ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

হ্যালো, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী কি বলছেন! হ্যালো, আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা কি বলছেন! হ্যালো হ্যালো, বঙ্গবন্ধুকন্যা কি বলছেন? হায়রে—কোনোভাবেই যে সংযোগ স্থাপন করা যাচ্ছে না। রিং টোন অবিরাম বেজেই চলেছে। কী ব্যাপার—প্রধানমন্ত্রী কি তবে ঘুমুচ্ছেন! না, তা কেন হবে! ঘুমানোর সময় এখন নয়। টিভির খবরে নানা অনুষ্ঠানে তাকে প্রচুর কথা বলতে দেখি। বিশ্বব্যাংককে ধোলাই দিচ্ছেন, বিরোধী দলকে রামধোলাই দিচ্ছেন। তাতে মনে হয় না, দিনে-দুপুরে ঘুমানোর ফুরসত তার রয়েছে। তবে কি তিনি বিশ্রাম নিচ্ছেন? এটা হতে পারে। শেখ হাসিনার বিশ্রাম বড় দরকার। খুব পরিশ্রম যাচ্ছে। চলতি মহাজোট সরকারের মেয়াদের দ্বিতীয়ার্ধে তিনি এত কথা বলছেন—তার স্বরযন্ত্রের ওপর বড় চাপ পড়ছে। তার বিশ্রাম বড় প্রয়োজন। কিন্তু আমার যে তার সঙ্গে কথা বলাও বড় দরকার। অনেকগুলো বিষয় মাথায় সাজিয়ে নিয়েছি। বড় সাধ ছিল এসব বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে ফোনালাপ করব। এই শখ বুঝি পূরণ এবার হচ্ছে না। কেবল বেজেই চলেছে রিং টোন। তার পক্ষে ধরবার কি কোনো লোক নেই?

অবশ্য এই ধরনের লোক না থাকাই ভালো হয়েছে। এই ধরনের লোকগুলো হয় বড় ভয়ংকর। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হয়ত মোটেই ভয় লাগবে না। কিন্তু তার সহকারীদের সঙ্গে আতঙ্কে কথা বলব না। দারোগার চেয়ে মাঝির দাপট বেশি হয়, সে সম্পর্কে আমরা অনেক শুনেছি। পিওন, সহকারী, আর্দালি—এদের ফোন ধরতে না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বড় ভালো কাজ করেছেন। ফোনের সংযোগ না পেয়ে নিজেকে বড় বঞ্চিত মনে হচ্ছে। আসলে আমার সব সময় মন্দ ভাগ্য। অথচ পত্রিকায় পড়েছি—কত লোক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ধন্য হয়েছে। কেউ কেউ ফোন করে প্রধানমন্ত্রীর গলা শুনে ভয়ে ফোন রেখে দিয়েছে। তাদের বিশ্বাসই হয়নি—এমনটা হতে পারে। ‘আপনি কি সত্যিই প্রধানমন্ত্রী?’ এমন বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। একটা কাগজ তো দেখলাম আস্ত একটা ইন্টারভিউ নিয়ে পর্যন্ত ছেপেছে।

অনেকে প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, স্কুলছাত্রী স্কুলের বই পেয়ে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে, দোয়া করেছে প্রধানমন্ত্রীর জন্য। কেউ বিশ্বব্যাংককে রামধোলাই দেয়ার বীরত্বব্যঞ্জক কাজের জন্য সাধুবাদ জানাতে ফোন করে ঠিকই শেখ হাসিনাকে পেয়েছে। কোনো এক ছাত্র পদ্মা সেতুর জন্য টিফিনের টাকা দেয়ার ওয়াদা সত্যিই নাকি জানাতে পেরেছে তাকে। তবে আমি কেন লাইন পাচ্ছি না। আমি বেশকিছু বিষয় স্থির করে নিয়েছি। যদি সত্যিই লাইনটা পেয়ে যাই, তিনি আমায় দীর্ঘ সময় দেবেন তো? নাকি বিরক্ত হয়ে লাইন কেটে দেবেন। তাকে বিরক্ত করা ঠিক হবে না নিশ্চয়।

