ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
Democracy-2ycn094fktgmmveibaq7sw

“Of the People, By the People, For the People…” গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটি চমৎকার। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যা চর্চা হচ্ছে তা কোনো-ভাবেই গণতন্ত্রের সাথে মিলে না।

গণতন্ত্র মানেই ৫বছর পর একবারের জন্য জনগণকে স্মরণ আর ক্ষমতায় আরোহণের পর জনগণের সরকারের পরিবর্তে দলীয় সরকারে পরিণত হওয়া। জনগণ যে গত সরকারের অপশাসনে অতিষ্ঠ হয়ে সুন্দর স্বপ্নের জাল বুনে সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্য একটি দলকে ক্ষমতায় বসালো তা সেই দল বেমালুম ভুলে পরবর্তী ৫বছর নিজেরাই সেজে বসে অপশাসক। আর জনগণ তাদের অপশাসনে আশাহত হয়ে পরবর্তী নির্বাচনে আবার নির্বাচিত করে বিরোধীদলকে। এমন নয় যে বিরোধী দল গত ৫বছর চমৎকারভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করেছে, গঠনমূলক সমালোচনায় সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে। কিন্তু তারপরও দিশেহারা জনগণ অনন্যোপায় হয়ে তাদেরই নির্বাচিত করছে।

Of the People, By the People, For the People…সংজ্ঞাটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পরিণত হয়েছে- “Of the Party, By the Party, For the Party!!!”

গণতন্ত্রের নামে এখানে কলুর বলদ জনগণ। গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতায় থাকার জন্য এখানে গুলি করে মারা হয় জনগণ, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তথাকথিত গণতান্ত্রিক অধিকার “হরতাল” এর নামে পুড়িয়ে মারা হয় জনগণ। বিরোধীদল যুদ্ধ ঘোষণা সরকারের বিরুদ্ধে কিন্তু জান-মালের ক্ষতি হয় সাধারণ জনগণের। যাদের সংঘর্ষ সরকারের সাথে তারা কেনো সরকারী মন্ত্রণালয় ঘেরাও করছেন না, কেনো সচিবালয় ঘেরাও করছেন না!!! হরতাল আর অবরোধের নামে জিম্মি আজ জনগণ।

আর এইসবের দায়ভার?

বিরোধীদলের আঙ্গুল সরকারের দিকে, সরকারের আঙ্গুল বিরোধী দলের দিকে!!!

গণতন্ত্রের নামে যে অপ-তন্ত্রের চর্চায় আমরা লিপ্ত হয়েছি তা থেকে রেহাই যে কবে হবে তা একমাত্র খোদাই জানেন। গণতন্ত্রের নামে ৫বছর পর পর এক একটি দলকে আমরা নির্বাচিত করে সমভাবে আমাদের শোষণ করার ক্ষমতা দিচ্ছি।

আমি গণতন্ত্রের বিরোধী নই, কিন্তু আজ এইক্ষণে মনে হচ্ছে গণতন্ত্রের জন্য আমাদের জাতি ঠিক প্রস্তুত নয়। শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সুশিক্ষিত জাতি প্রয়োজন। আমরা আদৌ কি সুশিক্ষিত জাতি। ৬০% বা ৭০% সাক্ষরতার হার শুধু নাম-দস্তখতেই সীমাবদ্ধ। আদৌ এই জনগণ কতটুকু গণতন্ত্র সচেতন!! সর্বোপরি নিজের অধিকার সম্পর্কে কতটুকু সচেতন। বর্তমানে যারা গণতন্ত্রের ঝাণ্ডা সমুন্নত রেখেছেন তারা ৭১ এবং পরবর্তী প্রজন্ম, যারা একের পর এক আন্দোলন সংগ্রাম আর বিশৃঙ্খলা দেখে দীক্ষিত হয়েছেন, আর তারা ধরেই নিয়েছেন ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়িই আন্দোলন সংগ্রাম আর বিশৃঙ্খলা মতান্তরে মানুষ মারা। আর যারা ক্ষমতায় থাকেন তারাই মনে করেন ক্ষমতায় থাকার মূল মন্ত্রই হচ্ছে “দমন” আর “নিপীড়ন”।

