ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

২৩ জুন সকালে মেঘে ঢাকা বিষণ্ন ঢাকায় যখন টেবিলে এই কলাম লিখতে বসলাম, তখন কয়েকশ’ বছরের ইতিহাসের নির্জনতা ভেঙে কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা মানসপটে উঁকি দিয়ে যাচ্ছিল। বাংলার ভাগ্যাকাশের বিপন্ন বিষাদের কিছু ঘটনার নিষ্ঠুর তামাশার মাঝে মনটা অবিমিশ্র বেদনায় আহাজারি করে উঠছিল—হায়রে আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশবাসী কী চেয়েছিল, আর কী পেল! বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তার অমাত্যবর্গের কাছে কী প্রত্যাশা করেছিলেন, আর তিনি কী পেলেন? দিনে দিনে কম হলো না বেলা। আর মাত্র সোয়া বছরের মধ্যে শেখ হাসিনা দু-দুটি শাসন মেয়াদ পূর্ণ করতে চলেছেন; তার রাজনৈতিক ললাটরেখা কোনদিকে নিয়ে যাচ্ছে তাকে? তার নিষ্ঠুর অমাত্য-উমিচাঁদরা তাকে আরও দু-চার মেয়াদ ক্ষমতায় রাখার কৌতুককর তোয়াজি-স্বপ্ন দেখাচ্ছেন; আর নিঠুর বাস্তবতায় তিনি জনগণের চিত্ত থেকে ক্রমে দূরে সরে যেতে যেতে সহস্র আলোকবর্ষ বিহনে চলে যাচ্ছেন। মহাজোট সরকারের নামে যারা রুটি-হালুয়া, প্লট-রেন্টাল বিদ্যুত্, শেয়ারবাজার, দ্রব্যমূল্য, ব্যাংক, ব্যবসা-বাণিজ্য, সরকারের লাখ লাখ কোটি টাকার তহবিল চেটেপুটে লুটেপুটে খেল—তারা নেত্রীকে ‘গুড হিউমার’-এ রেখে কীভাবে সুকৌশলে সটকে পড়ছে। নিপুণ কুশলতায় ইন্দ্রজালের মায়াবী বিভ্রমে তারা অবিরাম বোকা বানিয়েছে নেত্রীকে। কেউই তার বিশ্বাসের মূল্য দেয়নি। আস্তে আস্তে কেউ তার পাশে থাকছে না। প্রিয় নেত্রী হয়ে পড়ছেন নিসঙ্গ নির্জন। তাকে জনপ্রিয়তাশূন্য করে রাজনৈতিক দেউলিয়া বানাতে কসুর করছে না তারা। বেইমান কখনও ইমানদার হতে পারে না; ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস—শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধু কখনোই এই অমোঘ সত্যকে আমলে নেননি।
আজ অবাক এবং হতবিহ্বল হয়ে দেখছি, দুর্দিন-দুঃসময় যত আকাশ আঁধার করে ঘন হচ্ছে—আওয়ামী লীগের স্বঘোষিত প্রেমিকরা পালাচ্ছে। তারা আর দলটির পাশে থাকছে না। ভোল পাল্টাচ্ছে তারা। মহাপ্রেমিকবেশে যারা একদিন সুসময়ের পাখি ছিল, সাথী ছিল—তারা এখন মহাসমালোচক হয়ে উঠেছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য-নৈরাজ্যপীড়িত দেশে এমনটা হয়। ক্ষমতার উদ্বোধনের দিনে শত সুখের পায়রা এসে ভিড় করে। উড়ে উড়ে সারা আকাশ রঙিন করে তোলে। আর বেলাশেষের নিঝুম সন্ধ্যায় আপন নিরাপদ নীড়ে তারা স্তুতির কলরব করতে করতে ফিরে যায়।
২৩ জুন বাংলার ভাগ্যাকাশে দুটি লাল অক্ষরের ঘটনা ঘটেছিল। ১৭৫৭ সালের এই দিনে ঘটেছিল মহাবিপর্যয়। অনন্ত অন্ধকারে ডুবেছিল স্বাধীন সূর্য। ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে নবাব সিরাজউদদৌলার মহাপরাক্রম বাহিনী রবার্ট ক্লাইভের ক্ষুদ্র ইংরেজ বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়েছিল যুদ্ধ নামের এক পাশার খেলায়। সুখের দিনের পায়রা বিশ্বাসঘাতকদের দুষ্ট চালবাজিতে হেরে গিয়েছিলেন শেষ স্বাধীন নবাব।
১৯২ বছর পর এই দিনেই ’৪৭-এর স্বাধীনতা ও পাক-ভারত দেশবিভাগ-উত্তরকালে ১৯৪৯ সালে জন্ম নেয় বাঙালির প্রথম গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ৬৩ বছরের দীর্ঘ পথচলায় দলটি আজ ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত। উত্থান-পতন, চড়াই-উতরাই। স্বাধিকার আন্দোলন, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা—আবার স্বপ্নভঙ্গের দুঃশাসন, বাকশাল নামের বদ্ধ গারদখানা; ষাটের দশকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবিরাম লড়াই—আবার আশির দশকে এরশাদ স্বৈরাচারের সঙ্গে গোপন আঁতাত ও সখ্য; এই দলটি হচ্ছে সেই রহস্যময় প্রদীপ—যেটির আলোর নিচে নিকষ অন্ধকার। একদিকে অর্জনের রাজতিলক, অন্যদিকে কলঙ্কের অমোচনীয় কালিমা—দুটিই ধ্রুব সত্যের মতো দলটির পথচলার সঙ্গী। ৬৩ বছরের সফরে দলটি স্বয়ং স্বপ্ন দেখতে দেখতে ক্লান্ত এবং একইসঙ্গে জনগণকে স্বপ্ন দেখাতে দেখাতে হতোদ্যম।
