ক্যাটেগরিঃ স্বাস্থ্য

dementia

Dementia কি?
এক কথায়, এটি একটি স্মৃতি-ভ্রম রোগ। এতে দীর্ঘ-স্থায়ীভাবে চিন্তা করা বা দৈনন্দিন চিন্তা, ভাবনা বা কার্যক্রম স্মরণ করার ক্ষমতা হ্রাস পায়।
আলজাইমারস রোগীদের মধ্যে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতি-ভ্রম রোগ বেশি দেখা যায় (৭৫%)
এছাড়াওLewy body dementia, vascular dementia, frontotemporal dementia, progressive supranuclear palsy, corticobasal degeneration, normal pressure hydrocephalus and Creutzfeldt–Jakob disease এর ক্ষেত্রে এই স্মৃতি-ভ্রম রোগ পাওয়া যায়। কিছু রোগীদের চিকিৎসা করা গেলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসায় কোনো ভালো ফল পাওয়া যায় না, তখন ঔষধের পাশাপাশি শারীরিক এবং মানসিকভাবে সাহায্য রোগীদের ক্ষেত্রে ভালো সহায়তা করে। বয়স্ক রোগীদের ক্ষেত্রে এই রোগ সচরাচর বেশি দেখা যায়। যেখানে ৬৫-৭৪বৎসরের রোগীদের মাত্র ৩% ডিমেনশিয়ায় ভোগেন সেখানে ৮৫বৎসরের উপর রোগী ৪৭%!
.
DSM-5 (The Diagnostic and Statistical Manual of Mental Disorders, Fifth Edition) এর সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিমেনশিয়ার রোগীদের “Neurocognitive disorders” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় রোগের প্রকটতার ভিত্তিতে।


উপসর্গঃ

ডিমেনশিয়াতে ব্যক্তির মস্তিষ্কের চিন্তা করা বা স্মরণ করার ক্ষমতা আক্রান্ত হয়। এছাড়াও সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় দৃষ্টিশক্তি, বাকশক্তি, কর্মক্ষমতা ইত্যাদি। সর্ব ক্ষেত্রেই ডিমেনশিয়া খুব মন্থর গতিতে কোনো ব্যক্তিতে বিস্তার লাভ করে। এই সময়ের মধ্যে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে যে উপসর্গগুলো দেখা দেয় সেগুলো হলোঃ

বিষণ্ণতা এবং দুশ্চিন্তা
অস্থিরতা
সিদ্ধান্তহীনতা
শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় কষ্ট হওয়া
হাত কাঁপা
কথা জড়িয়ে যাওয়া
খাবার চিবাতে বা গিলতে ধীরগতি বা সমস্যা হওয়া
কল্পনাপ্রবণ এবং সন্দেহ-প্রবণ আচরণ (প্রায়শই রোগী অভিযোগ করে সে প্রতারিত হয়েছে বা তার কিছু খোয়া গেছে বা চুরি হয়েছে)

dementia1

পর্যায় এবং প্রকারঃ

Mild cognitive impairment:
এই পর্যায়ে ডিমেনশিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ ও উপসর্গগুলো দেখা দেয়। এই পর্যায়ের ৭০ভাগ রোগী পরবর্তীতে ডিমেনশিয়াতে ভোগেন। দৈনন্দিন কাজকর্মের তালিকায় বিস্মৃত হওয়া। যেমন, মাঝে মধ্যে কোন ওয়াক্তের নামাজ পড়েছেন কি না তা স্মরণ করতে না পারা, বা দুপুরে বা রাতে খাবার খেয়েছেন কিনা ভুলে যাওয়া… ইত্যাদি। Mini-Mental State Examination (MMSE) টেস্টে এই ধরণের রোগীর ২৭ থেকে ৩০স্কোর হয় যা একজন স্বাভাবিক মানুষের সমান। তাই এই সব রোগীর ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় করা বেশ কষ্ট সাধ্য। তবে যত সময় যায় তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রমে স্মৃতিচারণ মূলক সমস্যা প্রকট হয়।

