ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

bnp

ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তো অবশ্যই, অনলাইনে থাকা পরিচিতজনরাও আমায় টিপ্পনী কাটেন “সরকারি চামচা” বলে। জাতীয়তাবাদী বন্ধুদের নিত্য অভিযোগ আমার প্রতিটি লেখায় “আওয়ামী” চিন্তাধারা ফুটে উঠে। অথচ “আওয়ামী” সমালোচনায় লেখা মন্তব্য কিংবা কলামগুলো নিত্য তাদের চোখ এড়িয়ে যায়। আজ লিখার শুরুতেই সিদ্ধান্ত নিলাম কলামটি লিখবো শুধুমাত্র জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বন্ধুদের জন্য।

জাতীয়তাবাদী নেতা-নেত্রীদের আগুন ঝরানো বক্তৃতা আর মন্তব্যে টিভিপর্দা গরম হয়, বাংলার আকাশ বাতাস কাপে, ঈশান কোনে মেঘের ঘনঘটা দেখা যায়, অতঃপর তা হাওয়ায় উবে যায়! সাধারণ জনগণের মনে কোনো ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় না, অর্থাৎ সাধারণ জনগণকে তারা আন্দোলন সংগ্রামে সম্পৃক্ত করতে পারছেন না কিংবা কেনো জাতীয়তাবাদী বন্ধুদের আন্দোলন সফলতার মুখ দেখছে না!!! কিন্তু কেনো??

আন্দোলন, জাতীয় ইস্যু এবং জনগণ…
‘৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ কিংবা তৎপূর্ববর্তী আন্দোলন দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কিন্তু ‘৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এবং তৎপরবর্তী সকল আন্দোলন সংগ্রাম সচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, একটি দল শুধু মাত্র তাদের নেতা-কর্মীদের দিয়ে কোনো আন্দোলন সফল করতে পারেন না, আন্দোলনে চাই জনগণের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ অংশগ্রহণ।
১৯৯১-৯৬ কিংবা ২০০১-০৬ সরকার বিরোধী প্রত্যেকটি চূড়ান্ত আন্দোলনের পূর্বে ছোট-বড় জাতীয় ইস্যুতে জনগণকে চমৎকারভাবে সম্পৃক্ত করেছে। ১৯৯৬-২০০১ কিংবা ২০০৯-২০১৪ বিএনপি কি পেরেছে সাধারণ জনগণকে আন্দোলন সংগ্রামে সফলতার সহিত সম্পৃক্ত করতে? জাতীয় ইস্যু জনগণের সামনে নিয়ে আসতে?? জনগণের পাশে দাঁড়াতে??

অতীতে আমি আমার বিভিন্ন লেখায় বার বার বলেছি, এই দেশের গণতন্ত্রে একটি দল বা গোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন হয়, জনগণ ক্ষমতার আবহের বাইরে থাকে সর্বদাই। জনগণের জন্য যে গণতন্ত্র সেই গণতন্ত্রের নামে এখানে জনগণের মুখে তুলে দেয়া হয় “হাওয়ার মিঠাই”। জনগণও কয়েক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে “মিঠাই” উপভোগ করে আর মনে মনে ভাবে এইতো বেশ আছি!! তবে সাধারণ জনগণ এটা ভালো করেই জানে সরকার পরিবর্তন আর নির্বাচনের নামে এই দেশে শুধু দুটি দলেরই ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। তাই ছোট বড় জাতীয় ইস্যু নিয়ে আন্দোলন করে জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। জনগণকে সেই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে হয়, জনগণকে উপলব্ধি করাতে হয় তাদের থেকে আমরা সেরা। জাতীয়তাবাদী দল কি তা করতে পেরেছে??
ব্যাংক দুর্নীতি, শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু ইস্যুর মতো বড় বড় ইস্যু তাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে গেলো, কই কখনো তো দেখলাম না এই সব ইস্যুতে তারা আন্দোলনে মাঠে নামতে!! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে কার্যালয়ে বসে কিংবা নিজ রুমে আরামদায়ক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে সরকারকে দোষারোপ করেছন তারা… এতেই হয়েছে দায়িত্ব পালন। বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, গ্যাসের দাম বাড়ছে… এই নিয়ে আন্দোলন নেই! জন-সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে আন্দোলন জোরদার করার জন্য এই সব ইস্যুর বিকল্প নেই, নেতারা এইসব কবে বুঝবেন!! সাধারণ জনগণ থেকে থেকেছেন যোজন যোজন দূর। এমন কি নিজ এলাকায়ও পা মাড়ান না কালে ভাদ্রে!!! যার ফলে তৃনমূলের নেতা কর্মীদের সাথে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব।