আমি সত্যিই এক কুফা। টিভি চ্যানেলগুলোয় দেশের নানা কিসিমের নায়ক-নায়িকাদের ফোনোলাইভ গানের অনুষ্ঠান হয়। কত চেষ্টা করেছি—তাদের সঙ্গে কথা বলব। অখ্যাত-বিখ্যাত উঠতি-পড়তি কোনো গানের শিল্পীকে বাদ দিইনি। যাকেই দেখেছি—ফোনের পর ফোন করে গেছি। আমার দুর্ভাগ্য, কখনও তাদের পাইনি। চ্যানেলগুলোর এক গাদা লাইন দেয়া থাকে। পাঁচ-ছয়টা নম্বর। সবগুলোতে ট্রাই করতে করতে আঙুল ব্যথা করে ফেলেছি। কোনো সুবিধা করতে পারিনি। অথচ চোখের সামনে দেখেছি গায়িকা-নায়িকা হাস্য-লাস্য সহকারে নয়ন মনোহর ভঙ্গিতে অন্যসব কলারদের সঙ্গে কথা বলছেন। কলাররা তাকে প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন। জীবনে যার কেউ নাম শোনেনি তাকেও বলছে, আপনার কণ্ঠ লতা—আশার মতো সুন্দর। আপনার অমুক গানটা খুব ভালো লেগেছে। ওটা সুপার-ডুপার হিট হয়েছে। সেই গান আমি জীবনেও কাউকে শুনতে দেখিনি।

তারপর অবাক হয়ে দেখেছি, শুধু গুণগ্রাহী, ভক্ত, মুগ্ধ শ্রোতাই নয়, গায়িকার বাল্যবন্ধু, মাসি, পিসি, খালু, খালা, মামি, বন্ধুর শ্যালক, বাবা, নানি, দাদি—এরা পারিবারিক আলোচনার আসর খুলে বসেছেন। তাদের বাচাল মুখর প্রশংসার জোয়ারে গান লাটে উঠেছে। উফ! সেসব অভিজ্ঞতা সত্যিই হরিবল। ভয়ংকর।

বঞ্চিত, বিরক্ত, বিস্মিত আমি মনে মনে এই ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছি, টিভি কোম্পানিগুলো সম্ভবত এমন কোনো সিস্টেম করে রেখেছে—গায়ক-গায়িকার দুর্দমনীয় ভক্ত, অনুরাগী, প্রশংসাকারী, কিংবা গায়িকার খালা, মাসি, বাল্যবান্ধবী না হলে অন্য কেউ তাকে ফোনে পাবে না। অন্য কেউ ফোন করলে অবিরাম বিজি টোন কিংবা রিং টোন বাজলেও কেউ ধরবে না।
পরে অবশ্য খোঁজ-খবর নিয়ে দুষ্টু বিনোদন রিপোর্টারদের কাছ থেকে জেনেছি, উঠতি অখ্যাত গায়ক-গায়িকারা নানারকম সেটিং করে রাখেন। তারা আগে থেকেই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের বলে রাখেন। অনেক কষ্টে প্রোগ্রাম পেয়েছি, লাইভটা যেন ফ্লপ যায় না। একদল ভক্ত গুণগ্রাহী তারা সাজিয়ে রাখেন, তারাই প্রশংসার বন্যায় ভাসিয়ে দেন মহান সঙ্গীত শিল্পীকে।
কিন্তু তারপরও প্রশ্ন—ওই নির্দিষ্ট লোকগুলোই কেন ফোন পাবে, আমি কেন আঙুল ব্যথা করেও ‘রিচ’ করতে পারব না। কে জানে, হয়তো আরও কোনো সিস্টেম কলাকৌশল করা হয়, আমরা ‘ছাগলটাইপ’ কলাররা সেই সম্পর্কে কিছুই জানি না।

তওবা, তওবা। প্রধানমন্ত্রীর দরবারে ফোন করার ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তেমন কিছু কলাকৌশল করা হচ্ছে না। তাছাড়া বিজি টোন নয়; রিং তো ঠিকই হচ্ছে। কিন্তু খোদা না খাস্তা, তাই আমি ফোন পাচ্ছি না। কিন্তু তাই বলে কথা বন্ধ থাকবে, তা তো হয় না। ফোন করা নাই হলো, ইমেইলে বা পত্রিকায় লিখে তাকে আমার কথা জানাতে পারি। তাহলে এবার সাজানো ব্যাপারগুলো খুলে বলি।

