ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

পেশাগত ব্যস্ততার কারনে জীবনটা হাফিয়ে উঠেছিলো ইদানিং। আমার স্ত্রী মানসুরার দাবীর মুখে প্লান করলাম ঘুরে আসবো চট্টগ্রাম। আমার খুবই প্রিয় একটি শহর,সুন্দর ছিমছাম মানুষগুলোও চমৎকার।
পরিকল্পনা হলো আটদিনের ভ্রমন, কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন-চট্টগ্রাম-বান্দরবন। আমার মন আনন্দে ভরে গেলো। ঘোষনা দিয়ে মোবাইল বন্ধ করা যাবে, সারাটা পথ যাওয়া আসা, সমুদ্র সৈকত সব জায়গায় একটানা বই পড়ার সুযোগ!! ভাবতেই অদ্ভুত এক অনুভুতি হলো । আমার শ্লোগানঃ মোবাইল মুক্ত স্বর্গ চাই। স্বর্গে যদি মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা থাকে টেকনিশিয়ান ফেরেশতার যোগসাজসে আমি সেই নেটওয়ার্ক ক্রাস করে দেয়ার চেষ্টা করবো। মোবাইল ফোনের কারনে স্বর্গও নরক সমতুল্য।

আমার ড্রাইভার সাহেব খুবই করিৎকর্মা মানুষ। একদিনের ভিতরে ট্রেনের টিকেট যোগাড় করে ফেলল। বর্তমান সময়েও যে ট্রেনের টিকেট এতো সহজলভ্য তা আমার জানা ছিলো না। ড্রাইভারকে ডেকে টিকেটের ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে সে ব্যাপারটা একদমই এড়িয়ে গেলো – বাদ দেন স্যার, শুলনে আপনার মনটা শুধু শুধু খারাপ হয়ে যাবে। আমি ও মন খারাপের দিকে না গিয়ে পড়ার জন্য বই যোগাড় করতে থাকলাম, আর আমার স্ত্রী কাপড়চোপড় গোছাতে থাকলেন । ব্যস্ততার কারনে যেসব বই জমে গিয়েছিলো সব একসাথে করে রাখলাম ব্যাগে ভরার জন্য।

প্রায় একযুগ পর ট্রেন জার্নি, কিছুটা রোমাঞ্চিত। নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে ট্রেনে উঠে রওনা দিলাম এবং কিছুক্ষনের মধ্যেই বোঝতে পারলাম, যে বইয়ের ব্যাগ ভুল করে ল্যাগেজে ঢুকানো হয়নি। ব্যাপারটা চেপে গেলাম নিঃশব্দে। কারন আগামী ৮দিন কোনো কারনে স্ত্রীর মন খারাপ করবো না বা মন খারাপের কারন হবো না বলে তার কাছে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ভাবলাম কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা না। কারন অতীতের ট্রেন ভ্রমন থেকে জ্ঞাত আছি যে কিছুক্ষনের মধ্যেই লোকজন বই ফেরী করতে আসবে। কয়েকটা কিনে নিলেই হবে।

কিছুক্ষন পর বই ফেরীওয়ালা ঠিকই আসলো কিন্তু তার কাছে কিছু ধর্মীয় বই, অ-আ-ই-ঈ বর্নমালার আর কিছু নিম্নমানের লেখকের বই। বইগুলোর নাম গুলো কিন্তু চমৎকার – মন মানে না , কঠিন প্রেম, তুমি সুন্দর, গরীবের প্রেম। অতীতের ‘মচৎকার’ অভিজ্ঞতার কারনে বই গুলো কিনলাম না। এরপর আরও কয়েকজন ফেরীওয়ালা আসলো, কিন্তু ফলাফল একই। ভালো ম্যাগাজিন পেলেও চলতো। জিজ্ঞেস করলাম ভালো বই নেই? উত্তর -‘এগুলোই তো ভালো বই স্যার।’

