ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

মাত্র অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিল সুজাতা। তারপর আর এগুতে পারেনি। তবে বাড়িতে বসেই নবম-দশম একাদশ শ্রেণীর জটিল সব গানিতিক হিসেব রপ্ত করে ফেলেছিল। সেই সাথে ভারতবর্ষের ইতিহাস, কোয়ান্টাম মেথড, পৃথিবীর বিবর্তন, স্রষ্টা-সৃষ্টি, মানবতা প্রায় সবই অনানুষ্ঠানিকভাবে রপ্ত করে ফেলেছিল। তার ভেতরে মানবকুলের আর ধর্মের ভেদাভেদ নিয়ে কঠিন কঠিন প্রশ্নের জন্ম দিলেও, নিজেই সে উত্তর খুঁজে বের করার চেষ্টা করতো। কপাল দোষে অস্পৃর্শ পরিবার আর জাতিতে জন্ম নিয়ে তার সৌন্দর্য্য আর গুনের কদর হয়নি কখনো। তারপরেও স্নেহময়ী বাবার ঘোষনা ছিল-“ধর্ম যাহাই হউক, কন্যাকে পাত্রস্থ করতে এক পাল্লায় কন্যা আর অন্য পাল্লায় কাগজের নোট আর স্টিলের মুদ্রা সমান করে দিবে জামাইকে !” আমাদের কুলীন সমাজে কথাটি মুখে মুখে রটে গেলেও জাত-কুলের ভয়ে এমন সুশীলা, গুনবতী কন্যাটিকে স্ত্রী হিসেবে কেউ গ্রহণ করেনি। পিতৃকূল অস্পৃশ্য জাতের। তাই সীমাহীন যন্ত্রনা নিয়েই সেদিন সুজাতা তার বাবাকে বলেছিল-“তোমার স্বপ্ন পূরণ হইবে, আমি তোমার কন্যা হইলেও তোমার জাতপাতের ভেদাভেদহীন মানসিকতা আমাকে তোমার স্বপ্নের জায়গায় নিয়ে যাবে।“

হ্যাঁ, সত্য হয়েছে সুজাতার সে কথা। সে জাত- পরিচয় কোথাও গোপন করেনি। তার শরীরের ওজনের সমান কোন মুদ্রা দিয়ে কাউকে ক্রয় করতে হয়নি। সুজাতার মানবতার দীক্ষায় সে একজন মানুষকে শেষ পর্যন্ত জীবন সঙ্গী করে নিতে পেরেছে। আজ ওরা দু-জনেই একই সুরে বলছে-আমি মানুষ বলেই সুজাতাকে পেয়েছি। আমার ধর্ম সুজাতাকে গ্রহণ করার অনুমতি দেয়নি। আমি এবং আমরা বিশ্বাস করেছি “কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদুর। মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর”। সহাস্যে সুজাতা বললেন-আর কোন স্বর্গের আশায় আমি জপ করবো বলুন। সে আমার বন্ধু, আমার অভিভাবক, আমার প্রেম, আমার ভালোবাসা, আমার সবকিছু। আমরা অনেক সুখী। সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টিকূলকে সুখী দেখতে চেয়েছিলেন। আমরা সেই সুখী দম্পত্তি। আমাদের ঘরে রাধা-কৃষ্ণের কো্ন মুর্তি নেই, আমাদের ঘরে কোরআন, বাইবেল কোনটাই নেই। আমাদের পড়ার ঘরে রয়েছে-লালন, রবি ঠাকুর, নজরুল, সমরেশ মজুমদার, সক্রেটিস, ম্যাক্সিম গোর্কি, লেলিন, মার্কস, এঞ্জেল। আমরা দু-জনেই ধর্মবিদ্বেষী নই, কিন্তু আমরা কোন কুলীনতায় বিশ্বাস করিনা। সুজাতা বেশ গর্ব সহকারে বললেন-আমার জন্ম অস্পৃশ্য একটি জাতির ঘরে। আমাদের কোন অধিকার ছিল না-মানুষদের মধ্যে বসবাস করবার। আজ, আমি আর আমার দেবতার মত মানুষটি মিলে সেই সমাজ, সেই ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছি-যেখানে মানুষের মূল্যবোধ রয়েছে, ইচ্ছার স্বাধিনতা রয়েছে। সুজাতা বেশ গর্ব করে বলতে লাগলেন, অনেকেই ভাবতে চরিত্র আবার কি? আমার কাছে মনে হয়েছে যারা বিকৃত রুচি সম্পন্ন, মিথ্যাবাদী তারাই একাধিক জনের সাথে শারীরিক বা মানসিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়। জীবনে এমন কোন ঘটনার সামনাসামনি হলে, তা যদি কোনভাবেই এভয়েড করা না যায়, তবে সেখানে ব্যক্তিত্ব আর রুচির পরিচয় দিতে হবে। আমি আমার স্বামীকে নিয়ে গর্বিত। আমরা দু-জনে সত্য কথা বলি। আমার কোন পুরুষকে ভালো লাগতেই পারে, অন্যদিকে আমার স্বামীরও ইচ্ছে জাগতে পারে-অন্য কোন নারীর সংস্পর্শে আসতে। সে আমাকে কখনো বাধা দেয়নি বা আমিও তাকে কখনো বাধা দেয়নি। কারণ-আমার ভালোবাসার, শারীরিক বা মানসিক কোন ঘাটতির জন্যই হয়তো এমন ইচ্ছের জন্ম নিতে পারে। সেক্ষেত্রে দু-জনে আলোচনা করেই এর সমাধান সম্ভব। তাহলে আমাকে আর মিথ্যেবাদী হতে হলো না, বা আমার স্বামীকে অন্য কোন পুরুষের লালা, বর্হ্য কোন কিছুর সাথে পরিচয় হতে হলো না, অন্যদিকে আমার স্বামীও একই ভাবে আমার জন্য করছেন।

