ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদ স্যার এবং একুশে পদক

রুশ ভাষায় আমার একটি প্রিয় প্রবাদ আছে -Лучше поздно, чем никогда (লুচসে পজনা, চেম নিকাগদা ) অর্থাৎ একেবারে না হওয়ার চেয়ে দেরীতে হওয়াও ভালো।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি সরূপ অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ স্যার একুশে পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন এবং অবশেষে!!

খবরটি একদিক দিয়ে আমার কাছে যেমন আনন্দের তেমনি অন্যদিক থেকে বেদনাদায়কও বটে। এতো বড় একজন ব্যক্তিত্ব একাধারে সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, ভাষাসৈনিক, ভাষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক এতোগুলো গুনাবলীর অধিকারী অসামান্য মানুষ, এতো সব অবদান বাংলা সাহিত্যে আর তাঁর অবদানের স্বীকৃতির জন্য এত বেশি যাচাইবাচাই!! এতো অপেক্ষা!!!

২০০৪সালে স্যারের মৃত্যুর পর তৎকালীন সরকারের দুই বৎসর, পরবর্তীতে ফখরউদ্দিন এন্ড কোং এর দুই বছর শাসন আমল আর তারপর বর্তমান সরকারের প্রায় তিন বছর- ২০০৪সাল থেকে ২০১২!!
বিএনপি-জামাত সরকারের কাছ থেকে হুমায়ুন আজাদ স্যারের মূল্যায়ন পাবো তা ছিলো কল্পলোকের গল্পের মতোই অলিক, মাঝখানে দুইবছর তত্বাবধায়ক সরকারও সাহস দেখালো না, স্বাধীনতার স্বপক্ষ আর ধর্ম-নিরপেক্ষতার কথা বলতে বলতে মুখে ফেনাতোলা আওয়ামী সরকারের সময়েও তিনবছর অপেক্ষা করতে হলো ব্যাপারটা তাই বেদনাদায়কই বটে।

২০১২সালের একুশের পদকের জন্য অধ্যাপক আজাদের সঙ্গে মনোনীত হয়েছেন সদ্যপ্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদসহ আরো ১৩ জন। সরকারের এক তথ্য বিবরণীতে মনোনীতদের নাম প্রকাশ করা হয় এবং ২০ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে পদক দেওয়া হবে।

শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ স্যার ভাষা ও সাহিত্য শাখায় একুশে পদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন। এইজন্য বর্তমান সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।

একুশে পদক বাংলাদেশের একটি জাতীয় পুরস্কার। এদেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিল্পী, শিক্ষাবিদ, ভাষাসৈনিক, ভাষাবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, দারিদ্র্য বিমোচনে অবদানকারী, সামাজিক ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় পর্যায়ে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের উদ্দেশ্যে ভাষা আন্দোলন এর শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সাল থেকে একুশে পদক দেয়া হচ্ছে।

প্রথা বিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ স্যারের জন্ম ২৮শে এপ্রিল, ১৯৪৭ (১৪ই বৈশাখ, ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ), রাড়িখাল, বিক্রমপুর; মৃত্যু: ১১ই আগস্ট, ২০০৪, মিউনিখ, জার্মানি।
যখন তিনি ৬০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ছিলেন, তখন ভাষাবিজ্ঞানে চম্‌স্কি-উদ্ভাবিত সৃষ্টিশীল রূপান্তরমূলক ব্যাকরণ তত্ত্বটি আলোড়নের সৃষ্টি করেছিল। হুমায়ুন আজাদ স্যারই প্রথম এই তত্ত্বের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে বাংলা ভাষার গবেষণার একটি অবহেলিত ক্ষেত্র বাক্যতত্ত্ব নিয়ে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণাকর্ম সম্পাদন করেন ও বাংলা ভাষার গবেষণাকে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানে উত্তরণ ঘটান। তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের নাম ছিল Pronominalization in Bengali (অর্থাৎ বাংলা সর্বনামীয়করণ)। এটি ১৯৮৩ সালে একই শিরোনামের ইংরেজি বই আকারে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৪ সালে বাংলা বাক্যতত্ত্বের উপর বাক্যতত্ত্ব নামে উনার আরেকটি বাংলা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। একই সালে তাঁর বাঙলা ভাষা শিরোনামে দুই খণ্ডের সঙ্কলন প্রকাশিত হয় যা বাংলা ভাষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপর বিগত শতাধিক বছরের বিভিন্ন ভাষাবিদ ও সাহিত্যিকের লেখা গুরুত্বপূর্ণ ভাষাতাত্ত্বিক রচনা স্থান দখল করে নেয়, তিনটি গ্রন্থই বাংলা ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা।

