ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা সিরাজ শিকদার, চারু মজুমদারের আত্মা আজ ক্ষোভে ফেটে পরছে। বেঁচে থাকলে নিশ্চই অভাগাদের বাঁচাতে বলে উঠতেন ’বিপ্লব দির্ঘজীবি হউক’, আর বিপ্লবের মূলমন্ত্র থেকে বিচ্যুত কিছু নির্লজ্জদের বধ করে ফেলতেন।

ভাতের অভাবে ১২ বছরের এক কিশোরীর আত্মহত্যা নিয়ে যে নির্লজ্জ প্রচারণা চালানো হচ্ছে, তাতে করে মানুষের মুক্তির বাসনায় ’শ্রেণীশত্রু হঠাও’ সমর্থকদের চরম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। এই নির্লজ্জ মানুষগুলো দেশের সহজ সরল দরিদ্র জনগোষ্ঠির ওপর ভর করে নিজের স্বার্থ এবং নিজেকে দরদী, দেশপ্রেমি, আদর্শবাদী বলে জাহির করতে ব্যস্ত। এরা কোন অবস্থাতেই বাম ধারার রাজনীতির মূলমন্ত্রে দীক্ষিত নয়।

‘৭৪ এ বাসন্তীর ছবি এদেশের গনমাধ্যমকে কলুষিত করেছে। তৎপরবর্তি সময়ে তথাকথিত কিছু মানুষের স্বার্থান্বেষি হানাহানি আর নৈতিক স্খলনের কারণে আজও এই বাংলাদেশে সাধারন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি। বরং, এদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে দেশে স্থায়ীভাবে সাম্প্রদায়িকতার সৃষ্টি হয়েছে।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে রঙ দেওয়া এবং একটি সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা সমৃদ্ধ সংবাদটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে অনেক সত্যকথা। তথাকথিত একটি শ্রেণী এই অভাবী মানুষগুলোকে পূজি করে উষ্কানীতে মেতে উঠেছে, যদিও তারা প্রকৃত সত্য কথাটা জানে ও উপলব্ধিতে এসেছে। নিজেদের বিপ্লবী, বিদ্যান আর বাম আদর্শের ধারক বাহক বলে দাবী করারা মনষ্তাত্বিক বিশ্লেষণ করে ভালমতোই জানে যে, ওই কিশোরীর আত্মহত্যার কারণ ভাত নয়। সংবাদে লেখা রয়েছে, ’ওই কিশোরীর বয়স এখন ১২ বছর। ৮ বছর আগে তার মা মারা যায়। বাবার দ্বিতীয় বিয়ে। সেখানেও আরও বৈমাত্রেয় ভাই-বোন আসে। অভাবের কারণে তার সৎ মাও অন্যত্র চলে যায়। ভাই-বোনদের দত্তক দেয়া হয়। তবে, অভাব ছিল তাদের নিত্য সঙ্গী। অভাবের তাড়নায় ওই কিশোরী আত্মহত্যা করে। মৃত্যুর আগে কারও সাথে ঝগড়া-বিবাদ করেনি’।

তথাকথিত প্রতিবাদকারীরা এবং সঙ সেজে থাকা আদর্শচ্যুত তথাকথিত কিছু লোকজন ভাল করেই জানে যে,

১। বাংলাদেশে না খেয়ে মানুষ মারা যাবার পরিস্থিতি স্বৈরাচার শাসন, বিএনপি-জামায়াত জোট এবং ১৪ দলীয় সরকারের সময়ে ছিলনা এবং নাই।

২। গ্রামের মানুষ শুধু কৃষি ও কৃষি মজুর নির্ভর নয়, অধিকাংশ গ্রামের মানুষের মধ্যে দেশের গার্মেন্টস শিল্পের অবদান বিরাজমান।

৩। এখনও বাংলাদেশের প্রায় সকল গ্রামের কৃষকরাই ফসল উৎপাদন করে শুধু নিজেদের চাহিদা পূরণ করছে তা নয়, দেশের বিরাট জনগোষ্ঠির খাদ্য চাহিদা পূরণ করছে।

৪। গ্রামের অধিকাংশ মানুষের নিজের জমি নাই। জমির মালিক কৃষকরা সার, বীজ ও কীটনাশকের উচ্চমূল্য সত্বেও কৃষিকাজ বন্ধ করে দেয়নি। অসাধু ব্যবসায়ী এবং ষড়যন্ত্রকারীদের সহায়তায় সৃষ্ট কৃষি উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতি, সার বীজ কীটনাশকের উচ্চ মূল্য নির্ধারন তরা সত্বেও জমিতে উৎপাদিত ফসলে লোকসান গুনতে হয়নি কৃষককে। তবে, কম লাভ হয়েছে।

