ক্যাটেগরিঃ ধর্ম বিষয়ক

 

ইসলাম মানুষের আত্মিক ও পার্থিব উভয় দিককেই বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। বিভিন্ন ধরণের ইবাদত, যিকির, দু‘আ, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি আত্মিক বিষয়গুলোর বিধিবিধান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে জাগতিক বিষয়গুলো সংক্ষিপ্তাকারে উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা ইসলাম সর্বদা পরকালের ভাবনাকেই সর্বাগ্রে বিবেচনা করে। দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, আখিরাতের শস্যক্ষেত ও নেক আমলের চারণভূমি। তবে মানুষের জীবন যাপনের প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন: খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও জীবন ধারণের অন্যান্য উপাদানকে উপেক্ষা করেনি। বাসস্থান নির্মাণ করা মানুষের জীবন যাপনের অত্যাবশকীয় উপাদান। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “আর আল্লাহ তোমাকে যা দান করেছেন তাতে তুমি আখিরাতের নিবাস অনুসন্ধান কর। তবে তুমি দুনিয়া থেকে তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না”। [সূরা : আল্-কাসাস, ৭৭]

সুন্দর একটি বাড়ি মানুষের জীবনে লালিত স্বপ্ন, প্রশান্তির লাভের জায়গা, সর্বোপরি এটি মহান আল্লাহর অপার নি‘য়ামত যা তিনি বান্দাহকে দান করেন। আল্লাহ বলেছেন, “আর আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলোকে তোমাদের জন্য আবাস করেছেন এবং তোমাদের পশুর চামড়া দিয়ে তাবুর ব্যবস্থা করেছেন, যা খুব সহজেই তোমরা সফরকালে ও অবস্থানকালে বহন করতে পার। আর তাদের পশম, তাদের লোম ও তাদের চুল দ্বারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গৃহসামগ্রী ও ভোগ-উপকরণ (তৈরি করেছেন)। আর আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন, তা থেকে তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং পাহাড় থেকে তোমাদের জন্য আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন, আর ব্যবস্থা করেছেন পোশাকের, যা তোমাদেরকে গরম থেকে রক্ষা করে এবং বর্মেরও ব্যবস্থা করেছেন যা তোমাদেরকে রক্ষা করে তোমাদের যুদ্ধে। এভাবেই তিনি তোমাদের উপর তার নি‘আমতকে পূর্ণ করবেন, যাতে তোমরা অনুগত হও। [সূরা: আন-নাহাল: ৮০-৮১]

মানুষের জীবনে ঘর-বাড়ির গুরুত্ব অপরিসীম বলে ইসলাম এ সম্পর্কে কতিপয় দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। মুসলিম হিসেবে আমাদের সব কাজই হওয়া উচিত ইসলামের নির্দেশনা অনুযায়ী। তাহলে আবাসন ক্ষেত্রে ব্যয় করেও সওয়াবের অধিকারী হওয়া যাবে। জীবনের অনস্বীকার্য উপাদান ও মানবিক চাহিদার বিবেচনায় ইসলামি শরি‘য়ত আবাসন নির্মাণ বৈধ করেছে এবং এ সম্পর্কে কতিপয় নীতিমালা নির্ধারণ করেছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, জনসাধারণ ও ব্যক্তি বিশেষ কাউকে ক্ষতি বা কষ্ট না দেয়া। ইসলামের প্রতিটি বিধানের মূলই হলো কাউকে কষ্ট না দিয়ে ও কারো প্রতি সীমালঙ্ঘন না করে নিজের মালিকানা ভোগ করা। প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা, শুফ‘আর হক (পাশের জমির মালিকের হক) আদায়, ভবনের উপর ও নিচ তলার মালিকদের হক আদায় ইত্যাদি ইসলামের অপরিবর্তনীয় নীতিমালা। এসব অধিকার আদায়ের ব্যাপারে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্ষতি করাও যাবে না, ক্ষতি সহ্য করাও যাবে না। (ইবন মাযাহ: ২৩৪০, সহীহ)। প্রতিবেশীর হকের ব্যাপারে কুরআন ও হাদীসে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করে। (মুসলিম: ৪৮)। রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন, “জিবরীল (আঃ) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অবিরত উপদেশ দিচ্ছিলেন, এমনকি আমার ধারণা হলো যে, অচিরেই তিনি তাকে হয়তো ওয়ারিস বানাবেন”। (বুখারী: ৬০১৫, মুসলিম: ২৬২৫)