বঙ্গবন্ধুর শতমুখী স্বপ্ন, শেখ কামাল-সুলতানা কামালের ক্রীড়া জগতের স্বপ্ন, কামাল জামাল রাসেল সেতু বাস্তবায়নের স্বপ্ন; আবুলি পদ্মা সেতুর স্বপ্ন, বঙ্গমাতা ফজিলতুন্নেসাসহ শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে জেলায়-উপজেলায়, বন্দরে-নগরে হাজারো সংকীর্তন—সংগঠনের অশেষ স্বপ্ন, বঙ্গবন্ধু দৌহিত্রীর অটিস্টিক স্বপ্ন, জয়ের ডিজিটাল স্বপ্ন—আওয়ামী লীগ এখন এক অফুরন্ত স্বপ্ন-সম্পদের খনি, যা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদের সঙ্গে দলটির একটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অত্যাবশ্যক। দলটিকে আজীবনের জন্য ক্ষমতার চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে রাখা দরকার। শেখ হাসিনা ’৯৬-২০০১ ক্ষমতা মেয়াদের শেষ দিনগুলোয় গণভবনকে চিরস্থায়ীভাবে নিয়েছিলেন। তেমনি এখন প্রয়োজন চিরস্থায়ী ক্ষমতা। নতুবা ভিশন ২১ কিংবা ভিশন ২০৪৯—অর্থাত্ দলটির একশ’ বছর পূর্তিতেও এই স্বপ্নের অবসান ঘটবে না। অমাত্য-উমিচাঁদবর্গ সেই ভয়ংকর স্বপ্নই দেখিয়ে বিভ্রান্ত-পথভ্রষ্ট, বিপথগামী করছে নেত্রীকে। কিন্তু ইতিহাসের নিষ্ঠুর পরিহাস—দলিল দস্তাবেজমূলে পাওয়া গণভবনও রক্ষা করা যায়নি, বরং তা নেত্রীর জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছিল। আজ জননেত্রী সেই গণতান্ত্রিক অতিথিশালার ক্ষণিকের অতিথি। জনগণ যে কোনো সময় অতিথিশালার চাবি কেড়ে নিতে পারে।
আজ আওয়ামী লীগের পাশে কেউ নেই। ঠোঁটকাটা চোখে আঙুল দাদারাও নেই যে দুঃসময়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাবে—নেত্রী আপনার কোথায় ভুল হচ্ছে। নেত্রী, এভাবে মসনদকে চিরস্থায়ী করা যায় না। কেউ চোখে আঙুল দাদা হতে সাহসও পাচ্ছে না। কেননা কেউ ভুলটি দেখালেই তাকে দমন করা হচ্ছে কঠিনভাবে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা যাদের বিশ্বাস করেছিলেন, কেউ বিশ্বাস রক্ষা করেননি। একই ট্রাজিক পরিণতি দেখেছি বঙ্গবন্ধু জমানাতেও। তিনি যাদের বিশ্বাস করেছিলেন, তারাই অর্থাত্ সেই আত্মীয়-অমাত্যবর্গ চরম বেইমানি করেছিল তার সঙ্গে।
বাকশাল নামের কলঙ্ক কায়েমের মাধ্যমে যারা ‘শেখ বংশ’র শাসন ব্যবস্থা চালুর আড়ালে চেটেপুটে খেয়েছিল দেশকে, সেই রায় দুর্লভ উমিচাঁদ ইয়ার লতিফ-মীরজাফর-কাসিমদের কখনোই আওয়ামী লীগ নির্মোহ দৃষ্টিতে চিহ্নিত করেনি। ফলে নিষ্ঠুর ট্র্যাজেডির শিকার হয়েছে বঙ্গবন্ধু পরিবার, কিন্তু মীরজাফর-রায়দুর্লভরা ঠিকই দলের মধ্যে রয়ে গেছে বহাল তবিয়তে। আওয়ামী লীগের হাতেই বারবার নিহত হয়েছে আওয়ামী লীগ, অথচ দলটি সেই অপ্রিয় ধ্রুব সত্যকে উন্মোচনই করে দেখেনি। ১৭৫৭ সালের মহা বিশ্বাসঘাতকতার দিনগুলোয় পরমাত্মীয় মীরজাফর-ঘষেটি বেগমদের বিশ্বাস করে বাঙালির স্বাধীন সূর্যকে অস্তাচলে বিসর্জন দিয়েছিলেন সিরাজ-উদদৌলা। সিরাজ শোকমহাকাব্যের লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, সিরাজ একবারই মরেছেন। শেক্সপিয়রের ভাষ্যমতে, বীরের মৃত্যু একবারই ঘটে। কাপুরুষদের বারবার। সিরাজ একবার ট্র্যাজিক মৃত্যুবরণ করে মহাকালের পাতায় অনন্তকালের মহাবীর হিসেবে অক্ষয় হয়ে আছেন।
অন্যদিকে পলাশীর প্রান্তরে তত্কালীন নবাবি রাজশক্তিরও চিরকবর ঘটেছে। মীরজাফররা তা রক্ষা করতে পারেনি। ২৩ জুন এসবের স্মারক। প্রায় ২০০ বছর পর একই দিনে আধুনিক বাঙালির গণতান্ত্রিক স্বপ্নের অভ্যুদয় ঘটলেও সেই দলটি উল্টো বংশীয় নবাবির কবলে ধংসের মুখে পড়েছে একাধিকবার। দলটি মরতে মরতে বেঁচে গেছে আল্লাহর অসীম কৃপায়। গণতন্ত্রে বংশতন্ত্র—নবাবির স্থান নেই। আর এ কারণেই যারা দলটির বংশতন্ত্রের মীরজাফর-ঘষেটি বেগম—তাদের খুঁজে বের করা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের বোঝা নন, তিনি সুযোগ্য উত্তরাধিকারী নেত্রী। জয়ও বোঝা হবেন না, যদি তিনি যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন। সুযোগ্যরা কখনোই দেশ, দল, দশের বোঝা নন। কিন্তু নিষ্ঠুর সত্যটি না বলে পারছি না—বঙ্গবন্ধু ও তার মেয়ে শেখ হাসিনার জন্য দুর্ভার, দুর্বহ, দুর্নিষ্কৃতিযোগ্য হিমালয় পর্বতমালাসম দুষ্কৃতির বোঝা হলো গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, গৌরনদীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সুবিশাল শেখ বংশ। মাননীয় নেত্রী মাঝেমধ্যে অত্যন্ত সঠিকভাবেই ‘রক্ত বীজের ঝাড়’ কথাটি নানা প্রসঙ্গে উপমা হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন।
