ক্যাটেগরিঃ চারপাশে

 

গতকাল রাত সাড়ে নয়টায় উত্তরা থেকে বাসায় যাবার উদ্দেশ্যে হাউজবিল্ডিং এলাম। মানুষকে ইতস্তত ছোটাছুটি করতে দেখে এগিয়ে গেলাম। ২৭ ভিআইপি পরিবহনের একটি গাড়ি প্রাইভেট কারকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দিয়েছে। প্রাইভেট কারটি সামনে সিগন্যালে দাঁড়ানো আরেকটি কারের সঙ্গে প্রচণ্ড ধাক্কা খায়। তিনটি গাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে মাঝের এই কারটির চালক বুক মাথা ও হাঁটুতে প্রচণ্ড আঘাত পান। সব মিলিয়ে চার জন লোক আহত হন। এমতাবস্থায় উপস্থিত লোকদের প্রধান করণীয় ছিল আহতদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। কিন্তু আশপাশে বেশ কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় এখানে যা হবার তাই হলো। মহাসমারোহে নির্বিচার গাড়ি ভাংচুর শুরু হলো। সবার মনোযোগ সেদিকে। পুলিশ এসেও তাদের নিবৃত করতে পারছিল না।

এমন সময়ে আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে প্রথমে পরিস্থিতি বুঝতে চেষ্টা করলাম। হঠাৎ ২৭ এর চালককে কোত্থেকে খুঁজে আনল কে যেন। মার শুরু হবার আগেই সে হাউমাউ করে কাঁদা শুরু করল। কিন্তু কে শোনে কার কথা। যেভাবে তাকে মারা শুরু করল জানি না শেষ পর্যন্ত সে বাঁচল না মরল। আমার একার ক্ষীণ কণ্ঠ কারো কানেই পৌঁছাল না। অন্যায়ের প্রতিবাদে অন্যায়ের সাধারণ ঘটনাই ঘটে চলল। হঠাৎ আমার পেছনে বোরকা পরা মহিলার আর্তনাদ শুনে দৌড়ে গেলাম। তিনি কোন গাড়িতে ছিলেন বুঝতে পারলাম না তবে গুরুতর আহত হয়েছেন। চিৎকার করে বললাম, ভাই আগে মানুষ বাঁচান তারপর বিচার করেন। দু’জন লোককে দিয়ে রিক্সা আনিয়ে তাকে এবং আরেক রিক্সায় আরেকজনকে পাঠানো হলো অদূরের উত্তরা আধুনিক মেডিকেলে।

আরেকটু এগিয়ে ঘাতক গাড়ির পাশে ফুটপাথে পেলাম ওই প্রাইভেট কারের আহত চালককে। আমাকে ইশারায় কান তার মাথার কাছে নিতে বললেন। কাতরকণ্ঠে বললেন, আমাকে একটা সিএনজিতে তুলে দেন। আমি বললাম, আগে আপনাকে হাসপাতালে নেই। বললেন, না আমি বুকে বেশি ব্যথা পেয়েছি, দয়া করে আমাকে সিএনজিতে তুলে দেন। আমি বললাম, আপনার বাসার কারো নাম্বার বলেন, অতি কষ্টে নাম্বার বললে আমি তাতে ফোন করে বললাম জলদি দু’জন ছেলে মানুষকে হাউজবিল্ডিং পাঠান। ওপাশ থেকে সম্ভবত উনার স্ত্রী কান্না শোনা গেল। পুলিশের সাহায্য চাইলে একজন হৃদয়বান পুলিশ একটি সিএনজি ডেকে দিলেন। কিন্তু প্রায় বেহুশ এই লোকটি একা যেতে পারবে? কে যাবে তার সঙ্গে? কয়েকজন রিকোয়েস্ট করে কাজ হলো না। অগত্যা আমিই নিয়ে গেলাম। তার বাসায় পৌঁছে দিয়ে আমার বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে গেল। তারপরও একটি ভালো কাজের তৃপ্তি আমার সব ক্লান্তিকে ম্লান করে দিল।

বাসায় ফেরার পথে ভাবছিলাম, আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে যারা বের হয়ে আসছে এরা কী শিক্ষা নিয়ে ঘরে ফিরছে? এদের জীবনাচরণে এত উগ্রতা কেন?

পুনশ্চ : আজ সকালে ওই আহত ভাই ফোন করেছিলেন। তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তার বাসায় যাবার কথা বললেন। আমি তাকে ভালো করে চিকিৎসা ও বিশ্রাম নিতে বললাম। ডাক্টার তাকে এক্স রে করতে বলেছেন। তার বুকের ব্যথা নাকি এখনো কমে নি। দুআ করি আল্লাহ যেন ওই ভাইকে দ্রুত সুস্থ করে দেন। তার বুকের জখম যেন মারাত্মক না হয়।