ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

২০০২ সালে ২৩শে অক্টোবর রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে দোব্রভকা থিয়েটারে চেচেন বিদ্রোহীদের ৪০-৫০জনের একটি দল প্রায় ৮৫০ থেকে ৯০০ জনকে জিম্মি করে। জঙ্গিদের দাবি ছিলো চেচনিয়ার স্বাধীনতা এবং চেচনিয়া থেকে রাশিয়ান সৈন্য প্রত্যাহার। রাশিয়ার অধীনে থাকা চেচেন রিপাবলিকের দেখভাল রাশিয়াই করে থাকে। কিছু বিচ্ছিন্ন চেচেন বিদ্রোহী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন যাবৎ চেচনিয়ার স্বাধীনতা দাবী করে আসছে, এবং রাশিয়ান সৈন্যদের সাথে তাদের ছোট-বড় সংঘর্ষও হয়েছে। ২০০২সালের থিয়েটারে জিম্মির ঘটনা ছিলো রাশিয়ান সরকারের জন্য বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ। রুশ কর্তৃপক্ষ ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলো যে এই বাজিতে তারা হেরে গেলে একের পর এক এই প্রকার বড় ধরণের জিম্মি বা নাশকতার ঘটনা ঘটতেই থাকবে। তাই রুশ সরকার কোনো ক্রমেই চেচেন বিদ্রোহীদের প্রশ্রয় দিতে রাজী হয়নি। পুরুষ মহিলাসহ ৪০-৫০জনের চেচেন দলটি থিয়েটারের ভিতরে প্রায় ৯০০জন মানুষকে জিম্মি করে। চেচেন দলটির হাতে ছিলো আসল্ট রাইফেল এবং বড় ধরণের বিস্ফোরক যা দিয়ে পুরো থিয়েটার হল উড়িয়ে দিতে পারতো।
রুশ সরকার চেচেন দলটির সাথে আলোচনা চালিয়ে যায় এবং আলোচনার আড়ালে রুশ কর্তৃপক্ষ বড় ধরণের প্রতিরোধ এবং আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। জিম্মি ঘটনার চতুর্থ দিন ২৬শে অক্টোবর ভোরে থিয়েটারে বায়ু চলাচলের রাস্তা দিয়ে বিশেষ এক ধরণের গ্যাস ঢুকিয়ে দেয় সমন্বিত রাশিয়ান বাহিনী। থিয়েটারের বাইরে শত শত এম্বুলেন্স অপেক্ষায় থাকে আহতদের উদ্ধারের। এই গ্যাস বিপদজনক জেনেও দেশের নিরাপত্তার কথা ভেবে সরকার সিদ্ধান্ত নেয় তা ব্যবহারের। গ্যাস থিয়েটারে ছড়িয়ে পড়ার মুহূর্তেই চেচেন বিদ্রোহীসহ জিম্মিদের সবাই তন্দ্রাচ্ছন্ন এবং অজ্ঞান হয়ে যেতে থাকে। তৎক্ষণাৎ আক্রমণে আসে রাশিয়ান আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজন। দ্রুত তারা চেচেন বিদ্রোহীদের হত্যা করে জিম্মিদের উদ্ধার করতে থাকে। রাস্তায় অপেক্ষারত এম্বুলেন্স সবাইকে নিয়ে যায় হাসপাতালে। উক্ত ঘটনায় ৪০জন চেচেন সহ মোট ১৭০জন নিহত হয় এবং আহত প্রায় ৭০০জন লোক।

1

পুরো ঘটনাটি টেলিভিশন লাইভ দেখাচ্ছিলো, কিন্তু টিভির পর্দায় তাই লাইভ আসছিলো যা রাশিয়ান সরকার দেখাতে চাচ্ছিলো। রুশ কর্তৃপক্ষের আক্রমণের পরিকল্পনার কোনো কিছু লাইভ নিউজে আসেনি। বরঞ্চ চারদিন যাবৎ খবরে দেখে বুঝা যাচ্ছিলো রুশ সরকার খুবই চিন্তিত জিম্মি ঘটনা নিয়ে এবং চেচেন বিদ্রোহীদের সাথে আলোচনা করে যে কোনো মূল্যে একটি সমঝোতায় আসবে।
২৬ তারিখ ভোরে বিষাক্ত বায়ু চলাচলের রাস্তায় গ্যাস ভরে দিয়ে আক্রমণে যাবার ঘটনা কেউই আগে জানতো না। এই সময়ে সংবাদ মাধ্যম এবং লাইভ চ্যানেলগুলোর দায়িত্ব সচেতন খবর প্রচার ছিলো দেখার মত। এত সুন্দর ভাবে তারা সব খবর উপস্থাপন করেছিলো যে বাইরে থাকা জঙ্গিদের সহযোগিদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ হয়নি কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বড় ধরণের আক্রমণের মুখে পড়তে যাচ্ছে।

বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহারে প্রায় ১৩৩জন সাধারণ মানুষ মারা যায়, যারা ঐ থিয়েটারে জিম্মি অবস্থায় ছিলো। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো ১৩৩জনের কারো পরিবারই রুশ সরকারের গ্যাস ব্যবহারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানায়নি। পরিবারের লোকজনকে হারানোর পরও তারা সরকারকে সমর্থন দিয়ে গেছে, এটাই ঠিক আছে, জঙ্গিদের সাথে কোন আপোষ নয়, যদি তা নিজের জীবনের বিনিময়ে হয় তবুও!

উল্লেখ্য যে থিয়েটারে কি ধরণের গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছিলো তা রুশ সরকার কখনোই প্রকাশ করেনি। আর তাদের মিডিয়াও এ নিয়ে উচ্চ বাচ্য করেনি। শুনেছি এই গ্যাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আবিষ্কার হলেও ইতি পূর্বে রুশ সরকার কখনোই ব্যবহার করেনি বা ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি।

থিয়েটারে জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে তিনটি ব্যাপার ছিলো লক্ষ্যণীয়ঃ
১। সময় ক্ষেপণ এবং প্রাণহানীর ঘটনা ঘটলেও পুরো আক্রমণটি রুশ সরকার প্রতিহত করে দিয়েছিলো।
২। প্রিন্ট এবং স্যাটেলাইট মিডিয়া প্রফেশনালিজম নিয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলো আইন শৃংখলা বাহিনীকে। গ্যাস ব্যবহারের ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে রুশ গণ মাধ্যম জনগণকে বিভ্রান্ত করেনি।
৩। নিজের পরিবারের অনেকে হতাহত হলেও সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছিলো রুশ জনগণ।

জঙ্গি হামলার নতুন শিকার বাংলাদেশ। তবে জঙ্গি হামলা বিশ্বে নতুন কিছু নয়। অনেক বছর যাবৎ পুরো বিশ্ব জঙ্গিদের মোকাবেলা করে আসছে। বিশ্বে ঘটে যাওয়া অতীতের জঙ্গি মোকাবেলার ঘটনা থেকে সহজেই আমরা শিক্ষা নিতে পারি। গুলশান, শোলাকিয়ার ঘটনার পর আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা তৎপরতা মুগ্ধ হবার মত। তারা নিজের জীবন দিয়ে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। অথচ কতিপয় বুদ্ধি বেশ্যার কারণে তাদের এই আত্মত্যাগ তৎপরতা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে চলেছে। বাংলাদেশের মূল শত্রু আজ জঙ্গিবাদ, তাদের নির্মূলের কোনো সংবাদই কিছু লোক সহজ ভাবে নিতে পারছেন না। পুলিশের সকল উদ্যোগকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছেন তারা ব্যক্তি স্বার্থে নাকি দলীয় স্বার্থে নাকি তারা জঙ্গিবাদ সমর্থন করে সে নিয়ে তর্কের অবকাশ থেকেই যায়।

বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া সহজ ব্যাপারগুলোকে হজম করতে পারে না, যতক্ষণ না পুরো ব্যাপারটিকে রংচং দিয়ে সাজিয়ে নাটক না বানানো যায়। দীর্ঘদিন যাবৎ একটি ব্যাপার সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ্য করেছি, মিঠুন চক্রবর্তী বেঁচে আছেন এটা আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া চায় না, তারা প্রায়ই মিঠুনকে মেরে ফেলে, ম্যারাডোনাকে মেরে ফেলে, আং সাং সুচিকে মুসলমান বানিয়ে দেয়, ইসলাম ধর্মের ইউনেস্কোর ভুয়া শান্তি পুরস্কারে হাজার হাজার লাইক শেয়ার হয় আর আল্লাহু আকবার মন্তব্য হয় …। কত ধরণের ভুয়া খবরে সর গরম থাকে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া। কিন্তু আমাদের হিরোরা যখন সারারাত অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গিদের আস্তানা গুড়িয়ে দেয়, তখন অভিযানের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে।