তার উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি আমার কাছে বড় উপভোগ্য, রসোত্তীর্ণ এবং যথার্থ মনে হয়। বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধান বলছে, ‘রক্ত বীজের ঝাড় বা বংশ’ হলো—যার বা যে বংশের বা দলের ধ্বংস নেই, বৃদ্ধি আছে। অর্থাত্ যা অবিরাম বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। আমি দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোয় অবিরাম বাড়তে থাকা যে বংশটির কথা বললাম, সেটি হলো রক্ত জীবের ঝাড়। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতায় আসবার পর তা অবিরাম বেড়ে চলছিল। স্পর্ধার চরম বাড়াবাড়ি করছিল। তার পরিণাম এই কথিত বংশ পদবিধারীরা ও তাদের লতাপাতার হঠাত্ গজিয়ে ওঠা আত্মীয়রা ভোগ করেনি, ট্র্যাজেডি হলো তা ভোগ করেছেন একা বঙ্গবন্ধু। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে এদের খুঁজে পাওয়া যায় না। অহোরাত্র অমানুষিক পরিশ্রম করে শেখ হাসিনা ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এলেন। ক’দিন যেতে না যেতেই রক্ত বীজের আগমন। ২০০১ সালে আবার তারা দেশছাড়া। শেখ হাসিনা আবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দলকে ক্ষমতায় আনতেই এরা জুটেছে বঙ্গবন্ধুকন্যার পিছু পিছু। ছায়ার মতো অনুসরণ করছে তাকে। শেখ হাসিনা প্রথম প্রথম অসাধারণ নৈর্ব্যক্তিকতা দেখিয়ে এদেরকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। কাজ হয়নি। ওরা নানাভাবে নানা চেহারায় জায়গা করে নিয়েছে। এই বংশধারীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তাদের শালীর বেটির ভাগ্নের শালার পুত জাতীয় আত্মীয় ও কুটুম্বসহ অনেকে। এরা নানা ব্যবসা বাগিয়ে নিয়েছে। রেন্টাল বিদ্যুত্, জমির ব্যবসার আন্তর্জাতিক দালালিসহ নানা সেক্টরে দখলবাজি করেছে। এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে একদল জ্ঞানপাপী, দুর্নীতির গলিঘুপচি আবিষ্কারকারক সাবেক সিএসপি ও বর্তমান আমলা। ওই বংশধারীদের জ্ঞানের অভাব, বুদ্ধির অভাব এরা পূরণ করেছে। আমি পরিস্কার ভাষায় বলতে চাই, এইসব সিএসপি ও দুর্নীতিবাজ আমলারা আওয়ামী লীগের বন্ধু নন। এরা আওয়ামী লীগ-দ্রোহী; সরকারদ্রোহী, দেশদ্রোহী; রাষ্ট্রদ্রোহী। এরা আওয়ামী লীগ সরকারকে কখনোই সুবুদ্ধি দেয়নি। দিয়েছে দুষ্ট বুদ্ধি। এরা পরিত্রাণের পথ দেখায়নি। দেখিয়েছে অধঃপতনের পথ। আওয়ামী লীগের এই জাতশত্রুরা কোন সাহসে প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের বলে দেশদ্রোহী! এই সাহস তারা কোথায় পায়? তাদের ইতিহাস কী? তাদের পুত্র-কন্যারা কোথায় থাকে, কোন দেশে! মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে খোঁজ নিয়ে দেখার একান্ত অনুরোধ করব—এসব সাবেক সিএসপির বংশধরেরা কোথায়, বাংলাদেশে নাকি ইউরোপ-আমেরিকায়? আরও একটি ব্যাপার খোঁজ নেয়ার অনুরোধ করি—বর্তমানের অনেক আমলা কানাডায় আমেরিকায় ইউরোপে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। কানাডায় বাড়ি করেছে। চুপি চুপি গিয়ে নাগরিকত্ব, রেসিডেন্টশিপ বাগিয়ে রেখেছে। কারও কারও স্ত্রী-সন্তান সেখানে অবস্থান করছে। এরা দ্বৈত নাগরিক। দেশ, সরকার, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তারা বিশ্বাসঘাতক। তাদের এই কার্যক্রম সরকারি চাকরিবিধির চরম লঙ্ঘন। সংবিধানের লঙ্ঘন। এদের কোনো অবস্থাতেই চাকরি থাকার কথা নয়। এরা রাষ্ট্রকে কী সেবা দেবে—এরা আওয়ামী লীগ সমর্থক আমলা সেজে দেশ ও দলের বারোটা বাজাচ্ছে। এরা