ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

হায় হুমায়ূন আহমেদ! একটি লাশ! নন্দিত কথাসাহিত্যিক, সফল নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। বাংলাভাষাভাষী কোটি কোটি পাঠককে শোকের সাগরে ভাসিয়ে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তাঁর মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান পুরো দেশ। শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী থেকে নিয়ে সব শ্রেণী-পেশার অসংখ্য মানুষ। তাবৎ প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ই-মিডিয়াজুড়ে চলছে তাঁর বন্দনা আর স্মৃতিচারণা। তিনি যখন দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে গমন করেন, তখন থেকেই মিডিয়াগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তাঁর চিকিৎসার সর্বশেষ খবর প্রচার করে আসছিল। তাঁর মতো আর কাউকে এভাবে গুরুত্ব পেতে দেখিনি আমাদের মিডিয়াগুলোয়। সারা দেশ থেকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা ভক্তদের যে ঢল দেখা গেল তেমনটিও এ জাতির কোনো লেখকের কপালে জোটেনি। সবকিছুর পরও আজ এটিই নিষ্ঠুর সত্যি, হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। তিনি এখন কেবলই একটি লাশ!

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু থেকে যদি আমরা শিক্ষা নিতাম! তাঁর সহকর্মী, সমমনা, শুভার্থী ও ভক্তবৃন্দ শিক্ষা নিতেন! এত জনপ্রিয় ব্যক্তি, সুনীলের ভাষায় যিনি শরৎকেও ছাড়িয়ে গেছেন, যার বন্দনায় সারা দেশ মাতোয়ারা, যার মৃত্যুতে পুরো দেশ শোকাতুর, প্রধানমন্ত্রী থেকে নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানিত ব্যক্তিরাও যার বিদায়ে নির্বাক, ব্যথাতুর- আজ তাঁকেও চলে যেতে হচ্ছে সেই ঠিকানায় যেখানে রাষ্ট্রের সবচে নিঃস্ব ব্যক্তি ঠাঁয় নেয়। যেখানে ঈমান ছাড়া কোনো কিছুরই কোনো মূল্য নেই। অনলাইন নিউজ সাইটে সদ্যই দেখলাম মরহুমকে ঠিক তেমনি মাটির অতি সাধারণ বিছানায় চিরনিদ্রায় রেখে আসা হচ্ছে, যেখানে আর দশজন সাধারণ মানুষকে কবর দেয়া হয়!

এখন কেউ বলছে না, হুমায়ূন আহমেদ; সবাই বলছে হুমায়ূনের মরদেহ, লাশ। আহ্, এখন তাঁর সব কীর্তিই অন্যের; তাঁর কেবল তা-ই যাকে তাঁর স্নেহের ছোট ভাই জাফর ইকবাল অন্ধের মত অস্বীকার করে এসেছেন। ব্যঙ্গ করেছেন অবিবেচকের মতো। শাওনের মতো কুশীলবরা যার প্রতি ন্যূনতম নজর দিতে পারেন নি রবীন্দ্রসঙ্গীতে অতি আসক্তির পরিণতিতে। পরকালের সম্বল কেবল তা-ই যা তিনি সামাজিক উৎসবের অংশ হিসেবে শুক্রবার বা ঈদের নামাজে কামাই করেছেন। কিংবা সেই নেক আমল যার সম্পর্কে আমরা অজ্ঞাত। যা তিনি নিবেদন করেছেন কেবলই এক আল্লাহর জন্য।

হায়, বইমেলায় স্বাক্ষরের জন্য অসংখ্য ভক্তের লাইনের আজ কোনোই মূল্য নেই। অসাধারণ নাটক বা চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিভার আজ কানাকড়িও দাম নেই। কিংবা গুলতেকিনকে পাগলকরা তরুণ অধ্যাপক ড. হুমায়ূন আহমেদের মেধার আলাদা কোনো আবেদন নেই। চার সন্তানের জননীর হৃদয় থেকে নিঠুর ভাবে কেড়ে নিয়ে যে বিত্ত-সম্মানের মোহে মেয়ের বয়েসী শাওন ঘর বেঁধে দুটো এতিমের সংখ্যা বাড়ালেন, সেই বিত্ত-সম্মানের আজ কোনো বৈশিষ্ট্য নেই- আজ সবকিছুর নাম কেবল একটি লাশ! হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ!

