ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

editor_53531
সৃষ্টিকর্তার নির্দেশ অমান্য করে বাবা আদম পৃথিবী নামক এই নরকে পতিত হন। হাজার বছরের তপস্যায় তাঁকে আর স্বর্গে ফিরিয়ে নেননি সৃষ্টিকর্তা। তবে হাজার বছরের তপস্যায় মা হাওয়াকে তিনি ফিরে পেয়েছিলেন।
সামান্য একটা নির্দেশ অমান্যে সৃষ্টিকর্তার এমন নিষ্ঠুর আচরন কতটুকু মানবিক হতে শেখায় তা আমার বোধগম্য নহে। তবে মানুষকে ক্ষমা করা যদি মানবিকতা হয়, তবে, আমার মানতে কষ্ট হচ্ছে যে সৃষ্টিকর্তা মহান।
হ্যা, যদি আইনের শাসনের কথা বলি, তবে আইনের শাসন তিনি প্রতিষ্ঠা করার নজির স্থাপন করেছেন, এটা মানতে হবে।
তিনি সৃষ্টিকর্তা, যার রহস্যভেদ এখনো ধর্ম এবং বিজ্ঞানের কাছে দু-ধরনের। ঘটনা আর যাই হউক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি বাবা আদম বা মা হাওয়াকে মৃত্যুদন্ড দেননি। এর রহস্য এটাও হতে পারে যে, তিনি পৃথিবী নামক এই সুন্দর নরককে লীলাভূমি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা তিনি সফলও হয়েছেন। সৃষ্টির রহস্য অনুযায়ি শয়তানের মত ধর্মপ্রান ফিরিশতাকে অভিশম্পিত হতে হয়েছে অথবা সৃষ্টির রহস্যে কোন রাবন বা কংস নামক দেব-দেবীর ভূমিকাও অনেক।
অভিশম্পিত এসব ফিরিশতা বা দেবদেবীকূলের ভয়ে অথবা তাদের কাছ থেকে বাঁচতে মানুষকে ৭০ জন নারী উপহারে প্রলুদ্ধ করা হয়েছে। সৃষ্টির রহস্যেই দ্রৌপদী বা উর্বশীদের বর্ণনা অভিশম্পিত ফিরিশতা বা দেব দেবীর কাছ থেকে কতটুকু দুরে সরাতে পেরেছে তা প্রশ্নবোধক হলেও, সুরা আর সাকিকে একই সূত্রে সৃষ্টিকর্তা বেঁধেছেন তা বেশ স্পষ্ট। তবে এই ধরনিতে ১৬শ গোপীনির সাথে কৃষ্ণ লীলা, পীর-দরবেশ এবং ধর্ম প্রচারকদের জন্য নারীর সমারোহ বা যুদ্ধ বিগ্রহে নারীকে ভোগ্য পন্যে পরিনত করলেও সেই ধরনীতেই ভিন্ন ভিন্ন আইন প্রনয়ন করে বাধার সৃষ্টি করা হয়েছে-এ যেন সকল মানুষের অপরাধ প্রবনতাকে বাড়িয়ে তোলার একটি ষড়যন্ত্র।
যাহোক ধর্মতত্ব আর মানা না মানা নিয়ে অনেক হয়ে গেছে-যাতে জীবনের কিছু সময় পালিয়ে, লুকিয়ে বেড়াতে হয়েছে হয়তো। নিজগৃহ কবে যে নরকের অংশ হয়ে গিয়েছে, বুঝে উঠিনি। তারপর তারপর অনেক বেলা গড়িয়ে গেছে। সাঁজ বেলায় এসে বুঝলাম, আমিও সৃষ্টিকর্তার রোষানলে পতিত। পৃথীবি নামক কারাগারে আমার জন্য অনাচার, অবিচার সবই হয়েছে। বারবার বিচার প্রার্থী হয়েও বিচারকও কিনা অবিচারের রজ্জুতে বাঁধা রয়েছেন, এটা পরিষ্কার হয়েছে। প্রগতিশীল, ধার্মিক, আস্তিক বা নাস্তিক সবই দেখা হলো, শোনা হলো বুঝাও হলো। চোখের সামনেই কোন কোন ধার্মিক কখনো নাস্তিক আবার কখনো কখনো জ্বি-হুজুর ইত্যাদি আবার তারাই শুকর মাংসকে হারাম হালাল বলে মনুষ্য রক্ত মাংস ভক্ষন করছেন। বুঝতে অনেক দেরি হলেও, সৃষ্টিকর্তার অনুকম্পা জোটেনি আমার জন্য।
বাবা আদমকে সৃষ্টিকর্তা মৃত্যুদণ্ড দেননি, হয়তো আমাকেও দিবেন না, তবে মরুভূমিতে নিশ্চল করে ফেলে রেখে, শকুনদের দ্বারা ঠোকরে ঠোকরে চক্ষু ভক্ষনের মত শাস্তি বরাদ্দ করেছেন।
সৃষ্টির বিরুদ্ধে আলোচনা, সমালোচনা করা গেলেও হাজার বছরের মধ্যে কেউ সাহস করেননি যুদ্ধ ঘোষনার।