৫। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে নষ্ট হওয়া ফসল ও জমির সাথে কৃষি শ্রমিকরা কোন অবস্থাতেই সংশ্লিষ্ট নয়। ৬। কৃষি শ্রমিকরা বা অন্যান্য শ্রমিকরা শুধু কৃষি জমির ওপর নির্ভরশীল নয়। ৭। চাউল সহ অন্যান্য জিনিসপত্রের উচ্চমূল্য হলেও শ্রমিকশ্রেণী তা কিনছে এবং জীবন নির্বাহ করছে। বরং জমির মালিক ও কৃষকদের যারা জমির ওপর নির্ভরশীল, তাদের সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু শ্রমিকদের নয়।

তাহলে ভাতের অভাবে কিশোরীর আত্মহত্যা?

১। কিশোরীটি মাত্র ৪ বছর বয়সেই মাতৃহীন হয়ে অবহেলা, অযত্নে লালিত হয়।

২। পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজব্যবস্থায় নারীরাই বাড়ির সব কাজ, সন্তান লালন পালনে ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে কিশোরীটি অযত্নের শিকার হওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত খাদ্যও পায়নি। এক্ষেত্রে তার বাবার উদাসিনতার কারণ রয়েছে।

৩। পরবর্তীতে সৎ মায়ের সংসারেও কিশোরিটি কিছুটা অযত্ন আর বৈষম্যের শিকার হয়।

৪। যেহেতু কিশোরিটি পড়াশোনা করেছে এবং স্কুলে গিয়ে তার সহপাঠিদের সাথে মিশেছে, সেখানে তার সহপাঠিদের সাথে তার চলমান জীবনকে সে কোন অবস্থাতেই মিলাতে পারেনি। এতে তার মনের মধ্যে সর্বদাই হতাশা আর হীনমন্যতা বিরাজ করেছে।

৫। ওই কিশোরীর মায়ের মৃত্যু, সৎ মায়ের সংসারে থাকা, সৎ ভাই-বোনকে দত্তক দেওয়া, তার সৎ মায়েরও সংসার ত্যাগ করে চলে যাওয়া, পিতার উদাসিনতা, অতি দারিদ্রতায় জীবন চলমান, এসব ঘটনায়, তার অন্যান্য সহপাঠিদের জীবনের ধারাবাহিকতায় চরম অমিল। এতে করে ওই কিশোরীর মনে চরম হতাশাবোধ কাজ করে। সার্বক্ষনিক নিরব থাকাই-এর নিদর্শন।

৬। পিতার উদাসিনতায় সংসারের অভাব দূর হয়নি।

৭। অবহেলা, অযত্ন, বৈষম্য আর সহপাঠিদের জীবন থেকে তার চলমান জীবন একেবারেই ভিন্ন।

৮। না খেয়ে তো অবশ্যই নয়, ওই কিশোরী, তার আত্মহত্যার ঘটনা তার কোন পূর্ব পরিকল্পিত নয়। জীবন চলার অস্বাভাবিকতা, সংসারের কাজ কর্ম নিজের হাতে করা, স্কুলে যেতে না পারায় তার অতৃপ্তি থেকে ক্ষুব্ধতার সৃষ্টি। সেই ক্ষুব্ধ আর আবেগ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পরায়, তাৎক্ষনিকভাবেই সে আত্মহত্যার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।

তাহলে ভাতের অভাবে আত্মহত্যার সংবাদ?-সংশ্লিষ্ট সংবাদদাতা একজন আবেগি মানুষ তবে চরমদায়িত্বশীল নন আবার দায়িত্বহীনও নয়। ঘটনাটি একটি দরিদ্র পরিবারের, পরিবারটিকে কোনও আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে দেওয়া যায় কিনা, এই জায়গা থেকেই সংশ্লিষ্ট সংবাদদাতা ভাত, অভাব সহ কিশোরীর নানা বাড়িতে কিশোরীর খাদ্য খাওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভাবকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন এবং কিশোরিটি ভাতের জন্যই আত্মহত্যা করেছে বলে বুঝিয়ে সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা করেছেন মাত্র। তবে, একজন দায়িত্বশীল সংবাদদাতা মাত্রই বিষয়টিকে স্পর্শকাতর বলেই ধরে নেন। এখানে কোন অবস্থাতেই ভাতের কারণে আত্মহত্যার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। এখানে সংশ্লিষ্ট সংবাদদাতা কিছু দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। বরং, এই সংবাদটি একটি বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ হয়ে ঠিক এই রকম হতে পারতো যে, অযত্ন, অবহেলা আর বৈষম্য যে আত্মহত্যার কারণ হতে পারে, কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনা তার একটি উদাহরণ।

’ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো’ কেন?

