ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

বৃষ্টি কখন যে শুরু হয়েছে আর কখনইবা থামবে- দুটোর কোনটারই ইয়ত্তা নেই। শহরে বর্ষা মানেই এক হাঁটু জল, কাদাপানি মাড়িয়ে অফিস ছুটতে থাকা। ভোগান্তির মাত্রা এমনই চরমে যে, রবি ঠাকুরের ‘ঝর ঝর মুখর বাদল’ উপভোগ্য হয়ে ওঠে না। ফুটপাত থেকে দালানের চৌকাঠ, সবখানেই জলের বাড়বাড়ন্ত। বর্ষা নগর জীবনে প্রাণের স্পন্দন থামিয়ে দিয়ে যায় যেন।

অথচ শৈশবে এই বর্ষায়, একটা ‘রেইনি ডে’ আশীর্বাদ হয়ে আসতো। সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ রগরাতে রগরাতে যেদিন অঝোর বৃষ্টির সাথে দেখা হতো, সেই দিনের মত আনন্দময় আর কিছুই যেন হয় না।

মফস্বলের শেষ দিকটায় দিগন্ত জোড়া মাঠে একবার একটা মার্বেল কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই ছিল সর্বোচ্চ সুখকর স্মৃতি। কিন্তু বলা-কওয়াহীন এই বর্ষার আগমন সেই স্মৃতিকে এক ঝটকায় কোথায় যেন দমকা বাতাসের সাথে উড়িয়ে নিল।

এমন দিনে মা বলতেন, ‘থাক আজ আর স্কুলে গিয়ে কাজ নেই’। এরপরই অপ্রত্যাশিত দিনটা কীভাবে কাটবে তার পরিকল্পনা শুরু হয়ে যেত। ঘরের দেরাজ, উঠোনের কোনা বা সিলিং থেকে বের হতো কিম্ভূত সব খেলনা। যেন গুপ্তধন। শৈশবের খেলনা বলতে তো সেই। প্ল্যাস্টিকের আধিক্য সেসময় ছিল না। হয় জোড়াতালি দেওয়া কাঠের বাক্স, যার ভেতরে ভরা রাজ্যের মনি-মুক্তো আর মনোপলি। লাটিম, মার্বেল, ম্যাচের খোল, ভাঙা পিস্তল, চুম্বক কত কি!

খেলনার দিকে শুধু তাকিয়ে থেকেই গোটা সময় বয়ে যেত। সকালটা কোথা দিয়ে যে উড়ে যেত! সাথে সেসময় সঙ্গী-সাথী পাড়ার ছেলেমেয়েরা। বৃষ্টি না থামলে কী হবে; ঘরে বসে থাকার জো নেই ডানপিটে শৈশবের।

মা অবশ্য এতো কিছুর খোঁজ রাখতেন না। হারাধনের ছেলের মতো কোথায় যেতাম কী করতাম তা নিয়ে ভাবার অত অবকাশ কোথায় একান্নবর্তী পরিবারে।

ঘরে ফেরা হতো কেবল দুপুরে খাওয়ার সময়। দুটো খেয়েদেয়ে মা যখন ভাতঘুমের আয়োজন করতেন, আমরা বসতাম কমিকস কিংবা গল্পের বই নিয়ে। বর্ষার রাজ্য থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য হারিয়ে যেতাম অজানা কোনও দুনিয়ায়।

মা ঘুমিয়ে পড়েছে; যখনই বুঝতে পারতাম, গুটিগুটি পায়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি ততক্ষণে। বৃষ্টি যদিও ছাড়েনি তখন। ধরে এসেছে কিছুটা সবে। তাতে কী? হাতঘড়ি না দেখেও বলে দেয়া যেত এখন সময় বেরিয়ে পড়ার। মাদবড় বাড়ি বা বড় বাড়ির চিলেকোঠায় ততক্ষণে জমায়েত পাড়ার বিচ্ছুগুলো। কার গাছে হানা দেয়া যায়, নতুন কী বানানো যায় জলঝড়ার দিনে বা কিছুই না হলে নিদেনপক্ষে জামাই-বউ খেলার ফিকির জমে গেছে।

দিনশেষে সরকার বাড়ির আতা, কর্নেল সাহেবের সাধের লাল পেয়ারা সাবার করে তবেই ঘরে ফেরা। একরাশ মন খারাপ ভর করতো তখন। সেই তো কাল আবার স্যারের কড়া শাসন। পড়তে বসে কেবলই জানালা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে রাতের আকাশে কী যেন দেখার চেষ্টা হতো। যেন এই রেইনি ডে শেষ না হয়। দিব্যি আর মানতের শেষ থাকতো না।

ছেলেবেলার সেসব পাগলামি মনে পড়লে এখন কেবল হাসি পায়।

মিটিমিটি হাসি থেকে সম্বিৎ ফিরে এলো বাসের কন্ডাক্টরের ডাকে- ‘মামা ভাড়াটা দেন’।

চারপাশে চেয়ে দেখি বৃষ্টির সকালে পরিবহন সংকটে প্রাণের শহর ঢাকা। তিন বাসের যাত্রী উঠে পড়েছে একটা গাড়িতে। রেইনি ডে’তে একটা সিট অন্তত আমার কপালে জুটেছে, তাই বা কম কিসে?

slide