ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

সড়ক পথে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার কথা বলছি। কিছুদিন আগের কথা। শুক্রবার ছুটির দিন। সায়েদাবাদ থেকে বাস ছাড়ল দুপুর ১২:৪৫-এ। কাঁচপুর পৌঁছালাম দুপুর প্রায় আড়াইটার দিকে। কারণ? রাস্তায় জ্যাম। জ্যাম না থাকলে ১৫-২০ মিনিটের পথ। যাত্রীরা উৎকন্ঠিত; কতক্ষণ লাগে পৌঁছাতে! যাক কাঁচপুর ব্রীজ পার হোয়ার পর রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। বাসও চলছে ভালই। যাত্রীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এল। কিন্তু হায়! গোমতী ব্রীজ-এর উপর উঠে বাস থেমে গেল, সামনে জ্যাম, ড্রাইভারও বাসের ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। বিপরীত দিক থেকেও কোন গাড়ী অাসছে না। বেশ কিছুক্ষণ পর হেলপার খোঁজ নিয়ে এসে জানাল ব্রীজের শেষ মাথায় একটি এক্সিডেন্টের কারণে এই জ্যাম অার এই জ্যাম সহসা ছুটবে না।

বাইরে প্রচন্ড শীত তার উপর বাতাস বইছে। তবুও যাত্রীরা প্রায় সবাই বাস থেকে নেমে পড়লেন। বাসে বসে থেকেই বা কী করবেন। ব্রীজের উপর প্রচুর মানুষ; যেন কোন জনসভা। অবশ্য জনসভা না হলেও কয়েকজন মিলে ছোট ছোট গ্রুপে অালাপ শুরু হয়ে গেল। প্রধান এজেন্ডা কখন ছুটবে এই জ্যাম। কেউ বললেন, কমপক্ষে ৩-৪ ঘন্টা। আবার দু’/একজন আশাবাদীর উচ্চারণ – এতক্ষণ লাগবে না বড়জোর ঘন্টাখানেক লাগতে পারে। পাল্টা যুক্তি দিলেন একজন – এটা বাংলাদেশ। ঢাকা থেকে উদ্দারকারী ক্রেন আসবে; পুলিশ ঝামেলা …..আরো সময় নষ্ট। বলতে না বলতেই, একটি পুলিশের গাড়ী সাইরেন বাজিয়ে ঘটনা স্থালের দিকে এগিয়ে গেল। কেউ কেউ সিঙ্গাপুর, মালেশিয়ার বিভিন্ন উদাহরণ টানলেন আর এদেশের সদ্য বিদায়ী যোগাযোগ মন্ত্রীসহ রাজনীতিবিদদের গোষ্ঠী উদ্ধার করলেন। একজন বললেন এই যে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের সাথে রাজধানীর এরকম যোগাযোগ ব্যবস্থা কি এজমানায় হওয়া উচিত? ট্রেন-এর টিকেট পাওয়া যায় না ১০ দিন আগে থেকেই। কালোবাজারেও টিকেট পেতে ভাগ্য লাগে। কারণ যাত্রীর তুলনায় ট্রেন অতি নগন্য। অথচ রেলওয়ে লোকসান দিচ্ছে। এই যে ঢাকায় ২৬ কিঃমিঃ ব্যাপী ফ্ল্ইাওভার বানাচ্ছে প্রায় ১১হাজার কোটি টাকা খরচ করে নিশ্চিত থাকেন যানজট কমবে না আরো বাড়বে। কারণ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নাই। গাড়ী বাড়ছে ………..। একজনকে বেশ কিছুক্ষণ অস্থিরভাবে পায়চারী করতে দেখছিলাম। কারণে অকারণে বিরক্তি ঝরে পড়ছিল একটু পর পর। তিনি আমাদের বাসেই ছিলেন – ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন রাতের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না সময়মত বিয়ের অনুষ্ঠানে পৌঁছাতে পারবেন কিনা নাকি ঢাকায় ফিরে যাবেন। কারণ বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে তার রাতের বাসেই আবার ঢাকা ফিরে যাওয়ার কথা।

সময় প্রায় একঘন্টা গড়িয়ে গেল। জট ছাড়ার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। নারী-পুরুষ, শিশুসহ অনেকে ব্যাগপত্রসহ হাঁটা শুরু করেছেন। এরমধ্যে বরযাত্রীসহ এক বরকে গাড়ী থেকে নেমে হেঁটে গন্তব্যের দিকে রওয়ানা হলেন। হয়ত ওপারে বিকল্প কোন ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিছুক্ষণ পর বিপরীত দিক থেকে দ’ুটি বাসকে পেছনের দিকে ফেরত পাঠালো পুলিশ। সেই বাসগুলো যানজট জেনেও ওভারটেক করে চলে গিয়েছিল কিন্তু পারল না শেষ পর্যন্ত। এ দৃশ্য দেখে কিছু মানুষ উচ্ছসিত হলেন – সেই বাস ড্রাইভারদের উচিত শিক্ষা হয়েছে বলে। হঠাৎ করে একটি প্রাইভেট কার এসে ঢাকা, ঢাকা বলে ডাকতে লাগল। গাড়ীর মালিকের অজান্তেই ড্রাইভার কিছু কামিয়ে নেবেন আর কি! সেই অস্থির চিত্তের ভদ্রলোক যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেলেন। তিনিসহ সেই প্রাইভেট কারে গাদাগাদি করে ৫জন উঠে পড়লেন ঢাকায় ফিরে যাওয়ার আশায়। উল্লেখ্য রাস্তার একদিক অর্থাৎ জ্যামের পর থেকে বিপরীত দিকে রাস্তা স্বাভাবিকভাবেই ফাঁকা ছিল।