বহুদিন পূর্বে New York Times এ একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম, সেখানে খুবই সুন্দর ভাবে গণতন্ত্রায়নের জন্য শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত হয়েছিলো। আর্টিকেলটার শিরোনাম ছিলো চমৎকার- “Want a Stronger Democracy? Invest in Education”

প্রশ্ন করি, আদৌ কি জাতি হিসেবে আমরা গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত বা গণতন্ত্র আমাদের জন্য উপযুক্ত!!! গণতন্ত্রের আড়ালে ভোট দিয়ে আমরা কখনও কি জনগণের সরকার পেয়েছি!!! দলীয় সরকারের আড়ালে পরিবারতন্ত্রের যে অপশাসন চলে তা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মত আমাদের ঘাড়ে সওয়ার হয়েছে। গণতন্ত্র বলতে সরকারি দল বোঝে ৫বছরের জন্য দেশের বন্দোবস্ত, গণতন্ত্র বলতে বিরোধীদল বোঝে হরতাল অবরোধের মাধ্যমে জনগণকে জিম্মি করে সরকারের বিরোদ্ধে বিতৃষ্ণা সৃষ্টি। আর জনগণের কাছে গণতন্ত্র একটি দিনের ভোটাধিকার।

আমার কাছে মনে হয়েছে, গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা, বাস্তবায়ন এবং এর সুফল লাভের জন্য জাতি হিসেবে আদৌ আমরা প্রস্তুত না। এখনও ভোটের সময় দেশের জনগণ ইস্যু না হয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ইস্যু হয়, ‘৭১ এর বিকৃত ইতিহাস ইস্যু হয়, আস্তিক-নাস্তিক নামের ভুয়া তত্বও বিরাট ইস্যু, মনুষ্য রচিত সংবিধানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মিথ্যা প্রলোভন ইস্যু হয়, ভিটামিন-এ ক্যাপসুলের মিথ্যা বানোয়াট প্রোপাগান্ডাও ইস্যু হয়, দুই নেত্রীর মধ্যে কে বেশি সুন্দর তাও ইস্যু হয়। আর সেইসব ইস্যুতে সম্মোহিত হয়ে পঙ্গপালের মত ভোটাধিকার প্রয়োগ করে একটি দলকে জয়ী করি।

এখানে মূল্যায়িত হয় না সরকার বা বিরোধী দলের কর্মযজ্ঞ। গত ৫বছরের সরকার আমাদের কি দিলেন আর বিরোধী দলেরই বা ভূমিকা কি ছিলো!!!

আজ এইক্ষণে খুবই প্রয়োজন মনে করছি একটি সৎ একনায়ক-তন্ত্র বা কঠিন সমাজতন্ত্রের। আগামী ২৫-৩০বছর তারা কঠোর হাতে দেশ শাসন করবে, আমাদের শিক্ষিত, সভ্য করবে। কঠিন শাসনের মধ্য দিয়ে যেদিন আমরা গণতন্ত্র গ্রহণের জন্য প্রস্তুত হবো সেদিনই শুধুমাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে। যেদিন জনগণ কারো দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে, টাকার কাছে নিজেকে বিক্রি না করে, সুচিন্তিত-ভাবে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে, যেদিন ভোট দেবার পর জনগণ নিশ্চিতভাবে জানবে তার ভোট চুরি হবে না বা ভোট চুরি বা জোর করে ক্ষমতায় থাকার মন-মানসিকতা চিরতরে বিলীন হবে সেদিনই শুধুমাত্র আমরা গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত হবো।

আজ আমি যা ভাবছি, এতো বছর পর যা বুঝতে পারছি, দেশ স্বাধীনের মাত্র তিন বছরের মাথায়ই আমার মহান নেতা তা বুঝতে পেরেছিলেন, “জাতি হিসেবে গণতন্ত্রের জন্য আদৌ আমরা প্রস্তুত নই”

মনে রাখবেন, সচেতন না হলে এখানে “Of the People, By the People, For the People…” এর গণতন্ত্রের আড়ালে চলতেই থাকবে পরিবারতন্ত্র যা “Of the Family, By The Family, For the Family”