ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

সম্প্রতি বিদ্যুত্ ইস্যুটি সারাদেশেই ব্যাপক আলোচিত। একদিকে আমরা সবাই বলছি বিদ্যুত্ নেই। লোডশেডিংয়ে সবার ঘুম হারাম। তীব্র গরম। তীব্র কষ্ট। নাভিশ্বাস উঠেছে সবার। বিদ্যুত্ পাচ্ছে না আলোকিত ঢাকা শহরের মানুষ। আলো পাচ্ছে না চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী—প্রধান শহরের মানুষ। সব জায়গাতেই একঘণ্টা অন্তর লোডশেডিং। বিদ্যুত্ নেই—ত্রাহি অবস্থা। তবে কি গ্রামে গ্রামে বিদ্যুতের বন্যা বইয়ে দেয়া হচ্ছে! প্রধান শহরগুলোকে অন্ধকার করে আলোকিত করা হয়েছে ৬৪ হাজার গ্রাম। না, সে কথাও সত্য নয়। গ্রামের অবস্থা আরও ভয়াবহ। সেখানে কেবলই খাম্বার বাহার। খালি খাম্বা আর খাম্বা। বিদ্যুতের নেটওয়ার্ক আছে। লাইন আছে। পল্লী বিদ্যুত্ আছে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ২-৪ ঘণ্টা বিদ্যুত্ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুত্ মিলছে না কোথাও। তাহলে প্রশ্ন হলো—প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী যে অঢেল বিদ্যুত্ উত্পাদন করলেন; বিদ্যুতের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে তার সরকার—সেই হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কোথায় যায়! এই বিদ্যুত্ বন্যার জামানা কায়েম করতে কত কষ্টই না করতে হয়েছে মহাজোট সরকারকে। কুইক রেন্টাল, বার্জ মাউন্টেড, কুইক মানি—নানা খাতে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে। এখনও হচ্ছে। জনগণের টাকা। রাষ্ট্রের টাকা। কারও বাপ-দাদার টাকা নয়। আজ হোক কাল হোক, অবশ্যই এই টাকার হিসাব দিতে হবে। আগামীতে যদি জবাবদিহির সরকার কায়েম হয়, এই কুইক রেন্টালের নামে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা কোথায় গেল, তার দায় এড়াতে পারবেন না মহাজোট সরকারের কর্ণধাররা। সারাদেশের মানুষ বলছেন বিদ্যুত্ নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলছেন—বিদ্যুতের অভাব নেই। নানা কুইক কাণ্ড ঘটিয়ে তিনি বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ ও প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে এই যে বৈপরীত্য, এর নেপথ্য কারণ কী? আমি বিশ্বাস করি না, প্রধানমন্ত্রী জেনে শুনে অসত্য বলছেন। প্রধানমন্ত্রীরা মিথ্যে বলতে পারেন না। প্রধানমন্ত্রী মিথ্যা বললে সে রাষ্ট্র আর কার্যকর থাকতে পারে না। আর প্রধানমন্ত্রীরা মিথ্যা বলেন, এমনটি আমি বিশ্বাসও করতে চাই না। তবে এ কথা ঠিক যে, কখনও কখনও প্রধানমন্ত্রীর কথা মিথ্যা হয়ে ওঠে। শুনে আমরা হা-হুতাশ করে উঠি—‘হায় হায়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী এভাবে ডাহা মিথ্যা বলছেন!’

তখন লজ্জায় মাথা কাটা যায় তার ভক্তদের। তারা গ্রামে গঞ্জে মুখ দেখাতে পারেন না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, মিথ্যা বলছেন প্রধানমন্ত্রী। তাকে দিয়ে মিথ্যা বলানো হয়। তার চারপাশকে ২৪ হাজার ওয়াট বিদ্যুতে সব সময় আলোকিত করে রাখেন কিছু মোসাহেব, কিছু চাটুকার। ওরাই মিথ্যা বলতে সুকৌশলে বাধ্য করে প্রধানমন্ত্রীকে। ওরা এমন সব পরিসংখ্যান, এমন সব গালগল্প হাজির করে—ডাহা মিথ্যাকেও প্রধানমন্ত্রীর কাছে মনে হয় ‘আহা কি অপরূপ সত্য’। এই চাটুকাররা হলো মিথ্যা বলার জাহাজ। এই শনিচক্রই বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে— শনৈঃশনৈ বিদ্যুত্ হচ্ছে দেশজুড়ে। কুইক রেন্টাল এমন সোনায় সোহাগা প্রকল্প আর হয় না।