তৃনমূলের নেতা কর্মীদের নিয়ে সরকার এবং বিরোধীদলের উপর ক্ষোভ আমার চিরদিনের। কেউই তৃনমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করে না। আজীবন নিবেদিত একজন কর্মী নিঃস্বার্থ ভাবে একদলের পক্ষে কাজ করে যায়, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা তাদের খোজ খবর রাখেন না, সুখ-দুঃখের অংশীদার হোন না। এমন কি তৃনমূলের নিবেদিত নেতা কর্মীদের উপেক্ষা করে ঢাকায় বসে পকেট কমিটি তৈরি করেন, কখনো তা স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কখনো আবার অর্থের বিনিময়ে।
দাবা খেলায় সবার আগে মাঠে থাকে সাধারণ সৈন্য। তাদের ব্যাকআপে থাকে গজ, কিস্তি, ঘোড়া… কখনো মন্ত্রী। সৈন্যের যথাযথ অবস্থানের কারণে খেলার বোর্ড (মাঠ) দখল করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায়। মাঠে টেলে দেওয়া এইসব সাধারণ সৈন্য অর্থাৎ কর্মী-বাহিনীর ব্যাকআপে কি জাতীয় বা জেলা পর্যায়ের নেতা থাকছেন??!!!

“আপনারা আমায় মূল্যায়ন করবেন না, খোঁজখবর নেবেন না, ঢাকায় বসে আন্দোলনের ঢাক দিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে রিমোট হাতে টিভি চ্যানেল পাল্টাবেন, আমি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আপনাদের ক্ষমতার সিঁড়ি হবো সেই দিন আর নাই…!” এই মনোভাব চলে এসেছে অনেক কর্মীদের মাঝে। আপনারা যেভাবে দায়সারাভাবে আন্দোলনের ঘোষণা দেবেন মাঠ পর্যায়ে আন্দোলন ঠিক সেইভাবে দায়সারা ভাবে চালিত এবং কার্যকর হবে।

জাতীয়তাবাদী জাতীয় পর্যায়ের নেতা…
আমার কথা গোস্বা করতে পারেন, কিন্তু একবার ভেবে দেখেন ‘জাতীয় পর্যায়ে বিএনপির নেতা কারা?’ তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস কি? হাতেগোনা কয়েকজন নেতা বাদে বিএনপির অধিকাংশ নেতা দলছুট, দলত্যাগী,প্রাক্তন সরকারী আমলা, প্রাক্তন সামরিক অফিসার। অধিকাংশই জোটবদ্ধ হয়েছেন ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে ভোগবিলাসের অংশীদার হওয়ার জন্য।
তারা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে পারেন, টিভি টক-শোতে চমৎকার কথা বলতে পারেন, কিন্তু নেত্রী আন্দোলনের ঢাক দিলে তারা ঘর ছেড়ে বের হন না। এ নিয়ে খোদ বিএনপি নেত্রীর ক্ষোভের শেষ নেই। ৫ই মে নেত্রী হেফাজতের পাশে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের দাড়াতে হুকুম দিয়েছিলেন… কয়জন রাস্তায় নেমেছিলো? যদি সেইদিন নেতা-কর্মীরা মাঠে নামতো তবে আজ ইতিহাস অন্য হতো।

মনক্ষুন্ন হবেন না, আমি তো শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দোষারোপ করছি, বিএনপি নেত্রীর বাসায় যখন মধ্য রাত অবধি গোল-টেবিল বৈঠক হয় তখন কিন্তু সবার মোবাইল সিজ করা হয়। এ নিয়ে মওদুদ আহমেদের সাথে মনোমালিন্যের খবরও সবার জানা। এতো কিছুর পরও ঐ গোল টেবিল বৈঠকের সকল তথ্য সরকার দলীয় লোকের কাছে চলে যায়। নেত্রী তো একাধিক বার রাগান্বিত হয়েছেন, মিটিং এ আলোচিত বিষয় সংবাদ মাধ্যমে চলে আসে কিভাবে!! এই হলো বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ!!!

যুদ্ধাপরাধী ইস্যু!