দলকে কী আনুগত্য দেবে? কত বড় দুঃসাহস—এরা আমাদের দেশপ্রেম নিয়ে সবক দেয়! নিজেরা অন্য রাষ্ট্রের গোপন চোরাই নাগরিক হয়ে আমাদের বলে দেশদ্রোহী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এদের চিহ্নিত করুন। খুঁজে বের করুন। ইউরোপ, আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোয় এখন আওয়ামী লীগের শক্তিশালী শাখা সংগঠন রয়েছে। সেসব সংগঠনকে নির্দেশ দিন—বলুন, বিদেশে এদের বাড়ি, গাড়ি, সম্পদ ও নাগরিকত্বের সব তথ্য হাজির করতে। আশা করা যায়, এক মাসের মধ্যে সব তথ্য পাবেন। আপনার টেবিলে তথ্যের স্তূপ জমবে। আপনি নিশ্চিত থাকুন, এসব আমলারা আপনার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলেও বহির্বিশ্ব আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বেইমানি করবে না। আপনাকে ভুল তথ্য দেবে না। আপনি চাইলে সরকার সমালোচক ও নিরপেক্ষ পত্রিকাগুলোর কাছেও তথ্য চাইতে পারেন। হয়তো একটু উনিশ-বিশ হবে। কিন্তু প্রচুর খবর পাবেন। কেননা সচিবালয়ে গিয়ে দেখেছি, সেখানকার বাতাসে অনেক খবর ভেসে বেড়ায়। হাওয়ায় ভেসে বেড়ানো তথ্য সব যে সঠিক ও সত্য, তা নয়। কিন্তু ওইসব খবরের মধ্যে অজস্র সত্য লুকিয়ে আছে।
সবিনয়ে বলি, ’৯৬-২০০১ ক্ষমতার মেয়াদের দ্বিতীয়ার্ধে আপনার সরকারকে নানা দুষ্টবুদ্ধি দিয়ে অজনপ্রিয় করে তুলেছিল একদল সাবেক সিএসপি, আধা সিএসপি আমলা। এখনও স্মৃতির পটে জ্বল জ্বল করছে—এক মহাজ্ঞানধর আমলার নেতৃত্বে একটি অর্থলোভী গ্রুপ আপনাকে বেশ কয়েকখানা সম্মানসূচক ডক্টরেট এনে দিয়েছিল। তারা নানাভাবে প্রলোভনের জাল বিছিয়েছিল। শোনা যায়, নোবেল প্রাইজের মায়াবী প্রলোভন তৈরি করে দূতিয়ালি, তদবির, বিদেশভ্রমণের নামে রাষ্ট্রের বিশাল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা এরা হাতিয়ে নিয়েছে। এরা লুটেরা। এরা লুটবাজ। আমি এই প্রজন্মের একজন তরুণ কলামিস্ট হিসেবে জানতে চাই, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক শেখ হাসিনার কোন কাজে লেগেছে সেই মহামূল্যবান সাম্মানিক ডক্টরেটগুচ্ছ। সাত বছর পর দীর্ঘ সংগ্রাম করে আবার আপনি ক্ষমতায় এলেন। এই লড়াইয়ে ওইসব ‘পিএইচডি’র ভূমিকা কি! কই, আপনাকে তো কখনোই ওগুলো ব্যবহার করতে দেখি না। আপনি তো কোথাও লেখেন না—ড. শেখ হাসিনা। তাহলে ওই ভণ্ড জ্ঞানপাপিষ্ঠ নিপুণ দুর্নীতিবাজরা আপনাকে ভুল বুঝিয়ে, সরলতা ও তীব্র আগ্রহের সুযোগ নিয়ে কয়েক লাখ ডলার পাউন্ড পকেটস্থ করল—তার হিসাব ও জবাবদিহি কি নিয়েছেন? শাস্তি বিধান করেছেন? ওসব পিএইচডি কি ২০০৯ সালের নির্বাচনে একটি ভোটও বাড়িয়েছে কিংবা বিদেশে আপনাকে কি মহিমান্বিত করেছে? আসলে প্রকৃত জননেত্রীর কখনও সম্মাননা পিএইচডি দরকার হয় না। মাস্টার্স ডিগ্রি দরকার হয় না। বঙ্গবন্ধুর দরকার পড়েনি। বেগম খালেদা জিয়ার দরকার পড়েনি। বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি মার্কা কিছু পদক দেয়া হয়েছিল। কিন্তু রাজনীতির ওই জ্ঞানপণ্ডিত কখনও সেসবের জন্য লালায়িত ছিলেন না। কেননা তিনি জানতেন, দুষ্ট আমলাচক্র তাকে পুরস্কার নামের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেবে। তিনি তার তৃণমূল কর্মীর সততায় বিশ্বাস করতেন। কিন্তু বুদ্ধিধর প্যাঁচগোচ জানা আমলাদের মনেপ্রাণে কখনও বিশ্বাস করেননি। তথাকথিত আওয়ামী লীগ বা সরকার সমর্থক এই দুষ্ট আমলাচক্রও হলো রক্ত বীজের ঝাড়। এরাও ক্ষমতায় ইউরিয়া সার খেয়ে খেয়ে নানা রূপে দুর্নীতির বংশ হিসেবে বেড়েই চলছে। সব সরকারে এরা আছে। শেখ বংশের অধঃপতিত ধ্বজাধারীদের শিখণ্ডী করে এরা বিদ্যুত্, ব্যাংক, শেয়ারবাজার, ব্যবসা-বাণিজ্য সব লুটে খাচ্ছে।
কাগজে-কলমে এরা দেখাবে, ১০-২০ কোটি টাকারও মালিক নয়, কিন্তু দুর্বুদ্ধির প্যাঁচ দিয়ে এরা দিব্যি ব্যাংকের মালিক বনে গেছে। স্বয়ং বিধাতা পর্যন্ত নানা রকম অভিশাপ দিয়ে এদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছেন, কিন্তু ওদের শিক্ষা হয় না। ইবলিসের কাছে যে মগজ মর্টগেজ রেখেছে, তাদের কে রুখবে?