বোন, শাওন! ভাই জাফর ইকবাল, সত্যি বলছি, হূমায়ুনের মৃত্যুতে আমিও শোকাহত। আপনাদের মতো আমিও ব্যথিত। আপনাদের চোখ থেকে যা ঝরছে আমার তা ঝরছে হৃদয় থেকে। আহ, আজ যদি আপনারা না কেঁদে, এ জাতি তাঁর কেবল মৌখিক গুণকীর্তন না করে বিনম্র ভালোবাসায় তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করত। ওপারে কাজে আসবে এমন কিছু করত তাঁর জন্য, তবে কতই না ভালো হত। হ্যা, এই যে ফুলেল শ্রদ্ধা, বিগলিত ভালোবাসা আর বাস্তবোচিত অকৃপণ প্রশংসা সবই তাঁর প্রাপ্য। কিন্তু সত্যি কথা হল, চোখ বোজার পর এর কোনোটাই তাঁর কাজে আসার নয়। হ্যা, হুমায়ূন আহমেদের দুর্দান্ত মেধাবী যে মেয়েটি তাঁর নাস্তিক চাচাকে হতাশ করে আমেরিকা থেকে ডক্টরেট ডিগ্রির সঙ্গে মাথায় হিজাবখানাও এনেছেন তাঁর প্রার্থনা কাজে আসবে সবচে বেশি।

হায়, কতই না ভালো হত যদি তিনি আল্লাহর দেয়া এমন বিরল প্রতিভার খানিকটা তাঁর দীনের কাজে লাগাতেন! হুমায়ূন, জাফর আর আহসান হাবীবদের দাদার মতো পরকালের কিছু পাথেয় সংগ্রহে ব্যবহার করতেন! আল্লাহর দেয়া প্রতিভার বদৌলতে কামানো অঢেল বিত্তের কিছু সেন্টমার্টিনের বিলাসভবন কিংবা গাজীপুরের নুহাশ পল্লীর মতো কবরে ঘুমিয়েও যার বেটিফিট পাওয়া যাবে এমন কিছুর নির্মাণে ব্যয় করতেন! হ্যা, নিজ এলাকায় একটি স্বপ্নের বিদ্যালয় করেছেন। দু’আ করি তা যেন হয় আপনার কবরের জন্য বিনিয়োগ। প্রিয় হিমু, মিসির আলীরা, আজ আমি এসব ভেবেই ব্যথিত।

আপনাকে আমাকে সবচে বেশি যিনি ভালোবেসেন, আমাদের কল্যাণচিন্তায় যিনি অনুক্ষণ বেচাইন থেকেছেন সেই মহানবীর ভাষ্যমতে : মানুষের মৃত্যুর পর তাঁর পুণ্য কামাইয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে যায়। কেবল খোলা থাকে তিনটি পথ : সাদাকায়ে জারিয়া (জনকল্যাণমূল্যক কিছু), নেক সন্তান যে কিনা তাঁর জন্য দু‘আ করে এবং এমন ইলম বা বিদ্যা যা থেকে মানুষ উপকৃত হয়। (ভাবার্থ, তিরমিযী : ১৩৭৬) ইস্, আমাদের প্রিয় এই লেখক যদি হাদীসখানার কদর করতেন। আমাদের অজ্ঞাতে যদি তিনি এই তিনটি খাতের কোনোটি খুলে রেখে যান তবে তো বড়ই আনন্দের বিষয়। দু‘আ করি তা-ই যেন হয়। কিন্তু হায়, মিডিয়াগুলো তাঁর নাটক-সিনেমার কীর্তিকগুলোই তো বারবার স্মরণ করছে। তাঁর প্রতিটি মৃত্যু দিবসেই তারা তাঁর এসব কীর্তিকে মহিয়ান করে তুলে ধরবে। অথচ যত বেদনাদায়ক মনে হোক না কেন, সত্যি হলো তা কেবল তাঁর আত্মাকে কষ্টই দেবে।

