ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

হেফাজতের উত্থানের ইতিহাস ছিল ২০১৩ সালে মূলত নাস্তিক ইস্যুতে। যদিও বাংলাদেশে নাস্তিকদের প্রকৃত সংখ্যা কত তা জানা নেই, তবে ধারণা করি তা শতকরা এক ভাগেরও কম আর এইসব নাস্তিক এতই শক্তিশালী যে হাজার হাজার তৌহিদি জনতা নিয়ে শাপলা চত্বরে একত্রিত হওয়া লাগে। মাত্র চার বছর আগের ঘটনা, সবকিছু স্মৃতিতে এখনো তাজা। বয়স এত বেশি হয়নি যে তালগোল পাকিয়ে কিছু উলটো পালটা কল্পনা করবো।

হেফাজতের নাস্তিক বিরোধী আন্দোলন ছিল গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে একটি প্রটেস্ট মুভমেন্ট। গণজাগরণ মঞ্চের জনপ্রিয়তা যখন তুঙ্গে, রাজাকারদের সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে সারা দেশ যখন সোচ্চার, ঠিক তখনই হেফাজতের উত্থান। হেফাজতের আন্দোলন বিএনপি এবং জামাতপন্থি দ্বারা প্রত্যক্ষ মদদ দেয়া গণজাগরণ মঞ্চ বিরোধী মুভমেন্ট এবং সর্বোপরি সেই সুযোগে সরকার পতনের আন্দোলন। যদিও হেফাজত সবসময়ই বলে এসেছে তাদের আন্দোলন রাজনীতি বহির্ভূত, সম্পূর্ণ ধর্মীয় আন্দোলন। কিন্তু তাদের সমাবেশে স্বঘোষিত নাস্তিক লুঙ্গি মাজহারের মত ব্যক্তির উপস্থিতির কারণ সঠিক ভাবে তারা কখনোই ব্যাখ্যা করেনি।

মামলা সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ধারনা আছে। বিচারপ্রার্থী হয়ে কোন মামলা করলে প্রতিপক্ষ আপনাকে নাজেহাল করার জন্য আপনার বিরুদ্ধেই আরেকটি মিথ্যা মামলা ঠুকে দেয়, এতে আপনি ঝামেলা এড়াতে প্রতিপক্ষের সাথে সন্ধি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, সেই সুযোগে প্রতিপক্ষ স্বার্থসিদ্ধি করবে। হেফাজতের আন্দোলন আমার দৃষ্টিতে এমনই একটি ষড়যন্ত্র, প্রত্যক্ষ ভাবে গণজাগরণ মঞ্চ বিরোধী মনে হলেও পরোক্ষভাবে তা ছিলো সরকার বিরোধী এবং সরকার পতনের আন্দোলন।

হেফাজতের সমাবেশ থেকে ৫ই এপ্রিল ঘোষণাও এসেছিলো, ৬ই এপ্রিল ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট হবেন আল্লামা শফি এবং প্রধানমন্ত্রী জুনায়েদ বাবু নাগরি। একই দিন সন্ধ্যায় বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকেও ঘোষণা এসেছিলো হেফাজতের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে বিএনপি এবং তার অঙ্গ সংঘটনের সকল নেতা কর্মীদের হেফাজতের পাশে দাঁড়ানোর।

আওয়ামী লীগের ইতিহাস দেখলে যেভাবে খন্দকার মোস্তাকের মত বেঈমানের আনাগোনা দেখা যায়, ঠিক তেমনি জিল্লুর রহমান বা সৈয়দ আশরাফের মত নিবেদিত প্রাণ আওয়ামী লীগারও দেখা যায়। যাদের কারণে অসংখ্য সংকটেও আওয়ামী লীগ উতরে যায়। ৫ই মে ঐদিন সৈয়দ আশরাফের টিভিতে দেয়া বক্তব্য ছিলো সময় উপযোগী সাহসী পদক্ষেপ। আজ অনেক নেতা অনেক কথাই বলবেন, কিন্তু ঐদিন হেফাজতের তৈরি করা উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে সৈয়দ আশরাফ ছাড়া আর কাউকেই এগিয়ে আসতে দেখিনি। বরং অনেকেই পরিস্থিতি বিবেচনায় ভাগলপুর যাওয়ার চিন্তা ভাবনা করেছিলেন।

