ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

প্রেক্ষাপট-০১
দুই বৎসর পূর্বে আমার শ্যালক যখন ক্লাস টেনে পড়তো তখন তার জন্মদিনে তাকে একটি বই উপহার দিয়েছিলাম। জাফর ইকবাল স্যারের একটি বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্ট বিষয়ক বই।
সপ্তাহ খানেক পরে তাকে যখন বইটি কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করলাম তখন বুঝতে পারলাম সে বইটি খোলেও দেখেনি। ভাবলাম হয় বিষইয় নির্বাচন ভুল হয়েছে, তাই একটি থ্রিলার দিলাম, যেটি তাদের ঘরেই রাখা ছিলো। কিন্তু তারপরও বই তাকে আকর্ষিত করলো না।

প্রেক্ষাপট-০২
পাড়ার উঠতি বয়সী ছেলেরা সারাটা বিকেল মোড়ের দোকানে আড্ডা দেয়। একদিন তাদের কাছে উপস্থিত হয়ে বিব্রত করলাম বই পড়ার বিষয়টা তুলে। অবাক হয়ে দেখলাম ১৬-১৭ বছরের ছেলে গুলো বইয়ের ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই। সারাদিন মোবাইল টিপা ছাড়া তারা কিছুই করে না। (২/১ জন ব্যতিক্রম পেলাম যাদের আলাদা করে বাসায় ঢাকলাম বই দেব বলে)

প্রেক্ষপট-৩
সেদিন গিয়েছিলাম আমার পরিচিত বিভাগীয় গ্রন্থাগারে। অবাক হয়ে দেখলাম কয়েকজন দৈনিক পত্রিকা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে, তাছাড়া পুরো লাইব্রেরীই খালি। একসময়ের লোকসমাগমে ভরপুর আজকের খালি লাইব্রেরী আমায় কিসের যেনো সতর্ক বার্তা দিলো ।

একটি জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য একদিনে গড়ে উঠে না। শত শত বছরের প্রয়োজন । আমাদের একটি সুন্দর ও গর্বিত ইতিহাস আছে যা যুগ যুগের ব্যবধানে গড়ে উঠেছে। আমাদের তথা পৃথিবীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানা এবং বুঝার জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। সারাদিন রিমোট হাতে টিভির চ্যানেল পাল্টালে সমাজ, পৃথিবী সর্বোপরি নিজেকে তোড়াই জানা হবে।
সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের পাঠাভ্যাসের ইতিহাস পাওয়া যায়। কিন্তু আজ এই ২০১২ সালে দাঁড়িয়ে আমি দেখতে পাই তরুন সমাজ বইয়ের প্রতি আগ্রহই হারিয়ে ফেলেছে।
অথচ বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার প্রেক্ষিতে পাঠ অভ্যাসের কোনো বিকল্পই নেই। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি জন্য পাঠাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে ।
আমাদের কিশোর-কিশোরীরা যারা এখন কম্পিউটারে ফেইসবুক স্ট্যাটাস আর কমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত, ব্যস্ত টিভিতে লাইভ শো, সিরিয়াল আর ক্রিকেট খেলা নিয়ে তাদেরই এখনই উপযুক্ত সময় ছিলো পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার।

আমরা একটি মানসিক ও জৈবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমাজে চলার জন্য তৈরী হই। মন-মানসিকতাকে গড়ে তোলার জন্য বই পড়া গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। মস্তিষ্কের গঠন ও বুদ্ধির বিকাশের জন্য বইয়ের বিকল্প কখোনোই অন্য কোনো মাধ্যম হতে পারে না। সঠিক বুদ্ধির বিকাশ প্রতিফলত হয় কর্ম দক্ষতায়। যে কোনো জটিল ব্যাপার ও সহজ করে দিতে পারে অতীতে পঠিত কোনো বই।
মনে পড়ে রাশিয়ার প্রথম দিকের দিনগুলো, অনেক জায়গার নাম, অবস্থান এমন কি কারনে গুরুত্বপূর্ন তা ওই দেশে যাওয়ার শুরু থেকেই জানতাম, যা আমার রাশিয়ায় বসবাসরত অনেক সিনিয়রকে করেছে অবাক। নিয়মিত বই পড়ার ফলে একটি বিশাল শব্দ ভান্ডারের সাথে পরিচিতি ঘটেছিল যেখানে ছিলো অনেক বিদেশী শব্দও।
পরিক্ষার সময় এলে প্রচুর বই জমতো, পড়তে পারতাম না, প্রতিদিন তীব্র ভালোবাসায় বইগুলোর হাত বোলাতাম, কখন পরিক্ষা শেষ হবে আর কখন থেকে বই পড়া শুরু করবো। ঘড়ির কাটার দিকে থাকাইনি বই হাতে নিলে। ঘন্টার পর ঘন্টা পার করে দিয়েছি ত্রিলার, তিন গোয়েন্দা, রাজু গোয়েন্দা, অনুবাদ পড়ে। মাসুদ রানা, হুমায়ুন কিনবা জাফর স্যার ছিলেন আছেন সংগী হয়ে। আরজ আলি মাত্তব্বর থেকে শুরু করে ব্রাট্রান্ড রাসেল অনুবাদ, সুনিল, কিনবা শেষের কবিতা কিছুই বাদ পড়েনি, যা পেয়েছি গিলেছি গো-গ্রাসে।
বই ছিলো সঙ্গি এখনও আছে।

আমাদের নব্য মোবাইল আর ফেইসবুক জেনারেশনের সৃজনশীলতা নিয়ে আমি সন্দিহান। এরা যতই থাকুক পরিপাটি, বাইরে দেখাক যতই স্মার্টনেস, আসলে বই বিমুখ একটি অন্তরসার শুন্য প্রজন্ম উপহার পেতে যাচ্ছি নিশ্চিত। এখনি সময়, নতুন প্রজন্মের হাতে বই তুলে দিতে হবে, আমি কখনোই ইন্টারনেট – ফেইসবুকের বিপক্ষে নই। আমি চাই তারা ফেইসবুকে কপি পেইস্ট না করে, অন্যের প্রতিভাকে ট্যাগ না করে, চুরি না করে নিজেরা কিছু লিখুক, নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটাক। এই রকম কপি পেইস্ট জেনারেশন আমরা চাই না, যা আগামী বাংলাদেশের তথা পৃথিবীর জন্য বিপদজ্বনক । এক্ষেত্রে বই পড়ার কোন বিকল্প নেই, এটা বোঝাতে হবে আমাদের নতুন প্রজন্মকে। বই তুলে দিতে হবে তাদের হাতে।
তা না হলে খুবই কঠিন সময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।