ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

রোটারী ক্লাবের সাপ্তাহিক সভা শেষ হওয়ার পর যখন টেবিলে থাকা স্যুপ আর অন্তনে মনোনিবেশ করেছি তখনই পাশের চেয়ারে বসে থাকা সহ রোটারিয়ান কোনো ধরণের ভূমিকা ছাড়াই প্রশ্ন করলেন,
“কি বলেন ভাই জয় কি আমাদের হবে?”

আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পালটা প্রশ্ন করি, “কোন বিষয়ে কথা বলছেন?”

তিনি যোগ করলেন, সরকার পতনের আন্দোলনের কথা বলছি।

বুঝতে পারলাম তিনি চলমান সরকার বিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে আমার মতামত চাইছেন। সহরোটারিয়ান আমার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না বোধকরি, ধারণা করেছেন আমি আমি জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী। আমি তাঁর বিশ্বাসে চিড় ধরাতে চাইলাম না।

কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে বললাম, ভাই বিএনপি-আওয়ামীলীগের সমর্থক না হয়ে নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে আন্দোলনকে দেখতে চাই। এই আন্দোলনে জয়ী কে হবে বলতে পারছি না ভাই, তবে পরাজিত কে হবে বলে দিতে পারবো নিশ্চিত।

তাঁর চোখে বিস্ময়, কে পরাজিত হবে?

আমি উত্তর দেই “জনগণ”

আন্দোলন হলে তো জনগণের একটু ভোগান্তি হবেই। সেটাই তো স্বাভাবিক। অতীতেও তাই হয়েছে!

ভোগান্তি শব্দটিতে আমার একটু আপত্তি আছে ভাই। ভোগান্তির নামে যা হচ্ছে তা সরাসরি পুড়িয়ে মানুষ হত্যা। আমি বিএনপির দাবীর সাথে পুরোপুরি একমত। কিন্তু আন্দোলনের মানে পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা কোনো ভাবেই সমর্থন করি না।

“অবরোধ হরতালে কেনোই বা তারা বাস ট্রাক চালাবে??”

ভাই প্রয়োজন রাজনীতি মানে না। একনাগাড়ে একদিন, দুইদিন, এক সপ্তাহ অবরোধ ঠিক আছে, কিন্তু কোনো বিরতি না দিয়ে অবরোধের নামে সন্ত্রাস চলতে থাকলে সাধারণ জনগণ অসহায় হয়ে পড়বে। পেটের দায়ে, জরুরি প্রয়োজনে তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য। আর আন্দোলনের নামে আপনি অবরোধ হরতাল ডাকতে পারি, স্বল্প পরিসরে জনগণ তা মেনেও নেবে, দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষেত্রে তা অকেজো হয়ে পড়বে। আন্দোলনের মুল শক্তি জনগণ। আন্দোলন যদি জন সমর্থন হারায় তবে তা ফলপ্রসূ হয় না। আন্দোলনে জন-সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বিএনপির বিশাল জন সমর্থন আছে, কিন্তু সহিংসতা হলে আর সেই সহিংসতায় সাধারণ মানুষ পুড়ে মরলে… বিএনপি জনসমর্থন হারাবে। আর সরকার এটাই চায়।

“বর্তমানে সহিংসতা কিন্তু সরকার পক্ষের মদদেও হচ্ছে। সরকারের এজেন্টরা অনেক ক্ষেত্রেই জড়িত।”

আমি বলি, সেক্ষেত্রে তো আমি বলবো সরকারের এজেন্ট যদি সহিংসতা করে তাহলে তো সরকারের উচিত তাদের এজেন্টদের সাথে সংলাপে বসা। বিএনপি সাথে কেনো বসবে!!

“আপনি কি বলতে চান?”

দেখুন, আমি নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে যদি পুরো ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করি তবে বলবো… সরকারের এজেন্ট হিসেবে বিএনপি নিজেই সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।

“কিভাবে??”

সরকার আন্দোলনের সুযোগ দিচ্ছে না। যথেষ্ট পরিমাণ জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও সাংঘটনিক দুর্বলতার কারণে বিএনপিও আন্দোলনে জন সম্পৃক্ততা বাড়াতে পারছে না। জনগণ জানে এই আন্দোলন দুই দলের ক্ষমতায়নের আন্দোলন। বিএনপির উচিত ছিলো এক্ষেত্রে কিছুটা সময় নিয়ে জন সম্পৃক্ত ইস্যু নিয়ে একটু একটু করে আন্দোলনে জনগণকে নিয়ে আসা। অনেকগুলো ইস্যুই ছিলো, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংক জালিয়াতি, শেয়ার বাজার… আরো অনেক ইস্যু আছে। এতে একটু সময় লাগতো কিন্তু আন্দোলন সফল হতো শতভাগ। বিএনপি একবছর অপেক্ষা করতে পেরেছে, আরো এক-দুই বছর রাজনীতির জন্য বড় কোনো সময় না। বিএনপি যদি নগদ কোনো ফলাফল চাইতো ২০১৪সালের ৫ই জানুয়ারির পর আন্দোলন থেকে সরে দাড়ানোই উচিত হয়নি। আন্দোলন বন্ধ করে দেয়ায় সরকার দেশে বিদেশে নিজেকে গুছিয়ে নেয়ার সময় পেয়ে গেছে।

