ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা

কোন সেতু নির্মান হবে, ক্রয় করতে হবে পন্য বা এ জাতীয় কিছু সেক্ষেত্রে দেশীয় ও বিশ্ববাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আহবান করা হয় দরপত্র। কিন’ সরবরাহ করতে হবে শ্রমিক-তাও আবার কে কত কম দামে শ্রমিক সরবরাহ করবেন তাও নির্ধারন করবেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার। ঠিকাদারদের শ্রমিক সরবরাহ কাজ পাওয়ার দরপত্র প্রতিযোগিতার শিকার হয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের বিসিআইসি বাফার গোডাউনের শ্রমিকদের ভয়াবহ অবস’া দাড়িয়েছে। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭ টন অর্থাৎ মোট ১৪০ টি বস-া (৫০ কেজি ওজনের) গোডাউন থেকে মাথায় করে নিয়ে ট্রাকে লোড করে মোট আয় করছেন ৪২ টাকা। অর্থাৎ প্রতি টনে ৬ টাকা ! এ নিয়ে ঠাকুরগাঁও বাফার গোডাউনে দেখা দিয়েছে শ্রমিক অসনে-াষ। মুখোমুখী অবস’ানে ঠিকাদার আর শ্রমিক পক্ষ। পুলিশি প্রহরায় পরিসি’তি এখন শান- থাকলেও যে কোন সময় ঘটতে পারে শ্রমিক বিস্ফোরন।

নিষ্পেষনের শিকার ও কর্মরত কুলী শ্রমিকরা জানান, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও গোডাউন কর্তৃপক্ষের কোন কাজের প্রতিবাদ করলেই তাদের ভাগ্যে নেমে আসে, কিলঘুষি, লাথি আর অকথ্যগালাগালি। বের করে দেয়া হয় তাদের। নির্যাতনের শিকার শ্রমিকরা জানান, ঠিকাদারের লোকজন তাদের বলেছে মাথা চলবে, পা চলবে, হাত চলবে, মুখ চলবে না। মুখ চললেই চাকুরী থাকবে না।

গত শুক্রবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শীবগঞ্জ বিসিআইসি বাফার গোডাউনে সরজিমেন গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কর্মরত ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক তাদের শ্রমিক কার্যালয়ের সামনে বসে আছেন। কেমন আছেন আপনারা জিজ্ঞেস করতেই শীবগঞ্জ কুলী শ্রমিক সভাপতি খায়রুল ইসলাম জানালেন, আজকে আমি সহ আমাদের শ্রমিকরা আয় করেছি মাত্র সাড়ে ৯ টাকা। সংসার চালানোর চিন-ায় আমরা খুবই চিনি-ত। কিভাবে ভালো থাকতে পারি বলেন।

খায়রুল ইসলাম জানান, বাফার গোডাউনে তারা কুলী শ্রমিকের কাজ করেন। তাদের কাজ করতে হয় ঠিকাদারের মাধ্যমে। ২০০৭-০৮ সালে ঠিকাদার তাদের ১ টন (৫০ কেজির ২০টি বস-া) গোডাউন থেকে ট্রাকে নিয়ে লোড করা বাবদ দিতেন ১৯ টাকা, ২০০৯-১০ সালে প্রতি টন লোড বাবদ পেয়েছেন ১৭ টাকা আর ২০১০-১১ আর্থিক বছরের গত জুন মাস থেকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিটন সারের বস-া লোড করতে তাদেরকে দিচ্ছেন ৬ টাকা হিসেবে। একজন শ্রমিক একদিনে সর্বোচ্চ ৭ টন পর্যন- বস-া লোড ও আনলোড করতে পারেন। আগে আয় একটু বেশি থাকলেও বর্তমানে মোট ১৪০ টি বস-া গোডাউন থেকে ট্রাকে লোড করে একজন শ্রমিকের সারাদিনের আয় হয় মাত্র ৪২ টাকা। ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক প্রতিদিন কাজ পান না। তারা পালা করে কাজ করতে হয়। বাহির থেকে সারের ট্রাক আসলে তা গোডাউনে মজুদ করতে ২৫ টাকা টন হিসেবে শ্রমিকরা পান। এটাকাই মূলতঃ আমাদের ভরসা। কিন’ গত ৭-৮ মাসে নওপাড়া, ফেঞ্চুগঞ্জ বা অন্যান্য জায়গা থেকে ট্রাকে করে যে, সার আসে গোডাউন কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে তা আনলোড না করেই তা বিতরন দেখানো হয়। এতে করে কর্তৃপক্ষের ব্যক্তিগত লাভ হয় কিন’ বঞ্চিত হন কুলী শ্রমিকরা।

