ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

আজ “২০ নভেম্বর” আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার দিবস পিতৃপরিচয়হীন শিশুরা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার পাশাপাশি আইনী জটিলতায় ভুগছে। ঠাকুরগাঁও আদালতে পিতৃ পরিচয় নিরুপনে ডিএনএ টেস্টের অভাবে ২৬ টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম স’বির হয়ে আছে

মেধাবী ছাত্রী ফরিদা (১৮) (ছদ্মনাম) এখন ঢাকার একটি গার্মেন্টস এ কাজ করে। নবম শ্রেনীতে শিক্ষাবোর্ডের নিয়ম অনুযায়ি রেজিষ্ট্রেশন ফরমে বাবার নামের স’ানে বাবার নাম লিখতে না পারায়, অষ্টম শ্রেনীতেই তাকে পড়াশোনার ইতি টানতে হয়। কেন শেষ করতে হলো তার পড়াশোনা ?-এ প্রসংঙ্গে প্রধান শিক্ষক ইমদাদুল হক জানালেন, ওই শিক্ষার্থীকে আমরা স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সবাই একমত হয়ে স্কুলে ভর্তি ও পড়াশোনার সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন’ বাধ সাধলো নবম শ্রেনীর রেজিষ্ট্রেশন ফরম। শিক্ষা বোর্ডের ওই রেজিষ্ট্রেশন ফরমে নিজের নামের পাশাপাশি লিখতে হয়, বাবা ও মায়ের নাম। ওই শিক্ষার্থী তার মায়ের নাম লিখতে পারলেও তার বাবার নাম রেজিষ্ট্রেশন ফরমে লিখেন নি। কারন হিসেবে ওই শিক্ষার্থী ও এলাকার লোকজন জানান, ওই শিক্ষার্থীর মা নির্যাতনের শিকার হয়েই ওই শিক্ষার্থীর জন্ম। নির্যাতনকারী ওই শিক্ষার্থীকে জন্মের পর থেকেই নিজের মেয়ে বলে স্বীকার করেননি ও পরিচয়ও দিতে রাজী হননি। তাই পিতৃপরিচয়হীন অবস’ায় ওই শিক্ষার্থীকে বেড়ে উঠতে হয়েছে।

শুধু ফরিদাই (ছদ্মনাম) নয়, ঠাকুরগাঁওয়ের ৫ টি উপজেলায় এক সমীক্ষা চালিয়ে পিতৃপরিচয়হীন হয়ে বেড়ে উঠছে এমন ৬৭ জনের সন্ধান পাওয়া গেছে। যারা এখনো শিশু রয়েছে তাদের সবাইকে সামাজিকভাবে হেয় হয়ে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। বাবার নাম না থাকার কারনে এরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে না এমনকি যারা ১৮ বছর অতিক্রম করেছে তারা ভোটাধিকারও পাচ্ছে না। শুধু তাই নয়, এরা এদেশেরই নাগরিক হলেও এরা কোন অবস’াতেই বৈধভাবে মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন না।

ওই ৬৭ জনের সবাই সামাজিকভাবে নিগৃহীত। তাদের মায়েরাও নির্যাতনের শিকার। সামাজিকভাবে এরা নিগৃহীত হওয়ায় প্রতিকার পেতে অনেকেই আইনের দরজা পর্যন- আসতে পারেননি। অনেকে আসলেও বিচারিক প্রক্রিয়ায় এগুতে পারেননি উল্লেখযোগ্যভাবে।

এ ব্যাপারে ঠাকুরগাঁও জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবি মোস-াক আলম টুলু জানান, নির্যাতন, প্রলুব্ধহয়ে, নির্যাতনের শিকার হয়ে বা অন্য যে কোন অবৈধ উপায়ে যে সকল নারীরা সন-ানের জন্ম দিচ্ছে, তাদের জন্ম হওয়া সন-ানগুলো প্রায় সবাই সামাজিকভাবে নিগৃহীত। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ প্রায় সব জায়গাতেই মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজের নামের পাশাপাশি বাবা ও মায়ের নামের দরকার হয়। অনেকক্ষেত্রে নির্যাতিতা নারীটির জন্ম নেয়া সন-ানটিকে অস্বীকার করায় ডাক্তারী পরীক্ষার দরকার হয়। এক্ষেত্রে ডিএনএ টেস্টের জন্য আইনে বলা থাকলেও এর ব্যয়ভার বহন করতে হয় ওই নির্যাতিতাকেই। অসহায় দরিদ্র পিড়িত বিচারপ্রার্থী ওই নারী এ টাকা জোগাড় করতে না পারায় বিচারও পাচ্ছেন না তারা।

এ ব্যাপারে বেরসরকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আরডিআরএস এর কর্মকর্তা হাসিনা পারভীন জানান, ঠাকুরগাঁওয়ে নির্যাতিতা এসকল কুমারী মায়ের সংখ্যা আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাবার পাশাপাশি সমস্যাও প্রকট হচ্ছে। বিচারপ্রার্থীদের জন্য তেমনকোন বাড়তি সুবিধা না থাকায় এদের বিচার প্রক্রিয়াও জটিলতা বাড়ছে। সন্তানদের পরিচয় নিশ্চিত হতে দরকার হচ্ছে ডিএনএ টেস্টের। কিন’ বিচারপ্রার্থীদের নিজ খরচে ডিএনএ পরীক্ষা করার বিধিবিধানের কারনে সমস্যা বেশ বেড়েছে। এক্ষেত্রে আপোষ মিমাংসার পথ তৈরী হচ্ছে এবং এসকল পিতৃপরিচয়হীনদের সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে দেশে মৌলিক অধিকার বঞ্চিত তৃতীয় একটি নাগরিক শ্রেনীর সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন।

উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও আদালত সূত্রে জানা গেছে, পিতৃ পরিচয় নিশ্চিত করবার জন্য ঠাকুরগাঁও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে ২৬ টি মামলায় ডিএনএ পরীক্ষার জন্য বলা হয়েছে। অর্থ সংকুলান করতে না পারায় বিচারপ্রার্থীরা ডিএনএ টেস্টও করতে পারছেন না আর মামলার বিচার কাজও এগুচ্ছেনা।