ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

খবরে দেখলাম যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফর তারা যে কোনো মূল্যে প্রতিহত করবে। হিসেবে তাই হওয়ার কথা। মাস-কয়েক পূর্বে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা লন্ডন সফর করেছিলেন তখন বিএনপি এবং তার অঙ্গ-সংঘটনের নেতাকর্মীরা তাঁকে যে পরিমাণ অসম্মান করেছে এবং সেই অসম্মানের মাত্রা এতোই বেশি ছিলো যে আওয়ামীলীগ এবং এর অঙ্গ-সংঘটনের নেতাকর্মীরা অপেক্ষায় আছে কখন বেগম জিয়া লন্ডন সফর করতে আসবেন। আমি নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারি শুধু যুক্তরাজ্য নয় বেগম জিয়া যে দেশেই ভ্রমণ করবেন সে দেশেই আওয়ামী নেতাকর্মীরা ওত পেতে থাকবেন সুযোগের অপেক্ষায়। এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যতটা অপমান করা হয়েছে তার থেকে শত গুন বেশি অপমান করার চেষ্টা করা হবে আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে।

এমনই হয়ে আসছে, এমনই হবে… তবে আমরা কি একটু ব্যতিক্রম কিছু চিন্তা করতে পারি না??? হিসেব নিকেশ করে জানি না বেগম খালেদা জিয়া শেষ পর্যন্ত কবে যুক্তরাজ্য সফর করবেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা লন্ডনে অপমানের শিকার হয়েছেন এটা নিশ্চিত ভাবেই কোনো আওয়ামীলীগ সমর্থিত নেতাকর্মী তো অবশ্যই এমন কি সুস্থ মন-মানসিকতার সাধারণ মানুষও মেনে নেবে না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ থেকে যদি ঘোষণা দেন, বিএনপি নেত্রী লন্ডন সফর কালে তাঁকে যাতে আওয়ামী নেতাকর্মীরা যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে এবং বেগম জিয়ার লন্ডন সফর প্রতিহতের ঘোষণা থেকে তারা যেনো সরে আসে। বেগম জিয়া এই দেশের একাধিক বারের প্রধানমন্ত্রী, একটি বড় দলের প্রধান এবং সেই দলের একটি বড় জনসমর্থন এই দেশে আছে। সম্মান দিলে কখনো সম্মান কমতে দেখিনি, নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারি বেগম জিয়াকে আওয়ামীলীগ লন্ডন সফরকালে যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শন করলে আওয়ামীলীগ দূরদর্শিতার পরিচয় দেবে এবং এতে বঙ্গবন্ধু কন্যার সম্মান বাড়বে বৈ কমবে না। অন্তত একবারের জন্য হলেও কি পরিক্ষামূলকভাবে কি আমরা এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি না!!!??? তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা… তাঁর কাছে থেকে আমরা এমন আশা করতেই পারি।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার কাছেও আমাদের অনেক প্রত্যাশা। তিনিও সুন্দর একটি ঘোষণা দিতে পারেন। আমি তর্কের খাতিরে মেনেই নিলাম বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন ১৫ই আগস্ট। এইদিনে /বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোকদিবস হিসেবে পালন হয়ে আসছে। এই দিনে ভুয়া জন্মদিন পালন করা অসুস্থ মন-মানসিকতার প্রতিফলন। তবে কারো সত্যিকারের জন্মদিন হয়ে থাকতেই পারে। যেহেতু বেগম জিয়ার জন্ম তারিখ নিয়ে অস্বচ্ছতা এবং তর্ক রয়েই গেছে, সেহেতু বেগম জিয়া নিজ থেকে এগিয়ে এসে যদি ঘোষণা দেন, ১৫ই আগস্ট আমার জন্মদিন হলেও এই বছর থেকে তা উৎযাপন করবো ১৬ই আগস্ট। এক্ষেত্রে ১৬ই আগস্ট যদি কয়েকশো মন ওজনের কেক কেটে যদি বিএনপি’র নেতাকর্মীরা জন্মদিন পালন করে তবে আওয়ামীলীগের কিছু বলার থাকবে না। আমাদের রাজনীতিবিদরা চরম অসহিষ্ণু হয়ে পড়েছেন ইদানীং, যার ছায়া পড়ছে সাধারণ জনসাধারণের উপর। আমাদের রাজনীতিতে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ, সদ্ভাব, সদাচরণ বড্ড জরুরী। কেউ না কেউ তো তা শুরু করতে হবে। আমরা আশা করতেই পারি, আজ না হোক কাল তা শুরু হবেই, হতেই হবে।