সৈয়দ আশরাফের ঐদিন সময় বেধে দিয়ে সমাবেশ স্থল খালি করার আদেশ, এবং দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করার উদ্যোগ ছিলো অসাধারণ সাহসী উদ্যোগ। বিডিআর বিদ্রোহ, হেফাজতের উত্থান সামাল দেওয়া, বঙ্গবন্ধু পরিবারের প্রতি বিএনপি নেতা তারেক রহমানের হুমকিস্বরূপ বক্তব্য এবং এ দলকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে আশরাফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা অনস্বীকার্য। বিডিআর বিদ্রোহের সময় আশরাফের মতামত ও তিন বাহিনী প্রধানদের মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

হেফাজতের মতিঝিল ঘেরাও এবং তাদের কর্মসূচির ব্যাপারে সৈয়দ আশরাফের মতামতকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৩ সালের ৩ মে, ৪ মে ও ৫ মে একান্তে বৈঠক করেছিলেন তিনি। দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গেও এ সময় বৈঠক করেছেন কিন্তু আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখ প্রবীণ নেতাদের তখন এতোটা আস্থায় নিতে পারেননি। যদিও তারা সেদিন একবার ৫ই মে ২০১৩ এর বৈঠকে ছিলেন। সৈয়দ আশরাফের অভিমত ছিল- “হেফাজতের কার্যক্রমে বোঝা যাচ্ছে, জামায়াত-বিএনপি-হেফাজত একই দল”।

হেফাজতকে রাজাকার-আলবদরের নতুন প্রজন্ম এবং পাকিস্তানের প্রেতাত্মা আখ্যা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘ধর্মের নামে তারা তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে চলছে। আগামীতে তা আর বরদাশত করা হবে না। অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে হেফাজত এবার ঢাকায় এসেছে। আগামীতে ঢাকায় আসতে দেওয়া হবে না। প্রয়োজনে ঘর থেকে হেফাজতের নেতা-কর্মীদের বের হতে দেওয়া হবে না।’ শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে ঢাকা ত্যাগ করার আহবান জানিয়ে আশরাফ বলেন, সন্ধ্যার মধ্যে হেফাজতের নেতা-কর্মীদের ঢাকা ত্যাগ করার কথা বলা হয়েছে। না হলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার যা যা করা দরকার তার সবই করবে।“

পরবর্তীতে সরকার সাউন্ড গ্রেনেড ফাটিয়ে সমাবেশ স্থলের তিনদিক বন্ধ করে একদিক খোলা রেখে নিরাপদে সকল হেফাজত কর্মীদের বেরিয়ে যাওয়ার যে রাস্তা করেছিল তা সত্যই প্রশংসনীয়। সেই অভিযানে অংশ নেয়া একজন আইনশৃখঙ্গলা বাহিনীর সদস্যদের একটি মন্তব্য আজও খুব মনে পড়ে, যে ব্যক্তি মাইক হাতে সমাবেশ স্থলে সবচেয়ে বেশি নাচানাচি করে চিৎকার করছিলো, জান যাবে তবু সমাবেশ স্থল ছেড়ে যাবে না, সেই ব্যক্তিই সাউন্ড গ্রেনেড ফুটানোর পর সবার আগে দৌড় দিয়েছিল।

রাজনীতি সচেতন অনেকেই সেদিন বলেছিলেন, এই আন্দোলনকে এত সহজ পন্থায় দমন করার মত বুদ্ধি এবং সাহস একমাত্র আওয়ামী লীগই রাখে। বাংলাদেশ তো অবশ্যই বহির্বিশ্বে অনেক উন্নত দেশেই ঐ পরিস্থিতিতে সরকার পতন অনিবার্য ছিল।

২০১৩ সালের ৫ই মে হেফাজতের ঢাকা শহর ম্যাসাকারের ছবি আজও ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। ছবিগুলো দেখে প্রায়ই ভাবি, নাস্তিক নিধনের সাথে এইসব ধ্বংসযজ্ঞের কী সম্পর্ক ছিল? কী সম্পর্ক ছিলো বায়তুল মোকারমের বইয়ের দোকানে আগুন দেয়ার? কী সম্পর্ক ছিলো গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে দেয়ার? কী সম্পর্ক ছিলো ল্যাম্পপোস্ট উপড়ে ফেলার?  বই, গাছ, ল্যাম্পপোস্ট সবই কি নাস্তিকদের দোসর ছিলো?