এবার আসুন আমরা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করি, বিদ্যুত্ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা বলতে বাধ্য করছেন—এই ইন্দ্রজাল সম্রাট মোসাহেবটা কে! কী তার পরিচয়? আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা শেখ হাসিনাকে সারাদেশে বিদ্যুত্ বন্যার ধারণা দিয়েছেন—এমনটি মনে করার কোনো কারণ নেই, বরং তারা সুযোগ পেলেই সাবধান করার দুঃসাহসিক কাজটিই করেছেন বার বার। তবে বিদ্যুত্ মন্ত্রকের যিনি দায়িত্বে, তিনি কি মিথ্যা তথ্যে বিভ্রান্ত করে চলেছেন; তা-ও জোর দিয়ে বলা মুশকিল। কেননা ওই মন্ত্রকে পূর্ণ মন্ত্রী নেই; আছেন একজন অপূর্ণ মন্ত্রী—প্রতি বা ডেপুটি এমন কিছু একজন হবেন। তবে তার এমনই খাসা ইমেজ ও নামডাক; সম্প্রতি এক পরীক্ষায় বেচারার নাম বলে জানতে চাওয়া হয়েছিল—ভদ্রলোক কোন ডিপার্টমেন্টের প্রতিমন্ত্রী! বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, কেউই বলতে পারেনি। অথচ পরীক্ষার্থীরা সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ছিল। ফার্স্ট ক্লাস পাওয়াও ছিলেন অনেকে। এমনই নিঝুম মন্ত্রী এই বেচারা। সম্প্রতি মহাজোট নাট্য সংস্থার বিবেক গোলাম মাওলা রনির এক সুলিখিত রচনায় প্রতিমন্ত্রীদের হাল-হাকিকত সম্পর্কে জেনেছি। একজন ভয়ংকর প্রতিমন্ত্রীর কথা তিনি লিখেছেন খুবই সতর্কতার সঙ্গে—ওই পাতি মন্ত্রী আইজির কাছে নিবেদন রেখেছেন তার সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটু বলার জন্য। কেননা আইজির নিয়মিত যাতায়াত গণভবনে। পাতি বেচারা সেখানে ঢোকারই মওকা পায় না। আরও উপাদেয় কথাবার্তা জানিয়েছেন রনি মওলা। জমানা উল্লেখ না করে এক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথা তিনি বলেছেন যে, সেই লোক মন্ত্রী হওয়ার পর নিকটজন এমপিরা তার কাছে জানতে চেয়েছে—পুলিশ কি এখন তাকে স্যালুট দেয়? গাড়ল সেই প্রতিমন্ত্রী এত খুশি যে, রীতিমত অভিনয় করে দেখিয়েছে—কীভাবে পুলিশ তাকে স্যালুট দেয়। ভাবুন একবার প্রতিমন্ত্রীগুলোর অবস্থা।

বিদ্যুত্ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। তার সঙ্গে টুকটাক চিন-পরিচয় আছে মিডিয়ার মানুষ হিসেবে। তিনি আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মন্ত্রিসভায় তিনি অনালোকিত-অনালোচিত হতে পারেন কিন্তু স্মার্ট, কেতাদুরস্ত, সুদর্শন। প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার তিনি মানুষই নন। কুইক রেন্টালে তিনি তেমন কোনো করিত্কর্মা ভূমিকাও রাখতে পারেননি।
তাহলে কে সেই মোসাহেব!

