ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১নম্বর ওয়ার্ডের ১৯নম্বর বেডের পাশে। সেখানে অগ্নিদগ্ধ হয়ে শুয়ে আছেন একজন ট্রাক চালক। তাঁর শরীরের ৪০শতাংশ পেট্রোল-বোমার আগুনে পুড়ে গেছে। এক ব্যাগ রক্ত রাতেই দেয়া হয়েছে, এখন দ্বিতীয় ব্যাগ চলছে। বেডের পাশে তাঁর স্ত্রী এক নাগাড়ে কেঁদে সৃষ্টিকর্তার কাছে নালিশ করছেন।
কি দরকার ছিলো অবরোধের সময় ট্রাক নিয়ে রাস্তায় বেরুনোর!!!
দুই সপ্তাহ অবরোধের কারণে ট্রাক বন্ধ, জমানো সব অর্থ খরচ হয়ে গেছে। নিজের সন্তান, মা, বাবা, বোনের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। অবরোধের ভয়ে ড্রাইভার ট্রাক নিয়ে বেরোননি এতোদিন, নিজে তো না খেয়ে থাকা যায়, কিন্তু মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তানদের উপোষ রাখা কি আর সম্ভব?
ভয়কে সঙ্গী করে সৃষ্টিকর্তার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ট্রাক নিয়ে। সিলেট-তামাবিল রোডে যে পেট্রোল-বোমাটি ছোড়া হয় সেটি ড্রাইভার লক্ষ্য করে তাতে তিনি পুড়ে কয়লা হয়ে যাবার মুহূর্তে দগ্ধ শরীর নিয়ে লাফিয়ে পড়েন ট্রাক থেকে… পা ভেঙ্গে যায় তৎক্ষণাৎ।
এখন মৃত্যুর প্রহর গুনছেন হাসপাতালের বেডে শুয়ে।
তিনি সরকার দলের সমর্থক নন, বিরোধীদলেরও সমর্থক নন, তিনি এদেশের সাধারণ একজন মানুষ…যে পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করে, স্ত্রী-সন্তান, মা-বাবাকে নিয়ে খুবই সাধারণ জীবনযাপন করেন। যার জীবনে বড় কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই, তিনি ক্ষমতা চান না, নেতা হতে চান না, বড়লোক হতে চান না… শুধু দু-মুঠো ভাত খেয়ে নিজের পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকতে চান, এটাই তাঁর অপরাধ।
“তুই আবার কেরে বেটা!! তোর বেঁচে থাকার কি অধিকার আছে এই দেশে??? এখানে বেঁচে থাকবেন নেতা-নেত্রীরা, তাদের সন্তান-সন্তানাদিরা। তোর জীবনের মূল্য এদেশের নেতা-নেত্রীদের কাছে পোকা-মাকড়ের থেকেই কম।”

যে দগ্ধ ব্যক্তির কথা এতক্ষণ বলছিলাম, তিনি আমার ঘনিষ্ট বন্ধু নিপেন্দু সরকার নাথের ফুফা, বকুল দেব নাথ । নিপেনের সাথে গিয়ে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারিনি তাঁর বেডের পাশে। খুবই কষ্ট লাগছিলো। আত্মীয়স্বজন সবার মুখে একই নির্বাক-প্রশ্ন, ক্ষমতায় থাকবেন তারা… ক্ষমতায় যাবেন তারা… আমাদের পুড়িয়ে মারছেন কেন!!!

অভিশাপ দেয়া আমার স্বভাব বিরুদ্ধ। আমি কখনোই কাউকে অভিশাপ দেই না, এমন কি আমার শত্রুকেও না… আজ এইক্ষণে খুব অভিশাপ দিচ্ছে ইচ্ছে করছে, হে উপরওয়ালা, শুনবেন কি আমাদের ফরিয়াদ?