হায়, অন্য তারকারা যদি একটু চিন্তা করতেন! যে মিডিয়াগুলো আজ মরহুমকে নিয়ে এত মাতামাতি করছে। তারা কিন্তু পিতাহারা শোকাকুল সন্তানদের শান্তিতে চোখের পানিও ফেলতে দিচ্ছে না। যে মিডিয়া আজ হুমায়ূন আহমেদকে আকাশে তুলে দিচ্ছে, তারা সত্যিই তাঁকে ভালোবাসে? তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার দাবি ছিল সবাইকে এ সময় কর্তব্যের কথা মনে করে দেওয়া। মিডিয়াগুলো নিজের স্বার্থেই মানুষকে আকাশে তোলে, আবার মাটিতে নামিয়ে আনে। এ জন্যই তারা মানুষকে পরকালের কথা মনে করিয়ে দেবার বদলে সে সময় মরহুমের পুরনো পাপের কাসুন্দি ঘাটে। তারকাদের তওবার পথও যেন বন্ধ করে দিতে চায় এই মিডিয়া। অনেকেই হয়তো জানেন না, বড় বড় তারকারা যখন মৃত্যুর প্রহর গোনেন, ঝানু মিডিয়ার লোকেরা তখন চিন্তা করেন কি করে তাঁর মৃত্যুর পর এক্সক্লুসিভ কিছু দেয়া যায়। গুণধর এই লোকটি মারা যাবার পরপরই দেখুন প্রতিটি মিডিয়া ব্যতিব্যস্ত হয়ে তাঁর শেষ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে শুরু করেছে! সন্দেহ নেই তাঁর মৃত্যুর আগে থেকেই ছিল মিডিয়ার এই আপাতনিষ্ঠুর প্রস্তুতি।

অতএব হে, শীলা, নোভা, বিপাশা, নুহাশ, নিনিত ও নিষাদ, হে জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব আর হুমায়ূন ভক্তরা, সবাই কেবল একমাত্র আল্লাহর কাছেই দু‘আ করুন প্রিয় মানুষটির জন্য। সবাই শিক্ষা নিন দুনিয়ার তাবৎ কর্মকাণ্ডের মধ্যেও আখিরাতকে না ভোলার। জীবনের প্রতিটি পর্বে একবার নিজেদের স্রষ্টা ও নিয়ন্তা মালিকের প্রতিও তাকান। তাঁর নির্দেশ অমান্য করতে গিয়ে একবার ভেবে দেখুন। পরিশেষে একটি হাদিস দিয়ে ব্যথিত বেদন শেষ করব। শাদ্দাদ ইবন আউস রাদিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘প্রকৃত জ্ঞানী সেই ব্যক্তি, যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য নেক কাজ করে। আর অক্ষম সেই যে নিজের নফসকে প্রবৃত্তির পেছনে পরিচালিত করে এবং আল্লাহর কাছে কেবল প্রত্যাশা করে।’ [তিরমিযী : ২৪৫৯]

আমাদের জীবন ও মরণদাতা আল্লাহর একটি বাণীও এখানে প্রণিধানযোগ্য। পবিত্র কুরআনে তিনি বলেন, ‘এই হচ্ছে আখিরাতের নিবাস, যা আমি তাদের জন্য নির্ধারিত করি, যারা যমীনে ঔদ্ধত্য দেখাতে চায় না এবং ফাসাদও চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।’ {সূরা আল-ক্বাসাস, আয়াত : ৮৩} হ্যা, শুভ পরিণাম কেবলই আল্লাহভীরুদের জন্য। শেষ পরিণামে তাঁরাই সফল যারা আল্লাহর দেয়া জীবনটাকে আল্লাহর মহত্ব আর বড়ত্ব প্রচারে ব্যয় করেন। যারা মালিকের দেয়া মেধা আর আয়ূটাকে মালিকের তুষ্টির কাজেই নিয়োজিত রাখেন।

হে আল্লাহ, সেই সৌভাগ্যবানদের সারিতে আমাদের অন্তর্ভুক্ত করুন যাদের জন্য আপনি শুভ পরিণাম নির্ধারণ করেছেন। হে ক্ষমার আধার প্রভু, এ দেশের লাখো-কোটি মুসলিম যার ভালোবাসায় অশ্রু বিসর্জন করছে আপনার সেই মেধাবী বান্দাটিকে ক্ষমা করুন। তাঁর দোষগুলো ঢেকে রেখে আপনি তাঁকে মাগফিরাতের ঝর্নাধারায় সিক্ত করুন। তাঁর শোকে কাতর পরিজনদের ধৈর্য দিন। তাঁদেরকে আরও তাওফিক দিন অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতকে সুন্দর বানাবার। আমীন।