Early stages: প্রাথমিক পর্যায়-

প্রাথমিক পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন রোগ সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরু করেন। রোগের উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনে প্রকট হতে শুরু করে এবং স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রে প্রায়শই পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্য নেয়া লাগে। এই পর্যায়ে কোনো ব্যক্তির গুছিয়ে কথা বলা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত দক্ষতা লোপ পেতে শুরু করে। ঔষধ খাওয়া, স্নান করতে ভুলে যাওয়া এই পর্যায়ে প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে অন্যতম। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করার সহজ পন্থা হলো আক্রান্ত ব্যক্তির আর্থিক হিসেব নিকেশে নজর রাখা। এই পর্যায়ে আক্রান্ত রোগী প্রায়শই জমা খরচ বা ব্যাংক একাউন্ট সম্পর্কে ভুলে যান। Mini-Mental State Examination এ এই ধরণের রোগীর স্কোর ২০ থেকে ২৫ এর মধ্যে। এই পর্যায়ে রোগী স্থান সম্পর্কে বিস্মৃত হতে থাকেন এবং একই কাজ একাধিকবার করা বা এজাতীয় ভুল করেন। আক্রান্ত হওয়ার ৫ থেকে ১০বৎসরের মধ্যে ডিমেনশিয়ার সকল উপসর্গ ধীরে ধীরে ঐ ব্যক্তির মাঝে পরিলক্ষিত হয়। তখন একজন গণিতের অধ্যাপকও সাধারণ যোগ বিয়োগের অংক কিভাবে করতে হবে তা ভুলে যান।

denemtia2

Alzheimer’s dementia: আলজেইমারস ডিমেনশিয়া-
এই পর্যায়ে আক্রান্ত ব্যক্তি প্রকট সমস্যায় ভোগেন। প্রায়শই আক্রান্ত ব্যক্তি স্থান, কাল, পাত্র স্মরণ করতে পারেন না। চেনা পরিচিত জায়গায়ও নিজের কাছে অচেনা লাগে। Lewy bodies and fronto-temporal ডিমেনশিয়াতে এই উপসর্গগুলো প্রাধান্য পায়।

Middle stages বা মধ্য পর্যায়ের ডিমেনশিয়া-
এই পর্যায়ে আক্রান্ত একজন ব্যক্তির Mini-Mental State Examination স্কোর করে ৬ থেকে ১৭পর্যন্ত চলে আসে। রোগীকে নতুন কোন তথ্য দিলে তিনি তা দ্রুত ভুলে যান। আক্রান্ত রোগী নিজ ঘরে এবং কর্মস্থলে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েন। এই পর্যায়ে রোগীকে কখনোই ঘরে একা রেখে পরিবারের অন্য সদস্যদের বাইরে যাওয়া ঠিক নয়। এই পর্যায়ে আক্রান্ত রোগীদের ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিছন্নতা সম্পর্কে শুধু স্মরণ করিয়ে দিলেই চলে না এক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সাহায্যও করতে হয়। personal care and

Late stages বা বিলম্বিত পর্যায়-

এই পর্যায়ে রোগীদের দৈনন্দিন সকল কাজকর্মে সহায়তা প্রদান করা লাগে। রোগীর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য পরিবারের সদস্যদের ২৪ঘন্টাই নজরদারি করতে হয়। এক্ষেত্রে রোগী প্রায়শই প্রস্রাব বা পায়খানায় যাওয়ার বিষয়টি স্মরণ করতে পারেন না এবং প্রস্রাব বা পায়খানার বেগ নিয়ন্ত্রণে এই ধরণের রোগী ব্যর্থ হন, তাই পরিবারের অন্য সদস্যদের বিষয়টি নজরে রাখতে হয়। এ পর্যায়ে রোগীর শক্ত খাবার খেতে কষ্ট হয় তাই রোগীকে নরম পাতলা খিচুড়ি জাতীয় খাবার দেয়া উচিত।
ঘুম কমে যাওয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি বিছানায় যেতে অনীহা দেখান, সারারাত জেগে বিছানায় বসে থাকেন।
এই পর্যায়েই কোনো একসময় আক্রান্ত ব্যক্তি পরিবারের সদস্যদেরও চিনতে পারেন না।


ডিমেনশিয়ার কারণ?