তাঁর কাব্যগ্রন্থ গুলোর মধ্যে ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ (১৯৭৩), ‘জ্বলো চিতাবাঘ ১৯৮০, ‘সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ (১৯৮৫)’ যতোই গভীরে যাই মধু যতোই ওপরে যাই নীল’ (১৯৮৭)
‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ ১৯৯০ আমার পড়া অন্যতম।

হুমায়ুন আজাদ স্যারের প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ১৩। তাঁর ভাষা গঠন, দৃঢ়তা, কাহিনী এবং রাজনৈতিক দর্শনের কারনে এইসব উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অসামান্য অমূল্য সম্পদ । ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল (১৯৯৪), সব কিছু ভেঙে পড়ে (১৯৯৫), মানুষ হিশেবে আমার অপরাধসমূহ (১৯৯৬),যাদুকরের মৃত্যু (১৯৯৬),শুভব্রত, তার সম্পর্কিত সুসমাচার (১৯৯৭),রাজনীতিবিদগণ (১৯৯৮),কবি অথবা দন্ডিত অপুরুষ (১৯৯৯),নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু (২০০০),ফালি ফালি ক’রে কাটা চাঁদ (২০০১),শ্রাবণের বৃষ্টিতে রক্তজবা (২০০২),১০,০০০, এবং আরো একটি ধর্ষণ (২০০৩),একটি খুনের স্বপ্ন (২০০৪),পাক সার জমিন সাদ বাদ (২০০৪)।

পাক সার জমিন সাদ বাদ- আমার পড়া একটি ভিন্নধর্মী, অসাধারণ নতুন মাত্রার উপন্যাস। এসব ছাড়াও ভাষাবিজ্ঞান, সমালোচনাগ্রন্থ সহ কিশোর রচনায় তাঁর অসংখ্য বই রয়েছে।
স্যারের লিখা প্রবচনগুলো আমার খুবই প্রিয়। একটি তো প্রায়ই বলি -‘পা, বাঙলাদেশে, মাথার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পদোন্নতির জন্যে এখানে সবাই ব্যগ্র, কিন্তু মাথার যে অবনতি ঘটছে, তাতে কারো কোনো উদ্বেগ নেই।’ অসম্ভব প্রিয় আরেকটি উল্লেখ্য করার লোভ সামলাতে পারছি না, তা হলো – ‘এদেশের মুসলমান এক সময় মুসলমান বাঙালি, তারপর বাঙালি মুসলামান, তারপর বাঙালি হয়েছিলো; এখন আবার তারা বাঙালি থেকে বাঙালি মুসলমান, বাঙালি মুসলমান থেকে মুসলমান বাঙালি, এবং মুসলমান বাঙালি থেকে মুসলমান হচ্ছে। পৌত্রের ঔরষে জন্ম নিচ্ছে পিতামহ।’

১৯৯২ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ নারী। মৌলবাদীদের অসামান্য ক্ষমতার প্রভাবে ১৯৯৫ সালে বইটি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয় সরকার। পরবর্তীতে ৪ বছর পর ২০০০ সালে বইটি আবার পাঠকের হাতে আসে।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাসায় যাওয়ার পথে মৌলবাদীদের হামলার শিকার হয়ে গুরুতর আহত হন। জার্মান সরকারের বৃত্তি ও আমন্ত্রনে ২০০৪-এর ৭ আগস্ট জার্মানি যান, এবং ১১ আগস্ট আকস্মিকভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ।

শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আজাদ স্যারের জীবিত অবস্থায় যেমন ছিলেন আপোষহীন শক্তিমান, মৃত্যুর পরেও তিনি হয়ে আছেন কিংবদন্তী। এই ভাষার মাসে তোমাকে নত মস্তিষ্কে শ্রদ্ধা জানাই অগ্রজ।