ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

(আমার প্রয়াত বন্ধু অনেক অভিমানে অনেক চিঠি লিখেছিল, যা পোষ্ট করা হয়নি তার, প্রয়াত বন্ধুটির ড্রয়ার থেকে বের করা কতগুলো কাগজ, অনেক যত্নে ভাজ করা, যা এখন অনেক বেদনার হয়ে গেছে আমাদের। তারই একটি চিঠি আজ দিলাম)

প্রিয় অরন্য,
রাগতো মানুষেরই থাকে, তাই হয়তো তুমি রাগ করেই ছেড়ে চলে গেছো। আমি মানুষের দলে পরি কিনা, তা জানিনা, তবে তোমার অপরাধকে আমি ক্ষমা করতে না পারলেও বুকের ভেতরে যে টান টান কষ্ট, তা থেকে বুঝতে পারি, তোমার সে বড় অপরাধ আমার মনের টানের কাছে তুচ্ছ। তারপরো আমি এখন বাকহীন, শুনেছি, বাকহীনদের নাকি কোন শত্রু নেই। এ বাকহীনতা যদি আবার তোমাকে আমার মিত্র করে তোলে, সে আশায় কাটছে, দিন, মাস ক্ষন।

ভাবছি সে কদমফুলটা হাতে নিয়ে যদি খোপায় গেথে দেই, অথবা, শিশির ভেজা একমুঠো শিউলি যদি তোমার মুখের ওপর ছিটিয়ে দেই, হয়তো আবারো ভরে উঠবে আমাদের জীবন।

অনেক ভাবনা এখন আমাকে তাড়িয়ে বেরায়। আমি নির্বাক, কারন সমূদ্র স্নানে যদি আমার নিথর শরীর জোয়ারে ভেসে উঠে তোমাদের মাঝখানে, তখন কি বিব্রতকর অবস্থা হবে, ভাবছি, তখন হয়তো চিৎকার করে উঠবে। চোখের কোনে অশ্রু দেখা দিলেও হয়তো বলতে পারবে না এটা সেই আমি। আহা কি মানব প্রেম, এমন এক অজানা দেহ, যাকিনা জোয়ারের টানে ভেসে এলো, তাতেই এত কষ্ট এ মানবীর !!!

অনেক এলোমেলো ভাবনা, তবে পরিচ্ছন্ন জীবনেও সব এলোমেলো।

এখন, যখন তখনই ইচ্ছে করে হাতে যা আছে ছুড়ে মারি। ক্ষত বিক্ষত করে দেই সামনের যা কিছু। মাঝে মাঝে চিৎকার করে কাদতে ইচ্ছা করে। আবার কখনো এক নজরে তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে। গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। ইদানিং দেখি চোখের সাথে সাথে নাক থেকেও যেন পানির ফোটা পড়ছে। উপরে আকাশে চাদ আর মেঘের খেলা দেখতে দেখতে কখন যে নাক আর চোখের পানি এক হয়ে মিশে গড়িয়ে পড়ছে।

ভাবতেই, চমকে উঠি, আমি চেয়েছিলাম একটা স্বপ্নের জীবন, ভালোবাসার জীবন। কখনো দৌড় দিবো, কখনো দু-জনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাবো।

স্বপ্ন পূরন আর স্বপ্ন ভাঙা দুটো আমাকে হয়তো আজ নিষ্পেষিত করছে। টেবিলে বসেছি, বললে ‘হাত ধুয়ে আস’। আমি হাসছিলাম, মনে হয়েছিল তুমি হয়তো কাজের ভীড়ে ভুলে গেছো। মনে হতেই তোমার ঠোটের কোনে হাসি ফুটে উঠে। মাছ থেকে কাটা বেছে যত্ন করে আমার মুখে ভাত তুলে দিলে। কখনো কখনো অনেক বেশি খেয়ে ফেলেছি। তারপরো বার বার জিজ্ঞাসা আর একটু, আর একটু।

ভালোবাসা আমাকে যেভাবে আরষ্ট করে তুলেছিল, ভুলেই গিয়েছিলাম, আমার জীবনে এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তবতা।
ভাবতেই অবাক লাগে, একটি ফোন কোম্পানী ঘোষনা দেয়, রাত ১০ টা থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত কথা বলা যাবে ফ্রী, আমরা ওই সময়টির প্রতিদিন ঠিক রাত ১০ টায় কথা বলা শুরু করতাম, সকাল ৬ টায় সময় শেষ হলেও আমাদের কথা ফুরায়নি। এতটুকু ক্লান্তি কাজ করেনি। কখনো কখনো প্রায় ৮ ঘন্টার সবটুকুই রাস্তায় হেটেছি, কিন্তু থামেনি গল্প। কি এমন কথা ? সব কথাই ছিল, সাধারন, অতি সাধারন। আসলে মনের ভেতর ছিল অতৃপ্ত বাসনা, ভালোবাসা। অনেক ভালোবাসার ঘাটতি ছিল। এত কথা বলেও তা শেষ হতো না।