এর থেকে পরিতাপের আর কি হতে পারে যে আমাদের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মুখপাত্রকে অভিযানের সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য ফেইসবুকে স্ট্যাটাস আপডেট করতে হয়। কতটা ক্ষোভ থেকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মুখপাত্র মনিরুল ইসলাম লিখতে পারেন, “কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযান কালে সন্ত্রাসীদের গ্রেনেড নিক্ষেপে পুলিশের চার কর্মকর্তার মৃত্যু, আহত ৪২ কর্মকর্তা, তিন জঙ্গি গ্রেপ্তার হলেও বাকিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে!” মনিরুল ইসলাম লিখেছেন, “দুঃখিত, বন্ধু, এ রকম একটা খবর যদি আপনি আশা করে থাকেন তাহলে আমরা আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারিনি! প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় আপনি যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন, আমরা সত্যিই দুঃখিত!”
বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা লাজলজ্জার ধার ধারি না এটা সবার জানা, মনিরুল ইসলামের অবজ্ঞার মর্ম বুঝতে পারার কথা আমাদের না। জাতি হিসেবে অনুভূতি নিয়ে আমরা বেশি আলোড়িত হই, মনিরুল ইসলামের স্ট্যাটাস আমাদের ভাবায় না, লজ্জা দেয় না।

ঘটনার বিবরণে তিনি উল্লেখ করেছেন, “আনুমানিক রাত ১টার কাছাকাছি পুলিশের প্রথম দলটি বাসাটিতে নক করে এবং প্রথম দফা সংঘর্ষের পরে প্রায় সারা রাত বিল্ডিংটা কর্ডন করে রাখা হয়। চূড়ান্ত অভিযান শুরু হয় ভোর ৫টা ৫০-এর দিকে। এত দীর্ঘ সময় তারা ঘুমিয়ে ছিল কি না, এই পোশাক পরার সময় পেয়েছিল কি না তা বোঝার জন্য বুদ্ধিজীবী হওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, দয়া করে ভেবে দেখবেন কি? সারা রাত মুহুর্মুহু গোলাগুলি হয়েছে এ রকম কোনো তথ্য আমার জানা নেই। আমি যতটুকু জানি যখনই পুলিশ বাসাটিতে ঢুকতে চেষ্টা করেছে, ততবারই গুলি চালানো হয়েছে। চূড়ান্ত অভিযান হয়েছে এক ঘণ্টার কাছাকাছি। ওই সময়েই মূলত চূড়ান্ত গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আপনার বিশ্বাস, এ তথ্য আপনার অজানা নয়। তাহলে কেন এ রকম প্রশ্ন তুলছেন? পুলিশের সাফল্য মানতে পারছেন না তাই তো!”

“আপনি তো সবজান্তা অথচ আপনি এই ধরনের অপারেশনগুলোর ইতিহাস জানেন না। দেশে এবং দেশের বাইরে কোথায় এই ধরনের অপারেশনে কতজন জীবিত গ্রেপ্তার হয়েছে জানালে বাধিত হব। আসলে, পুলিশের কেউ মারা যায়নি কিংবা কেউ গুরুতর আহত হয়নি- এতেই তো আপনার যত আপত্তি তাই না, বন্ধু!”

3

বিশ্বে জঙ্গি বিরোধী সকল অভিযানে নিজ নিজ দেশের সকল মানুষ একাত্মতা ঘোষণা করে। নিজের দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু খেয়াল করলে দেখবেন আমাদের দেশের কিছু সংখ্যক লোক সর্বদাই সব কিছুকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে হীন স্বার্থ হাসিলে মত্ত থাকে। তারা সাধারণ জনগণের মনে সন্দেহের বীজ রোপণ করে তাতে পানি ঢালে যাতে সেই বীজ চারা হয়ে বিষ বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। জঙ্গিবাদের হুমকির মুখে সারা বিশ্ব যেখানে একাত্ম সেখানে আমরা নিজেদের মধ্যে দোষারোপের রাজনীতিতে মত্ত! এই ধরণের কুৎসিত খেলা যে কবে শেষ হবে তা কে জানে!

পরিশেষে, ঢাকার কল্যাণপুরে পুলিশ বাহিনীর সাফল্যের প্রশংসা করি এবং তাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সবাইকে আহবান জানাই জাতীয় ঐক্যে জঙ্গিবাদ মোকাবেলার এবং এই ব্যাপারে সরকার এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করার। আমাদের সকলের উদ্যোগ, সহযোগিতা আর ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র প্রয়াসই রুখে দিতে পারে জঙ্গিবাদ।