ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 

আমার স্ত্রী একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের শিক্ষিকা প্রচলিত শব্দে মিস্‌ হওয়ার কারনে প্রতিদিন সকালে তাকে স্কুলে গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে আসতে হয়। এই গুরু দ্বায়িত্ব আমাদের ড্রাইভার সাহেব নেয়ায় আমি বড় বাঁচা বেচে গেছি। তারপরও মাঝে মধ্যে ড্রাইভারের অনুপস্থিতিতে এই কাজের ভার আমাকেই গ্রহন করা লাগে। একই সড়কে একাধিক ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হওয়ার দরূন প্রতিদিন সকালে ওই সড়কে যানজট লেগে করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়। না আগে যেতে পারি না পিছে। নার্সারী থেকে শুরু করে ও’লেবেল অবধি প্রায় সব ছাত্রছাত্রী নিজস্ব গাড়িতে স্কুলে যাতায়াত করে। যার ফলে সমস্ত রাস্তা জুড়ে তীব্র যানজট মতান্তরে চলে নতুন মডেলের গাড়ির প্রদর্শনী । আমি এমন কিছু ছাত্রছাত্রীকে দেখলাম গাড়ি নিয়ে আসতে যাদের বাসা স্কুল থেকে হাঁটা পথে ৪-৬মিনিট, কিন্তু গাড়ি করে আসায় তাদের লাগছে ২০-২৫মিনিট। ছোট বাচ্চারা তো অবশ্যই এমনকি উপরের ক্লাসের বাচ্চা (!!)রাও গাড়ি করে স্কুলে আসছে।

বছর কয়েক আগের কথা। আমার এক সহকর্মী আমার কাছে আমার ব্যক্তিগত গাড়িটি কয়েকদিনে সকালে ৩০মিনিটের জন্য ধার চেয়েছিলেন। কারন জানাতে গিয়ে বললেন তার বড় ছেলে এবার ক্লাস ফোর -এ পড়ে । ছেলের প্রায় সকল বন্ধু গাড়ি করে স্কুলে আসে, ও আসতে পারে না। প্রতিদিন তার মা হেঁটে হেঁটে তাকে স্কুলে দিয়ে আসেন। তার বায়না গাড়ি কিনতেই হবে তা না হলে সে আর স্কুলে যাবে না। অনেক বোঝানোর পরও সে মানতে নারাজ। তাই আপাতত কয়েকটা দিন তার বন্ধুদের কাছে তার মান সম্মান রাখতে গিয়ে গাড়ি ধার করা।

আমি জানি আমার এই লেখা পড়ে অনেক বাবা মা-ই মন খারাপ করবেন। আমি দুঃখিত এই জন্য। কেউ কেউ নিরাপত্তার প্রশ্নে চিৎকার তুলবেন, কেউ বা বলবেন গাড়ি আছে তো ব্যবহারের জন্যই। না থাকলে একটি কথা ছিলো। আমি তাদের সব যুক্তিই মেনে নেবো। গাড়ি করে স্কুলে আসা যাওয়া এটা একটি পারিবারিক সিদ্ধান্ত। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।

আমাদের অনেকের স্কুল জীবন এই রকম উৎকৃষ্ট মানের ছিলো না। প্রায় সবাই হয়তো আমার মতো বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র বা ছাত্রী। আমার খুব মনে পড়ে ছোট প্রাইমারীতে পড়ার সময় প্রতিদিন সকালের পাঠ শেষে নাস্তা খেয়ে তৈরী হয়ে অপেক্ষা করতাম আমার সহপাঠিদের। সহপাঠিরা দল বেধে আসতো যার নেতৃত্বে থাকতেন একজন সিনিয়র আপা বা বড় ভাই, যারা নিজেই ক্লাস ফাইভ বা ফোর এ পড়তেন, বাসার সামনে এসে নাম ধরে ডাক দিতো সবাই, দৌড় দিয়ে দলে যোগ দিতাম। যাওয়ার সময় রাস্তায় কতো ধরনের অভিজ্ঞতা হতো, পাড়ার রাস্তা পেরিয়ে বড় সড়কে, ছোট ছোট দোকান– তারপর বাজার তারপর স্কুল। কতো কি দেখতাম প্রতিদিন । রাস্তার পাশে থাকা কুল গাছে ঢিল, আম গাছে চড়া, মালিকের দৌড়ানি সব মিলিয়ে কিযে একধরনের আনন্দের মধ্যে স্কুলে পৌছে যেতাম টেরও পেতাম না। একবার সহপাঠিদের বুদ্ধিতে একটি কামরাংগা গাছে উঠে কামরাংগা পাড়ছি তখন ওই বাড়ির মালিক এসে উপস্থিত। আমার দলের সবাই উঠে ভোঁ-দৌড়, আমি গাছে … ভ্যা করে দিলাম কেঁদে, ওই ভদ্রলোক গাছ থেকে আমায় নায়িয়ে হাতে দু’টা কামরাংগা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আরও কতো স্মৃতিতে যা আজও সতেজ দৃশ্যপটে। দারুন সব অভিজ্ঞতা জীবনে চলার পথে জুগিয়েছে অনেক জ্বালানী। বিদেশ বিভূঁইয়ে একা পড়াশোনা করতে গিয়ে কখনো মনে হয়নি আমি একা, ছোট বেলার এইসব ছোট ছোট অভিজ্ঞতা আমায় করে তুলেছিলো এনেক বেশি স্বাবলম্বী অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। এই সব কথা কিংবা ঘটনা শুধু আমার ক্ষেত্রে নয় আপনাদের অনেকের ক্ষেত্রে সত্য।

একটি মানুষের শেখার ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট সময় স্কুলে পড়ার সময় । এইসময় মস্তিষ্কের গঠন উর্বরতা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটে। মানুষের চিন্তা চেতনা গড়ে উঠার তখনই সর্বশ্রেষ্ট সময়। যা আমাদের সবার চলার পথের পাথেয় হয়ে থাকে সারা জীবন । আমাদের সন্তানদের সাথে ফার্মের মুরগীর মতো আচরন না করে, দেই না তাদের প্রকৃতিতে- পরিবেশে বেড়ে উঠতে। তারা হয়ে উঠুক শক্ত সামর্থ, বুদ্ধিমত্বায় অসাধারন। তাদের মাঝে ধুনাক্ষরে যেনো গড়ে না উঠে অহংবোধ। মানুষকে তারা মানুষ হিসেবেই চিনুক, দেখুক। এসি-র ঝাপসা গাড়ির কাঁচের গ্লাসের ভিতর থেকে নয়।।

শুনেছি ঢাকায় স্কুল বাসে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে যাদের মনে কষ্ট দিলাম এই লেখায় তাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিচ্ছি, সুন্দর একটি সকালের আশায়।
ভালো থাকবেন।