মানব সৃষ্টির শুরুতে কোন ধর্মের কথা বলা আছে কি না-তা আমার জানা নেই। তবে গোত্র, দলাদলী ইত্যাদির কারনে যুগে যুগে ধর্মের আবির্ভাব হয়েছে। হয়রত মোহাম্মদ (সা:) তখনকার অবস্থার প্রেক্ষিতে মানব জীবনের চলবার দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। সে নির্দেশনা আজো মুসলিম সমাজ মেনে চলছে। রাধা কৃষ্ণের প্রেম লীলা বেশ পুলকিত করে-অন্যদিকে রাস পূর্নিমায় চন্দ্র আর পৃথিবীর মধ্যকার সমন্বয়ে গঠিত মানব শরীরের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির গল্পে হয়তো কৃষ্ণের ১৬শ গোপীনির সাথে প্রেম লিলার গল্পের অবতারনা হয়েছে। এসব মহামনিষিদের কোন কার্যক্রমই অবহেলার নয়। ভালোলাগা-ভালোবাসা-জীবন সংসার, সবাই তাদের বর্ণনার মধ্যেই নিহীত রয়েছে। সব কিছু বিশ্লেষনে আমরা মানবজাতি ইচ্ছে করলেই সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারি, যেখানে মনিষিদের মহামূলবান মতাদর্শ রয়েছে।

সব মিলে আমি অস্পৃশ্য একটি জাতিতে জন্ম গ্রহণ করলেও, আজ আমি মানুষ বলে দাবি করতে পারছি। সবার উপর মনুষ্য ধর্ম তাহার উপর নাই। আমি সুখী-সৃষ্টি যেই করুন, আমি কৃতজ্ঞ যে, আমরা মানুষ হয়ে বাঁচতে পারছি। তবে কষ্ট একটাই যে, আমরা অন্যান্য সকল মানব সমাজের মধ্যে বসবাস করার কোন যোগ্যতা হয়তো রাখিনি। তারপরেও বলবো-আমরা যাদের কাছে অযোগ্য, তাদের চেয়ে অনেক বেশি ভালো আছি আমরা।