প্রধানমন্ত্রীর পরিবার প্রসঙ্গ : প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর পরিবার প্রসঙ্গে দুটো কথা বলি। সম্প্রতি তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তিনি বা তার পরিবারের কেউ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। তিনি জানিয়েছেন, তার পরিবারের সদস্য হলো—তিনি ও তার ছেলেমেয়ে এবং তার বোন শেখ রেহানা ও তার ছেলেমেয়ে। এর বাইরে কেউ তাদের পরিবারভুক্ত নন। এরা কেউ দুর্নীতি করেন না। এই গুটিকয়েক পরিবার সদস্যের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি দুর্নীতি করে, তবে তাদের সমুচিত শাস্তি দেয়া হবে। তিনি টেলিফোন ও ইমেইলে তাদের নাম-ঠিকানাসহ অভিযোগ জানাতে বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে কথা। এর নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তার কথায়, তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা দুর্নীতি করেন না দাবি করা হলেও একইসঙ্গে দেশে ব্যাপক দুর্নীতি যে হচ্ছে, তা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। কেবল তিনি কৈফিয়ত কবুল করেছেন—ওইসব দুর্নীতির সঙ্গে তারা জড়িত নন। যদি দেশে দুর্নীতির মচ্ছবই না হতো তবে তিনি শুধু ১০-১২ জন ব্যক্তিকে কেন নির্দোষ ও দুর্নীতিমুক্ত দাবি করবেন। তার তো বলার কথা—দেশে তার শাসনামলে দুর্নীতির ‘দ’ও হচ্ছে না। তার মন্ত্রিসভায় কোনো দুর্নীতিবাজ নেই। সারাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী দুর্নীতি চাঁদাবাজি করছে না। তার সরকার, তার মন্ত্রিসভা, তার দল, মহাজোট, প্রশাসন—সব দুর্নীতিমুক্ত। তার বলার কথা—দেশে এখন দুর্নীতিবিহীন স্বর্ণযুগ চলছে। যেমনটা তিনি মাত্র ক’দিন আগেও বড়গলায় দাবি করতেন। তিনি বড়গলায় বলেছেন, কুইক রেন্টাল চক্র, সুরঞ্জিত, আবুল হোসেন—কেউ দুর্নীতি করেনি। আওয়ামী এমপিরা কোনো দুর্নীতি করেনি। যত দুর্নীতি সব আগের আমলে হয়েছে। এখন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।

সংসদে দেয়া সর্বশেষ বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী রাতারাতি সেই বক্তব্য থেকে সরে গেছেন। প্রচণ্ডভাবে সরে গেছেন। তার সরকার সদস্যবর্গ—মন্ত্রীরা, এমপিরা, আওয়ামী লীগ ও মহাজোট নেতাকর্মী, প্রশাসন, আমলা, উপদেষ্টারা দুর্নীতিমুক্ত—এই সার্টিফিকেট তিনি আর দিচ্ছেন না। কুইক রেন্টালের লুটেরা চক্র দুর্নীতি করেনি, এটা বলছেন না। শেয়ারবাজারের দরবেশচক্র, আবুল-সুরঞ্জিত দুর্নীতি করেনি—এমন দাবি থেকে তিনি হঠাত্ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন। এখন দুর্নীতিমুক্ত কেবল তিনি, শেখ রেহানা এবং তাদের সন্তানরা।

মহাজোট নেত্রীর এমন রাতারাতি চুপসে যাওয়ার কারণ কি! একটা মোক্ষম কারণ হতে পারে, অভিযোগ-সন্দেহের তীর তার একান্ত আত্মীয়-স্বজনদের দিকে ওঠায় তিনি ভীষণভাবে রক্ষণশীল হয়ে পড়েছেন। এখন ‘চাচা আপন বাঁঁচা’ অবস্থা। ঠেলার নাম বাবাজি। অবস্থা এখন এমনই সঙ্গিন ও বেগতিক যে, অন্য দুর্নীতিবাজ-দস্যুদের রক্ষার আর সুযোগ নেই। এখন নিজেদের ইমেজ নিয়েই টানাটানি।

কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই পিঠটান কেউ প্রত্যাশা করেনি। বাংলা-ইংরাজি অভিধান, ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম—ফ্যামিলি বা পরিবার হচ্ছে—১. স্বামী, স্ত্রী, সন্তানাদি; অথবা ২. সব রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয় (All blood relation); অথবা ৩. সেইসব সদস্য, যারা একই খানা-বসতিতে বাস করেন—চাকর-বাকর, আত্মীয়-স্বজন এবং অর্থনৈতিক সামাজিক সুবিধাভোগীরা।

অভিধানভুক্ত এসব সংজ্ঞার কোনটি প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করলেন! একইসঙ্গে এই প্রশ্নও এসে যায়, এর মধ্যে কোনো সংজ্ঞা প্রধানমন্ত্রী অবজ্ঞা করতে পারেন কিনা।

সংজ্ঞা নম্বর এক : স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মরহুম স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা, জয় এবং পুতুল বাদে কেউই পরিবারভুক্ত নন। ওয়াজেদ মিয়া মৃত। জয় বিয়ে করে আমেরিকায় আলাদা স্বামী-স্ত্রী ইউনিট কায়েম করেছেন। পুতুল কানাডায় পৃথক স্বামী-স্ত্রী-সন্তান ইউনিট কায়েম করেছেন। দুটো আলাদা পরিবার সেখানে স্থায়ীভাবে বসত গেড়েছে। এরা এখন মায়ের পরিবারভুক্ত কিনা অভিধানকর্তারা ভালো বলতে পারবেন।

