ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

ধর্মানুভূতিতে আঘাত বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ইতিহাস এই উপমহাদেশে অতি পুরাতন। উপমহাদেশের মানুষের পরনে কাপড় থাক আর না থাক, পেটে ভাত থাক আর না থাক, একটি অনুভূতি এখানে প্রবল তা হলো ধর্মীয় অনুভূতি। এই ভূখণ্ডের মানুষের ধর্মানুভূতি লজ্জাবতী লতার চেয়েও স্পর্শকাতর।
একটু পেছন থেকে শুরু করতে চাই, সময়টা ১৮৫৭। ব্রিটিশ সরকারের রাজ চলছে। ১৮৫৩ সালে তৈরি .৫৫৭ ক্যালিবার এনফিল্ড(পি/৫৩) রাইফেল ব্রিটিশরা এদেশে নিয়ে আসে। এই রাইফেলের ব্যবহৃত কার্তুজে চর্বিযুক্ত অংশ ছিলো, যা লোড করার পূর্বে সৈন্যকে তা দাঁত দিয়ে ভেঙ্গে ফেলতে হত। গুজব রটানো হলো এই চর্বিযুক্ত অংশ গরু এবং শুকরের চর্বি দিয়ে তৈরি। এই গুজবের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয় ১৮৫৭–৫৮ সালে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে উত্তর এবং মধ্য ভারতে বিদ্রোহের ভারতীয় মহাবিদ্রোহ (সিপাহী বিদ্রোহ)। যেহেতু গরু ও শুকরের চর্বি মুখে দেওয়া হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের সৈন্যদের কাছে অধার্মিক কাজ ছিল। ১৮৫৭সালে সিপাহীরা (ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয় সৈন্য) নতুন কার্তুজ ব্যবহার করতে অস্বীকার জানায়।

1345293823_lucknow1

সিপাহী বিদ্রোহ মঙ্গল পাণ্ডের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে শুরু হয়ে তা মিরাট, দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। স্বভাবতই শীঘ্রই সারা বাংলাদেশ জুড়ে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় সৈন্যদের মধ্যে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার প্রতিরোধ এবং সিলেট, যশোর, রংপুর, পাবনা ও দিনাজপুরের খণ্ডযুদ্ধসমূহ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং সৈন্যরা খণ্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। তারা জেলখানা হতে সকল বন্দিদের মুক্তি দেয়। তারা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ দখল করে নিয়ে, কোষাগার লুণ্ঠন করে এবং অস্ত্রাগারে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ত্রিপুরার দিকে অগ্রসর হয়। চট্টগ্রামে সিপাহিদের বিদ্রোহ দ্রুত ঢাকায় সহ যশোর, রংপুর, দিনাজপুর, সিলেটে ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশরা কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন করে। ব্রিটিশ রাজের ভিত কাঁপিয়ে দেয়া সিপাহী বিদ্রোহের পরিণতি ছিলো খুবই করুণ। বিদ্রোহীদের প্রকাশে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। নূন্যতম দোষীদেরও যাবত-জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