জীবনটাকে ছোট করে এনেছি। শহরের ঝলমলে আলো থেকে অনেক দুরে, আলো-আঁধারির নিষ্ঠুর ঝলকানি, যা নাকি বাবুদের আলোড়িত করে, সেখানেই আসন গড়েছি। সৃষ্টির আইনের নিষ্ঠুরতার মাঝেই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রান প্রচেষ্টায়-আমার এমন পলায়ন। কেউ কেউ ধরেই নিয়েছেন-পরাজয় বরণ করেছি, জবাবে বলবো “হয়তো তাই”, কেউ কেউ বলছেন-ভীরু-কাপুরুষ, জবাবে বলবো “হয়তো তাই”।
তবে হ্যা-এটা খুব সত্য, একেবারেই অনুভূতিহীন, নিশ্চল, নিশ্চুপ, সকল চাহিদা বিবর্জিত হয়েই এখানে আমার বসবাস। দিনের আলোকে ভয় পাই, রাতের আলোতে মনে হয়-আমি স্বাধীন, মনে হয়-আমার আমার আশপাশে বিধাতা আমাকে পর্যবেক্ষন করছেন না। তখন নিজেকেই বিধাতা মনে হলেও, পরক্ষনেই মনে হয়, আমিতো এখনো এই পৃথিবী নামক নরকেই আছি। যা দেখছি সবই মায়া-ছায়া-কৃত্রিমতা।
পিতৃ-মাতৃকূলের আদর ভালোবাসায় আমার ভাগ্যে হয়তো-কুখ্যাত সেই আবু গারিব জেলখানার পৈশাচিক অত্যাচার ঘটেনি, কিন্তু যা ঘটেছে, ঘটছে তা সেই পৈশাচিক অত্যাচারের চেয়ে কম কিসে ?
সাংবাদিকতা জীবনের একটা ঘটনা আজো নাড়া দেয়। “চৈত্রের কাঠ ফাটা দুপুরে খবর সংগ্রহ করে বাইক নিয়ে ফিরছিলাম। এত রৌদ্র, রাস্তার ধারে মাঝে মাঝে কোন কোন মানুষ একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন। হঠাতই বাইক ঘুরিয়ে একটি গাছতলায় এসে দাড়ালাম। সেখানে গমের শিষ হাতে দু-জন নারী। তাপদাহ, এলাকার অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনার এক পর্যায়ে হালি বেগম বলে উঠলেন “ বাবা কাল রাত থেকে ছেলে মেয়ে নিয়ে না খেয়ে আছি, এমন না খেয়ে থাকার লজ্জার কথা কি বলা যায় !!!!” আমি স্তম্ভিত। সাংবাদিকতা জীবনে কখনো শুনলাম না, কেউ কখনো না খেয়ে থাকা, ক্ষুধাকে লজ্জা বলে আখ্যা দিয়েছেন। বিশেষ পর্যালোচনায় জানলাম, শস্যভান্ডার বলে পরিচিত বৃহত্তর দিনাজপুর এলাকার কোন মানুষ না খেয়ে থাকে এটা অনেক লজ্জার। সেই ধারাবাহিকতায় বা জেনেটিক্যাল প্রক্রিয়ায় হালি বেগম না খেয়ে থাকাকে লজ্জা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। রাতেই কথা হয়, প্রথম আলোর সেলিম ভাইয়ের সাথে। তিনি অভাবের সংবাদের জন্য ফোন করেছিলেন। আমি হালি বেগমের পরিবারের অভাবের মধ্য দিয়ে এলাকাকে তুলে ধরবার চেষ্টা করতেই প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে সেলিম ভাই বললেন, সংবাদটি রাতেই তৈরী করে পাঠাতে। “না খেয়ে থাকার লজ্জার কথা কি বলা যায়” শিরোনাম নিয়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতা অলংকৃত করে সংবাদটি শনিবারে প্রকাশ পেলো। সেদিন ছিল মঙ্গলবার। সংবাদের ধারাবাহিকতায় অফিসের মাধ্যমে দরদি মানুষদের দান করা হালি বেগম আর অপরজনের জন্য ১২ হাজার টাকা নিয়ে হাজির হলাম, সেই হালি বেগমের বাড়িতে। চারদিকে চুপচাপ নিরবতা। ১৪ বছরের সন্তানটি বেশ জোড়েই কেঁদে উঠে প্রলাপ করতে লাগলো- “যেদিন তার মায়ের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশ হয়, সেদিন শনিবারও সন্তানদের জন্য হালি বেগম পতিত জমি থেকে গমের শিষ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন। মা কখন গমের শিষ আনবে, তারপর সেই শিষ থেকে গম বের করে তা সেদ্ধ করে পরিবারের সবাই ক্ষুধা নিবারন করবে-এমন প্রতিক্ষা করছিল সন্তানেরা। প্রচন্ড তাপদাহে ওই গমক্ষেতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পরেন হালি বেগম।“
কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে আমি মাটিতে বসে পড়লাম। চোখ থেকে পানি ঝড়ছে-অফিসে ফোন করে ঘটনা বলতেই অপরপ্রান্তে একেবারে নিরবতা-আর আমি পাগলের মত হ্যালো হ্যালো বলেই চলছি। সেলিম ভাই ভেজা কণ্ঠে বললেন-তার জন্য বরাদ্দকৃত টাকাটা তার ছেলের হাতেই দিয়ে দাও। বাসায় এসে বিছানায় শুয়ে পড়েছিলাম। অফিস থেকে বারবার ফোন করছেন-সংবাদটি পাঠানোর জন্য। সেদিন আর লিখতে পারিনি। সেলিম ভাইকে ফোন করে বললাম, “ ভাই হালি বেগম হাত পাতার লজ্জা থেকে রেহাই পেয়েছেন। আমি এই একটি বাক্য ছাড়া সংবাদের আর কিছুই লিখতে পারবো আজ বলে সেলিম ভাইকে জানালাম তিনি বললেন, আচ্ছা আমিই সাজিয়ে তোমার নামে সংবাদটি দিয়ে দিচ্ছি”। পরদিন আবারো প্রথম পাতায় সংবাদ এলো “হাত পাতার লজ্জা থেকে রেহাই পেলেন হালি বেগম”।
সংবাদের এমন একটি উদাহরন দেবার কারণ হচ্ছে-সৃষ্টিকর্তার সৃষ্ট সেই মানবীর জন্য আমি খাদ্য বহন করে নিয়ে গেলাম, কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সেই মানবীকে অভুক্ত মৃত্যু উপহার দিলেন। সৃষ্টিকর্তার এমন কর্মকে আমি আজো সৃষ্টিকর্তার মহানুভবতা বলে মানতে পারিনি। সৃষ্টিকর্তার নৈতিক বৈষম্য আজ আমাকে সমাজ, সংস্কার, লোকালয়, জীবন, জৈবিক, মানসিক, ভালোলাগা, মন্দলাগা থেকে আলাদা করে দিয়েছে। আমি স্বাধীন নই-তবে একা।
কয়েকদিন থেকেই ভাবছিলাম, আমিতো বন্দীত্ব লাভ করেছি। তাই সিদ্ধান্ত অনুযায়ি, লোকালয়ের একটু দুরে ছোট এই খামার বাড়িটির জানালা-দরজা এমনকি বারান্দা সহ বাঁশ আর জাল দিয়ে শক্ত করে ঘিরে ফেললাম। পাশের ঘরে সারারাত চেচামেচিতে ব্যাস্ত হাঁস, তার পাশের ঘরেই মুরগির কোলাহল। শোবার ঘরটি বাদ দিয়ে সারা বারান্দা হাঁস আর মুরগীর বিষ্ঠা যত্রতত্র। সামনেই জাল দিয়ে ঘেরা পুকুরে মাছের লম্ফঝম্ফ। পরিবারের কাছে লাভজনক, দেশের জন্য বেকারত্ব দূরীকরন বলে মনে হলেও, আমার দেবশিশুটি আমার মলিন মুখ দেখে বলে উঠলো “আব্বু, তুমি এখন যা করছো, তা তোমার সাথে মানাচ্ছে না, তুমি চেষ্টা করো, আবার শুরু করো, তুমিতো ইমদাদুল হক মিলন নও যে, কারো দয়া নিয়ে বেঁচে আছো, কাউকে জ্বি হুজুর বলছো। তুমি মানুষকে বঞ্চিত করোনা প্লিজ”।
আমার সেই দেবশিশুটি এখন কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। সে জানে পারিবারিক স্বার্থপরতায় তার পড়াশোনার অর্থ আমি কিভাবে জোগাড় করছি। তারপরেও তার প্রত্যাশা-“তুমি মানুষকে বঞ্চিত করোনা”।
আমার এই আবাসস্থলে কোন মানুষ বাস করতে পারে, এটা আমি বিশ্বাস করিনা। তারপরেও আমি আছি, থাকবো হয়তো। আমার ভালোবাসা-উদারতা সৃষ্টিকর্তার পছন্দ হয়নি, আমি খাদ্য নিয়ে গিয়েছি-তিনি মৃত্যু দিয়েছেন, আমি মানুষকে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নে বিভোর-তিনি মানুষকে সর্বশান্ত করছেন। ধর্ম আর বিজ্ঞানের দ্বন্দে আমিও সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে সন্দিহান। তবে সকল গুনাবলী যদি সৃষ্টিকর্তার মধ্যে নিহীত থাকতো তবে হয়তো-আজ আমি, আমার নিজ হাতে গড়ে তোলা, পৃথিবীর ইতিহাসের আর একটি আবু গারিব জেলখানায় স্বেচ্ছায় কারাবরণ করতাম না।