ক্ষান্ত দিলাম। মনোনিবেশ করলাম ট্রেনের বগির ভিতর, যদি কারও কাছে বই কাছে বই পাওয়া যায় ধার। কিন্ত কই, সবাই মোবাইল নামক আচানক বস্তুটি নিয়ে টিপাটিপিতে ব্যস্ত। ৬০-৭০জন মানুষ বগির ভিতর আবং প্রায় সবাই মোবাইল নিয়ে রিসার্চে মত্ত। হায় খোদা কি হচ্ছে, কি হচ্ছে এসব!! একটি গ্রুপ পাওয়া গেলো তাস খেলছে, যাই হোক পাওয়াতো গেল এমন কিছু লোক যারা মোবাইল ছাড়াও চলতে পারে। আমি অন্য বগিতে চেষ্টা চালিয়ে প্রায় ৯টি বগি ঘুরে কয়েকজন মানুষ পেলাম যারা পত্রিকা পড়ছে। ধন্য ধন্য বাঙালী। তাও তো পাওয়া গেলো কেউ কিছু পড়ছে।

এর মধ্যে একটি ষ্টেশন চলে চলে এলো, আমি নামলাম, কিন্তু কোনো বুক ষ্টল পেলাম না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম রাত হয়ে গেছে তাই সব বন্ধ। তাও ভালো,বন্ধ, বুক ষ্টলে গিয়েও যদি বই না পেতাম তাহলে …!!??

সর্বশেষে ভেবেছিলাম ‘বাংলা সিনেমার আধুনিক গান’ নামক একটি আদর্শ গানের বই কিনে তাতে মনোনিবেশ করবো। কি ভেবে কেনো জানি তাও করলাম না।
সিলেট থেকে চট্টগ্রাম অবধি আমার একটি কষ্টকর ভ্রমন হলো, চট্টগ্রাম নেমেই কিছু বই কিনে হাফ ছেড়ে বাচলাম। যেনো অক্সিজেন।

কিছুটা সময় পেছনে নিয়ে যাই আপনাদের। ২০০৫সালের মার্চ মাসে সেণ্টপিটার্স বার্গ থেকে মস্কো যাচ্ছি। ট্রেনের প্রতিটা বগিতে প্রায় ৯০%মানুষের হাতে বই। মোবাইল সবার কাছেই আছে, তবে তা পকেটে কিনবা হেডফোন লাগিয়ে এফ,এম শুনে শোনে বই পড়ছে। আমার হাতে বই ছিলো না বলে খুব লজ্জা লাগছিলো। পরের ষ্টেশনে নেমেই একটি বই কিনে পড়া শুরু করে দিলাম।

সেইন্ট পিটার্স বার্গে অন্যান্য সবার মতো আমারও চলাচলের মাধ্যম ছিলো সাবওয়ে। সাবওয়েতে ঢুকার পর কতো সময় লাগতো ২-৩ বা ৪ ষ্টেশন যেতে, সর্বোচ্চ ১০-১৫মিনিট। এই সময়ও দেখতাম প্রায় সবার হাতে বই। এত ভাল লাগতো তা বলে প্রকাশ করার মতো নয়। ইউরোপের বেশ কয়েকটি শহর ঘুরার সৌভাগ্য আমার হয়েছে, প্রতিটি শহরেই একই সৌন্দর্য।

প্রতি বছর বই মেলা হয়। কিছু প্রকাশক ও ১৬কোটি আমজনতার দেশে কিছু উৎসাহী পাঠকের দৌড়ঝাপের মধ্যেই যেনো আমাদের পাঠাভ্যাস সীমাবদ্ধ। কেনো এই বই বিমুখতা?? অনেকেই বলবেন কই অনেকেই তো বই পড়ছে। পড়ছে!! কয়জন, গুনে দেখেন। সময় দিচ্ছি।

কেউ বলবেন বিনোদনের আজকাল অনেক মাধ্যম হয়েছে বই ছাড়াও… তাই, বইইয়ের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনোদন মাধ্যম!! তাও হয় নাকি!!?? টিভি ছেড়ে সারাদিন চিকনি চ্যামেলীর নাচ, মুন্নি বদনাম হওয়ার দৃশ্য…আহ…, আর চুইংগামের মতো টেনে লম্বা করা হিন্দি সিরিয়াল। হায় খোদা, হায় ঈশ্বর কি হচ্ছে এসব!!