modi-timeline-train-slide-nrjs-videosixteenbynine600

ব্রিটিশরা এই দেশ শাসন করতে এসেছিলো। তাদের শাসন কালে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলো এদেশীয় হিন্দু, মুসলিমদের দিয়ে তৈরি ব্রিটিশ কোম্পানির সেনা বাহিনী। তারা কেন গরু আর শুকরের চর্বি কার্তুজে দেবে! তাদের কি দায় পড়েছিলো নিজেদের বেতন ভুক্ত সৈন্যদের ধর্ম নষ্ট করে নিজেদের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার!! ব্যাপারটি ছিলো পুরোটাই গুজব, পুরো ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিলো ভেবে চিন্তে। আর যে বা যারা এই মহা-পরিকল্পনা করেছিলো তা এই উপমহাদেশীয় মানুষের পালস্‌ ভালই ধরতে পেরেছিলো। তারা জানতো, ব্রিটিশদের অন্যায় আগ্রাসনের কথা এই উপমহাদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদের মাধ্যমে প্রতিরোধ বা বিপ্লব আশা করা অলীক কল্পনা মাত্র যা শত বর্ষেও বাস্তব রূপ নেবে না। আর তাই সর্ট কার্ট রাস্তা হলো ধর্মানুভূতির গুজব ছড়িয়ে নগদ মুনাফা আদায়। যারাই এই পরিকল্পনা করেছিলেন তাদের পন্থা সঠিক না হলেও উদ্দেশ্য শত ভাগ সৎ ছিলো… “ব্রিটিশ রাজের পতন”। অসফল সিপাহী বিদ্রোহের করুণ পরিণতি আর আমাদের ভোঁতা অধিকার অনুভূতি আর কখনোই উপলব্ধি করতে না পারা স্বাধীনতার অনুভূতির কারণে ব্রিটিশরা রাজ করেছিলো আরো শত বর্ষ।
ধর্মানুভূতির ব্যাপারটা দাঙ্গার মাধ্যমে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠে ব্রিটিশ শাসন আমলের শেষের দিকে। কতিপয় স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের কারণে উপমহাদেশ ভাঙ্গে ধর্মীয় মানচিত্রে। বিদ্বেষের বীজের বিষবৃক্ষ তখনই ডালপালা ছড়িয়ে প্রকাণ্ড থেকে প্রকাণ্ডতর হতে থাকে। এক দেশ থেকে ট্রেনে ভর্তি লাশ আরেক দেশে প্রবেশ করে আর আরেক দেশে মুসলমানদের করা হয় কচু কাটা। অথচ কিছুকাল আগেও হিন্দু মুসলিমরা একই ভূখণ্ডে সুখে শান্তিতে বসবাস করে আসছিলো শত শত বর্ষ যাবৎ। সংঘাত ছড়াতে মন্দিরে রাতের অন্ধকারে গরুর মাংস ফেলে রাখা হল, একই ভাবে মুসলিমদের মসজিদ প্রাঙ্গণে জবাই করে রাখা হল শুকর ছানা। আর কি লাগে!! একটি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার মধ্য দিয়ে ভূমিষ্ঠ হলো দুটি রাষ্ট্র, পাকিস্তান আর ভারত, যাদের আর কোন অনুভূতি থাকুক আর না থাকুক ধর্মীয় অনুভূতি প্রবল!!!

parzania1

আমাদের এ ভূখণ্ডে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু মুসলিমদের বৈষম্য ছিলো প্রকট। এমন কি এদেশের হিন্দুদের তখন তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক গণ্য করা হত। হিন্দুদের রেখে যাওয়া সম্পত্তিকে বলা হত এনিমি প্রপার্টি বা শত্রু সম্পত্তি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লগ্নে একটি শ্লোগান খুব পরিচিত ছিল, “জয় বাংলা জয় হিন্দ, লুঙ্গি থুইয়া ধূতি পিন্দ। অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হলে কেউ মুসলমান থাকবে না, দেশ ভারত হয়ে যাবে। এই ধ্যান ধারণা অনেকেই বিভ্রান্ত করতে পারলেও আপামর মুক্তি পাগল জনসাধারণের স্বাধীনতার চেতনাকে লক্ষ্যচ্যুত করা যায়নি। তবে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, এদেশীয় রাজাকার আর পাক বাহিনীর বিশেষ লক্ষ্য ছিলো হিন্দু জনগোষ্ঠী। আমার নিজ এলাকা সিলেটের বালাগঞ্জ এককালে ছিলো হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এই এলাকার ৮ থেকে ১০টি স্থানে গণহত্যা চালানো হয়, ধর্ষিতা হন শত শত মহিলা, যাদের শতকরা নব্বুই ভাগই ছিলেন হিন্দু জনগোষ্ঠীর।

