ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

সময়টা ফেব্রুয়ারি ২০১৬ সাল। ভারতের স্বনামধন্য জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (ডিএসইউ) কিছু প্রাক্তন সদস্য একটি সাংস্কৃতিক সভার আয়োজন করে। সভার উদ্দেশ্য ছিল, উদ্যোক্তাদের ভাষায়, ‘মকবুল ভাট এবং আফজল গুরুর বিচার বিভাগীয় হত্যার প্রতিবাদে এবং কাশ্মীরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের গণতান্ত্রিক অধিকারের সংগ্রামে সংহতি প্রকাশ’। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিজেপি নিয়ন্ত্রিত ছাত্র সংগঠন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের ক্যাম্পাসে মাইক ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং শেষমেষ পুলিশ দিয়ে তাদের উচ্ছেদ করে।

ডিএসইউ সাহায্য চায় জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (জেএনইউ-এসইউ)। সাথে অন্যান্য বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো, এসএফআই, এআইএসএ- এরা একজোট হয় গণতান্ত্রিক এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা করার অধিকার রক্ষায়। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেফতার করা হয় জেএনইউ-এসইউ’র সভাপতি কানহাইয়া কুমারকে। অভিযোগ দেয়া হয় ‘কাশ্মীরের স্বাধীনতা চাওয়া জনগণকে সমর্থনের’। ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে কুমারের মুক্তি দাবির আন্দোলন। প্রথমে সেই আন্দোলনের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা, তারাও শিকার হয় পুলিশি ও ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হামলার। এভাবে রাজধানী দিল্লিসহ বেঙ্গালুর, চেন্নাই, জয়পুরসহ বিভিন্ন স্থানে কানহাইয়া কুমারের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন হয়।

এই ঘটনাটি বলার কারণ হলো, এই আন্দোলনের সাথে ছাত্রদের সংশ্লিষ্টতা সাধারণ বিষয়, কিন্তু এই ন্যায়ের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষকগণের ভূমিকা ভারতের ছাত্র আন্দোলনকে আজ অবধি স্মরণীয় করে রেখেছে। কলকাতায় শিক্ষার্থীদের উপর পুলিশি হামলার পরে
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সুরঞ্জন দাস বলেন, “দরজা বন্ধ করে, ফোর্স দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা যায় না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ হলো মুক্ত চিন্তার জায়গা।” গণতন্ত্রে সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন সুরঞ্জন দাস। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ছাত্র আন্দোলন করে জেএনইউ’র সমর্থনে প্ল্যাকার্ড ছাপিয়ে মিছিল করে। অন্যদিকে ছাত্রদের আন্দোলন থামাতে মরিয়ে হয়ে উঠে প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে বলা হয় উপাচার্যকে। কিন্তু সুরঞ্জন দাস সাফ জানিয়ে দেন, তিনি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করবেন না এবং পুলিশ ডেকে তিনি ক্যাম্পাস শাসন করবেন না। সেরকম কিছু হলে পদত্যাগ করবেন। উপমহাদেশর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রমিলা থাপার সহ প্রায় ১২০ জন শিক্ষক তখন ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ায়। রমিলা থাপার বক্তব্য দেন জেএনইউ ক্যাম্পাসে। ‘দ্যা নেশন এন্ড হিস্ট্রি- নাউ এন্ড দেন’ প্রবন্ধে তুলে ধরেন সমকালীন রাজনীতি, বাক স্বাধীনতা ও ইতিহাসের আলোকে উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদ।

এখন আসা যাক আমাদের দেশের প্রক্ষাপটে ভারতের ছাত্র জাগরণ কতটা সম্পর্কিত। এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ দফা দাবি নিয়ে মাঠে নামে দেশের সকল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে টনক নড়েনি সরকারের কিংবা বুদ্ধিজীবি মহলের। এরপর নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটে এই নিয়ে। দেশের সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ যাবতকালের সব থেকে বড় প্রশাসনিক দুর্বলতার প্রমাণ দেয়। উপাচার্যের স্ববিরোধী বক্তব্য, প্রক্টরের প্রশাসনিক দুর্বলতা, সব শেষ কবি সুফিয়া কামাল হলের নাটকীয় ঘটনা এবং প্রভোস্টের অদক্ষতা তাদের এ দুর্বলতার প্রমাণ দেয়।

একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গোটা জাতির কাছে সম্মানিত ব্যক্তি, কিন্তু জাতির বিবেকদের এহেন অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অদক্ষতা তাদের ‘বুদ্ধিজীবী’ ও ‘জাতির বিবেক’ খ্যাতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই শিক্ষকদের  যেভাবে মেরুদণ্ডহীন বলছে সবাই, তাতে কেবল তাদের সম্মান নয়, আমাদেরও লজ্জা লাগছে। শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নয়, ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আড্ডায় আজ তারা হাসি-তামাশার বিষয়।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দাবিতে সচেতন শিক্ষকদের ব্যানারে যারা মানববন্ধন করেছেন সেখানে শিক্ষকের সংখ্যা ছিল খুবই কম। এখন প্রশ্ন হলো প্রায় ১৮ শত শিক্ষকের মাঝে মাত্র ২০ জনই কি সচেতন? নাকি সাদা-কালো-নীল আর গোলাপি রঙের শিক্ষকরা সচেতন নন? আমি দেখেছি যখন কোন শিক্ষক অন্যায় ভাবে নির্যাতিত হন তখন সাদা-কালোর বিভেদ থাকে না, সবাই শিক্ষক হয়ে যান। কিন্তু যেই শিক্ষার্থীদের জন্য তারা শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের দিনে তারা সাদা-কালোর রাজনীতি করেন!

আমারা ঊনসত্তর, নব্বই, ছিয়ানব্বইয়ের ছাত্র আন্দোলনের কথা বাদই দিলাম, কিন্তু নিকট অতীতে ঘটে যাওয়া ভারতের যে উদাহরণটি টেনেছি তাতে আমাদের শিক্ষকদের তো অনেক কিছুই শেখার ছিল। ভারতের ছাত্র আন্দোলনে যেখানে শিক্ষকরা একাত্মাতা প্রকাশ করেন, প্রতিবাদে নিজের উপাচার্যের দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার হুশিয়ারি দেন সেখানে আমাদের দেশে ছাত্র আন্দোলন চলাকালে অনেক ‘গুণী’ শিক্ষক ছাত্রদের বিপক্ষে দাঁড়ান। গত ৮ এপ্রিল রাতের ঘটনায় যে ছাত্ররা আহত হয়েছে তাদের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাঁড়ায়নি। অনেক সমালোচনার পর একদিন মাত্র দেখতে গিয়েছেন তাদের।

শিক্ষকতা কি শুধুই একটা পেশা? যে কোন পেশাতেও যে দায়িত্ববোধটা থাকে তা কি আমাদের শিক্ষকদের মাঝে আছে? ছিল কি এই কয়েকদিন? আজ ১৬ দিন পর (২৪ এপ্রিল) ঢাবি শিক্ষক সমিতি কালো ব্যানারে সংবাদ সম্মেলন করে বললেন, “ছাত্রদের উপর নির্যাতন করা যাবে না।” ব্যাস, শেষ হয়ে গেল দায়িত্ববোধ!

আমাদের দুঃখ, আমারা ইতিহাস বিকৃতকারী শিক্ষককে অব্যাহতি দিতে পারি, কিন্তু ইতিহাসের দ্বার আটকে দেয়া আর কোন এক রাজনৈতিক দলের ‘ইয়েস ম্যান’ হওয়া শিক্ষকদের ‘নো’ বলতে পারিনা। এই শিক্ষকরা যেন যেন পার্টটাইম শিক্ষক আর ফুলটাইম রাজনীতিবিদ!