ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 
you-salary-why-are-you-not-growing-all-your-friends-are-now-grown-up

সরকারি চাকুরিতে প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড অফিসার হিসেবে যোগদান করার পর প্রথম মাসে ৯নং পে স্কেলে মূল বেতন ১১,০০০/= (এগারো হাজার) টাকায় বাড়ি ভাড়া ও চিকিৎসা ভাতাসহ মোট বেতন গ্রহণ করি প্রায় ১৬৩০০/= (ষোল হাজার তিনশত) টাকা। বেতন নিয়ে অনেকেই হীনমন্যতায় ভুগলেও নিজে সর্বদাই গর্ব করেছি। ধনবান পিতার সূত্রে বেতনের টাকার উপর কখনোই নির্ভর করতে হয়নি। অনেকেই হয়তো বিশ্বাস করবেন না, বেতনের প্রায় পুরোটাই খরচ করেছি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে আর সাহায্য সহযোগিতায়। এ নিয়ে বাবার সাথে একাধিকবার ঝগড়াও হয়েছে।

প্রথম যখন সরকারি চাকরি পেলাম, তখন ঘনিষ্ঠ এক প্রবাসী আত্মীয় বাসায় ফোন করে জিজ্ঞাস করেছিলেন বেতন কত। কোনো মেয়েকে যেমন তার বয়স জিজ্ঞাস করতে নেই, তেমনি বেতনের ব্যাপারে কোনো পুরুষকেই প্রশ্ন করতে নেই, এই তথ্য আমার ভাই জানতেন না। আমি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করি, কিন্তু তিনি বার বার চাপ দিতে থাকেন বেতনের অঙ্ক জানার জন্য। একসময় আমি যখন বলি প্রায় ষোল হাজার টাকা, তখন তিনি অবাক হয়ে বলেন, এটা তো আমার এক সপ্তাহের সেলারি থেকেও কম! বেতন বিষয়ক তুলনায় আমার মেজাজ কিছুটা খারাপ হয়ে যায়, আমি নরম ভাষায় বলি, নিজের যোগ্যতায় দেশে এসে ষোল হাজার টাকা সৎভাবে রোজগার করে দেখান ভাইজান।

সরকারি অফিসাররা কত বেতন পান তা নিয়ে সাধারণ জনগণের মনে অনেক আগ্রহ, যুক্তরাজ্য ভ্রমণ কালে আমার একাধিক আত্মীয় বার বার জানতে চেয়েছেন কত বেতন পাই, (আমি নিশ্চিত ছিলাম যে তারা বেতনের অংক শুনে তৃপ্ত হতে চান যে প্রবাসে এসে তারা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং তারা ভালো আছেন) আমি প্রতিবারই উত্তরে বলেছি, বেতনের অংক খারাপ না, বরং ভালো, যে টাকা বেতন পাই তা পাউন্ডে কনভার্ট করে ইংল্যান্ডে এসে খরচ করতে পারি।

কেমন হত যদি বাবার টাকার উপর আরাম আয়েশ না করতাম, স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবাকে নিয়ে সিলেট শহরে বাসা ভাড়া করে থাকতাম। মা-বাবার চিকিৎসা খরচ, কাপড়চোপড়, ইলেকট্রিক বিল, গ্যাস বিল, মোবাইল বিল থেকে শুরু করে বাজার-খরচাপাতি… আর তার বিপরীতে বেতনের সাধের ষোল হাজার টাকা!!!

আমার এক সহকর্মী বন্ধু মাঝে মধ্যে প্রচণ্ড ফ্রাস্ট্রেশনে কান্নাকাটি করতো, দেশের বাড়িতে প্রতিমাসে মা-বাবাকে টাকা পাঠাতে হতো, শহরে স্ত্রীকে নিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকা, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ… সব মিলিয়ে তার ত্রাহি দশা আমায় ভীষণ কষ্ট দিতো।

বেতন বিষয়ে হুমায়ুন আজাদ স্যারের একটি উক্তি আমার বার বার মনে পড়ে, “বেতন বাঙলাদেশে এক রাষ্ট্রীয় প্রতারণা। এক মাস খাটিয়ে এখানে পাঁচ দিনের পারিশ্রমিক দেয়া হয়।”

সরকার নতুন পে-স্কেলে কর্মচারি-কর্মকর্তাদের বেতন দ্বিগুণ করার সুপারিশ পেয়েছেন, আমি জানি না কতটুকু তা কার্যকর হবে। ধন্যবাদ এতদিন পর তাদের ঠনক নড়ার জন্য, আগে চার সদস্যের পরিবারের জন্য বেতন হিসেব করা হলেও এখন ছয় সদস্যের পরিবারের জন্য করা হবে।

বর্তমান দ্রব্যমূল্যের বাজারে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা ৯নং পে-স্কেলে যদি ১১হাজার টাকা মূল বেতন পান তবে তার নিচে থাকা বাকি ১১টি (১০-২০) পে-স্কেলে কর্মচারীরা কত বেতন পাবেন তা সহজেই অনুমেয়। বেতন বাড়লে, মূল্যস্ফীতি ঘটবে, দ্রব্য মূল্য বাড়বে, বাড়ি ভাড়া বাড়বে… এ যেন আমাদের নিয়তি।

আগামি অর্থ বছর শুরুর পূর্বে এইসব ব্যাপারে একটু নজর দিয়ে তদারকি করলে হয়তো কিছুটা রেহাই পাওয়া যাবে। অন্যথায়, কিছু অসাধু মানুষের সিন্ডিকেটের কারণে বেতন বাড়া আর না বাড়া একই কথা।