ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

প্রেক্ষপট ১- ১৯৯৬সালের ঘটনা। আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার ২৪ ঘন্টার মধ্যে এমসি কলেজের বিরোধী দলের ছাত্র সংঘটনের এমসি কলেজ সিলেটের ছাত্র বাবুল আহমেদ রাহীর হত্যাকান্ড ঘটে। প্রধান আসামী করা হয় সরকার দলীয় ছাত্র সংঘটনের কয়েকজন ছাত্রনেতাকে। যেহেতু সরকারের এখনো ২৪ঘন্টাও পার হয়নি আর এর মধ্যেই হত্যাকান্ড!! ব্যাপারটা হজম করার জন্য সরকারের উপর মহল থেকে ১২ ঘন্টা সময় বেধে দেয়া হয় আসামী ধরার জন্য, এবং ওইদিন রাতেই পুলিশ সফলতার সহিত ২জন আসামী গ্রেফতার করে। একজন ওই ছাত্র নেতার কলেজে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা, সদ্য এস,এস,সি পাশ ১৬ বছরের ছোট ভাই এবং অন্যজন তার ৫৫বছর বয়সী চাচা!!!

ঘনিষ্ট বন্ধু হওয়ার দরুন প্রতিটি মূহুর্ত আমার অত্যন্ত কাছ থেকে দেখা। ছাত্রনেতার চাচা বড় ধরনের উৎকোচের বিনিময়ে শীঘ্রই ছাড়া পেলেও ওই ১৬বছরের মেধাবী ছাত্রকে জেল থেকে ছাড়া পেতে অপেক্ষা করতে হয় ১মাস ২৬দিন। হত্যাকান্ডের সাথে সম্পর্ক তো দূরে থাক হত্যাকান্ড যে ঘটেছিলো তাও জানাছিলো না ছেলেটির। এই ব্যাপারে থানায় যোগাযোগ করা হলে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা নির্লিপ্তভাবে বলেছিলেন – ‘আরে ভাই একটা মার্ডার হয়েছে, উপর থেকে চাপ আছে, একজনকে তো গ্রেফতার দেখাতেই হবে, চাকরী তো বাঁচাতে হবে। আমরা চালান করে দিচ্ছি, কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে নেবেন, কথা দিলাম রিমান্ড চাইবো না।’ আমি ছেলেটার খুব ঘনিষ্ট থাকার কারনে জানতাম ছেলেটির প্রতিটি মূহুর্ত কাটতো কতো কষ্টে ওই ১৪ শিকের হাজতে।

প্রেক্ষাপট২- বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের দৌহিত্র এবং সোহেল তাজের ভাগ্নে ১৯বছরের রাকীব পুলিশ কর্তৃক প্রহৃত হওয়ায় উচ্চতর আদালত স্বপ্রনোদিত হয়ে গুলশান থানা, পুলিশের মহাপরিদর্শক, সরকারের স্বরাষ্ট্রসচিব ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের উদ্দেশে রুল জারি করেছেন। মিডিয়ার কল্যানে সবগুলো ব্যাপার আমাদের দ্রুত দৃষ্টিগোচর হয়েছে, যার ফলে সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাপারটা উচ্চতর আদালত অবধি গড়িয়েছে। এইজন্য মিডিয়াকে সবসময়ের মতো এবারও ধন্যবাদ । দাবী উঠেছে এ ধরনের দূর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হলে দোষী পুলিশ সদস্যদের শাস্তি নিশ্চিত করার এবং একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নাতির ক্ষেত্রেই শুধু নয়, আমাদের মতো সাধারন নাগরিকের ক্ষেত্রে সমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

রাকিবের ঘটনাটা যখন পত্রিকার ইন্টারনেট সংকলনে পড়ি তখন একজনের একটি মন্তব্য আমায় খুব চিন্তিত করে, রাকিবের মতো এতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলের যদি এই দশা হয় তাহলে আমরা সাধারন জনগন যাব কোথায়!!

পুলিশে কর্মরত আমাদের অনেক ভাইয়েরা প্রায়ই ভুলে যান তারা একটি সেবামুলক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। এখানে তাদের প্রধান কাজই হলো সেবাদান। ধরে এনে মারধোর আর ইচ্ছেমতো মামলা দেয়া নয়। এতে করে যে সমাজের কল্যান হয়না আর আইনশৃংখলা পরিস্থিতির উন্নতি আদৌ হয়না তা আমরাও জানি উনারা জানেন। তারপরেও ক্ষমতা বলে কথা, হাতে অস্র থাকলে ক্ষমতা থাকলে আইন কতো প্রকার ও কি কি তা জনগনকে বোঝানোর অসীম দ্বায়িত্ব যে উনাদের কাঁধে।

আমার এক সহকর্মী কথা প্রসংগে বলছিলেন দেশের প্রতিটি সরকারী বেসরকারী সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান আজ দূর্নীতিগ্রস্থ । সর্বস্তরে আজ অনিয়ম, অনিয়মই হয়ে উঠেছে নিয়ম। ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ সমাধা হওয়া রূপকথার গল্পের মতো। আর এই অনিয়ম দূর্নীতি শুরু হয়েছিলো পুলিশ প্রশাসন থেকে। তাই আজ যদি কোথাও এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হয় তাহলে সবার আগে প্রয়োগ করতে হবে পুলিশ প্রশাসনে। পুলিশ বিভাগ নিজে আইনের ভিতরে চলে এলে, দূর্নীতিমুক্ত হলে সরকারী বেসরকারী প্রত্যেকটি সেবা প্রদানকারী শাখা জাদুর কাটির ছোঁয়ার মতো শুদ্ধ হয়ে যাবে। আর অতীতের রেকর্ড বলে পুলিশ চাইলে পারে না এমন কোনো শব্দই অভিধানে নেই।

পরিশেষে সেই মেধাবী ১৬বছরের ছেলেকে দিয়েই শেষ করি। সেই মেধাবী ছেলে আজ একজন ডাক্তার, আমার সহকর্মী। স্মৃতিচারনে আজও তার চোখ ভিজে যায়। তাজউদ্দিন আহমদ কিংবা সোহেল তাজের মতো তার কোনো আত্মীয় ছিলেন না সেটি তার দূর্ভাগ্য। শুধু মাত্র গ্রেফতার দেখানোর খাতিরে ১মাস ২৬দিন জেল হাজতে!! ১৬বছরের ছেলেটি যে পরিবেশের মধ্যে জেলে ছিলো, তার ডাক্তার না হয়ে চোর বা ডাকাত হলে অবাক হতাম না। সেক্ষেত্রে তার ভবিষ্যত নষ্টের জন্য দায়ী হতো কে?

আমার বন্ধুটি প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করে সফল মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে। এটি একটি ব্যতিক্রম ঘটনা। সবার ক্ষেত্রে এরকম ঘটে না।