হেফাজত নাস্তিক দমনের কথা যত যাই বলুক, এই সমাবেশ যে ছিলো মূলত সরকার পতনের আন্দোলন তা দেশের জনগণ বুঝে নিয়েছে।

তবে সরকার হেফাজতকে শাপলাচত্বর থেকে বিতাড়িত করলেও জামাত-বিএনপি চক্র থেমে থাকেনি। তাদের প্রয়োজন ছিলো লাশের। কোথাও কিছু না পেয়ে ফটোশপ করে ভিনদেশি লাশের ছবি তারা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছিলো মানুষের সমবেদনা আদায় করার জন্য। এখনো অনেক বিএনপি নেতা বিশ্বাস করতে পারেন না কীভাবে আওয়ামী লীগ রক্তপাতহীন ভাবে এত বড় একটি সমাবেশ খালি করে দিতে পারলো।

তারা গল্প ছড়ান, রাতের আঁধারে ট্রাকে করে ভারতে সরিয়ে ফেলা হয়েছে লাশগুলি। তারা চেষ্টা কম করেননি; আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে এনে মিথ্যা রিপোর্ট তৈরি করে তাও প্রচার করেছেন এবং সেখানেও প্রমাণে ধরা খেয়েছেন। একটি এনজিওকে দিয়ে ৬৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছিলেন, অবশ্য তাদের অধিকাংশই ছিলেন জীবিত বা নিখোঁজ। যারা পরবর্তীতে বাড়ি ফেরত গিয়েছেন। বিএনপি-হেফাজত প্রোপাগান্ডার সেই হাজার হাজার লাশের খবর আর পাওয়া যায়নি।

হেফাজত সেদিন ১৩ দফা দাবির নামে  অগ্রহণযোগ্য এবং অবাস্তব কিছু দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরেছিলো, যা একটি গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় হাস্যকর।

সৈয়দ আশরাফ সেদিন বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সরকারের উদারতাকে দুর্বলতা ভাববেন না।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে হেফাজত নেতাদের কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের সমালোচনা করে আশরাফ বলেছিলেন, কথাবার্তা সংযত করুন। সরকারও দুর্বল নয়, আওয়ামী লীগও দুর্বল নয়। উদারতাকে দুর্বলতা হিসেবে নেবেন না। সংঘাতের পথে এলে আওয়ামী লীগ একাই হেফাজতকে দমন করতে যথেষ্ট।

হেফাজত উত্থানের পাঁচ বছর  হয়েছে। সেই সমাবেশ, সেই ধ্বংসযজ্ঞ, সেই দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য, প্রোপাগান্ডার  হাজার লাশের জন্য হাহাকার, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা নাবালক কিছু মাদ্রাসা ছাত্রের কষ্ট ও অপমান – এসবের জন্য দায়ী কিছু স্বার্থান্বেষী নেতা, যাদের আমরা বিচারের আওতায় আনতে পারিনি। অথচ এদের শাস্তি দেয়া উচিত ছিলো, যেন ভবিষ্যতে এই ধরণের  আন্দোলন আস্কারা না পায়।

সৈয়দ আশরাফের একটি কথা এখনো কানে বাজে, ‘আমি লাভের জন্য রাজনীতি করি না। আমার পিতা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন, নেতার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন। এটাই আমার রক্ত।’ এটাই রাজনীতিবিদ সৈয়দ আশরাফের আসল পরিচয়। তিনিই নেতা, আওয়ামী লীগের ‘ক্রাইসিস ম্যান’।