ক্যাটেগরিঃ কৃষি

 

কৃষকরা প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমে গভীর নলকুপ থেকে পানি সেচ নিবেন এমন নিয়ম থাকলেও বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ঠাকুরগাঁওয়ের গ্রামাঞ্চলের গভীরনলকুপগুলো চলছে চুক্তিভিত্তিক। এক বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে বোরো চাষে ২শ৬০ টাকা থেকে ৪শ টাকার পানি লাগলেও কৃষকদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ১ হাজার ৪শ থেকে ১ হাজার ৫শ টাকা। এ নিয়ে কৃষকদের মাঝে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ।

জেলার বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল ও সদর উপজেলার গভীরনলকুপগুলো সরেজমিন গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে জানা গেছে, গতবছর গভীরনলকুপের আওতায় চাষাবাদকারী কৃষকদের কাছ থেকে নলকুপ অপারেটররো বোরো মৌসুমে আদায় করে প্রতিবিঘায় এক হাজার টাকা করে। চলতি বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ার অজুহাতে কৃষকদের জানানো হয় প্রতিবিঘা জমিতে পানি সেচ দিতে ১হাজার ২শ টাকা থেকে ১ হাজার ৪শ টাকা লাগবে।

কৃষকদের অভিযোগ প্রতিবিঘা জমি চাষ করতে যেখানে প্রিপেইড মিটারের সাহায্যে পানি সেচ নিলে খরচ হয় ২শ ৫০ টাকা থেকে ৩শ টাকা। সেখানে বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু অসাধূ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে গভীর নলকুপগুলোর অপারেটররা বিগত বছরে বিঘা প্রতি ১ হাজার টাকা আদায় করেছে। চলতি বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ার অজুহাতে ১ হাজার ৪শ থেকে ১ হাজার ৫শ টাকার চাপ দেয়া হয়েছে।

রানীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও গ্রামের কৃষক শুকুরদী, ইসমাইল হোসেন, শুকুরদী সহ আরো অনেকে জানালেন, গভীর নলকুপের অপারেটররা যে টাকা নির্ধারন করেন সে টাকা পরিশোধে রাজী না হলে কৃষকদের পানি দেয়া হয় না। গত বছর অপারেটরদের প্রতিবিঘায় পানি সেচ বাবদ ১ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে ধান দেয়া হয়। এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে তারা ১ হাজার ৪শ টাকা এবং ১৫ কেজি ধান নিবে বলে জানিয়ে দিয়েছেন।

অতিরিক্ত টাকা আদায়ের কথা অস্বীকার করে রানীশংকৈল উপজেলার ৯৭ নং, ২২ নং, সদর উপজেলার ৪৩ নং গভীর নলকুপের অপারেটররা জানান, গতবছর প্রতি ঘন্টা পানি সেচ বাবদ খরচ হয়েছে ৭০
টাকা। এ বছরে বিদ্যুতের দাম বাড়ায় তা বেড়ে দাড়িয়েছে ৮৭ টাকা। তবে তারা স্বীকার করে বলেন, সব কৃষকই প্রিপেইড কার্ডের সাহায্যে এমন নিয়ম থাকলেও কৃষকরা নগদ টাকায় রিচার্জ করতে পারেন না। তাছাড়াও সবাই প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করলে সেচ নিয়ে ঝগড়াবিবাদ লাগবে নিজেদের মধ্যে। তাই প্রতিটি গভীর নলকুপেই অপারেটররা নিজের নামে প্রিপেইড কার্ড কিনে তা দিয়ে কৃষকদের সেচ প্রদান করে আসছেন। তবে তারা অতিরিক্ত ফি আদায় সম্পর্কে বলেন, সেচ দিতে গেলে লোকবল নিয়োগ দিতে হয় তাই অতিরিক্তি চার্জ নেয়া হয়। তারা বলেন, মোটর মেরামত সহ যাবতীয় খরচ তাদের করতে হয় বলেই কিছু বেশি টাকা আদায় করা হয়। তবে এটা নিয়ম নয় বলে তারা স্বীকার করেন।

জেলার রানীশংকৈল উপজেলার হোসেনগাঁও ইউপি চেয়ারম্যান মাহবুব আলম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্পের কিছু অসাধূ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে গভীর নলকুপগুলোর অপারেটররা বিগত বছরে বিঘা প্রতি ১ হাজার টাকা আদায় করেছে। চলতি বছরে বিদ্যুতের বেশি দামের অজুহাত দিয়ে বেশি টাকা আদায়ের চাপ দিয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান বেশি টাকা আদায় না করার জন্য অপারেটরদের এবং বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্পের লোকজনকে ডেকে হুশিয়ার করলেও এখনো সে সমস্যার সমাধান হয়নি।

অপরদিকে ঠাকুরগাঁও শহরের কাছাকাছি, বোর্ডবাজার, খোচাবাড়ি এলাকায় কয়েকটি গভীরনলকুপের কৃষকরা জানান, তারা সবাই প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমেই পানি সেচ নিচ্ছেন। ওই গভীরনলকুপের অপারেটররা জানান, যার যতটুকু পানির দরকার তারা সেভাবেই পানি নিচ্ছেন।

শহরের আশপাশ বা গ্রামে কোন বিভেদ থাকার কথা নয়। শহরে হাতে গোনা কয়েকটি গভীর নলকুপ। বাদবাকী সব গ্রামাঞ্চলেই। জেলার ১ হাজার ২শ ৭ টি গভীর নলকুপেই কৃষকরা প্রিপেইড কার্ডের মাধ্যমেই পানি সেচ গ্রহন করছেন বলে জানান, বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ শহীদুর রহমান।

তবে গ্রামাঞ্চলের গভীরনলকুপগুলোতে প্রিপেইডের বদলে চুক্তিভিত্তিক এবং বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে-এমন প্রমান পেয়ে তিনি জেলার বালিয়াডাঙ্গী ও রানীশংকৈল উপজেলার বরেন্দ্র কর্মকর্তাদের হুশিয়ার করেন।

ঠাকুরগাঁও জেলায় এবার ১ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদের লক্ষ্য নির্ধারন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৯ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায়। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ চালিত সেচপাম্প ও কোথাও কোথাও ডিজেল চালিত স্যালো মেশিন দিয়েই কৃষকরা বোরো চাষাবাদ করবেন। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষকরা অধিক সুবিধা পাবেন এমন আশা থাকলেও গভীরনলকুপগুলোকে জিম্মি করে রাখা লোকজনের কারনে দীর্ঘদিন থেকে সুবিধা বঞ্চিত হয়ে আসছেন এলাকার কৃষকরা।