শ্রমিক আবুল হোসেন কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন। তিনি তার ভাষায় জানান, “কাইল ছিল হাটের দিন, বাচ্চাগুলার তাহানে একটু মাছ, তরকারি কিনবা চাহিননু। (কাল ছিল হাটের দিন। বাচ্চাদের জন্য মাছ কিনতে চেয়েছিলাম) পারনুনি ছুয়ালাক একটা মাছ খিলবা। (পারলাম না মাছ কিনতে) এক আটি পাটা শাক লেহেনে বাড়িত গেনু। (এক আটি পাট শাক নিয়ে বাড়ি গিয়েছি) ছুয়ালা মোর ভাত খায়নি। (সন-ানরা আমার ভাত খাযনি) কোনহঠে আইজ সুদের ওপর টাকাও নি পানু। (আজকে অনেক চেষ্টা করেও সুদের ওপর টাকা পাইনি।)

শ্রমিক মাজেদ আলী, আঃ মতিন, সহিদুল ইসলাম, ফাগু সহ কয়েকজন জানান, গত জুলাই মাসের দিকে ঠিকাদার মঞ্জুর আলম তাদের জানান, তিনি কম রেটে কাজ নিয়েছেন তাই ৬ টাকা টন হিসেবে কাজ করতে হবে। এতে শ্রমিকরা প্রতিবাদ জানান এবং দাবি তুলে এমন কম মূল্যের টেন্ডার বাতিল করা হউক। তখন ঠিকাদার মঞ্জুর আলম এলাকায় মাইকিং করে সেখানে ওই ৬ টাকা টন মূল্যেই সেখানে প্রায় ৩০ জন শ্রমিক নেন। বেশি লাভের আশায় এলাকার শ্রমিকরা সেখানে কাজ শুরু করেন। শ্রমিক মমিনুল, ফাগু সহ আরো কয়েকজন জানান, তারা তাদের ভ্যান বিক্রি করে দিয়ে সেখানে কাজে যোগ দেন। গত জুলাই থেকে কাজ করে কোনদিনও সেখানে ৬০ থেকে ৭০ টাকার বেশি আয় করতে পারেন নি। একদিকে ভ্যান বিক্রি অন্যদিকে কম আয়। ধার কর্য্য করে ও সুদের ওপর টাকা নিয়ে সংসার চালাচ্ছেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে তারা দাবি করেন তারা এখন কি করবেন।

শ্রমিক নজরুল ইসলাম, আমিনুল সহ কয়েকজন জানান, এইতো কিছুদিন আগে নজরুলের মাথা থেকে একটা বস-া পড়ে যায়। তখন গোডাউনের পিয়ন ইসলামামুল তাকে লাথি মেরে তাড়িয়ে দেয়। তাছাড়াও প্রচন্ড রৌদের মধ্যে একটু জিরোনোর জন্য বসলেই শুনতে হয় অকথ্য গালিগালাজ। এমনকি নামাজ পড়ার সময় টুকুও দেয়া হয় না তাদের। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে শ্রমিক সহিদুল ইসলাম, ফাগু, নজরুল সহ কয়েজনকে তারা কাজ থেকে বাদ দিয়ে দেয়। ঠিকাদারের প্রতিনিধি আসিফ শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে সব সময় বলেন, মাথা চলবে, পা চলবে, হাত চলবে, মুখ চলবে না। মুখ চললেই চাকুরী থাকবে না।
গত ৪/৫ দিন থেকে সেখানকার নতুন ও পুরাতন কুলী শ্রমিকরা তাদের মজুরী যেন বাড়ানো হয় এর দাবি জানিয়ে আসছেন। শ্রমিক সভাপতি খায়রুল ইসলাম জানান, আমরা দাবি জানিয়ে আসছি। ঠিকাদারের সাথে কথা বলেছি। এমনকি ঠিকাদারের বড় ভাই বিশিষ্ট শিল্পপতি হাবিবুল ইসলাম বাবলুর সাথে কথা বলেছি, তাদের পা ধরে বলেছি এখানকার ৬০-৭০ জন শ্রমিকের পরিবারের ৬ থেকে ৭শ সদস্যকে বাঁচানোর জন্য। কিন’ কেউ কথা শুনছেন না। আমরা কাজও বন্ধ করতে পারছি না। কারন বিকল্প কোন কাজ নেই। এতে করে বর্তমানে দিনে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ টাকা আয়ে কাজ করছি। আজ (আজ আমরা ২ ট্রাক অর্থাৎ ৩০ টন সার ট্রাকে লোড করেছি। এতে বকশিশ সহ আমরা ভাগে পেয়েছি সাড়ে ৯ টাকা করে।