ও হ্যাঁ, বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম—বিদ্যুত্ মন্ত্রক তো আসলে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। একজন মহাশক্তিধর উপদেষ্টার তীক্ষষ্ট শাসনে এটি একরকম সার্বভৌম মন্ত্রক। তিনিই সেখানে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী—তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। সাবেক সিএসপি। সুপুরুষ। উন্নত নাসা। চওড়া কপাল। ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টের ইংরাজি জানা লোক। যেমন চমত্কার করে বলেন, তেমনি অপূর্ব ভঙ্গি। আর তার যুক্তি—একটিও মাটিতে পড়ার নয়। এসব মানুষ যে অনুগ্রহ করে বাংলাদেশের মতো ফকিরা দেশে জন্মেছেন, সে আমাদের সাত বাঙালি জন্মের পুণ্যি। এনাদের দেখলেই মনে হয়, যদি তাদের জাতিসংঘে নিয়ে বাঁধিয়ে রাখা যেত, কত-শত উপকারই না আমরা পেতাম। তারপরও বাংলাদেশের জন্য কী প্রাণপাত তিনি করে চলেছেন। সিএসপি হওয়ার পর মুহূর্ত থেকেই অক্লান্ত দেশ সেবা করে চলেছেন। কিছুতেই তাকে সেবা থেকে বিরত রাখা যাচ্ছে না। সেবাই তার ধর্ম। তার বয়সের নাকি গাছ-পাথর নেই। তারপরও সেবা আর সেবা। পাকিস্তানকে সেবা দিয়েছেন। একজন বিচক্ষণ সিএসপি হিসেবে সঠিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধও করেছেন। তার টাইমিং অসাধারণ। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলেই কিংবদন্তি প্রশাসক। বাঘে-মোষে একঘাটে জল খেত তার হুকুমে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরও সেবা কার্যক্রম থামিয়ে দেননি। জিয়াউর রহমান, এরশাদ—সব আমলে সেবা দিয়ে গেছেন। কোনো সরকারকেই তিনি বঞ্চিত করেননি। সব ধরনের ফুলদানিতে মনোহর এমন মহার্ঘ ফুলকে অবশ্যই ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা উচিত। শেখ হাসিনা গুণীর অনুরাগী। তিনি গুণীর কদর জানেন।

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী কমপক্ষে একজন গভর্নর হওয়ার যোগ্য মানুষ। পাক-ভারত বিভাগ, বাংলাদেশের অভ্যুদয় না হলে তিনি অখণ্ড ভারতবর্ষে প্রাদেশিক গভর্নর হতেন নিশ্চয়ই। ওই যে আরেকজন আছেন, ডিপ্লোম্যাটিক উপদেষ্টা গওহর রিজভী—তার ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। শেখ হাসিনা অবশ্য কম মূল্যায়ন করেননি। বিদ্যুত্ ডিপার্টমেন্টে তৌফিককে গভর্নরের মতো ক্ষমতাবান করে রেখেছেন। তার জবাবদিহি কেবল মহাজোট সরকারের ভরকেন্দ্র শেখ হাসিনার কাছে। এদের নানা সেবা কার্যক্রম তা সব রকম প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। সংসদের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহি নেই। সংসদে তাদের কাজের ব্যাপারে কেউ কোনো প্রশ্নও তুলতে পারবেন না। ১১ জুন তেমনই এক বিপদে পড়েছিলেন মহাজোট সিলমোহরপ্রাপ্ত এমপি রাশেদ খান মেনন। এদিন তিনি বিদ্যুত্ ইস্যুতে তুলাধোনা করেন সরকারকে। বলেন, কুইক রেন্টাল মাঠে মারা গেছে। এ কেবল টাকা গচ্চার কারবার।

তৌফিকের মতো সেবাকর্মীও মেননের বিষ তূণ থেকে রক্ষা পাননি। মেনন বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা হলেই তিনি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে, বিতর্কের ঊর্ধ্বে—তা কিন্তু নয়। কেননা ভুলে গেলে চলবে না, মোশতাকও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

