ক্যাটেগরিঃ জনজীবন

 

নবম শ্রেনীর ছাত্রী ক্রানি- মান্ডি একেবারেই শুদ্ধ বাংলা ভাষায় কথা বলছেন। সদা হাস্যচ্ছোল ক্রানি- জানান, আসলে স্কুলে এখন আর কোন বিভেদ খূজে পাইনা। ৩ বছর আগে যখন রাউতনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই তখন বান্ধবীদের অনেকেই পাশে বসতে দিতে চাইতো না। আর এখন আমরা সবাই একসাথে খেলছি উঠছি বসছি।

আদিবাসী পল্লী বলতেই আমরা বুঝি কতগুলো নোংড়া, জরাজীর্ণ মানুষের আবাসভূমি। কিন’ সময়ের আবর্তে একেবারেই পাল্টে গেছে তাদের জীবনচিত্র। ক্রানি- মান্ডির ৫ ভাই বোন। এর মধ্যে ৪ জনই পড়াশোনা করছেন। একই গ্রামের শিক্ষিত জনদের মধ্যে মানিক সরেন। তারই ছেলে রবেন সরেন শিক্ষকতা করছেন জেলার রানীশংকৈল উপজেলার রাউতনগর উচ্চ বিদ্যালয়ে। তিনি জানান, আসলে পারিপার্শ্বকিতার কারনে আদিবাসীরাও এখন বেশ শিক্ষিত হচ্ছে। রাউতনগর গ্রামে রয়েছে ১৬০ টি আদিবাসী পরিবার। প্রায় প্রতিটি পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখন শিক্ষিত হচ্ছে। অনেকেরই নিজেদের জায়গা জমি নাই। কৃষি মজুর হিসেবে খ্যাত আদিবাসীরা এখন নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে বিভিন্ন রকম পেশায়। কেউবা ব্যবসা করছেন, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন রকম কারিগরি পেশায় সম্পৃক্ত। নারীরাও পিছিয়ে নেই একেবারে। অবস’ার উন্নতি হয়েছে অনেক।

ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দক্ষিন পশ্চিমে অবস্থিত রাউতনগর গ্রাম। জানা গেছে আজ থেকে শতবর্ষ পূর্ব থেকে সেখানে আদিবাসীদের নিবাস। তারা প্রায় সবাই সাঁওতাল বংশোদ্ভুত। পূর্বপুরুষরা অগ্নিপূজারী বা সূর্যদেব বা গাছগাছালির পূজা আর্চনা করে আসলেও এখন অধিকাংশই খৃষ্ট ধর্মানুসারি। গ্রামে ঢুকতেই নজরে আসবে একটি আদিবাসী স্কুল। তার পাশেই একটি মাটির লম্বা ঘরে গির্জা। তার পাশেই একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি প্রশিক্ষন কেন্দ্র। লক্ষী হেমরন, ইলিশাবেদ হাজদা, সুরমা মরমু সহ প্রায় অর্ধশত ছেলে মেয়ের সবাই কেউবা মোটর সাইকেল মেকানিক আবার কেউ সেচ পাম্প মেকানিক আবার কেউ কেউ দর্জি বিজ্ঞানের সব প্রশিক্ষন নিচ্ছেন। প্রশিক্ষকদের একজন শাবানা দেব শর্মা জানান, কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি তারা তারা খাতাকলমেও শিক্ষিত হচ্ছেন। সেখানকার ছাত্রী সোনিতা কিসকু, সোহাগিনি মার্ডী জানান, বাড়ির কর্তার পাশাপাশি তারা ইতিমধ্যেই রোজকার করতে শুরু করেছেন। এতে সংসারে সন-ান সহ অন্যান্যদের জন্য বেশ ভূমিকা রাখছেন।

চারপাশে সবুজের মাঠ। তার মাঝেই রাউতনগর গ্রামের আদিবাসীদের নিবাস। প্রায় সব ঘরবারিই মাটির তৈরী। কদাচিৎ দু-একজন ইটের বাড়ি তৈরী করছেন। মাটির ঘরগুলোর দরজাগুলো দেখতে অনেকটা রাজাবাদশাদের বাড়ির আদলে তৈরী। প্রায় প্রতিটি বাড়ির সরজাতেই লাল, নীল সব বাহারী রঙের ফুল বা বিভিন্ন নকশা আঁকা। সব বাড়ির উঠোনে সব্জির চাষ, বিভিন্ন রকম ফল ফলাদির গাছ। প্রতিটি বাড়িই বেশ পরিপাটি। স’ানীয় বাসিন্দাদের অনেকের মতে, আদিবাসীরা স’ানীয় গ্রাম্য অধিবাসীদের চেয়েও সাজাজিক দিক দিয়ে এগিয়ে গেছে।

