ক্যাটেগরিঃ মানবাধিকার

 

মানুষের স্বজাত প্রবৃত্তি হলো, স্রোতের বিপরিতে চলা। তারপরেও এলোমেলো ভাবে ঘটিত অপরাধের সমাধান আছে বৈকি। কোন ধর্মই তোমাকে মানুষ হত্যা, নির্যাতন ও অপমান করতে বলে নাই। মানুষের অধিকার ও জীবনধারা সুন্দর করতেই ধর্ম মানতে হয়। তাহলে? জৈবিক তাড়নার ফলে মানুষ অনেক রকম অপরাধ করে ফেলে। অথবা কেউ কেউ বৈষম্যের শিকার হয়ে কিছু অপরাধ করে ফেলে। কিন্তু তার অর্থ কি এই যে, আমরা সেই অপরাধী মানুষটির অপরাধ না শুধরে দিয়ে তাকে হত্যা করবো? অথবা তার অপরাধের জন্য বংশানুক্রমে শাস্তি দেবার ব্যবস্থা করবো?

22051_1108579734130_3353806_n

একটা উদাহরণ দেই: একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক হলো। তাদের সে সম্পর্কের কারণে সংশ্লিষ্ট নারী গর্ভ ধারণ করলো। তারপরে সেই নারী একটি সন্তান প্রসব করলো। এ প্রসংগে, বাংলাদেশের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা হলো এই যে: যেহেতু ওই নারী এবং পুরুষটি গোপনে তাদের শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে, সেহেতু জন্ম হওয়া শিশুটি ইসলাম ধর্ম মতে একটি অবৈধ সন্তান। মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে সেই শিশুটিকে জারজ বলে আখ্যায়িত করে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার না থাকার ফলে, নারীরা পুরুষদের প্রতি প্রতিবাদ করতে পারেনা। অন্যদিকে ধর্মীয় কুসংস্কার দ্বারা অধিকাংশ মানুষই পরিচালিত। এক্ষেত্রে, যদি এলাকার লোকজন জেনে ফেলে যে, ওই নারী বিবাহ সম্পর্কের বাহিরে শারীরিক সম্পর্ক করে গর্ভ ধারন করেছে, তাহলে, শুধু ওই নারীই নয়, বরং ওই নারীর পরিবারকে একঘরে করে রাখা হয়। যদি নারীটির গর্ভপাত করানো সম্ভব না হয় তবে, সেই নারী একটি সন্তান জন্ম দেয়। কিন্তু অতীব দু:খের বিষয় হলো, লোক লজ্জার ভয়ে এবং সামাজিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই নারী সন্তান প্রসবের সময় কোন ডাক্তারের শরনাপন্ন হতে পারেনা! এমনকি সন্তান প্রসব করার আনন্দের পরিবর্তে ওই পরিবারে শোক নেমে আসে। প্রসবের সময় অথবা প্রসব পরবর্তী সময়ে ওই নারী অমানবিক জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। আমি নিজের চোখে দেখেছি যে, লোক লজ্জার ভয়ে এক নারীকে তার পরিবার একটি গোয়াল ঘরে সন্তান প্রসব করাচ্ছে!

জন্ম নেওয়া শিশুটিকে লোকজন জারজ বলে আখ্যায়িত করে! গ্রামের বা সমাজের কোন মানুষই জন্ম নেওয়া শিশুটিকে কোন সহানুভুতি দেখায় না। বরং গ্রামের ও সমাজের লোকজন মনে করে যে, ওই শিশুটিকে দেখার পরে ঘর থেকে কোন কাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া যাবে না। ওই শিশুটির মুখ দেখাকে তারা পাপ বলে মনে করে। সমাজের ভয়ে ওই নারীটি জন্ম দেওয়া সন্তানকে কোন এতিমখানায় দিয়ে দেয়। অথবা নিজে ও সন্তানটিকে লালন করতে চাইলে, তাকে সমাজ ছেড়ে অন্য কোন স্থানে বসবাস করতে হয়। অসহায় ওই নারীকে কেউ কোন কাজ দেয় না। এতে করে ওই নারী পতিতা বৃত্তি অথবা এরকম কোন কাজ বেছে নিতে বাধ্য হয়।