এ ব্যাপারে শীবগঞ্জ বাফার গোডাউনের ইনচার্জ আসাদুজ্জামান খান জানান, আগের অর্থবছরে শ্রমিক সরবরাহের ঠিকাদাররা একটু বেশি দরে শ্রমিক সরবরাহের কাজ করেছেন। এতে শ্রমিকরা বেশ লাভবান হয়েছেন। চলতি অর্থবছরে শ্রমিক সরবরাহের দরপত্র বিক্রি হয় ৭ টি। নিয়ম অনুয়ায়ি সর্বনিম্ন দরদাতাকেই কাজ দেয়া হয়। বর্তমান ঠিকাদার মেসার্স মঞ্জুর আলম প্রতি টন সার লোড করা শ্রমিক সরবরাহ বাবদ ১০ দশমিক ৭০ টাকা হিসেবে দরপত্র পেয়েছেন। আমার জানামতে তিনি শ্রমিকদের ৬ টাকা টন হিসেবে দিচ্ছেন-এ সম্পর্কে এ প্রতিবেদকের সাথে একমত প্রকাশ করে বলেন বিষয়টি সত্যিই অমানবিক। ঠিকাদাররা শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনা না করেই এমন অবিবেচ্য দরপত্র দাখিল করে শ্রমিক স্বার্থ ক্ষুন্ন করেছেন এটা ঠিক।

বাহির থেকে আসা ট্রাকের সার আনলোড না করেই অন্য জায়গায় সরবরাহ করা হচ্ছে-এমন অভিযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, যখন মৌসুমের সময় খুব ভীড় থাকে তখন হয়তো কোন কোন সময় এমন করা হয় তবে আনলোডের টাকা শ্রমিকরা ঠিকমতই পান। এক্ষেত্রে টাকা আত্মসাতের কথা অস্বীকার করেন তিনি।

ঠিকাদার মঞ্জুর আলমের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিযোগিতার বাজার। তাই কমরেটে কাজটা নিতে হয়েছে। প্রতি টনে ৬ টাকা হিসেবে দেয়া হচ্ছে কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, অনেক টাকা ইনভেস্ট করতে হয়েছে। ভ্যাট, ইনকাম টেক্স ও বিল আনতে যেতে হয় আশুগঞ্জে। তারপরে রয়েছে নিজের লাভ। সব মিলিয়ে ৬ টাকা হিসেবেই দর আমি ঠিক করেছি। এটা অমানবিক কি না এবং সেখানে আপনার লোক শ্রমিকদের নির্যাতন করেন, এখানে শ্রমিক অসনে-াষ দেখা দিয়েছে-এমন প্রসংগ এড়িয়ে গিয়ে তিনি জানান, আসলে ঠিকাদারি কাজ খুব কঠিন। সব মিলিয়ে বিষয়টি ঠিকই আছে। শ্রমিক স্বার্থ আপনি রক্ষা করেননি, বাজারে পন্যের মূল্য বাড়লেও আপনি শ্রমিক মজুরী কমিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করেছেন এবং শ্রমিক অসনে-াষের সৃষ্টি করেছেন-এমন প্রশ্নের কোন উত্তর তিনি দেননি।