ডিমেনশিয়ার অনেক কারণ থাকতে পারে।
দ্রুত আরোগ্য লাভ সম্ভব এমন ডিমেনশিয়ার মধ্যে আছে- হাইপারথাইরইডিজম, ভিটামিন B12 এর ঘাটতি, Lyme Disease এবং নিউরোসিফিলিস। সুস্থ ব্যক্তির স্মৃতি-ভ্রম হলে তাকে অবশ্যই ভিটামিন B12 এবং হাইপারথাইরইডিজম এর জন্য ল্যাব টেস্ট করা প্রয়োজন। Lyme Disease এবং নিউরো-সিফিলিস এর ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা করা বাঞ্চনীয়।

Mild cognitive impairment থেকে Late stage বা লম্বিত পর্যায় পর্যন্ত অধিকাংশ স্মৃতি-ভ্রম রোগীই আলজেইমারস রোগে ভোগে, অর্থাৎ আলজেইমারস রোগের প্রাথমিক উপসর্গ এই পর্যায়ে প্রকাশ পায়।

Fixed cognitive impairment
মস্তিষ্কে আঘাতজনিত কারণে রোগীর স্মৃতি শক্তি লোপ পায় তা আমরা অনেকেই জানি। এ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্ত এবং অক্সিজেন সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্মৃতিশক্তি লোপ পায় যা hypoxic-ischemic injury নামে পরিচিত। কোনো ব্যক্তি স্ট্রোক (ischemic stroke, বা intracerebral, subarachnoid, subdural বা extradural hemorrhage) হলেও স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, এছাড়াও মেনিনজাইটিস বা এনসেফালাইটিস রোগেও স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়। অতি মাত্রায় মদ্যপানও স্মৃতি শক্তি লোপের কারণ, যা এলকোহল ডিমেনশিয়া নামে পরিচিত। এছাড়াও অন্যান্য রোগের ক্ষেত্রেও ডিমেনশিয়া পরিলক্ষিত হয়, যেমনঃ
Parkinson’s disease,
Creutzfeldt-Jakob disease,
Corticobasal degeneration,
Progressive supranuclear palsy,
Alexander disease
Canavan disease
Cerebrotendinous xanthomatosis
Dentatorubral-pallidoluysian atrophy
Fatal familial insomnia
Fragile X-associated tremor/ataxia syndrome
Glutaric aciduria type 1
Krabbe’s disease
Maple syrup urine disease
Niemann Pick disease type C
Neuronal ceroid lipofuscinosis
Neuroacanthocytosis
Organic acidemias
Pelizaeus-Merzbacher disease
Urea cycle disorders
Sanfilippo syndrome type B
Spinocerebellar ataxia type 2

ডিমেনশিয়ার ক্ষেত্রে বয়স একটি বড় বিষয়। কোন বয়সে স্মৃতি-ভ্রম রোগ হয়েছে তা রোগের প্রকার, পর্যায় এবং রোগ নির্ণয় করা হয়। যেমন ৬৫বৎসরের বেশি বয়সী ব্যক্তির ক্ষেত্রে অধিকাংশ রোগীই আলজাইমারস রোগে ভোগে থাকেন। হাইপারথাইরইডিজম, ভিটামিন B12 এর ঘাটতি সাধারণত কম বয়সী রোগদের ক্ষেত্রে দেখা যায়।

রোগ নির্ণয়:
সাধারণত লক্ষণ এবং উপসর্গের উপর ভিত্তি করে ডিমেনশিয়া রোগ নির্ণয় করা হয়। রোগীর জন্য তৈরি বিশেষ প্রশ্ন তালিকা থেকে প্রশ্ন করে ডিমেনশিয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় (mini mental state examination)। অনেক ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান বা এমআরআই জাতীয় পরীক্ষা করা হয় মস্তিষ্কের অবস্থা বোঝার জন্য। এছাড়া vitamin B12, folic acid, thyroid-stimulating hormone (TSH), C-reactive protein, full blood count, electrolytes, calcium, renal function, and liver enzymes প্রভৃতি পরীক্ষা প্রয়োজন-মাফিক করা হয়ে থাকে।

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা-

ডিমেনশিয়া প্রতিরোধে চিকিৎসক-গন সবচেয়ে বেশি জোর দিয়ে থাকেন জীবনযাত্রার মান, দৈনন্দিন কর্ম পদ্ধতি পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট পথ্যের উপর। ঔষধের পাশাপাশি রোগীকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে সহায়তা প্রদান করলে রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হয়। ইদানীং ডিমেনশিয়ার রোগীদের জন্য আলাদাভাবে ডে-কেয়ার ক্লিনিক চালু হয়েছে যেখানে রোগীদের মানসিক অবস্থার উন্নতির জন্য বিশেষ ধরনের সেবা প্রদান করা হয়।

সতর্কতা-

ডিমেনশিয়ার রোগীদের যে সকল ঔষধ প্রদান করা হয় তাতে অনেক রোগীর ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ঔষধ সেবনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।


কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ

ডাঃ মতিউর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান
নিউরোলজি বিভাগ, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সিলেট।