সহরোটারীয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছিলেন।

আমি একটু দম নিয়ে যোগ করি, দেখুন আমি আগেও বলেছি, বর্তমান সময়ে আমার মনে হয়েছে বিএনপি আন্দোলনের নামে সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। সরকার চাচ্ছে বিএনপি সহিংসতা করুক, মানুষ মারুক, জনগণ বিএনপির উপর বিরক্ত হোক। এই সময়ে সরকার দেশে বিদেশে এই আন্দোলনকে সন্ত্রাস হিসেবে চিত্রায়িত করবে। আন্দোলনকে জঙ্গি রূপ দেবে। সরকার প্রধান ইতিমধ্যে মানুষ পুড়িয়ে মারার এই আন্দোলনকে আইএস এর সাথে তুলনা করেছেন। কাল বলবেন, আইএস এর সাথে ২০দলের যোগ সূত্র থাকতে পারে, পরশু বলবেন… ২০দল আইএস এর অঙ্গ সংঘটন। আমরা সবাই জানি বিদেশীদের কাছে জঙ্গি বা “টেররিস্ট” শব্দটি বিশেষ মূল্য বহন করে।
আর অবরোধের নামে তো অবরোধ হচ্ছে না। অবরোধ হবে অবরোধের মত, কোনো আন্তঃজেলা যানবাহন চলবে না। সব যানবাহন চলছে, রাতের অন্ধকারে আন্দোলনের নামে কাপুরুষের মত সাধারণ যাত্রীবাহী বাসে পেট্রোল-বোমা মারা কখনোই মেনে নেয়া যায় না। পুড়ে যাওয়া মানুষগুলো তো আর সরকারের লোক নয় ভাই।

“তাহলে এই আন্দোলনে সরকার পতন হবে না?”

সরি ভাই এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। আমার মনে হচ্ছে, আন্দোলনের নামে সরকারকে বিপদে ফেলতে গিয়ে বিএনপি নিজেই বিপদে পড়ে যাচ্ছে। “অবরোধ চলবে” শব্দটি ব্যবহার করে নেত্রী আন্দোলনকে একমুখী করে দিয়েছেন, হয় সরকারের পতন… নয়??? নয় কি তা বলতে চাই না। এদিকে সরকার সন্ত্রাস দমনের নামে বিএনপির সাংঘটনিক ক্ষমতা ধ্বংস করে দিচ্ছে, যার ফলে বিএনপি অতিমাত্রায় জামাত-শিবিরের উপর নির্ভর হয়ে যাচ্ছে। একটি দলের জন্য তা কখনোই দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষেত্রে শুভকর নয়।
এই সময়ে বিএনপির খুবই প্রয়োজন ছিলো ছাত্র রাজনীতি করে তৃণমূল থেকে উঠে আসা “ইলিয়াস আলী”র মত নিবেদিতপ্রাণ কিছু নেতা। ঢাকায় কিছু নেতা জেলে আছেন তা মানি কিন্তু বাকি বড় কিংবা মধ্যম সারির সব নেতা কোথায়, গ্রেফতার, জুলুম নির্যাতনের ভয়ে সবাই পালিয়ে আছেন, আন্দোলনে সম্পৃক্ত নেই। জেল-জুলুমের ভয় করে কে কবে নেতা হয়েছে!!!

“আপনার কথা শুনে খুবই আশাহত হলাম।”

দুঃখিত ভাই। আমি চেষ্টা করেছি নিরপেক্ষ থেকে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে। আশাবাদী হতে হলে আপনাকে বেশি করে ফেইসবুকে সময় দিতে হবে। ফেইসবুকে বসলে মনে হবে ২৪ঘন্টার মধ্যেই সরকারের পতন হয়ে যাবে। তবে আশার কথা আপনাকে শুনাতে পারি, এদেশে মাঠ পর্যায়ে বিএনপির বিরাট জন সমর্থন আছে। আওয়ামীলীগের মত দলের বিরুদ্ধে একমাত্র শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বিএনপি। এই জনসমর্থন তাদের চিরকালই থাকবে, কেনো থাকবে সেই ব্যাখ্যায় আমি যাবো না। বিএনপির উচিত সেই জনসমর্থন কাজে লাগিয়ে প্রয়োজনে একটু সময় নিয়ে দেশে বিদেশে তাদের দাবীর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিএনপির কূটনৈতিক শাখা খুব শক্তিশালী, খুব বেশি সময় লাগার কথা না।

যদিও সব কথার সাথে আমি একমত না, তবে আপনার সাথে কথা বলে আমার ভালো লেগেছে। একটি কথা চমৎকার লেগেছে, আন্দোলনে পরাজিত হচ্ছে জনগণ।

আপনাকেও ধন্যবাদ ভাই, আমার কথা শুনার জন্য । আজকাল সবাই বলার জন্য ব্যাকুল, কেউ শুনতে চায় না। ধন্যবাদ।