আজও পরিষ্কার ভাবে জানতে পারলাম না বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় কি না! বার বার প্রতিটি মিটিং এ নেত্রী স্বয়ং এবং বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা বলে আসছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান নেই। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডটা কি হবে আজো তারা ব্যাখ্যা করেননি। নেত্রী সিলেটে এসে চিহ্নিত রাজাকারদের নাম ধরে তাদের “রাজবন্দী” উল্লেখ্য করে মুক্তি দাবী করেছিলেন। একজন বীরাঙ্গনা এবং মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হয়ে তিনি যা বলেছেন তা ব্যক্তিগতভাবে কখনোই মেনে নিতে পারিনি। আমার জাতীয়তাবাদী বন্ধুরা বলেছেন, ঐ বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক!

কোনো কোনো জাতীয়তাবাদী বন্ধু আবার এক কাঠি সরেস, তারা জামাতের পক্ষাবলম্বন করে বলেন, যুদ্ধাপরাধ আবার কি!! ‘৭১ সালে জামাত বা তাদের নেতারা যা করেছেন সবই ছিলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। এতো বছর পর আওয়ামীলীগ ৪০বছরের পুরোনো ইস্যুকে নিয়ে খেলা করছে শুধুই রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য।

আমি তাদের বক্তব্যেই উত্তর খুঁজে পাই, ‘৭১ এ জামাত এবং তাদের নেতাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিলো পাকিস্তান সমর্থন, ২০১০-এ ৪০বছর পর আওয়ামীলীগ যুদ্ধাপরাধের বিচার করছে রাজনৈতিক কারণে। অসুবিধা তো দেখি না।

বিএনপি’র সাথে জামাতের জোট যদি শুধুই নির্বাচনের হয়ে থাকে তবে ৪৩বছর আগে করা জামাতের অপরাধের দায় পরোক্ষভাবে বিএনপি নিচ্ছে কেনো!!! একটা ব্যাপার লক্ষ্য করবেন, মুক্তিযুদ্ধের ৪৩বছর পর আজোও জামাত বা তাদের নেতৃবৃন্দ কখনোই ১৯৭১সালে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হোক বা কৃতকর্মই হোক কোনোটার জন্যই কিন্তু অনুশোচনা বা ক্ষমা চাননি!!!

তারেক ভাই!
তারেক রহমান বিএনপি’র ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি। জাতীয়তাবাদী ভাইয়েরা তাকে ইতিমধ্যে দেশনায়ক বলে থাকেন, সবাই জানে সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রীও তিনি। তিনি শুরুও করেছিলেন চমৎকারভাবে। মাঠ পর্যায়ে কর্মী সংযোগ, বঙ্গবন্ধু মাজার জিয়ারত, দোয়া পাঠ দেশের সব দলের সকল নেতা-কর্মীদের জন্য শিক্ষণীয়।
কিন্তু ইদানীং বঙ্গবন্ধুকে সরাসরি আক্রমণ করে তিনি যেসব বক্তৃতা বিবৃতি দিচ্ছেন তা দুঃখজনক। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে, প্রসিদ্ধসব ইতিহাসবিদগণ ইতিমধ্যে যথেষ্ট গবেষণা করেছেন, এখন মনে হয় তারেক ভাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গবেষণা না করে গবেষণা করা উচিত নিজের দলকে কিভাবে সংঘটিত করে কত দ্রুত ক্ষমতায় যাওয়া যায় সেইদিকে নজর দেয়া উচিত। কারণ তারেক ভাই সারা জীবন ক্ষমতার আবহে বড় হয়েছেন, ক্ষমতার বাইরে দীর্ঘদিন থাকলে তার শারীরিক অসুস্থতা মানসিক অসুস্থতায় পরিবর্তিত হবে, যা দল এবং দেশের জন্য শুভ হবে না। (মাঝে মাঝে আমার মনে হয়েছে তারেক ভাইয়ের মুখে পাগলাটে এইসব কথাবার্তা আওয়ামী এজেন্টরাই তুলে দিচ্ছে না তো!!!)

মাঠ পর্যায়ে তৃনমূল নেতাকর্মীদের সাথে সংযোগ বাড়িয়ে জাতীয় ইস্যুতে বিএনপিকে বেশি মনযোগী হয়ে জন-সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ব্যাপারে জোর দিতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাঠে নামলে মামলা-হামলা, জুলুম নির্যাতন হবেই, এই নিয়তি মেনে নিয়ে আওয়ামীলীগ আন্দোলন করেছে, বিএনপিকেও করতে হবে। এসি রুমে বসে নয়, রোদে পুড়ে তপ্ত রাস্তায় আন্দোলনে নামুন, আন্দোলন সফল করুন, তারপর ক্ষমতায় যান। অন্যতায় রাজনৈতিক ভাঁড় হিসেবে “অভিশাপ দিচ্ছি” ব্যানারে সভা করে জনগনকে বিনোদন দিয়ে যান।