ছোটবেলা দেখতাম পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য স্কুল গুলোতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে লোকজন যেতো, বই বিলি করতো, আবার খোঁজ নিতো বই পড়ছে কিনা ছাত্রছাত্রীরা। এখনো যায় তারা। গাড়ী নিয়ে অনেক স্কুলের সামনে তাদের বই বিলি করতে দেখি। প্রশংসার উর্ধ্বে যদি কিছু থাকে তাও তারা পাবার যোগ্য। আমার পরিচিত একটি পরিবারে বেড়াতে গিয়ে দেখি ক্লাস নাইনে পড়া তাদের মেয়েটি মনোযোগ দিয়ে টম স্যয়ার অনুবাদ পড়ছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে বিলিকৃত। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম কিছু বই দেয়া হয়েছে, পড়ার পর এইসব বইয়ের উপর একটি ছোট পরিক্ষা নেয়া হবে এটা জানার জন্য যে বইগুলো তারা কেমন পড়েছে। খুবই সুন্দর এবং চমৎকার উদ্যোগ। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি ওই মেয়েটি প্রতিযোগীতাটিতে তৃতীয় হয়েছিলো। আরও অনেকবার তাদের বাসায় গেছি কিন্ত মেয়েটিকে বই পড়ার ব্যাপারে আগ্রহী দেখলাম না। জানতে পেরেছি ওই প্রতিযোগীতার জন্য উৎসাহের সহিত বই পঠিত হয়েছিলো। প্রতিযোগীতা শেষ বই পড়াও শেষ।

পাঠাভ্যাসের ব্যাপারটা আসলেই পারবারিক। পরিবারের সবাই বই পড়তো তাই ছোটবেলা থেকেই আমার হাতে সহজেই বই চলে আসে, প্রায়ই বই উপহার পেতাম, টিফিনের টাকা,পায়ে হেটে স্কুলে গিয়ে রিক্সা ভাড়া বাচিয়ে টাকা জমিয়ে বই কিনতাম। বইগুলোর প্রতি থাকতো মমত্ববোধ ভালোবাসা। একবার বাসায় বন্যার পানি ঢুকে বেশকিছু বই নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো, আমার সেকি কান্না। বইগুলোর জন্য আজও কষ্ট লাগে। প্রবাসে যাওয়ার আগে আমার পাড়ার এক ছোট ভাইয়ের সাথে যৌথ সংগ্রহে প্রায় আড়াই হাজার বই ছিলো। লাইব্রেরী করেছিলাম, ২টাকা করে বই ভাড়া, টাকা জমিয়ে আবার বই কেনা। প্রবাসে দীর্ঘদিন থাকার ফলে এবং আমার ওই ছোট ভাই হঠাৎ করে তাবলীগ জামাতে যোগ দেয়ার কারনে বইয়ের প্রতি অমনোযোগী হয়ে যায়, প্রায় সব বই হারিয়ে কিনবা নষ্ট হয়ে যায়। দেশে ফিরে খুব কষ্ট পেয়েছি।

পাঠকরা যারা এই লেখাটি পড়ছেন তাদের নিশ্চিত ভাবেই পাঠাভ্যাস আছে। যেহেতু পাঠাভ্যাস ব্যাপারটা সম্পুর্নভাবেই পারিবারিক ভাবে গড়ে উঠে তাই আজই আপনার ভাই কিনবা সন্তানের হাতে বই তুলে দিন। তাদের সময় দিন। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। এর মাধ্যমেই আপনি গড়ে দিতে পারেন তার ভবিষ্যত। বই মানুষের নিজের সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলে, নিজেকে জানতে ও বোঝতে শেখায়। ওরা নিজেকে জানুক, বোঝুক। ওরাই তো আমাদের আগামী।
বই হোক তাদের সবচেয়ে ভালো ও কাছের বন্ধু।