ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

K1

পাড়ার প্রবেশ মুখে নতুন একটি কিন্ডারগার্টেন “প্রিপারেটরি স্কুল” উদ্বোধন করা হয়েছে। ইংরেজিতে নামটা খুবই চমকপ্রদ, নামটা সরাসরি বলতে চাচ্ছি না, বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, “ছোট্ট পাখির হাতেখড়ির বিদ্যালয়”।

বড় সাইনবোর্ডের এককোণে একটা আণ্ডা ফুঁড়ে পাখি বের হওয়ার ছবি দেয়া হয়েছে, সেই পাখি আবার ছোট ডানা দুটি উপরের দিকে তুলে আড়মোড়া ভাঙছে… অনেক হয়েছে ঘুম এবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পালা, অর্থাৎ আণ্ডা ফুঁড়ে বের হওয়ার সাথে সাথে বাচ্চাকে এখানে দিয়ে যান, তারা জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মত বীর সৈনিক হিসেবে তৈরি করে দেবেন আপনার সন্তানকে।

আমি যে এলাকায় বসবাস করি, সেই এলাকার আশপাশে সরকারি বেসরকারি মিলে ১০-এর অধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়, এই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রিপারেটরি বা শিশু শ্রেণীর ব্যবস্থাও আছে থাকার পরও একই এলাকায় তিনের অধিক শুধুমাত্র প্রিপারেটরি স্কুল আছে। বলাই-বাহুল্য বেসরকারি সবগুলো বিদ্যালয়ে ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করানো হয়। এইসব স্কুলে কারা শিক্ষকতা করেন এবং তাদের ইংরেজিতে শিক্ষাগত যোগ্যতা কি, দক্ষতা কেমন, কোন মানদণ্ডে তাদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তা কে বা কারা দেখভাল করে বা সরকারের ঐসব স্কুলের উপর নিয়ন্ত্রণ কতটুকু তা আদৌ আমরা কেউই জানি না। স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় খোলামেলা জায়গা আছে কি না, না থাকলে ঐ স্কুল কিভাবে অনুমোদন পায় তাও আমরা জানি না। অধিকাংশ স্কুলেই নেই শিশুদের খেলার মাঠ। তারপরও ইটপাথরের গিঞ্জি পরিবেশে একের পর এক স্কুল হয়েই চলেছে।

প্রিপারেটরি স্কুল বা শিশু বিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে কিছু শর্ত-পূরণ করা জরুরি। একটি ভালো কিন্ডারগার্টেনের খোলামেলা পর্যাপ্ত জায়গার পাশাপাশি খেলার মাঠ, গাড়ির জন্য নিজস্ব পার্কিং ব্যবস্থা, দুরের শিশুদের জন্য যানবাহন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ভূমি স্বল্পতার জন্য হয়তো খেলার মাঠ কিংবা গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থা সব স্কুল করতে পারে না, তবে শিশুদের মানসিক এবং শারীরিক বিকাশের জন্য কিছু প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ এবং ব্যবস্থা গ্রহণ তো অত্যাবশ্যকীয়। কী হতে পারে এগুলো?

K3
যেমন:
১। শিশুদের খেলাচ্ছলে লেখাপড়া শেখানোর জন্য পর্যাপ্ত উপাদান, খেলনা এবং যন্ত্রপাতি থাকা এবং প্রয়োজন। শিশুরা খুবই অনুভূতিপ্রবণ হয় তাই তাদের সাথে অবস্থানকারী শিক্ষক/শিক্ষিকাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত করে তবেই নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।

২। শিশুরা দীর্ঘ সময় স্কুলে থাকবে তা স্কুল অতি অবশ্যই তাদের জন্য আকর্ষণীয় হওয়া প্রয়োজন। শিশুরা হৈ চৈ করবে, খেলবে… খেলার মাধ্যমেই শিখবে। তাদের দীর্ঘ সময় চুপচাপ বসিয়ে না রেখে সৃষ্টিশীল এবং চিন্তাশীল খেলার মাধ্যমে আগ্রহ তৈরি করে শেখাতে হবে। ব্যাপারটা সহজ নয়, শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় উপাদানের সঠিক ব্যবহারে মাধ্যমে দক্ষ শিক্ষক/শিক্ষিকা তা করতে পারেন। যেমন: আঁকাআঁকির প্রচুর উপাদান, ছবির বই খাতা রং-পেন্সিল, ব্লক তৈরির খেলনা, জীবজন্তুর খেলনা মডেল।

৩। শিক্ষক/শিক্ষিকাদের ছোট ছোট গ্রুপ তৈরি করে বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করা উচিত। একসাথে অনেক বাচ্চা একটি গ্রুপে থাকলে শিশুদের কিছু শেখানে কঠিন হয়ে পড়ে।

