ক্যাটেগরিঃ প্রশাসনিক

 
Kean_Bridge_and_Ali_Amjad_Clock_Tower,_Sylhet

খুব বেশিদিন পুরোনো কথা নয়, দুই যুগ আগেও সিলেট শহরে সুপেয় পানির কোনো সমস্যা ছিলো না। মাত্র ৬০ থেকে ১০০ফিট গভীরে পানির লেয়ার পাওয়া যেতো। অনেক এলাকায় ৮০-৯০ ফুট গভীর টিউবওয়েলে শেষ রাতে চাপ দেয়া ছাড়াই প্রাকৃতিক প্রেশারের কারণেই পানি পড়তো। তৎকালে ১০০ফিটের উপর গভীর নলকূপকেই অনেক বেশি গভীর মনে করা হত।

নগরায়ন শুরু হলে শহরে অত্যধিক জনসংখ্যার চাপের কারণে বেশি পানির প্রয়োজনে একের পর এক গভীর নলকূপ স্থাপন হতে থাকে, এগুলো নিয়ন্ত্রণ করার বদলে অবিবেচকের মত সিটি কর্পোরেশন সিলেট সিটির ভেতরে পানি সরবরাহের জন্য শহরের বিভিন্ন স্থানে গভীর এবং শক্তিশালী পাম্প স্থাপন করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে যা হবার তাই হয়েছে, মাত্র দুই-যুগের ব্যবধানে পানির স্থর নেমে গেছে অনেক নিচে। শহরের বিভিন্ন স্থানে ৩০০ থেকে ৫০০ ফুট নিচেও মিলছে না পানির স্থর!
বেসরকারি ভাবে পানি উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করতে সিলেট সিটি কর্পোরেশন এখন আইন শক্ত করেছে শহরের ভিতরে কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে গভীর বা অগভীর নলকূপ স্থাপন করলে কর্পোরেশনের অনুমতি নিতে হবে। অথচ সামান্য উৎকোচের বিনিময়ে বিশেষ “অনুমতি”। বাস্তবে শহরের মানুষকে পানি আইনের আওতায় আনার কথা বলে মূলত সুকৌশলে পানিয় খাতকে ঘুষের আওতায় আনা হয়েছে।
সেই কালের ক্ষুদ্র সিলেট পৌরসভা আজ পরিণত হয়েছে একটি মহানগরীতে। সুযোগ সুবিধা এবং আরামদায়ক শহর হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশের লন্ডন খ্যাত সিলেট শহরে প্রতিদিনই বাড়ছে মানুষের সংখ্যা। বাড়ছে পানির চাহিদা। বর্তমানে নগরীতে পানির চাহিদা রয়েছে প্রতিদিন ৮ কোটি লিটার। আর সিটি কর্পোরেশন পানির সাপ্লাই দিচ্ছে মাত্র আড়াই কোটি লিটার। প্রতিদিন সিলেট নগরীতে পানির ঘাটতি থেকে যাচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি লিটার।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৩৭ সালে নগরীর তোপখানায় স্থানীয় প্রয়োজন মিটানোর জন্য ওয়াটার প্লান্ট তৈরি করা হয়। কিন্তু এক সময়ের ছোট সিলেট পৌরসভা আজ সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হয়েছে সিলেট। বিশাল জনগোষ্ঠীর পানির চাহিদা বেড়েছে কয়েকশত গুন বেশি।

আশার কথা হলো, নগরীর কুশিঘাট এলাকায় ১শ ৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট এর কাজ শেষ পর্যায়ে। পরীক্ষামূলক ভাবে প্রতিদিন ১ লক্ষ লিটার পানি সাপ্লাইও দেওয়া হচ্ছে। এ বছর ২০১৫ সালের শুরুর দিকে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা, তাহলে এই প্লান্ট থেকে সুরমা নদীর পানি উত্তোলন করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ২ কোটি ৮০ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা হবে।
তাছাড়া নগরীর তোপখানা এলাকায় সেই পুরোনো ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টকে সংস্কার করে আধুনিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সংস্কার কাজ চলছে। সংস্কার কাজ সম্পন্ন হলে ১ লক্ষ ২৫ হাজার লিটার পানি উত্তোলন করা হবে।

সিলেট শহরে কখনোই সুপেয় পানির সমস্যা ছিলো না। বর্তমানে সৃষ্ট প্রকট সমস্যার সম্পূর্ণ দায়ী তৎকালীন পৌরসভা আর বর্তমান সিটি কর্পোরেশনের কাণ্ডজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত আর সীমাহীন দুর্নীতি।
আমরা কখনো ভবিষ্যৎ সমস্যাকে মাথায় রেখে পরিকল্পনা সাজাই না। সকল প্ল্যান-পরিকল্পনাই বর্তমানকে ঘিরে, পকেট ভারি করার মহোৎসব।

সিলেট সিটি-কর্পোরেশনের সিস্টার সিটি হল যুক্তরাজ্যের সেইন্ট আলবান্স (St Albans), প্রাক্তন মেয়র সেইন্ট আলবান্স ভ্রমণ করে সেই নগরের মত সুন্দর করে সিলেট শহর সাজাতে চেয়েছেন। সেই অনুযায়ী কি উদ্যোগ তিনি নিয়েছিলেন আমি জানি না। সেইন্ট আলবান্স ভ্রমণের সুযোগও সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি চাই সুন্দর পরিছন্ন নাগরিক সকল সুবিধা সম্পন্ন সেইন্ট আলবান্সকেও আমার সিলেট নগরী ছাড়িয়ে যাক। সরকার এবং সিটি-কর্পোরেশনের সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সিলেট সিটি-কর্পোরেশন সুন্দর, পরিছন্ন বসবাসযোগ্য একটি চমৎকার নগরীতে পরিণত হোক এই প্রত্যাশাই করি।