আপনি জেনে আশ্চর্য্য হবে যে, আমি একটি জেলায় এরকম একটি জরিপ চালিয়েছিলাম। ওই জেলার লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ। এর মধ্যে আমি দুই শত পঞ্চান্ন জন এরকম সন্তানের খোজ পেয়েছিলাম। তাদের সবার জীবনের ঘটনা প্রায় একই ধরনের। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ি, কোন মানুষকে সরকারি অথবা বেসরকারি কোন সহায়তা পেতে হলে পূর্ণ পরিচয় প্রকাশ করতে হয়। অর্থাৎ নাম, পিতার নাম, গ্রাম, শহরের নাম লিখতে হয়। এসব তথ্যের কোন একটি যদি না থাকে তবে, সে কোন সহায়তা পাবে না ! শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট শিশুটি কোন স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না, ভোটাধিকার পাবে না। শুধু মাত্র পিতার নাম না থাকার কারনে ওই শিশুটি সকল মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে!

তাহলে কি সমাজে বিচার নাই? হ্যাঁ, বিচার আছে। সেক্ষেত্রে প্রমানের দরকার আছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা এখনো পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে ধর্ষনের অভিযোগের বিচারের সুবিধা আছে। সম্প্রতি উচ্চ আদালত ঘোষনা দিয়েছে যে, ধর্ষনের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুটি ধর্ষকের সম্পদের ভাগ পাবে। অনেকেই মনে করছেন যে, উচ্চ আদালত এটা একটা ভালো কাজ করলো। আমিও তাই মনে করি। তবে, আমার পর্যবেক্ষনে, আমি মনে করি যে, বিচার বিভাগ এখনো এ সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। কারণ, ধর্ষনের শিকার হবার পরে যদি কোন নারী আদালতে বিচার চায় তবে, ওই নারীকেই প্রমাণ করতে হবে যে, সে ধর্ষিত হয়েছে। তার নিজ খরচে ডিএনএ টেস্ট করিয়ে সন্তানটির পরিচয় সনাক্ত করতে হবে। আর এ বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ততদিনে ওই নারী অসহায় জীবন যাপন করে অথবা সমাজের মাতবর লোকদের প্রস্তাব অনুযায়ি তা আপোষ করে ফেলে। সে কারনে, জন্ম নেওয়া শিশুটির পিতার পরিচয় থাকে না।

অন্যদিকে দু’জনের সম্মতিতে শারীরিক মিলনের ফলে এরকম গর্ভ ধারনের ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্ষনের চেয়ে উভয়ের সম্মতিতে শারীরিক মিলনের ঘটনা বেশি। বাংলাদেশে পুরুষ শাসিত সমাজ বিদ্যমান। এ কারনে সর্ব ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে। নারীটি গর্ভ ধারনের পরে তার সঙ্গী পুরুষটি তা অস্বীকার করে এবং ওই নারীকে কলংকিত করে। এরকম ঘটনার কারণে, গ্রামের লোকজন শালিস বৈঠক বসে। তখন যে কোন কৌশলেই বিষয়টি আপোষ করে দেয়। আপোষের পরে ওই নারীকে হয় গর্ভপাত ঘটাতে হয়, অথবা সন্তান জন্ম দিলেও ওই সন্তানের পিতা বলে সংশ্লিষ্ট পুরুষটিকে দাবি করা যাবে না !

সামাজিক অনাচার এবং কুসংস্কারের কারনেই এমন অমানবিক ঘটনা ঘটছে। অন্যদিকে ইসলাম ধর্মে এরকম ঘটনাকে চরম অপরাধ বলে বিবেচিত। সে কারনে সমাজের লোকজন ধর্মের দোহাই দিয়ে ওই নারীকে ও পরিবারটিকে একঘরে করে ফেলে। অথবা ভ্রুন হত্যা করতে বাধ্য করে। দশের দোহাই দিয়ে এভাবে ভ্রণ হত্যা করা সঠিক কাজ কিনা তা বোধগম্য নয়। তবে, আমার মতে ভ্রুন হত্যা একটা অমানবিক কাজ। আমার অনুসন্ধান অনুযায়ি আমি মনে করি যে, ভ্রুন হত্যা করে ধর্ম রক্ষা করতে গিয়ে আরো চরম অন্যায় কাজ করছে সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্ট নারীকে একঘরে করে দিয়ে কোন ধর্ম পালন বা রক্ষা করা হচ্ছে, তা আমার বোধগম্য নয়। আমি বিশ্বাস করি যে, মানুষ হত্যা করা বা ভ্রুন হত্যা করা কোন ধর্মই সমর্থন করে না। মুসলমানরা হয়তো এ বিষয় নিয়ে বেশিই বাড়াবাড়ি করে।