আরেকটি কথা, এই সংজ্ঞা মেনে নিয়ে তার নিজের ছেলেমেয়েকে কোনোক্রমে পরিবারভুক্ত করা গেলেও প্রধানমন্ত্রী কোনো অবস্থাতেই তার বোন ও ভাগ্নে-ভাগ্নিদের পরিবারভুক্ত দাবি করতে পারেন না। এক্ষেত্রে তাদের পরিবারভুক্ত রাখার কোনো সুযোগই নেই।

সংজ্ঞা নম্বর দুই : অল ব্লাড রিলেশন। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখানে সব রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয়কে পরিবারের ছাতার নিচে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। তবে এই সংজ্ঞায় সমস্যা হলো পরিবার তখন শেখ হাসিনার দাবিমতো, তিনি ও তার বোন এবং তাদের সন্তানরা—এই সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না। এক্ষেত্রে তার সব রক্ত-সম্পর্ক—চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো, খালাতো ভাইবোন-বেরাদর সবাই রয়েছেন। শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার শেখ বংশের অন্যান্য গর্বিত উত্তরাধিকারী সদস্য, যেমন—শেখ সেলিম, শেখ মারুফ, শেখ তাপস, শেখ হেলাল প্রমুখ; নূর ই ইসলাম চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, বরিশালের আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ সবাই পরিবারভুক্ত। কাউকেই বাদ দেয়ার সুযোগ নেই।

এখানে সমস্যার বিষয় হলো এই সংজ্ঞা মেনে নিয়ে শেখবংশ এবং খালাতো, মামাতো, ফুপাতো—সবাইকে পরিবাভুক্ত করে নিলে প্রধানমন্ত্রী আর বড়গলায় নিজেকে দুর্নীতি ও কলঙ্কমুক্ত দাবি করতে পারেন না। অন্যান্য অভিযোগ বাদই দিলাম, এই পরিবার সদস্যদের একজনের বিরুদ্ধে পরিষ্কার অভিযোগ রয়েছে। পদ্মা সেতু মহা কেলেঙ্কারির দুর্নীতির ইস্যুতে মহাজোট পরিবারের পরম কুটুম্ব আবুল হোসেন গংয়ের উেকাচ দাবির ঘটনায় নিক্সন চৌধুরী ওতপ্রোত জড়িত। বিশ্বব্যাংকের এজাহারে তার নাম রয়েছে। সেটির ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন এরই মধ্যে নিক্সনকে তাদের দফতরে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। দুদক যথারীতি নিক্সনকে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ সিলমোহর দিয়েছে কিনা এখনও সেই পাকা খবর শুনিনি। নিক্সন নামটি খুব চেনা চেনা লাগছে। ও হ্যাঁ—রিচার্ড নিক্সন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিশ্বব্যাপী বিতর্কিত নিন্দিত নাম। ’৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞকে নতুন মাত্রা দিতে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিলেন। ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির হোতা। ওই কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন।

বাংলাদেশের চলতি শতাব্দীর মহাকলঙ্ক—পদ্মা গেট কেলেঙ্কারি। এখানেও একজন নিক্সনের জড়িত থাকার অভিযোগ টেবিলে। কাকতালীয় ব্যাপার বৈকি। বঙ্গবন্ধুর স্বজন গোষ্ঠীতে রিচার্ড নিক্সনের অনুকরণকৃত নাম। বিধাতার বিচিত্র পরিহাস বৈকি!

দুই নম্বর সংজ্ঞা প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিব্রতকর দেখছি। এটি কবুল করলে তার দাবি পরিষ্কারভাবে ধোপে টেকে না।

