ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

love8

বাস্তব জীবনের রোমাঞ্চর কিছু কথা। বিষয়টা একটু লজ্জার বটে। তারপরেও, দেখা হয়েছিল একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কর্মশালায়। আমি তখন নিরামিষ ভোজী ছিলাম। অবশ্য নিরামিষ ভোজীর ইতিহাসটা অনেক কষ্টের। আজ সে প্রসঙ্গটা বাদই দেই।

কর্মশালা শেষে খাবারের আয়োজন চলছে। সবাই আমিষ ভোজী, শুধু আমি ছাড়া। আয়োজকরা আমাকে নিয়ে একটু বিব্রত। তারপরেও মুগডাল দিয়ে দুপুরের খাবারটা সেরে ফেললাম। এরই ফাকে আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ এক শ্যামা সুন্দরির দিকে। বারবারই তার চাহনি কথা বলায় আমি চমৎকৃত হয়ে উঠছিলাম। ঘটনাটি সেখানেই শেষ হতে পারতো। তারপর অনেক অনেক মাস তার সেই শ্যাম চোখ, চাহনি আমার শরীরে শিহরিত করতো।

একটি প্রখ্যাত পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে প্রায় সব স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে ব্যাপক পরিচিত ছিল। একটি প্রতিষ্ঠানের একটি প্রজেক্টের প্রধানের সংগে অনেক সখ্যতা ছিল। এটা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, সে এনজিওতে কাজ করলেও চিন্তা ধারনা ছিল মানুষের উপকারের দিকেই।

এর মধ্যে তার কয়েকটি কর্মশালা সম্পন্ন হলো। আমাকে উপস্থিত হতেই হলো। একদিন বায়না ধরলাম, কর্মশালায় যাবো, তবে, “আমার সোনার হরিণ যদি সেখানে উপস্থিত থাকে”।

আমার সে বন্ধু সহ অপর একটি প্রজেক্টের প্রধান একটি অবাক হলেও বললেন যে, আপনার সে সোনার হরিণ তো এই অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না। আমিও জেদ করে কর্মশালায় গেলাম না।

এর প্রায় মাসখানেক পরে আমার বন্ধুটি একটি ফোন নম্বর দিলেন। ফোন নম্বরটি নিয়ে অনেক ভাবলাম। অত:পর ফোন দিলাম বটে, তবে ফোনের ওপাশ থেকে কেউ একজন ফোন ধরুক, এটা একেবারেই প্রত্যাশা করিনি। অবশেষে সেটা মিসড কল হিসেবেই ওই নম্বরে গেলো।

তারপর প্রায় সন্ধা। এমন সময় সেই নম্বর থেকে ফোন এলো “আপনার ফোন থেকে আমার নম্বর থেকে ফোন এসেছিল”। আমি নিরুত্তর। ভাবলাম কি বলবো, কি জবাব দিবো। অবশেষে বললাম যে, আমি আপনাকে চিনি এবং জানি। এভাবে প্রায় ৫ মিনিট কথা হলেও পরিচয় পর্ব নিশ্চিত হলো না। অবশেষে রাত ৯ টার দিকে ফোন দিলাম। সে সময় তিনশ টাকা দামের ফোনের রিচার্জ কার্ড পাওয়া যেতো।

অনেক কথাই লিখতে পারছি না, বলতে পারছি না। আমরা সারারাত ধরে জীবনের কথা বললাম, আশার কথা বললাম, নিরাশার কথা বললাম, পাওয়ার কথা বললাম, না পাবার কথা বললাম। মিনিট পেরিয়ে ঘন্টা পার হয়ে যায়, আমাদের কথা যেন আর শেষ হয় না।

প্রায় ৯ ঘন্টার মধ্যে কখনো কখনো কিছুক্ষন বসেছি, তবে, অধিকাংশ সময় রাস্তায় হেটে হেটে কথা বলেছি। ক্লান্তি কি জিনিস তা অনুভবই করিনি। অত:পর মাইকে ভেসে এলো “আসসালাতু খাইরুম…”। বললাম বিছানায় যাই। ফোনটা কানের কাছেই রেখে কথা চলতে থাকলো অনবরত।