ক্রানি- মার্ডি জানান, বাপ-দাদারা আগে প্রায় প্রতিদিন বিশেষ উপায়ে তৈরী চোয়ানি, মদ ভাং ইত্যাদি খ্যাত। এখন আমরা স্কুল কলেজে পড়ছি, একারনে বাবা-মায়েরা ওইসব খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।
শিক্ষক রবেন সরেন জানান, আদিবাসী ছেলেমেয়েদের স্কুল পর্যন- পড়তে কোন সমস্যা হয় না। কলেজের খরচ অনেকেই জোগাড় করতে না পেড়ে পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটছে। মেয়েদের বাধ্য হয়ে বিয়ে দিতে হচ্ছে অভিভাবকদের। সামাজিক পরিবর্তন আসলেও আর্থসামাজিক অবস’ার উন্নতি এখনো আসেনি। উৎসব প্রিয় এ আদিবাসীরা আয়োজন করেন নানান পূজা আর্চনার। তারা আনন্দে উৎফুল্লে মেতে উঠেন। বিশেষ করে বড়দিন, ১লা বৈশাখ, কারাম পূজা ইত্যাদি অনুষ্ঠান জামজমকভাবে পালন করেন তারা। অতি সৌন্দর্যে গাথা আদিবাসীদের আধুনিক জীবনযাপনের একটি উদাহরন রাউতনগর গ্রাম। জেলা শহরের আর্টগ্যালরী বাসষ্ট্যান্ড থেকে রানীশংকৈল বা হরিপুর উপজেলার বাস চলে প্রতি ৩০ মিনিট পরপর। ৪০ টাকা বাস ভাড়া দিয়ে রানীশংকৈল উপজেলা র শিবদিঘী হাসপাতাল মোড়ে নামলে সেখান থেকে মাত্র ১৫ টাকা ভাড়ায় রিক্সা অথবা ভ্যানে করে যাওয়া যায় রাউতনগর আদিবাসী পল্লী। অথবা ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে মাত্র ১ হাজার ৫শ টাকা ভাড়ায় পাওয়া যায় মাইক্রোবাস। অবশ্য ঢাকা থেকে যোগাযোগ বেশ সহজ। বাবলু এন্টারপ্রাইজ বা হানিফ এন্টারপ্রাইজের সরাসরি বাস রয়েছে রানীশংকেল উপজেলায় যাবার। সেখানে ভালো কোন হোটেল না থাকলেও জেলা শহরে বেশ সুলভেই ভালো হোটেলে রাত্রী যাপনের ব্যবস’া রয়েছে। আদিবাসী পল্লীতে যেতে যেতে রাস-ার দু-ধার্‌ে অনাবিল সবুজের মাঠ। সবুজে যেন চোখ ধাধিয়ে ওঠার মত। পাশেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন খুনিয়াদিঘী স্মৃতি সৌধ। প্রায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করে পাকসেনা ও স’ানীয় রাজাকাররা। সেই শহীদদের সাথে সহযাত্রি হয়েছেন আদিবাসী সেবু মরমু। তাকে খুনিয়াদিঘীর শিমুল গাছে হাতে পায়ে প্যারেক ঠুকে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যা করা হয়। রাউতনগর আদিবাসী পল্লীর সৌন্দর্য গাথা যে কাউকে মুগ্ধ করার দাবিদার। শুধু রাউগনগর আদিবাসী পল্লীই নয়, জেলায় রয়েছে ২৫ হাজার সাঁওতাল আদিবাসীর নিবাস। এর মধ্যে, রাঙাটুঙ্গি, শিহিপুর, গোবিন্দনগর, যাদুরানী বেশ বড় বড় আদিবাসী পল্লী। গ্রামে নতুন কোন মেহমানের অনুরোধে তাদের মাদল বেজে উঠে সেই সাথে আদিবাসী মেয়েদের সাঁওতালি নাচ আর গান মন কেড়ে নেয়।