এবার যাই তিন নম্বর সংজ্ঞায়। এটি উদার ব্যাপক। আওয়ামী লীগের মতো বিরাট দল, মহাজোট, শেখবংশ; সকল রকম আত্মীয়স্বজন; গোপালগঞ্জবাসীসহ বরিশাল আর ফরিদপুর-খুলনার সব সুবিধাভোগী; মন্ত্রী উপদেষ্টা—তৌফিক-ই-ইলাহী, আবুল, সুরঞ্জিত, গওহর রিজভী ম. খা. আলমগীর, এইচটি ইমাম, লতিফ বিশ্বাস, দিলীপ বড়ুয়া, নুহ উল আলম লেনিন, রাশেদ খান মেনন, ইনু, মশিউর, ছাত্রলীগ-যুবলীগ—সবাইকে আমরা এই বিশাল পরিবারের ছাতার নিচে স্থান দিতে পারি। এমনকি মহাজোট প্রশাসনের বেনেফিশারি আমলা- সারভেন্টস তারাও ঠাঁই পান। চাকর-বাকর, আত্মীয়স্বজন এবং অর্থনৈতিক সামাজিক সুবিধাভোগী ইউনিটের সবাই সদস্য; তদুপরি বাচাল গাড়ল মাহফুজ, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির বিষচক্র, সাগর-রুনিসহ হাজারো হত্যাকাণ্ডের মার্জনাপ্রাপ্ত ও দণ্ড মওকুফ খুনিচক্র সামাজিক-অর্থনৈতিক সুবিধাভোগীর কাতারে পরিবারের শামিয়ানার নিচে দাঁড়াতে পারে।

পরিবার বা ফ্যামিলির এই তিন নম্বর ব্যাখ্যানটি অভিধান ও সমাজবিদ কর্তৃক সুস্বীকৃত। এটি সুগৃহীত হলে মহাজোট জমানার পারিবারিক শাসন (কেউ দুঃশাসন পড়লে দোষের কিছু নয়) পারিবারিক দুর্নীতি-কেলেঙ্কারির সামষ্টিক দিকগুলো চমত্কারভাবে উদ্ভাসিত হয়। এটি একটি এপিক ক্যানভাস। তৌফিক-ই-ইলাহীর রেন্টাল বিদ্যুত্, প্রায় এক লাখ কোটি টাকার গ্রস দুর্নীতি, আবুল গংয়ের পদ্মা সেতু টাইটানিক দুর্নীতি; আমলা-উপদেষ্টাদের ঘুষ-উেকাচ, সুরঞ্জিত গংয়ের ৭০ লাখ টাকার বস্তা; পুত্র সৌমেনের সেনগুপ্ত টেলিকম; মশিউর, গওহর, রিজভীর ভারত তোষণ; লতিফ বিশ্বাসের সস্ত্রীক-সকন্যা তৃণমূল দুর্নীতি; দরবেশ বেশধারী লুটেরাদের এক লাখ কোটি টাকা শেয়ারবাজার মহাডাকাতি; এইচটি ইমামের আমলাশাহী; দিলীপ বড়ুয়ার প্লট-পাজেরো এসি; লাখ টাকার স্যুট-প্যান্ট; লেনিনের বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন; মেননের সুদীপ্ত প্রিন্টার্স, তেজগাঁওয়ে বাণিজ্যিক প্লট—সব মিলিয়ে মহোত্সব কাণ্ড। মহাজোটের মচ্ছব। প্রশ্ন হলো—প্রধানমন্ত্রী কোন সংজ্ঞাটি গ্রহণ করবেন? তিনি ও তার পরিবারকে দুর্নীতিমুক্ত দাবি করতে গেলে কোনো সংজ্ঞাই খাপসই হচ্ছে না। অবশ্য মহাজোট পরিবারের আরেক হিস্যা—বশংবদ তেলবাজ বুদ্ধিজীবীদের হুকুম দিলে তারা যুতসই কোনো নতুন সংজ্ঞা বাতলে দিতে পারেন কিনা দেখা যেতে পারে।

পদ্মা সেতুর টাকার সন্ধানে : টাকা কোথায় পাই! পদ্মা সেতুর জন্য ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা কোথায় পাই! বুদ্ধদেব বসুর সেই পদ্মা ও শোন নদী দেখার আকাঙ্ক্ষা-সংবলিত ‘নদীর স্বপ্ন’ কবিতাটি মনে পড়ছে। বোন ছোকানুকে নিয়ে শোন নদীর সেতু দেখতে যাবে ভাই। মাঝির কাছে দেনদরবার করছে, একপর্যায়ে তার আকুতি—‘ছোকানুর কাছে দুটি আনি আছে—তোমাকে দেবো গো তাও / আমাদের যদি তোমার সঙ্গে নৌকায় নিয়ে যাও।’ বলতে দ্বিধা নেই, নিত্যদরকারি চালডাল-লবণের দোজখি দামে পুড়ে কয়লা এই গরিব জাতিকে পদ্মা নদীর ওপরের স্বপ্নসেতু দেখাবার লোভ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নজর এখন ‘ছোকানু নামের গ্রাম্য দরিদ্র কিশোরীর মহার্ঘ সঞ্চয় ‘দুটি আনি’র দিকে।