সরকার নিয়ম চালু করেছে যে, যদি কোন সন্তানের পিতার পরিচয় না থাকে, তবে ওই সন্তানটি এতিমখানার প্রধানের পরিচয় দিবে। অর্থাৎ, ওই সন্তানটি তার পিতার নামের স্থানে এতিমখানার প্রধানের নাম লিখতে হবে ! অথচ সরকার একটি মৌলিক আইন প্রতিষ্ঠা করছে না যে, জন্ম নেওয়া কোন শিশু পিতা অথবা মাতা যে কারো একজনের নাম লিখতে পারবে এবং পরিচয় বহন করতে হবে। এখানে পিতার নাম আবশ্যক এমন কথা তুলে দিতে হবে। যদি কো পুরুষ কোন নারীর সাথে এমন প্রতারনা করে তবে আইনগত বিচার করতে হবে। তাহলে খুব সহজেই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

“এরকম ঘটনার শিকার এক মেয়ে (নাম, ঠিকানা প্রকাশ করা হলো না) এলাকার স্কুলের শিক্ষকদের সহায়তায় অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিল। তারপর যখন নবম শ্রণীতে রেজিষ্ট্রেশন করতে যায়, তখন বোর্ড থেকে প্রদান করা একটি নির্দিষ্ট ফরম পূরন করতে হয়। ওই ফরমে তার নামের পরে পিতার নাম সে লিখতে পারেনি। ওই ছাত্রী অনেক চেষ্টা করেও রেজিষ্ট্রেশন করতে পারেনি। তার পড়াশোনা সেখানেই শেষ হয়ে যায়। শিক্ষকরা তাকে পরামর্শ দিয়েছিল যে, তাকে যে লোকটি জন্ম দিয়েছিল, সে যেন তার নাম লিখে। কিন্তু ওই শিক্ষার্থী জবাব দেয় যে, ” না ওই লোকটির নাম আমি লিখবো না, কারণ, সে আমার মায়ের ধর্ষক”. বাংলাদেশে এই সমস্যাটির আইগত কোন সমাধান এখনো হয়নি। মুসলিম পারিবারিক আইন দিয়ে এ সমস্যার কোন সমাধান আছে বলে মনে হয় না।

এক্ষেত্রে, আমি একটি স্থানে পরিদর্শনে যাই। সেখানে গিয়ে দেখলাম, শত শত নবজাতক শিশুকে লালন পালন করা হচ্ছে। সেখানে কর্তব্যরত একজন জানালেন যে, যে সকল নারীরা এরকম সমস্যায় পরে গর্ভ ধারন করেছে এবং সামাজিকতার ভয়ে তারা ভ্রুন হত্যা করতে চায়,সে সকল নারীদের জন্য আমরা সন্তান জন্ম দেওয়ার সুন্দর পরিবেশ তৈরী করেছি। মানুষ হত্যা বা ভ্রুন হত্যা মহাপাপ। তাই, শিশু জন্ম নেবার পরেই আমরা সেই শিশুটিকে নিয়ে নেই। তাকে লালন পালন করে মানুষ করি। অনেকেই নবজাতক সন্তানটিকে হত্যা করতে চায়। আমরা তা করতে দেই না। সে সকল নারীর জন্য আমরা সহায়ক ভূমিকা পালন করি। ওই নারীর যেন সামাজিক কোন ক্ষতি না হয়, সে কারনে আমরা তার পরিচয় গোপন করে রাখি। তবে, যেহেতু ওই নারী বা পুরুষ সমাজের লজ্জায় ভ্রুন হত্যা বা নবজাতক হত্যা করতে চেয়েছিল, তাই কখনই আমরা ওই সন্তানটিকে তাদের কাছে ফেরত দেই না। আমাদের কাছে, মানুষের জীবনের মূল্য অনেক। কে কোন ধর্মের আমরা তা জিজ্ঞাসাও করিনা।

এখন আপনারাই বলুন যে, ভ্রুন বা নবজাতক হত্যা করে আপনি কোন ধর্ম রক্ষা করতে চান? আসুন, আমরা আগে মানুষ হই, মানবতা রক্ষা করি। তারপর না হয় ধার্মিক হবো।