এই উপমহাদেশীয় ভূখণ্ডে বার বার ধর্মীয় অনুভূতির ব্যাপারটি পুঁজি করে হাজারো মানুষের হত্যাযজ্ঞ হয়ে এসেছে যুগে যুগে । ১৮৮২-তে তামিলনাড়ু, ১৯২১-এ মাপ্পিতা, ১৯২৭ এ নাগপুর, ১৯৪৭এ পুরো ভারত বর্ষে, ১৯৬৭ তে রাঁচি, ১৯৬৯-এ গুজরাট, ১৯৮৪-তে ভিউয়ান্দি, ১৯৮৫-তে গুজরাট, ১৯৮৭-তে মীরুৎ, ১৯৮৯-তে ভাগলপুর, ১৯৯০-তে হায়দ্রাবাদ, ১৯৯২-তে বোম্বে, ২০০২-তে গুজরাট, ২০০৬-তে ভাদোদারা, ২০১৩-তে পশ্চিমবঙ্গ, ২০১৩-তে মুজাফফরনাগার। প্রত্যেকটি দাঙ্গাই ছিলো হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে, দাঙ্গাগুলো হত্যা-ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে অগণিত। যে ধর্মের জন্য এই দাঙ্গা, কেউই দাবী করতে পারবে না উল্লেখিত দাঙ্গায় কোন ধর্ম লাভবান হয়েছে। প্রত্যেকটি সংঘর্ষই সংগঠিত হয়েছে রাজনৈতিক বা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে। এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল লাভবান হয়েছে।

প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করা আধুনিক সভ্যতায় ধর্মানুভূতির ধোয়া তোলে মানুষে মানুষে হানাহানি সত্যিই হাস্যকর। আমরা এখনও কি যথেষ্ট পরিমাণ শিক্ষিত, সভ্য হতে পারিনি যে কে কোন উদ্দেশ্যে কি খেলা খেলছে তা বুঝতে পারছি না!!! প্রতিদিন চায়ের দোকানে বসে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, কোন দল নির্বাচনে আসবে, আসবে না, কে কি করলো এমন কি আমেরিকার নির্বাচনে কে জয়ী হবেন সবই আমাদের নখর দর্পে… কিন্তু ধর্মানুভূতির প্রশ্নে আমাদের বিদ্যা বুদ্ধি, চেতনা সবই ভোতা।
তথাকথিত ধর্মীয় অনুভূতির নামে রাম মারে রহিমকে, রহিম মারে রামকে। রাম কেন হঠাৎ শিবের মূর্তি বসাবে কাবার ছবির উপর আর রহিমই বা কেন রামের দেব-দেবতাকে নিকৃষ্ট ভাষায় গালিগালাজ করবে ফেইসবুকের পাতায়!!! ইতিহাস ঘেঁটে এরা দেখে না এইসব প্রত্যেকটি দাঙ্গাই পূর্ব-পরিকল্পিত, ব্যক্তিগত ভাবে রাম-রহিম কেউই লাভবান হয়নি এহেন দাঙ্গায়, লাভবান হয়েছে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বিশেষ বা রাজনৈতিক দল।

কলামের এ পর্যায়ে প্রিয় কবি নজরুলের কবিতার একটি অংশ বলার লোভ সংবরণ করতে পারলাম না…

মাভৈঃ! মাভৈঃ! এতদিনে বুঝি জাগিল ভারতে প্রাণ
সজীব হইয়া উঠিয়াছে আজ শ্মশান গোরস্থান!
ছিল যারা চির-মরণ-আহত,
উঠিয়াছে জাগি’ ব্যথা-জাগ্রত,
‘খালেদ’ আবার ধরিয়াছে অসি, ‘অর্জুন’ ছোঁড়ে বাণ।
জেগেছে ভারত, ধরিয়াছে লাঠি হিন্দু-মুসলমান!

হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে শান্তি সম্প্রিতি কামনা করে কলামের শেষে একটি তথ্য জানিয়ে যাই। ১৮৫৭সালে সিপাহি বিদ্রোহ অসফল হওয়ার অন্যতম কারণ এদেশীয় জমিদার-জোতদারগণ সাধারণ সিপাহিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তারা বৃটিশদের গরু ও ঘোড়ার গাড়ি এবং হাতি সরবরাহ; পলায়নরত সিপাহিদের গতিবিধির সন্ধান প্রদান এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বিদ্রোহী সিপাহিদের প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে স্থানীয় স্বেচ্ছসেবক বাহিনী গড়ে কোম্পানির স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে কৌশলগত সমর্থন প্রদান করেন। বৃটিশ সরকার কৃতজ্ঞতার সাথে জমিদার-জোতদারগণের এ সকল সেবার স্বীকৃতি প্রদান করে তাঁদেরকে নওয়াব, খান বাহাদুর, খান সাহেব, রায় বাহাদুর, রায় সাহেব প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত করে ও নানা সম্পদ দ্বারা পুরস্কৃত করে।