ওই পরম দুটি আনিও তারা এখন পদ্মা সেতুর অ্যাকাউন্টে জমা করতে বলছেন। কালো বেড়াল মন্ত্রিচক্রের কথা না হয় বাদ দিলাম, যাকে ন্যূনতম বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন বলে মনে করতাম, সেই স্পিকারের নজরও সর্বহারার পয়সা আনা-পাইয়ের দিকে। জনগণের জাতীয় সংসদের অধ্যক্ষ খোদ সংসদের অধিবেশনে বসেই প্রস্তাব করেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে নিজস্ব অর্থায়নের উত্স হিসেবে মোবাইল ফোনের প্রতিকলে ২৫ পয়সা সারচার্জ আরোপের। বোঝাই যাচ্ছে, সারাদেশে কোটি কোটি গরিব মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন দেখে অভিজাতদের চোখ টাটাচ্ছে। এর আগে অর্থমন্ত্রীও তার বাজেট প্রস্তাবে মোবাইলে কথা বলার ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী এই একটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলেন, দেখা যাচ্ছে। মোবাইল কোম্পানিগুলো এ পর্যন্ত ৯ কোটির বেশি গ্রাহক জোগাড় করেছে। সারাদেশে খালি কথা আর কথা। রিকশাঅলা, সেও কথা বলে। কৃষক-মজুর, সেও কথা বলে। চলতি-ফিরতি রাস্তাঘাটে কেবলি উচ্চৈঃস্বরের শব্দ। এর মধ্যে নিত্য দরকারি পারিবারিক-সামাজিক আলাপ চলছে। আবার জনদুর্ভোগ—ব্যবসা-বাণিজ্য, হাট-বাট, বাজারে আগুন পণ্যমূল্য—এ নিয়ে হায়-হাহুতাশও একেবারে কম নয়।
৯ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। এর বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। হঠাত্ বাংলা বসন্ত মার্কা কোনো জনঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে কতক্ষণ। আমরা তখন নাম দেব মোবাইল বসন্ত। তাছাড়া চাকর-বাকর, পিওন-দারোয়ান, কৃষক, গরিব-মিসকিন, রিকশাঅলা-মজুর—এরা এত কথা বলবে কেন? এদের এত কথা কিসের! তাদের যা কথাবার্তা তা তো প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী নেতা-উপনেতারাই সকাল-সন্ধ্যা অবিরাম বলে যাচ্ছেন। পাবলিক খালি শুনবে। তাদের বলার কিছু থাকতে পারে না।

অবশ্য মোবাইলে অর্থমন্ত্রীর কর-মিসাইল সাময়িক স্থগিত করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, মোবাইল সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। তাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থারোপ ঠিক নয়।
গরিবদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ওই দরদ তখন লোকদেখানো ভণিতা ছিল বলেই মনে হচ্ছে। স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট মঙ্গল গ্রহ থেকে আসেননি। এই নয়া সারচার্জ নামক কর-টর্পেডো সরকারপ্রধান ও সরকারি দলের মনোবাঞ্ছা না হলে তার এমন প্রস্তাব করার কথা নয়। এবার প্রধানমন্ত্রীও দেখলাম এ নিয়ে কোনো চটজলদি মন্তব্য করলেন না। গরিবের গরিবির ধুয়া তুললেন না। তিনিও নিজস্ব টাকায় পদ্মা সেতু খাড়া করার পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করছেন। মহাজোট পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলনেঅলা বিশ্বব্যাংককে একহাত দেখে নিতে হবে যে! সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনীতে তিনি আবারও বিশ্বব্যাংককে তুলাধুনো করেছেন। শেখ হাসিনার রাজনীতি বুঝতে হলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রবচন অবশ্যই আমলে নিতে হবে। কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, বাঘে ধরলে বাঘে ছাড়ে—শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না।

বিশ্বব্যাংকের এবার রেহাই নেই। সুরঞ্জিতের কথামত তাদের শুধু বাঘে ধরেনি, ধরেছে বাঘের বাঘ। অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন হাসিনা—পদ্মা সেতু বাবদ বিশ্বব্যাংকের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে। বুঝুন ঠেলা। দুর্নীতির রাঘব বোয়াল ধরতে কোচ নিয়ে পুকুরে নেমেছিল বিশ্বব্যাংক। তারা বোঝেনি, পুকুরে কত জল। এখন বোয়ালেই উল্টো কোচকে ধাওয়াচ্ছে।