নানা কারণে প্রতিবেশীর ক্ষতি সাধিত হয়, যেমন, ধোঁয়া, দুর্গন্ধ, উচ্চশব্দ, রাস্তার অপব্যবহার, দরজা ও জানালা দিয়ে কারো ঘরের দিকে দৃষ্টিপাত করা ইত্যাদি। সুতরাং অন্যকে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে গৃহ নির্মাণ করা হারাম। এমনকি কাউকে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্য না থাকলেও জমির মালিকের কার্যক্রমে যদি ক্ষতির আশংকা থাকে তবে ফিকহবিদদের মতে তাকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা হবে। যেমন কেউ তার জমিনের সীমানায় যদি কাঁটাযুক্ত গাছ লাগায় বা এমনভাবে গৃহ নির্মাণ করল যা অন্যকে আলো বাতাস থেকে বঞ্চিত করে। মোটকথা হলো, যথাসাধ্য অন্যের ক্ষতি না করে নিজের মালিকানা উপভোগ করার চেষ্টা করা। গৃহ নির্মাণের জন্য জায়গা ও উপকরণ হালাল হওয়া পূর্বশর্ত। জোরপূর্বক অন্যের জায়গায় বাড়ি ঘর নির্মাণ করলে তা মালিককে ফেরত দিতে হবে। সুউচুঁ অট্টালিকা নির্মাণ, নির্মাণ কাজে অপব্যয়, জালিম ও অমুসলিমদের অনুসরণ না করা উচিত। কেননা অতিউচুঁ ভবন নির্মাণ কিয়ামতের আলামত, ভূমিকম্পে ক্ষতির সম্ভাবনা বেশি আর এটা কখনও কখনও অহংকারের কারণ। তবে প্রয়োজন হলে উচুঁ ভবন নির্মাণে কোন বাঁধা নেই। জিবরীল (আঃ) কিয়ামমের আলামত সস্পর্কে রাসুল (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, “দাসী তার প্রভুর জননী হবে, আর নগ্নপদ, বিবস্ত্রদেহ দরিদ্র মেষপালকদের বিরাট বিরাট অট্টালিকার প্রতিযোগিতায় গর্বিত দেখতে পাবে।(বুখারী: ৪৭৭৭, মুসলিম: ৮)।

তাছাড়া গৃহকে অতিসাজে সজ্জিত করা, অতিকারুকার্য করা মাকরূহ। কেননা মানুষ এ জগতে স্থায়ী নয়, এখানে প্রয়োজন অনুসারে মানুষের জীবন অতিবাহিত করা উচিত। হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমি একটি মসৃণ চাদর দিয়ে দরজার পর্দা বানালাম। রাসূল (সাঃ) যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে যখন চাদরটি দেখতে পেলেনতখন তার চেহারায় আমি অসন্তুষ্টির আলামত প্রত্যক্ষ করলাম। তিনি তা টেনে নামিয়ে ফেললেন,এমনকি তা ছিঁড়ে ফেললেন অথবা টুকরা টুকরা করে ফেললেন। আর বললেন, আল্লাহ পাথর কিংবা মাটিকে পোশাক পরানোর হুকুম আমাদের দেননি। আয়েশা (রাঃ) বলেন, আমরা চাদরটি কেটে দু-টি বালিশ বানালাম এবং সে দুটির ভিতরে খেজুর গাছের অংশ ভরে দিলাম। তাতে তিনি আমাকে দোষারোপ করলেন না। (মুসলিম: ২১০৭) এ হাদীস থেকে বুঝা যায় অতিসাজসজ্জা করা মাকরূহ। তবে কেউ যদি আল্লাহর নি‘য়ামতের শুকরিয়া আদায়ের জন্য কারুকার্য ও সৌন্দর্য করে তবে তা জায়েয। আপনার গৃহটি যেন স্থায়ীত্ব, শক্ত, মজবুত ও হালাল উপকরণের দ্বারা তৈরি হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন। কেননা আল্লাহ তা‘য়ালা বান্দাহর মজবুত ও নিপুন কাজ পছন্দ করেন। পর্যাপ্ত আলো বাতাস, পানির সুব্যবস্থা ও পরিবেশের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে মসজিদের আশেপাশে গৃহ নির্মাণ উত্তম। কেননা মু’মিনের জিন্দেগী মসজিদ ছাড়া পানি ছাড়া মাছের ন্যায়। আপনার স্বপ্নের বাড়িতে পরিবার পরিজনের সতর যেন উত্তমরূপে রক্ষা হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখবেন। দরজা জানালা এমনভাবে তৈরি করা যেন অন্য ঘর থেকে তাকালে সরাসরি মানুষের চোখ না পড়ে। বিশেষ করে ঘরের একই দিকে সব দরজা দেয়া ঠিক নয়, এতে সামনের রুম থেকে ভিতরে তাকালে অনায়াসেই অন্দর মহলের সব কিছু দেখা যায়। ঘরের ছাদে কেউ আরোহণ করলে তাকেও খেয়াল রাখতে হবে যে, সে যেন অন্য কারো ঘরের দিকে তাকিয়ে তাদেরকে বিব্রত না করে। ঘরের মধ্যে ছেলে মেয়ে আলাদা থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। মেহমানদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা থাকা চাই। নারী পুরুষ যেন পর্দার বিধান রক্ষা করে সাচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারে সে ব্যবস্থাও রাখতে হবে। আপনার কাজের ছেলে মেয়েটিও যেন তার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় গৃহ নির্মাণের সময় সেদিকেও খেয়াল রাখবেন। সর্বোপরি, ইসলাম মানুষের জান, মাল, ইজ্জত হেফাযতে সব ধরণের নির্দেশনা দিয়েছে। সেগুলোর দিকে খেয়াল রেখেই সামর্থ অনুযায়ী সুন্দর পরিবেশে বাসস্থান নির্মাণ করা উচিত।

আব্দুল্লাহ আল মামুন আল আযহারী

(লেখক, অনার্স আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, মাস্টার্স ও এম, ফিল কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়, মিশর)

 

আরো পড়ুনঃ

আব্দুল্লাহ আল-মামূন