এখনো গায়ে কাটা দেয়, কি যেন একটা কথায় একদিনতো সত্যি সত্যিই গায়ে তার পেচিয়ে প্লাগটা ইলেকট্রিক লাইনে সংযোগ দিয়েই ফেলেছিলাম প্রায়। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড হলেই হয়তো সব শেষ হয়ে যেতো। তুমি বাচিয়ে নিয়েছিলে।
দিনটি ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরের পরে বাতাসে নিজেকে বের করলাম। বার বার বলছিলাম, বাতাসে শরীরটা উড়তে চাইছে। ভুলেই গিয়েছিলাম আমাদের ওই চার দেয়ালের বাইরে আর কোন পৃথিবী আছে।

সাগর যাত্রায় অনেক মান অভিমান কাজ করলেও সেই ২৭ সেপ্টেম্বরের চেয়ে কম ছিলনা, সাগরের ঢেউয়ের মাঝে আমাদের
আনন্দ। প্রতিদিন সে স্মৃতি আমাকে ক্ষয় করে দিচ্ছে।

তুমিই একদিন বললে আমাকে দীপ বলে ডাকবে, তৎক্ষনাৎ আমি বললাম, তোমাকে অরন্য বলেই ডাকবো। দীপের মধ্যেই অরন্য।
এখন জীবন আমার এলোমেলো। কখন এবং কিভাবে কান্না বের হয়, ঠিক তা জানা নাই। মাঝে মাঝে অকারনে চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ে।

জীবন এখন নিয়ন্ত্রনহীন। অনেক ভালোবাসি, বাস্তবতা হয়তো এটা, তোমাকে আমি পাবো না, বা তুমি আমাকে দুরে, অনেক দুরে ঠেলে দিয়েছ।

তুমি ভুল, কারন তুমি বলেছিলে “তোমার এমন অন্যায়কে আমি ক্ষমা করেছি, কারন আমি নিজেই অন্যায় করেছি”। ভুল, আমি অন্যায় করিনি। আমাকে যে পাত্রে রাখা হয়েছে, সেখানে অনেক যন্ত্রনা, কোন কারন ছাড়াই আমাকে প্রতি সময় আঘাত করা হয়।
তোমার অন্যায়কে আমি ক্ষমা করিনি। কিন্তু আমার ভালোবাসার কাছে সে অন্যায় ঢাকা পড়তে চেয়েছিল। তোমার অন্যায়ের কারনে আমি তিরষ্কৃত করেছি অনেক, কিন্তু বারবার কষ্টই পেয়েছি। তারপরও এমন ঘটনায় আমার কাছে আমি প্রশ্ন করেছি। ছুড়ে ফেলে দিতে পারিনি। অনেক খারাপ কথা বলেছি, অনেক রাগ করেছি, গালি দিয়েছি।

এখন আমার জীবন কাটে, শুধুই কান্না আর কান্না। এ জীবন দিয়ে হয়তো অনেকের অনেক প্রয়োজন মিটছে, তাই হয়তো বেচে আছি। রাতের পরে রাত আমি জেগে থাকি, কখনো কখনো চোখের পানি সামলাতে পারলেও অনেক সময়ই বলতে হয়, চোখের অসুখ হয়েছে।

তোমার ওপর আমার অনেক অভিমান, ঘেন্না, কিন্তু ভালোবাসার পাল্লা এতটাই ভাড়ী, সব ঢাকা পড়ে গেছে, সামনে শুধুই তুমি, যদিও তুমি হয়তো আমার কাছে আর ফিরে আসবে না।

কে হারলো আর কে জিতলো এমনটা আর কাজ করে না। শুধুই অনুভব করি, তুমি আমার জীবনে নেই। তুমি কতটুকু প্রতারনা করেছ, তাও একেবারে ক্ষুদ্র হয়ে এসেছে, আমার ভালোবাসার পরিধি দেখে। বুকের ভেতরে যে কি যন্ত্রনা, তা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝে বলে মনে হয় না।

অনেক অভিমান, কিন্তু ভালোবাসার ওজন অনেক বেশি। জীবন, সংসার সবকিছু নিয়ন্ত্রন করলেও কষ্ট আর চোখের পানি আজ আমার অনিয়ন্ত্রিত।