শেখ হাসিনা যে নিজস্ব টাকায় সেতু করবেন, সেটা আসলে তার ব্যক্তিগত টাকা নয়। মহাজোট ক্যাপ্টেনের নজর এবার গরিব জনগণের টাকার ওপর। উন্নয়ন বাজেটে ৫৫ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এই টাকার কিছুই তেমন জনগণের দোরগোড়ায় যায় না। এক বছর আগে গত রোজার ঈদে সারাদেশের ক্ষতবিক্ষত এবড়ো-থেবড়ো চড়াই-উত্রাই রাস্তাঘাট নিয়ে আবুল নানা উদ্ভট উত্কট কৈফিয়ত দিচ্ছিলেন। তার বদলে ওবায়দুল কাদের এখন সড়কমন্ত্রী। এক বছরেও রাস্তাঘাটের কোনো উন্নতি হয়নি। ওবায়দুল এখন সড়ক বিভাগের চোর-ছেঁচোড়দের ‘নইলে খবর আছে’ মার্কা ভয়ভীতি দেখিয়ে রাস্তার দুরবস্থা আগাম জনগণকে জানাচ্ছেন। ঈদ আসছে। জনগণ এবার টুঁটি চেপে ধরবে যে! সত্যি বলতে কি, বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে বৈদেশিক তত্ত্বাবধানে কাজ বাদে সড়ক-সেতু—কোনো উন্নয়ন কাজই দেশে সুষ্ঠুভাবে হয় না। যেটা হয় তা হলো উন্নয়নের নামে লুটপাট। সরকারের উন্নয়ন বাজেটের টাকা মানেই হরিলুটের বাতাসা। আশঙ্কা হচ্ছে, এসব টাকা আগামীতে পদ্মাদেবীর ভোগেই লাগবে। বিশ্বব্যাংকের টাকা এনে যথেচ্ছ ভোগ-বিলাস-ব্যসনে লাগানোর পারিবারিক প্রকল্প বৈদেশিক কটু নজরদারিতে ভেস্তে যেতেই এখন কুনজর জনগণের টাকার দিকে।

এজন্য কথা বলার ওপর সারচার্জ, স্কুল ছাত্রছাত্রীদের টিফিনে জমানো টাকা, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স, উন্নয়ন বাজেট—রাজার লম্বা হাত এখন সব দিকেই বাড়ানো হচ্ছে। ওদিকে মহাজোটের নিজস্ব তদারকিতে ব্রিজ হচ্ছে শুনে কিছু লোকের উত্সাহ দেখে কে! ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মালিকদের জোটপ্রধান শেখ কবীর হোসেন বলেছেন, তারাই ১১ হাজার কোটি টাকা দিতে পারবেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবার-ঘনিষ্ঠ আরেক শিল্পগোষ্ঠী সিকদার গ্রুপ বলেছে, তারা অন্তত ২০০ কোটি টাকা দিতে পারবে। বৃহত্তর শেখ পরিবারের লোকজনকে শেখ হাসিনা যতই দূরে ঠেলতে চান, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এরাই প্রথম তার পাশে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে উপস্থিত। এদের অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত। শেখ পরিবারের শত সদস্য এখন নানা নামে নানা পরিচয়ে বিশাল শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে—এরকম দু-একটা পদ্মা সেতু তাদের বংশীয় অর্থায়নেই তৈরি করা সম্ভব। বিশ্বব্যাংককে ঠ্যাঙাতে গিয়ে কেন অযথা জাতিকে জড়াচ্ছেন।

এই বাঙালি জাতিকে কোনো বিশ্বাস নেই। ক্ষমতার নামে লুটপাটকারীদের জন্য এই জাতটা মস্ত বেইমান। ষাটের দশকে, সত্তরের নির্বাচনে এরা শেখ মুজিবকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল।

আবার এরাই ’৭২-’৭৫-এর দুঃশাসনে চরম বৈরী হয়ে পড়ে মুজিব সরকারের জন্য। সে ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে যে বিপ্লবীপনা দেখাচ্ছেন, তা সাধারণের চোখে তামাশা ছাড়া কিছু নয়। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে বিশ্বাস করে না, এমন লোক আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মাঝেই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সাধারণ মানুষ এখন ব্যালটে সরকারের বালখিল্যতা- অপরিণামদর্শিতার জবাব দেয়ার জন্য মুখিয়ে। দেশে এখন মুজিব কোটধারীদের সংখ্যা আশ্চর্যরকম কমে গেছে। নৌকা প্রতীক হ্যান্ডেল ও হুডের ওপর বসিয়ে দিনভর মুজিব স্তুতিকারী রিকশাঅলাদের আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কোথায় হারালো তারা! কেন হারিয়ে গেল? বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে ধারণা করেছিলাম, মার-মার কাট-কাট হবে বইটি। ৫০-৬০ হাজার কপি তো বিকোবেই। সাধারণ আওয়ামী লীগাররা কিনলেই লাখখানেক কপি বিক্রি হওয়ার কথা। সেখানে ৫-১০ হাজার কপিই নাকি বিক্রি হচ্ছে না। এখন ‘রকমারি’ নামের একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ মূল্যছাড়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বিক্রির উদ্যোগেও সাড়া মিলছে না। এমনটি হওয়ার কথা নয়, তবুও হচ্ছে; তার কারণ পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। এখন নাট্য প্রহসন রঙ-ঢঙ করেও শেষ রক্ষা হবে না। এখন খোদ আওয়ামী লীগাররাই বঙ্গবন্ধুর লেখা বই কিনছেন না।