শেখ বংশধারীদের নাম উচ্চারণ করে দু-চারটি টক-ঝাল কথা বলায় যদি প্রধানমন্ত্রী এই কীটপতঙ্গসম নগণ্য কলামিস্টের প্রতি রুষ্ট ও বিরক্ত হন, সে হবে চরম ভুল। আমরা যারা লিখে আপনাকে সতর্ক ও হুশিয়ার করছি, তারা আপনার শত্রু নই। এই লেখা আর আম পাবলিক ক’জন পড়ে, বরং ওই দুই ধরনের রক্ত বীজের বংশধররা পরস্পর হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যা করছে, তা আওয়ামী লীগ-বিরোধী অপ্রতিরোধ্য মহা সমারোহপূর্ণ বিজ্ঞাপন হয়ে লোকমুখে ১৫ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। তাই কলামিস্ট-সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার না করে ওই চাটার দলকে প্রতিরোধ করুন। তাতেই জননেত্রীর ভালো হবে। তাতেই আওয়ামী লীগের কল্যাণ।
এটা পরিষ্কারভাবে বলা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধু পরিবার কিংবা কোনো রাজনৈতিক নেতার উত্তরাধিকার যদি রাজনীতিতে আসেন, জনসেবা করেন, তা অন্যায় নয়। তিনি যদি সুযোগ্য হন, রাজনীতি ও দলকে তিনি যদি আরও এগিয়ে নিয়ে যান, তা অন্যায় কেন হবে? উত্তরাধিকারের রাজনীতি মানেই ঘৃণ্য নয়। দেশের শ্রেষ্ঠ বরেণ্য নেতাদের কন্যা-স্ত্রী-পুত্রদের জন্য রাজনীতি যদি নিষিদ্ধ হয়, সে তো চরম অগণতন্ত্র। একইভাবে শেখ বংশধারীরা রাজনীতি করতে পারবেন না, এমন কোনো বিধিনিষেধ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বংশধারীরা সুযোগ্য কিনা। নাকি তারা পরিবার ও বংশের নাম বিক্রি করে লুটপাটে ব্যস্ত। নাকি তারা নির্দিষ্ট একটি বংশ ও পরিবারের নামে জেলায় জেলায় অনিয়ম ও নবাবিতন্ত্র কায়েম করেছে, সেটা দেখার বিষয়। সজীব ওয়াজেদ জয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। উন্নত দেশের সংস্কৃতি-সহবত-সভ্যতায় অনুপ্রাণিত ও উদ্ভাসিত হয়ে এবং সেই সভ্যতার অমিয়ধারায় অবগাহন করে এক ইউরোপিয়ান উচ্চ সংস্কৃতির রমণীর পাণিগ্রহণ করেছেন। বাঙালি ও বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকারের পাশাপাশি রংপুরের সুধা মিয়ার পরিবারের মেধাবী রক্তধারার সঙ্গে ইউরোপীয় রক্তধারার সংমিশ্রণ ও মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব ও প্রশংসনীয় অর্জন। নেবে আর দেবে, মেলাবে মিলিবে—এভাবেই তো মানবধারা বিকাশের গতিশীল ইতিহাস রচিত হয়। শুনেছি, মা শেখ হাসিনা ছেলের এই কাজে খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাও স্বাভাবিক। বাঙালি মায়ের মন। হয়তো তার মানসপটে বাঙালি কোমল পুত্রবধূর সুখস্বপ্ন ছিল। সবার ওপরে মা। মায়ের পরে কেউ নেই। সেও ঠিক। কিন্তু মহাকালের মানব সাগর তীরে দাঁড়িয়ে যখন দুনিয়ার হাজারো কম জাত-উন্নত জাত-গোষ্ঠী-উপগোষ্ঠীর দিকে তাকাই—তাদের মধ্যে কিন্তু ভালবাসা-প্রেমের পবিত্র বন্ধন একেবারে বিরল নয়। বিশ্বের নানা সভ্যতা ও জাত-গোষ্ঠীর মিলনের অনিবার্যতাকে জয় উদারভাবে নিয়েছেন। জয় লেখাপড়ায় চৌকস। জাতপাতের ঊর্ধ্বে বিশ্ব সম্মিলনীতেও তিনি বৈবাহিক অবদান রেখেছেন। তিনি সুযোগ্য। তার যোগ্যতাকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখা যায় না।
একইভাবে বঙ্গবন্ধু দৌহিত্রী সায়েমা ওয়াজেদ পুতুলেরও চমত্কার শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে। তিনি অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে একটি সেবা তত্পরতাও চালাচ্ছেন।