এবার ধন্যবাদ দেয়ার পালা। আমি আশার অন্ধকার সুরঙ্গে এক বিন্দু আলো দেখে বেঁচে থাকার রসদ খোঁজে পাই। বার্মা আমাদের বন্ধুসূলভ প্রতিবেশী নয়, বার বার সীমান্তে সংঘাত, রোহিঙ্গা মুসলমানদের মেরে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়া, বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষীকে হত্যা করা, ধরে নিয়ে যাওয়া, মাদক পাচারের মত শত উদাহরণ আছে যার দাঁত ভাঙ্গা জবাব বাংলাদেশ দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশ বার বার ধৈর্য আর সংযমের সাথে সব সমস্যা মোকাবেলা করেছে। বার বার পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টা করেছে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল নীতিই হলো প্রতিবেশী সহ সকল রাষ্ট্রের সাথে বন্ধুসূলভ আচরণ। বার্মার বন্যায় কোটি টাকার খাদ্য সামগ্রী দিয়ে বাংলাদেশ সেই দেশের পাশে দাঁড়িয়েছে। ফলাফল পেয়েছে হাতে হাতে… মায়ানমার আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশকে। মনে রাখতে হবে, মায়ানমার আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র, শক্তির তুলনায় যাবো না, কারণ শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত আমরা চাইবো না কোনো যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে। মায়ানমারের সাথে সুসম্পর্ক রেখে সেখানে আইটি সেক্টরে আমাদের একটি বিশাল বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। মেডিসিনসহ অন্যান্য সেক্টরের কথা নাইবা উল্লেখ করলাম। সুন্দর এবং সময় উপযোগী কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।

সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতি নিয়ত আমরা চরম অসহিষ্ণু আর ধৈর্যহীন হয়ে পড়েছি, প্রতিনিয়ত পরস্পরের প্রতি কমে যাচ্ছে আমাদের সম্মানবোধ, আত্মকেন্দ্রিক আমরা নিজের ক্ষমতা জাহিরে ব্যস্ত। যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন কার্যপ্রণালীতে। মিলন হয়ে রাজন থেকে রাকিব … শিউরে উঠি আমাদের মানসিকতা দেখে। ধৈর্য আর সংযমের বড়ই অভাব লক্ষ্য করি ইদানীং। তবে আমি আশাবাদী মানুষ, নিকষ অন্ধকারেও আলোক বিন্দু দেখতে পাই। দেশ, জাতি, সমাজ আজ একটি রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রূপান্তরের প্রত্যেকটি প্রক্রিয়াই জটিল। সাধারণ পদার্থও যখন একটি রূপান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায় তখন তা বিকৃত, গলিত, উত্তপ্ত হয়। রূপান্তরের কঠিন সময় পার হলে শীতল হয়ে তা একটি সুন্দর রূপ ধারণ করে। আশাকরি, জাতি এবং সমাজের এই রূপান্তরের এই কঠিন প্রক্রিয়া শেষ হলে আমরা একটি সুন্দর দেশ উপহার পাবো… হয়তো তা নিকট ভবিষ্যতে নয়… সময় লাগবে, তবু জানি সুদিন আসবে।

পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর জীবনের একটি ঘটনা বলে ইতি টানি। ১৯৭৩ সালের ঘটনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। সাপ্তাহিক “হক কথা” নামে একটি জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বঙ্গবন্ধু সরকার তৎকালে বন্ধ করে দেয়। গ্রেফতার হন সম্পাদক সৈয়দ ইরফানুল বারী। পত্রিকা বন্ধ এবং সম্পাদককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে মাওলানা ভাসানী আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে মতিঝিলে দলের অফিসে মাওলানা ভাসানী অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। এই খবর শুনে বঙ্গবন্ধু নিজে মতিঝিলে মাওলানা ভাসানীর দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে অনশন ভাংতে অনুরোধ করেন, এবং মাওলানা ভাসানীকে সরবত পান করিয়ে অনশন ভাঙ্গান।
বদলাবে সমাজ, বদলাবে দেশ, আমাদের জন্য না হোক, আমাদের সন্তানের জন্য, একটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশায়…