জনগণকে চরমভাবে ঠকানো হয়েছে। কিন্তু প্রতারণা-প্রবঞ্চনা আর কতদিন! মানুষকে রামগাধা ভেবে পরম আত্মতুষ্টি লাভ করছেন, যা ইচ্ছে তা-ই কাজ করা হচ্ছে। ভাবছেন, গাধার বাচ্চা জনগণ কেন কিছু বলছে না! নিশ্চয়ই এদের ঘাড়ে উঠে পাড়ালেও কিছু বলবে না। লুটপাটের অফুরন্ত খনি প্রকল্প গড়ার লক্ষ্যে আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর ও বঙ্গবন্ধু সিটি তৈরির অপচেষ্টা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। জনগণ বোকা সাজার ভান করে। আসলে তারা বোকা নয়। রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু নামের লুটপাটের মহা আয়োজনকে ভণ্ডুল করে দিয়েছে জনতা।

বিশ্বব্যাংকের কাছে তীব্র চপেটাঘাত খেয়েও সরকারের মধ্যে লজ্জা-শরমের লক্ষণ দেখছি না। এবার তারা দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির নাম ভাঙিয়ে তথাকথিত নিজস্ব অর্থায়নের ব্যাপারে জনগণের টাকা নিয়ে মহা দুর্নীতির নতুন নকশা এঁটেছে।

সততা শেখানো হচ্ছে জাতিকে। শিশু-কিশোর, কৃষক-মজুরদেরও এই ভণ্ডামির মধ্যে টানা হচ্ছে। বেহায়াপনার একটা সীমা আছে।

এতই যখন নিজস্ব টাকায় সেতু বানানোর ইচ্ছা—মহাজোট আমলে আত্মসাত্কৃত লুটের টাকায়ই একাধিক ব্রিজ তৈরি সম্ভব। শেয়ারবাজার থেকে যে এক লাখ কোটি টাকা লুট হয়েছে, কুইক রেন্টালের টাকা—এসব অর্থ দিয়ে তারা ব্রিজ বানিয়ে জাতিকে অবশ্যই সারপ্রাইজ দিতে পারেন। মহাজোটের একাধিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সাবেক আমলা কাম এমপি চলতি জমানায় যত টাকা কামিয়েছেন, তাদের টাকাতেও একাধিক সেতু সম্ভব। আর বিদেশে বসে এসব লুটেরাদের কাছ থেকে যারা উচ্চ হারে কমিশন নিয়েছেন, দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে তাদেরও। আশঙ্কা হয়—টিফিনের টাকা, প্রবাসীর টাকা ইত্যাদি বালখিল্য আবেগের আড়ালে সত্যি সত্যিই আবার লুটেরা বখরাজীবী সিন্ডিকেটের গোপন অর্থায়নে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে সেতুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কিনা!

বলা বাহুল্য, মালয়েশিয়ান কোম্পানির আড়ালে পিপিপির নামে এমন প্ল্যান-প্রোগ্রাম মহাজোট দুর্নীতিবাজদের মগজে রয়েছে। এখন দেশপ্রেম-মুক্তিযুদ্ধ, মোবাইল ফোনের ওপর সারচার্জ ইত্যাদির নামে ব্যাপক ডামাডোল তৈরি করে তলে তলে ভাড়ার বিদ্যুত্ প্রকল্পের মতো ‘ভাড়ার পদ্মা সেতু’ করা যায় কিনা তার সময়-সুযোগ ও মোক্ষম মওকা খোঁজা হচ্ছে। সুতরাং সাধু সাবধান! ‘যে গান তুমি শুনিতেছ, সেটি আসল গান নয়। যে গল্প তুমি জানিতেছ সেটি আসল গল্প নয়।’ তোমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম শুনেছ, সাহারা ইন্ডিয়ার নামও ইদানীং শুনছ, কিন্তু সাহারা ইন্ডিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জান না। পিকচার এখনও বাকি, প্রিয় বন্ধু!