মেনন বলা শেষ করতে পারেননি, তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন অখণ্ড মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। বললেন, তৌফিককে মোশতাক বলা চলবে না। উপদেষ্টারা সংসদে উপস্থিত থাকতে পারেন না। তারা সংসদে স্টেটমেন্ট দিতে পারেন না। সুতরাং তাদের কাজের জবাবদিহি সংসদে চাওয়াও সঙ্গত নয়। বুঝুন অবস্থা! কী সার্বভৌম ক্ষমতা ভোগ করছেন এসব উপদেষ্টা। যে যা-ই বলুন, ক্ষমতার হালুয়া-রুটি থেকে বঞ্চিত এক বামপন্থী আর ক্ষমতার আধখানা রুটির স্বাদ পাওয়া এক বাতিল বামপন্থীর সংসদরঙ্গ এদিন উপভোগ্যই হয়েছিল।

বিদ্যুত্ মন্ত্রকের মোসাহেবটি কে—তাকে আমরা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু আমরা চাইলে বিদ্যুত্-জ্বালানি সেক্টরের গভর্নর তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে আলোকপাত করতে পারি। তাকে এরই মধ্যে আবিষ্কার করেছি বাংলাদেশে কুইক রেন্টাল বিদ্যুত্ থিওরির এজেন্ট হিসেবে। তিনি এমনই বিশ্বস্ত এজেন্ট, তার বলতে বাধেনি—যারা কুইক রেন্টাল-বিরোধী তারা দেশদ্রোহী। স্পর্ধার কী বাড়াবাড়ি! দেশদ্রোহীর শাস্তি কিন্তু মৃত্যুদন্ড। যখন দেশের সব বুদ্ধিজীবী-অর্থনীতিবিদ কুইক রেন্টালের বিরুদ্ধে বলছেন, আর তিনি কি না বলছেন—এরা দেশদ্রোহী। এদের দেশপ্রেম নেই।

সিপিডি’র দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সচরাচর কঠিন কোনো রাজনৈতিক কথা বলেন না, তিনি পর্যন্ত বললেন—দেশপ্রেমের নতুন একটা সংজ্ঞা জানা গেল, যা এতদিন কেউ জানত না। দেশপ্রেমিক হতে হলে এখন থেকে কুইক রেন্টালের সমর্থক হতে হবে।

এটা না করলে তুমি রাষ্ট্রদ্রোহী। তোমার গলা কেটে ফাসি দেয়া হবে। সিএসপির জ্ঞানের ভীমরতি আর কাকে বলে।

অথচ কুইক রেন্টালের ইতিহাসটা পড়ুন। এই ধারণাখানার আমদানি ইসলামী জমহুরিয়া পাকিস্তান থেকে। আর এটি আমদানি করা হয়েছে তখন, যখন এই বিদ্যুত্ উত্পাদন থিওরি ব্যবহার করে পাকিস্তান চরম ব্যর্থ হয়েছে। তারাও হাজার হাজার রুপি গচ্চা দিয়ে কোনো সুফল দিতে পারেনি জাতিকে। জ্বালাতে পারেনি বাতি।

লোটাস কামাল— বিসিবি-বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের সভাপতি। সম্প্রতি তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন, টিম বাংলাদেশকে পাকিস্তানে ওয়ানডে ক্রিকেট খেলতে পাঠাবেন। একখানা ফিকশ্চারও চূড়ান্ত করেছিলেন। তারপর কি হেনস্তার শিকার হলেন। তাকে রাজাকার, পাকিস্তানপন্থী কত কিছুই না বলা হলো। ফেসবুকে, ব্লগে তাকে নিয়ে কত খারাপ খারাপ লেখালেখি। আর তৌফিক-ই-ইলাহী কী রাজভাগ্য নিয়ে এসেছেন! পাকিস্তানের বাতিল থিওরি অবলীলায় আমাদের গেলালেন। এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা হরিলুটের বাতাসার মতো ছড়ানো হলো। কুইক রেন্টালের বিশাল ভর্তুকির টাকা জোগাতে দেশের অর্থনীতির বারোটা বাজানো হলো। দ্রব্যমূল্য সেক্টরে বার বার ভূমিকম্প হলো। বাজেটকে বিশাল ঘাটতির অজগর গ্রাসে ঠেলে দেয়া হলো। ব্যাংকের ভল্টে টাকা জমা হতে পারে না। তার আগেই হাত পেতে রাষ্ট্র তা হাতিয়ে নিয়ে যায়। তারপরও জয় তৌফিক না বললে খোদ অর্থমন্ত্রীর চাকরির বারোটা। এমনই সঙ্গিন দেশ ও সরকারে অবস্থা।