এই ভাইবোন কাউকেই খাটো করে দেখার উপায় নেই। তাদের গরবিনী মা প্রায়ই উচ্চকণ্ঠে পুত্র-কন্যার ডিগ্রি নিয়ে তার বক্তৃতায় অন্যদের প্রতি তীব্র শ্লেষাত্মক আক্রমণ করে অহংকার প্রকাশ করেন। মাঠে-জনসভায়, গণভবনের জেলা-উপজেলার বৈঠকেও তিনি রংপুরের ড. ওয়াজেদ পরিবারের দুই কীর্তিমানকে নিয়ে শ্লাঘা ও তৃপ্তি প্রকাশ করেন। একইভাবে শেখ রেহানার পুত্র-কন্যারাও নাট্যকলাসহ নানা অভিজ্ঞানে শিক্ষিত।
ড. শফিক সিদ্দিকী পরিবারের এই যোগ্য সদস্যদের নিয়েও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গৌরববোধ করেন কম নয়। বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত দূরদর্শী ও প্রজ্ঞাবান ছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, তার দুই জামাই-ই তীক্ষষ্টধী মেধাবী; সেরা একজন বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া ওরফে সুধা মিয়াকে তিনিই কন্যাপতি নির্বাচন করে গেছেন। একই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতেও মাতৃসম বড় বোনের অভিভাবকত্বে এবং ড. ওয়াজেদের অনন্য বিচক্ষণতায় শেখ রেহানার বৈবাহিক সম্পর্কও এক অগ্রগণ্য পণ্ডিতের সঙ্গে হয়েছে।
পবিত্র সম্পর্কের এই মেলবন্ধনেও আমরা বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য দৌহিত্র-দৌহিত্রী পেয়েছি। রক্তধারার উত্তরাধিকারে এরা মুখ্যত ওয়াজেদ ও শফিক সিদ্দিকী পরিবারের প্রজন্ম হলেও কীর্তিমান মাতুলের নামও তাদের সঙ্গে জুড়ে আছে।
বিশ্বমিলনের স্বপ্নবান তরুণ জয় কিংবা সেবাপ্রাণ পুতুল যদি রাজনীতিতে আসেন, তাতে উপকৃত হবে দেশ। সুযোগ্যরা অবশ্যই রাজনীতিতে আসবেন। তাদের স্বাগতম। সুস্বাগতম। কিন্তু আত্মীয়বর্গ বলে পরিচয় ভাঙিয়ে গোপালগঞ্জ বরিশাল খুলনা বাগেরহাট অঞ্চলের বংশধারীরা নানাভাবে রাজনীতি ও ব্যবসার ওপর বাঁশ ঘোরাচ্ছে—এরা সম্পদ নয়, তারা কলঙ্ক। ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসসহ দু-একজন আশীর্বাদ হলেও বাকি অযোগ্যরা দুর্বহ বোঝা, তা বলাই বাহুল্য। ১৭৪ জন সুযোগ্য সিনিয়রের প্রতি অবজ্ঞা ও বৈষম্য করে জুনিয়র এক অযোগ্য ও আদালতে তিরস্কৃত আমলাকে যখন কোনো মন্ত্রকের কর্ণধার করা হয় বিশেষ অঞ্চল ও বংশের নামে, তখন তা দেশের জন্য আশীর্বাদ না অভিশাপ—সেটা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার দেখি না।
প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ওয়াজেদ-শফিক পরিবারের উত্তরাধিকারকে নিয়ে পঞ্চমুখ, তা বেশ বেশ। কিন্তু কই এই অযোগ্যদের নিয়ে তাকে বঙ্গবন্ধুর মতো বিরাগমুখ হতে দেখি না। বঙ্গবন্ধু তো সাহস করে নিজ পকেটের লুটেরাদের চাটার দল বলেছিলেন। তিনি এই রক্ত বীজের ঝাড়কে তিরস্কার-কটুমন্দ করতেন নিয়মিত। যাতে ওরা নিয়ন্ত্রণে থাকে। বেশি না বাড়ে। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা হয়েও জননেত্রী কিন্তু সামান্য তিরস্কারটুকু করেন না। তার নিজ পরিবারের খবর নেই, তিনি অহোরাত্র গালমন্দ করে চলেছেন জিয়া পরিবারকে। এতে ফলাফল হচ্ছে ভয়াবহ। এই অযোগ্য অভিশাপরা আশকারা পাচ্ছে। দল-বংশের বারোটা বানাচ্ছে। চেটেপুটে খাচ্ছে বঙ্গবন্ধু ও হাসিনা ইমেজ।
আপন পুত্র-কন্যার গুণকীর্তন করতে গিয়ে তিনি অকারণ-অপ্রয়োজনীয়ভাবে যখন অন্যদের তীব্র শ্লেষ ও বিদ্বেষাত্মক ভাষায় আক্রমণ করেন, তখন বিপন্ন প্রতিপক্ষকে বলতে শুনি, অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী। যদিও কথাটার আমি প্রতিবাদ করি সব সময়। বলি, অল্প বিদ্যা তো নয়, বরং বলা উচিত, কৃতবিদ্য অহংকারী। তখন তারা পাল্টা বলেন, খালি কলসি বাজে বেশি। এ কথাটিও অযৌক্তিক। প্রতিপক্ষ মনের দুঃখেই কথাটা বলেন, বোঝা যায়। তবে এ কথাটি আধখানা আমলে নেয়া উচিত, কেননা এ যুক্তি কেমন করে অস্বীকার করি—কলসি যদি ভরাই থাকে, সেই কলসি তো অবিরাম এত বাজার কথা নয়। ভরা কলসিতে যতই তাল ঠুকুন শব্দ হবে না। ভরা কলসি আত্মসমৃদ্ধ। তার আওয়াজ দিতে হয় না।