৪। শ্রেণীকক্ষ শিশুদের নিজস্ব সৃষ্টিশীল কাজ দিয়ে সাজানো উচিত। উদাহরণ হিসেবে সহজেই খরগোশ আর কচ্ছপের গল্পের আকা ছবি দিয়ে শিক্ষামূলক ডেকোরেশন করা যায়।

৫। শিশুদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা বর্ণনার সময় রাখতে হবে, সেই সুযোগে বর্ণ পরিচয়ও করা যাবে।

৬। শ্রেণীকক্ষে দেশ বিদেশ সর্বোপরি বিশ্ব পরিচয়ের জন্য ছবি, মডেল প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রাখতে হবে, যা তাদের স্মরণ শক্তি সহায়ক হবে।

৭। শিশুদের প্রত্যেককে আলাদা ভাবে প্রজেক্টের ধারণা দিতে হবে, যার মাধ্যমে তারা হাতে কলমে শিখবে। যেমন: একটি ছোট টবে বীজ রোপণ করে তাদের তা যত্ন নেয়ার পদ্ধতি শিখিয়ে দেয়া যেতে পারে, সেই বীজ থেকে চারাগাছ উঠবে, তা একটু বড় হলে তা নির্দিষ্ট জায়গায় রূপণ করবে। পুরো প্রক্রিয়ায় আলো, বাতাস, পানি সবকিছুর প্রয়োজনীয়তা তারা হাতে কলমে শিখে নিজ ভাষায় বর্ণনা করবে।

৮। শিশুর শরীর গঠনে শারীরিক পরিশ্রম হয় এমন খেলাধুলার ব্যবস্থা প্রত্যেকটি স্কুলকে অবশ্যই করতে হবে এবং তা মাঠে হলে ভালো হয়।

৯। ছোট পরিসরে লাইব্রেরির ব্যবস্থা থাকতে হবে অত্যধিক ছবি সংযুক্ত বই থাকবে।

K2

১০। শিক্ষক/শিক্ষিকারা মজাদার গল্পের বই শ্রেণী কক্ষে পড়ে শোনাবেন তাই তাদের উচ্চারণ স্পষ্ট এবং শুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে নজর দেয়া খুবই জরুরি।

১১। গল্পকে নাট্যরূপ দিতে পারলে শিশুদের শিক্ষা আনন্দময় এবং সহজ হয়। নাটিকার চরিত্রায়ন শিশুরা নিজেরাই করবে।

১২। শ্রেণী কক্ষে প্রচুর আলো বাতাস প্রবেশের দিকে নজর দিতে হবে। দীর্ঘ সময় স্কুলে অবস্থান করার ক্ষেত্রে স্কুল টিফিনের ব্যবস্থা করতে হবে।

১৩। স্কুলের অবস্থান কোলাহল মুক্ত, যানজট মুক্ত পরিবেশে হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিকটস্থ হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সাথে স্কুলের যোগাযোগ রাখা উচিত, যাতে কোনো বাচ্চা অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নেয়া সম্ভব হয়।

১৪। ইংরেজি, বাংলা, আরবি যে মাধ্যমেই শিক্ষা প্রদান করা হোক না কেনো, শিশুদের নিজ দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় পতাকা সর্বোপরি দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের প্রাথমিক ধারণা দেয়া অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে ইতিহাস ভিত্তিক দেয়াল চিত্র প্রদর্শন জরুরি।

ডিম ফুঁড়ে বের হওয়া পাখিকে প্রিপারেটরি স্কুলে পাঠিয়ে নিশ্চিত হওয়ার পূর্বে অভিভাবক হিসেবে আপনার দায়িত্ব বর্তায় যে স্কুলে আপনার সন্তানকে ভর্তি করছেন সেই স্কুলের মান, শিক্ষার পরিবেশ নিরীক্ষণ পূর্বক স্কুল নির্বাচন করা। অন্যথায় আপনার সন্তান শুধু শিক্ষায় পিছিয়ে পড়বে না, শারীরিক এবং মানসিক ভাবে অসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে শুধু আপনার নয়… দেশও জাতির জন্যও বোঝা হয়ে বেড়ে উঠবে।

রাষ্ট্রের সাথে সাথে আপনিও ব্যক্তিগতভাবে নিরীক্ষণের এই প্রক্রিয়ায় এগিয়ে এলে নাম সর্বস্ব মানহীন এইসব স্কুল নিশ্চিহ্ন তো হবেই… দেশ জাতিও হবে হবে উপকৃত।