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীর এই ভয়ঙ্কর ক্ষমতার উত্স কী? না, তাকে মোসাহেব বলা যাবে না। বরং তাকে বলা যায়, একবিংশ শতাব্দীর ক্ষমতার রাজনীতির বাজিকর। তিনি চাইলে দেশপ্রেমিককে রাতারাতি বানিয়ে দিতে পারেন দেশদ্রোহী। তিনি চাইলে পাকিস্তানের বাতিল প্রকল্পকে বানিয়ে দিতে পারেন বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক প্রকল্প। যেখানে সারাদেশে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার; কিন্তু মধুর মন্ত্রণায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর চোখকে এমনভাবে হিপনোটাইজড করতে পারেন যে, শেখ হাসিনা দেখছেন চারদিকে বিদ্যুত্ আর বিদ্যুত্। এই না হলে কিসের সাবেক দক্ষ সিএসপি!

বঙ্গবন্ধু বলতেন, দেশে যত দুর্নীতি হয়, অনিয়ম হয়; তা শিক্ষিত উঁচুতলার মানুষই করে থাকে। বাংলার গরিব কৃষক, শ্রমিক, মজুর ও অশিক্ষিত লোকজন কোনো দুর্নীতি করে না।
শেখ সাহেবের এই মহাজনী বাক্য উদ্ধৃত করে উঁচুতলার দুর্নীতিবাজদের একটু দোষারোপ করব তারও উপায় নেই। জমানা বদলে গেছে। কেননা আরেক কিংবদন্তি বাতিল বামপন্থী মতিয়া চৌধুরী সম্প্রতি রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করে বসেছেন বঙ্গবন্ধুকে। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলেছেন, গরিবরা অপচয় করে বেশি।

এ দুনিয়ায় হায় সেই বেশি চায়, আছে যার ভূরি ভুরি/রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।

রবীন্দ্রনাথের এই সাবেকি উপলব্ধিও এখন আর সত্য নয়। বরং সত্য হলো—যার কিছু নেই, যে সর্বহারা; সেই গরিবরাই এখন অপচয় করে দেশটার বারোটা বাজাচ্ছে। রাজার হস্ত এখন আর গরিবের ধন চুরি করে না। বরং কাঙ্গালরা অপচয় করে রাজার ধনসম্পদ উজাড় করে দিচ্ছে। তাই রাজপরিবারের লোকজন চারদিকে শোরগোল তুলে হায় হায় কান্নাকাটি করছেন। এখন বঙ্গবন্ধু মিথ্যা। রবীন্দ্রনাথ মিথ্যা। এখন সত্য হলেন—গরিব দার্শনিক মতিয়া চৌধুরী আর মহান দেশপ্রেম-বিশেষজ্ঞ তৌফিক চৌধুরী। তাদের আপ্তবাক্যের কাছে রবিঠাকুর ও মুজিবকে হাস্যকর ও অর্বাচীন মনে হচ্ছে। আমরা চাইলে রবি ও মুজিবকে গরিবদের দালাল-মোসাহেব বলতে পারি। কিন্তু তৌফিক-মতিয়াকে নৈব নৈব চ। অর্থাত্ ভুলেও বলা বারণ।

কুইক রেন্টালের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে—এ কথাটি বিশ্বাস করে না এ কাতারে আছেন শুধু প্রধানমন্ত্রী, পাগল, শিশু ও অধম এই কলামিস্ট। বাকি সবাই বিশ্বাস করে এক বাক্যে। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই বজ্রকণ্ঠে বলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না—আমার অর্থভাণ্ডারের ধনসম্পদ চেটেপুটে শেষ করে দিয়েছে কুইক রেন্টাল নামের চাটার দল। রবিঠাকুর হলে আবারও তার কবিতাখানা পুনঃপাঠ করতে বলতেন আর মুচকি মুচকি হাসতেন। এবার আসি চার অবিশ্বাসীর কথায়। শেখ হাসিনা বিশ্বাস করেন না—কারণ তাকে মোসাহেবরা বুঝিয়েছেন—কুইক রেন্টাল দেশপ্রেমিকরা কখনও দেশের সম্পদ লুট করতে পারে না। কুইক রেন্টালে দুর্নীতি-লুটপাট হয়েছে; এমনটা ধারণা করাই নৃশংসতম দেশদ্রোহিতা। আর যাই হোক, দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি কোনো অবস্থাতেই দেশদ্রোহী চিন্তাভাবনাকে মস্তিষ্কে প্রশ্রয় দিতে পারেন না।