১। বাম আদর্শের সাথে একাত্ম হতে পারেননি বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অধিকাংশ নীতি নির্ধারক/ধারক বাহক। তাদের নৈতিক স্খলন ঘটলেও ব্যক্তি নিজেকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াসেই এরা লিপ্ত।

২। শক্তি ছাড়া রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা যায়না নীতিতে বিশ্বাসী এসব মানুষ প্রভাব বিস্তারের জন্য দরিদ্র পীড়িত মানুষদের দুর্বলতম জায়গাকে পূঁজি করে আসছে। কৃষি শ্রমিক সহ সব ধরনের শ্রমিকরা আদিবাসীরা এদের বলির শিকার। অধিকার আদায়ের আন্দোলন করার নামে এরা তাদেরকে শুধু ব্যবহারই করে আসছে। তাদের নীতিকথায় মানুষ স্বপ্ন দেখে আর আশায় বুক বাঁধলেও কার্যত: এসব বঞ্চিত মানুষের কোন উপকারেই তারা আসেনি।

৩। বাম রাজনীতির সাথে জড়িত কিছু নেতা, বুদ্ধিবিক্রেতার বিভিন্ন কথোপকথন, বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা মন্তব্য-বক্তব্যে লক্ষ্য করা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত- প্রথমে সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে না চাওয়ায় এরা মানবতার বুলি আওরাতে থাকে আর উস্কানি দিতে থাকে। সরকার রোহিঙ্গাদের মানবিক ভাবে আশ্রয় দেবার পরে, মায়ানমারের সেনাবাহিনী আকাশ সীমা লংঘনের ঘটনায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে লিপ্ত হতে চরম উষ্কানী দিতে থাকে। প্রধান বিচারপতির সাথে সাংবিধানিক টানাপোড়নের ঘটনায় তারা একদিকে সরকারের তোষামদি ও উষ্কানী অন্যদিকে প্রধান বিচারপতিকেও উস্কানি থাকে ও সাম্প্রদায়িক উষ্কানিও দিতে থাকে। সরকার বা সংশ্লিষ্টরা এসব উষ্কানীতে মনযোগি না হওয়ায়, একজন দায়িত্বহীন সংবাদদাতার সংবাদকে পূঁজি করে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে ওই দরিদ্র পরিবারের কিশোরীর লাশকে এরা পূঁজি করেছে।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অন্যতম জামায়াত-শিবির কখনই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি। অতি জনপ্রিয় একটি সিনেমার ডায়ালগকে ব্যবহার করে তারা পএবার বলে উঠেছে, “ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো”। মানচিত্র খেয়ে ফেলবার স্বপ্ন তারা ‘৭১ থেকেই লালন করে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার পতনের সকল আন্দোলনেই বাংলাদেশের মানুষ সাড়া দেওয়ায় জনবিচ্ছিন্ন, সাম্প্রদায়িক উষ্কানী সমৃদ্ধ দলগুলো সর্বশেষ সংস্করন হিসেবে ওই কিশোরীর লাশকেই পূঁজি করেছে।

ক্ষমতাসীন সরকার জনকল্যানে খুব এগিয়ে গেছে, এমন ধারনাও বিব্রতকর। অপশাসন বিরাজ করছে চারদিকে। মানুষের জীবনযাত্রা বেশ কঠিন হয়ে পরেছে। তবে, না খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে বা গেছে এমনটা হয়নি হবেওনা হয়তো। তার মানুষ না খেয়ে নেই-এটার কৃতিত্ব কোন অবস্থাতেই সরকারের নয়। যুগের চাহিদায় জমিতে ফসল ফলানোর পরিমান বেড়েছে। দেশের প্রায় সব এলাকায় সকলের খোজ খবর সকলেই জানে। একদিকে অপশাসন, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির একটি অংশকে সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয় প্রদাণের ফলে দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এমন খারাপ একটি পরিস্থিতিই কিন্তু বিপ্লবের সূচনা করে। বাম আদর্শ এমন কথা বললেও, এ কথার ওপরে নির্ভর করে তথাকথিত বাম আদর্শের ধারক বাহক নৈতিক স্খলিত একদল মানুষ ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের অপচেষ্টায় লিপ্ত।

এদের ধিক্কার জানানোর ভাষা আমার নাই। তবে, এটাও ঠিক, বাম আদর্শ এসব মানুষকে কখনই গ্রহণ করেনি। এসব মানুষের কারণেই বাম আদর্শ বাস্তবায়িত হবার পথ দীর্ঘ হচ্ছে। চারু মজুমদার বা সিরাজ শিকদারের মত মানুষ বেচে থাকলে হয়তো, শ্রেণী শত্রু এরাই চিহ্নিত হতো। শুদ্ধিঅভিযান করে সাধারন মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এগিয়ে যেতো।