সুবক্তা ও ঈর্ষণীয় বাকচাতুর্যের অধিকারী প্রজ্ঞাময়ী প্রধানমন্ত্রী এই প্রচলিত প্রবাদের রস আস্বাদন থেকে বিমুখ—এমনটা মনে করার কোনো কারণ দেখি না। বরং গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আশঙ্কা হচ্ছে—তিনি আর কাউকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না। না ইনুকে; না মেননকে। ইনু যতই খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার ষড়যন্ত্র করুক; প্রধানমন্ত্রী জানেন ইনু হচ্ছেন শ্রীনাথ বহুরূপী—তার রূপের শেষ নেই। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে এরা লালবাহিনী করেছিল; লালঘোড়া দাবড়েও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি শেখ মুজিব। কীভাবে তখন তাকে বেইজ্জত করেছিল ওরা। তাই তো আওয়ামী লীগের পরীক্ষিত বন্ধুদের বলতে শুনি—জাতসাপকে তবু বিশ্বাস করা যায়—জাসদের ইনুকে কখনও নয়। আজ তারা মুখে খালেদা জিয়াকে মাইনাসের কথা বলছে ঠিক; কিন্তু শেখ হাসিনার জানতে বাকি নেই—এটা বলে এক ঢিলে দুই পাখি মারার ষড়যন্ত্র চলছে। মুখে ওরা একজনের নাম বললেও ব্রাকেটের মধ্যে শেখ হাসিনার নামও রেখেছে। মাইনাসের হিড়িক তোলার বিজ্ঞাপন হিসেবে আপাতত খালেদার নাম নিচ্ছে। হাসিনার বদান্যতায় নৌকায় চড়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়েছে—এখন কেমন করে মহাজোটনেত্রীর নামটি নেয়! তাছাড়া মহাজোটকে চুষে ছিবড়ে বানাতে আরও কিছুদিন তাদের হাতে রয়েছে। এখনই আমের আঁটিটি ছুড়ে দিতে চাইছে না। ১/১১ জাতীয় ষড়যন্ত্র হলে কারা কারা জলপানের জলপাই দাওয়াতে যায়—সে ব্যাপারেও বেখবর নন হাসিনা। নাজমুল হুদা একা একাই বেগানা রাজনৈতিক দেউলিয়া হয়ে গেলেন। আর ইনুর বাঁশিতে মাইনাসের রাগিণী—যারা খোঁজখবর রাখেন—তাদের বোঝার কিছু বাকি নেই। একেবারে হান্ড্রেডপার্সেন্ট তলাবিহীন ঝুড়ি—অকৃত্রিম সর্বহারা দিলীপ বড়ুয়াকে বিশ্বাস করেও কি ঠকাটাই ঠকলেন হাসিনা। তিনিও কিনা ৫-৬টি প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। চট্টগ্রামে আরও একটি নেয়ার চেষ্টা করছেন। আওয়ামী লীগের অনুগত সাংবাদিকরা লিখেছেন—দাদা এখন লাখ টাকার বেশি দামের সুট পরছেন। লোক দেখানো, জনগণ ঠকানো-ভোলানো মন্ত্রিসভা করতে গেলে কিছু চালবাজি না করলেই নয়। এমন দু-একজনকে রাখতে হয়, যাদের দেখিয়ে বলা যায় সবাই চুরি-চামারি করলেও আমার তমুক মন্ত্রী কোনো চুরি করে নাই। প্লট বাড়ি গাড়ি বানায় নাই। দিলীপ বড়ুয়ার একসময়ের বনভান্তে দরবেশি ভাবসাব দেখে তাকে ব্র্যান্ড করতে গিয়ে কি ঠকাটাই না খেলেন! যে লোক খালেদা জিয়ার সঙ্গে চীন গেলেন—তখন তার সুট-বুটের বাহার দেখা যায়নি—চারদলীয় জোট আমলে পুরোদস্তুর বনভান্তেই ছিলেন— মহাজোটের জমানায় তিনিই কি-না সর্বহারা থেকে সর্বপতি; তার কন্যা-ভাইপো সব পাড়ি দিয়েছে বিদেশে। বড়ই আফসোসের ঘটনা।