পাগল বিশ্বাস করে না, কারণ পাগলের মাথা ঠিক নেই। সে বিকৃত মস্তিষ্ক। শিশু বিশ্বাস করে না; কারণ শিশুরা অবুঝ, নাদান, নাবালক। ভালো-মন্দ, ইতর-সিএসপি ইত্যাদি তার বুঝ-বুদ্ধিতে আসে না। আর কলামিস্ট হিসেবে আমি বিশ্বাস করি না, কারণ কুইক রেন্টালের ক্ষেত্রে রাজার হস্ত তার রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ধনসম্পদ এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক বিশ্বস্ত অ্যাকাউন্টে তুলে রেখেছে। এ ক্ষেত্রে লুটের প্রশ্ন আসে কোথা থেকে!

পুনশ্চ : দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাংবাদিক গোষ্ঠী যতই টিটকিরি পাড়ুক—একের পর এক সৃষ্টিশীল বিদ্যুত্ উত্পাদন ও বিপণন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রগঠন, প্রবচনের কাজ থেকে তৌফিককে কিছুতেই বিরত রাখা যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের বাজেটে ৫৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হলেও তার জন্য বিশেষ বরাদ্দ সুরক্ষিত থাকছে। দেশে গরিব জনগণ যাতে আর অপচয় অপব্যয় করতে না পারে, সেজন্য তিনি নানা রকম সৃজনশীল ব্যয় প্রকল্প আবিষ্কার করে চলেছেন। অচিরেই আমরা তাকে ব্যয়বিজ্ঞানী হিসেবে আখ্যা দিতে পারব।

সম্প্রতি তিনি ১৪ টাকা ইউনিট দামে অনিশেষ বিদ্যুত্ বিপণনের প্রকল্প খাড়া করে জনমনে বিজলীর ঝলকানি দিয়েছেন। আশা করা যায়, এটি বাস্তবায়নের মহান কাজে নতুন খাম্বা স্থাপন, তার টানা খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে গরিবের অপচয় ব্যাধি প্রতিরোধ করতে পারবেন।

তার জন্য আরেকটি সৃষ্টিসুখের প্রকল্প হতে পারে — আকাশের মেঘে মেঘে ঘর্ষণে উত্পাদিত বিজলিকে বিশেষ কোনো উপায়ে ধারণ করে কুইক সঞ্চালনের মাধ্যমে বিপণন। বিজ্ঞান পত্রিকায় পড়েছি—ওরকম ২/১ খানা বিজলি তরঙ্গ পরিধারণ করা গেলে গোটা বছরের বিদ্যুত্ চাহিদা মেটানো সম্ভব।

এই বৈদ্যুতিক ব্যয়বিজ্ঞানী ও সাবেক আমলা চাইলে অর্থমন্ত্রী নিশ্চয়ই তাকে লাখ কোটি টাকার কুইক বরাদ্দ দিতে কার্পণ্য করবেন না।

এই কুইক-প্রকল্প প্রস্তাবনা ও বাস্তবায়নের নামে যেমন রাষ্ট্রের অঢেল ধনরাশি রিজার্ভ পকেটে সাশ্রয় করা সম্ভব হবে, তেমনি কুইক রেন্টাল দেশপ্রেমিক প্রকল্পের পর তিনি বিশ্বপ্রেমিক প্রকল্প উদ্ভাবক হিসেবেও দুনিয়াজুড়ে সুনাম অর্জন করতে পারবেন। বোনাস হিসেবে একখানা নোবেল টোবেলও তার হস্তগত হতে পারে।