শেষ পর্যন্ত সেই বলে উঠলো, আপনি সব জানলেন, বুঝলেন, শুনলেন। এখন বলুন তো, আপনি আসলে কি চান? আমি সাফ জবাব দিলাম, আমি আপনাকেই চাই। এ বিষয়ে কিছুটা অমত থাকলেও, অবশেষে বলে উঠলেন, আমি আপনার কাছে হেরে গেলাম। এর মধ্যেই আমরা অতি আপন হয়ে উঠেছি। ফোনের মধ্যেই তার উত্তপ্ত কামনার নিশ্বাস আমার আমার দৃষ্টি এড়ায়নি। সে বলে ফেললো, মানুষের জীবনে সব কিছু একসাথে জোটে না। আমি মনে করছি, আমার জীবনের না পাবার অংশগুলো আপনার মধ্যে রয়েছে। আমিও একই কথা বললাম যে, হ্যা, আমার কাছেও তাই মনে হয়েছে, জীবনের অপূর্ণ সব আপনার মধ্যেই নিহীত আছে।

কপালের দোষ……ফোনের ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলো। অনেক চেষ্টাতেও এত ভোরবেলা ফোন রিচার্জ করতে সমর্থ হলাম না। সেটা ছিল সেপ্টেম্বর মাস। বিছানা ছেড়ে রাস্তায় বের হলাম। শিউলি তলায় পরে থাকা একমুঠো শিউলি যত্ন করে দু-হাতে তুলে নিয়ে ঘ্রান নিলাম। আমি সেখানেই তার অস্তিত্ব গভীরভাবে অনুভব করলাম। সারাদিন কোন ক্লান্তি আমাকে ছুতে পারে নাই। কাল দেখা হবে, কথাটা কানের মধ্যে বাজতে লাগলো।

সারাদিন অনেকবার কথা হলো। মনে নেই সব কথা। তবে আমরা কথা বলাতে কোন ক্লান্ত বোধ করিনাই। মনে হয়েছিল, আমরা ফোনের জন্য অপেক্ষা করছি। আমি সে রাতের জন্য একজন বিশিষ্ট কবি বনে গেলাম। মনে হলো, কোথাকার নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, এসবই আমার কাছে তুচ্ছ। রাতভর তাকে উৎসর্গ করে লিখলাম একটা কবিতা।

এক পুলিশ অফিসার যাবেন অন্য একটি জেলায় মামলার স্বাক্ষী দিতে। আমাকে সাথে যাবার প্রস্তাব দিতেই আমি রাজি হয়ে গেলাম। সেদিন আর আগের রাতের না ঘুমানোর বিষয়টি শরীরকে মোটেই ক্লান্ত করেনি। কখন সে সকাল হবে। কম্পিউটারের কি-বোর্ডের সহায়তায় লেখা সে কবিতাটি নেবার জন্য সে ভোর থেকে অপেক্ষা করছে। অবশেষে সেই শুভ ক্ষন এলো। আমি একটি সাদা পাতায় লেখা কবিতাটি তাকে দিলাম। মুখখানা দেখলাম, নাহ! দু-রাতের ঘুমহীন আমাদের কাউকেই ক্লান্ত করতে পারেনি।

আমি সেদিনের জন্য, সেই সময়ের জন্য তুচ্ছ করে দেখেছিলাম, পৃথিবীর সকল কবি লেখককে। আমার মনে হয়েছিল, আমিই একমাত্র শ্রেষ্ঠ কবি, যে কবিতা লিখে আমার প্রিয়তমাকে দিয়ে আসতে পেরেছিলাম। সেও সহাস্যে তা গ্রহণ করে, কতবার সেটা পড়েছিল, তা আমার জানা নাই। তবে তার অস্ফুট স্বরের কথাটি আজো আমার কানের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হয়, ” এত ভালোবাসা কোথায় রেখেছিলে তুমি, এতদিন দেখা হয়নি কেন, এত দেরিতে দেখা হবার তো কথা ছিল না”।

————সাথে থাকুন