আর কার ওপর বিশ্বাস রাখবেন হাসিনা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন লৌহমানবী সাহারা খাতুনকে। নিশ্চয়ই ভেবেছিলেন লৌহপ্রতিম নেত্রীকে দেখে গুণ্ডারা পালাবে। পুলিশ ভড়কাবে। আইনশৃঙ্খলা কনট্রোলে থাকবে। সাংবাদিকদের পিটিয়ে পুলিশ দেশ-বিদেশে সরকারকে বেইজ্জত করবে না। সাহারাও পুলিশ-ছাত্রলীগের তাণ্ডবমূর্তিদের ধমকে-ধামকে রাখতে পারবেন। আর সাহারার এখন কি পারফরম্যান্স! সমস্যা দেখলেই আস্তে করে সেটি হাসিনার ঘাড়ে ঠেলে দেন। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড ইস্যুতে সরকার ঘূর্ণিঝড় আইলার তাণ্ডবের মুখে পড়েছে। কোথায় ঝামেলা সামলাবেন—তা না; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিপদ আরও বাড়াচ্ছেন। দিনাজপুরের বিরল উপজেলার বিরল এক গাড়ল সাগর-রুনি ইস্যুকে ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে একরকম টেনে নামানোর মিশনে নেমেছে। একে প্রশ্রয় দেয়া কত বড় ভুল হয়েছে—হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন তিনি। যত ঝামেলাই হোক—কালো বিড়ালকে গোড়াতে মারা উচিত ছিল। তাতে রক্তবীজের ঝাড়ের ২-১টি কাটা পড়লেও ১০ নম্বর রেড সিগনালে পড়তে হতো না। মসনদ রক্ষা করতে অমন একটু নিষ্ঠুর হতেই হয়। গাড়লটা এতদিন সাগর-রুনিকে নিয়ে কী অশ্রাব্য কদর্য কথা বললো; সাহারা কিছুই বললেন না। সাংবাদিক সমাজ এবং সারা বাংলাদেশবাসী চাচ্ছিল, এই মিডিয়া শত্রুকে গ্রেফতার করা হোক। কুম্ভকর্ণ তখন ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু যে-ই না জানা গেল—লোকটা হাসিনাকে বাচাল বলেছে। আমেরিকায় নকশা করে বেড়াচ্ছে—মহাজোটকে নাকি ক্ষমতা থেকে তাড়াবে। কথায় তো আছে—গাড়লে কি-না বলে, ছাগলে কি-না খায়! প্রধানমন্ত্রীর তখতে বসতে হলে কত গাড়লি কথাবার্তা সহ্য করতে হয়। কিসে আসে যায় তাতে। জনগণ চাচ্ছিল—এনিমি অব মিডিয়াকে ধরা হোক হত্যাকাণ্ডের থিংকট্যাংক বা হেড অব মিশন সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে। আর সাহারা হঠাত্ লৌহমূর্তি হয়ে জানালেন— হাসিনার বিরুদ্ধে কিছু বললে কঠিন অ্যাকশন নেয়া হবে। এবং আমরা ঘরপোড়া জনগণ নিশ্চিত জানি—কোনো অ্যাকশনই নেয়া হবে না। এটি সাহারার ৪৮ ঘণ্টা মার্কা ফালতু বাত। উনি পরে বলবেন— সাংবাদিকদের প্রশ্নের চাপাচাপির মুখে বলেছি। আসলে বিষয়টি শেখ হাসিনা টেকওভার করেছেন। প্রধানমন্ত্রীই সবকিছু জানেন।
শেখ হাসিনাকে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এখন ওই বিষ গিলতেই হবে। আর অনির্বচনীয় রহস্যজনক কারণে তিনিও কোনো ব্যবস্থা নেবেন না। তারপরও কথা হচ্ছে—তিনি একা আর কতদিক সামলাবেন। রক্তবীজের ঝাড়ের বিষ দংশন; আওয়ামী লীগের পরম বন্ধু সাজা সাবেক সিএসপিদের দুর্নীতির দংশন; তিনি বেলাশেষের দিনে ধীরে ধীরে নীলকণ্ঠ হয়ে উঠছেন। ওদিকে মাতৃভূমিতে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের নামে সাহারা ইন্ডিয়া কোম্পানি সাহারা মাতৃভূমির মোড়কে ঢুকে পড়েছে বাংলাদেশে। ২৬০ বছর আগে ব্যবসা-বাণিজ্যের মোড়কেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমন ঘটেছিল এই বাংলায়— পরের ইতিহাস আমাদের অনেকের জানা। সিরাজের পতন, মীরজাফরদের বিশ্বাসঘাতকতা— বাংলার ভাগ্যাকাশের মহাবিপর্যয়; কাশিম বাজার কুঠির ষড়যন্ত্র; আলীবর্দী খাঁর পরিবারের ট্র্যাজেডি কোনো পুরাণের গল্প নয়; প্রাগৈতিহাসিক যুগের কাহিনীও নয়—বাঙালির মানসপটে আধুনিক সেলুলয়েডে তোলা ছবির মতো জ্বলজ্বলে। এই ইতিহাসের অবশ্যই পুনঃপাঠ দরকার। অতীতের ট্র্যাজেডির সঙ্গে অত্যাসন্ন ভবিষ্যেক মিলিয়ে মিথস্ক্রিয়া প্রয়োজন। প্রিয় পাঠক, ধারাবাহিক এই লেখার আগামী পর্বগুলোতে এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আপনাদের দরবারে নিবেদন করে রাখলাম।