যাত্রা শুরুর আগে আমাদের ধারণা ছিল আমরা প্রায় ৩ টা নাগাদ কুমিল্লা পৌঁছে যাব এবং সেখানে যাত্রাবিরতিতে দুপুরের খাবার খাব। কিন্তু হায়! কোথায় কি! এখানেই এখন সময় প্রায় ৫টা বেজে গেল। জ্যাম ছোটার কোন লক্ষণই নেই। সেই উদ্ধারকারী ক্রেনইতো এখনও ঢাকা থেকে এসে পৌঁছেনি। সবাই খুব ক্ষুধার্ত। ব্রীজের উপর বলে কোন দোকান নেই এমনকি ব্রীজের কাছাকাছিও না। ভাগ্যিস শীতকাল বলে খাবার পানি নিয়ে অসুবিধা নেই। নইলে যে কী হতো! হঠাৎ কিছু কমলা বিক্রেতা উদিত হলো বড়ই সাইজের কমলা নিয়ে। বড়ই সাইজের কমলার হালি ৩০ টাকা। একদাম। লোকজন হামলে পড়ল কারণ কিছুতো অন্তত খাওয়া দরকার। একজন বললেন দামটা একটু কমিয়ে রাখা যায় না। জবাব একদাম! দেখেন না সবাই কিনতাছে! এইদামে যদি কমলা না কিনতে পারেন তাইলে ক্ষিরা খান গা দেখেন কোথায় ক্ষিরা বেঁচে। আহা, বেচারা।

আর কতক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। বাসে উঠে বসলাম। সন্ধ্যা গিয়ে রাত নামল। অন্ধকার হয়ে গিয়েছে চারিদিক। আমাদের বাসের ড্রাইভার সাহেবও বেশ একটা ঘুম দিয়ে নিলেন। একজন যাত্রী বললেন ভাই সময়টা ভালই কাজে লাগিয়েছেন দেখছি। ড্রাইভারের উত্তর – ভাই কাল রাতে চট্টগ্রাম থেকে সাড়ে বারটায় রওয়ানা দিয়ে আজ দুপুর সোয়া বারটায় সায়দাবাদ পৌঁছাইছি। আসতে না আসতেই আবার ১২:৪৫মিঃ এই ডিউটি। একটু টায়ার্ড হয়ে পড়ছিলাম। অবাক হতে হলো। বলে কী! টানা ডিউটি। তারপর আরো চমক ছিল। ড্রাইভার বললেন – জ্যাম ছোটার পর চট্টগ্রাম কখন গিয়ে পৌঁছাব তার ঠিক নাই কিন্তু কোম্পানী থেকে মোবাইলে জানাইছে – পৌঁছার সাথে সাথে আবার ঢাকায় একটা ট্রিপ দিতে হবে। মহাসড়কে জ্যামের কারণে গাড়ী সব আটকা। ওদিকে টিকেট বিক্রি করে বসে আছে। কাউন্টারে যাত্রীদের ভিড়। এবার অবাক না রীতিমত আঁতকে উঠতে হলো। একজন ড্রাইভার টানা ৩০-৩৫ ঘন্টা ডিউটি করলে তার গাড়ী চালানোয় মনোযোগ থাকে! দুর্ঘটনা ঘটার বিশাল ঝুঁকি। ড্রাইভার বললেন কি করব ভাই। বেতন পাই ট্রিপ ধরে। ট্রিপ নাই তো বেতন নাই। তাই বলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে …..!

যাক, অবশেষে সন্ধ্যা প্রায় সোয়া ছয়টার দিকে আমাদের বাস যাত্রা শুরু করল বেশ ধীর গতিতে। কারণ সামনে রাস্তা ক্লীয়ার নাই। প্রচন্ড জ্যাম। বিপরীত দিকে থেকে কিছু গাড়ী ওভারটেক করে রাস্তা আরো ব্লক করে দিয়েছে। ব্রীজ পার হয়ে, দাউদকান্দি, মুরাদনগর, গৌরীপুর …. ঢাকামুখী গাড়ীর সারি জ্যামের কারণে। তখন দেখেছিলাম বরসহ বরযাত্রী হেঁটে যেতে গৌরীপুর এসে দেখলাম বিয়ের কনেকে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জ্যামের কারণে। গৌরীপুর এসে বাস আবার জ্যামে আটকা পড়ল এতক্ষণ তাও বেশ ধীরে হলেও চলছিল। পুলিশি তৎপরতা চোখে পড়ল। বাঁশি বাজিয়ে টর্চ-এর আলো ফেলে, রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে বেশ একটা হুলস্থূল কান্ড। কারণ কি? মিনিট দশেক বসে থাকার পর দেখা গেল বিপরীত দিক থেকে একটি গাড়ীর বহর দ্রুতবেগে চলে গেল। একটি জীপে জাতীয় পতাকা ছিল। হয়ত কোন মন্ত্রী। বাহ্ বেশ। তাঁরা মন্ত্রী তাঁদের সময়ের মূল্য আছে না। সেই বহর চলে যাওয়ার পর আবার আমাদের বাস চলতে শুরু করল। বেশ সারাদিন অভুক্ত থাকার পর রাত প্রায় সাড়ে নয়টায় যাত্রাবিরতিতে খাবার খেলাম। সেই জ্যামের কারণেই হয়ত পরে রাস্তায় গাড়ী কম নেমেছিল বলে রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা ছিল আর ড্রাইভারও যাত্রীদের অনুরোধ উপেক্ষা করে বেশ জোরে গাড়ী চালিয়ে রাত সাড়ে বারটায় চট্টগ্রাম পৌঁছাল। ছয় ঘন্টার জার্নি ১২ ঘন্টায় শেষ হলো!