ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রীর পরিবার প্রসঙ্গে দুটো কথা বলি। সম্প্রতি তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, তিনি বা তার পরিবারের কেউ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। তিনি জানিয়েছেন, তার পরিবারের সদস্য হলো—তিনি ও তার ছেলেমেয়ে এবং তার বোন শেখ রেহানা ও তার ছেলেমেয়ে। এর বাইরে কেউ তাদের পরিবারভুক্ত নন। এরা কেউ দুর্নীতি করেন না। এই গুটিকয়েক পরিবার সদস্যের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি দুর্নীতি করে, তবে তাদের সমুচিত শাস্তি দেয়া হবে। তিনি টেলিফোন ও ইমেইলে তাদের নাম-ঠিকানাসহ অভিযোগ জানাতে বলেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর কথা বলে কথা। এর নানা গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তার কথায়, তিনি বা তার পরিবারের সদস্যরা দুর্নীতি করেন না দাবি করা হলেও একইসঙ্গে দেশে ব্যাপক দুর্নীতি যে হচ্ছে, তা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। কেবল তিনি কৈফিয়ত কবুল করেছেন—ওইসব দুর্নীতির সঙ্গে তারা জড়িত নন। যদি দেশে দুর্নীতির মচ্ছবই না হতো তবে তিনি শুধু ১০-১২ জন ব্যক্তিকে কেন নির্দোষ ও দুর্নীতিমুক্ত দাবি করবেন। তার তো বলার কথা—দেশে তার শাসনামলে দুর্নীতির ‘দ’ও হচ্ছে না। তার মন্ত্রিসভায় কোনো দুর্নীতিবাজ নেই। সারাদেশে আওয়ামী লীগের কোনো নেতাকর্মী দুর্নীতি চাঁদাবাজি করছে না। তার সরকার, তার মন্ত্রিসভা, তার দল, মহাজোট, প্রশাসন—সব দুর্নীতিমুক্ত। তার বলার কথা—দেশে এখন দুর্নীতি বিহীন স্বর্ণযুগ চলছে। যেমনটা তিনি মাত্র ক’দিন আগেও বড়গলায় দাবি করতেন। তিনি বড়গলায় বলেছেন, কুইক রেন্টাল চক্র, সুরঞ্জিত, আবুল হোসেন—কেউ দুর্নীতি করেনি। আওয়ামী এমপিরা কোনো দুর্নীতি করেনি। যত দুর্নীতি সব আগের আমলে হয়েছে। এখন দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।

সংসদে দেয়া সর্বশেষ বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী রাতারাতি সেই বক্তব্য থেকে সরে গেছেন। প্রচণ্ডভাবে সরে গেছেন। তার সরকার সদস্যবর্গ—মন্ত্রীরা, এমপিরা, আওয়ামী লীগ ও মহাজোট নেতাকর্মী, প্রশাসন, আমলা, উপদেষ্টারা দুর্নীতিমুক্ত—এই সার্টিফিকেট তিনি আর দিচ্ছেন না। কুইক রেন্টালের লুটেরা চক্র দুর্নীতি করেনি, এটা বলছেন না। শেয়ারবাজারের দরবেশচক্র, আবুল-সুরঞ্জিত দুর্নীতি করেনি—এমন দাবি থেকে তিনি হঠাত্ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছেন। এখন দুর্নীতিমুক্ত কেবল তিনি, শেখ রেহানা এবং তাদের সন্তানরা।

মহাজোট নেত্রীর এমন রাতারাতি চুপসে যাওয়ার কারণ কি! একটা মোক্ষম কারণ হতে পারে, অভিযোগ-সন্দেহের তীর তার একান্ত আত্মীয়-স্বজনদের দিকে ওঠায় তিনি ভীষণভাবে রক্ষণশীল হয়ে পড়েছেন। এখন ‘চাচা আপন বাঁঁচা’ অবস্থা। ঠেলার নাম বাবাজি। অবস্থা এখন এমনই সঙ্গিন ও বেগতিক যে, অন্য দুর্নীতিবাজ-দস্যুদের রক্ষার আর সুযোগ নেই। এখন নিজেদের ইমেজ নিয়েই টানাটানি।

কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এই পিঠটান কেউ প্রত্যাশা করেনি। বাংলা-ইংরাজি অভিধান, ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম—ফ্যামিলি বা পরিবার হচ্ছে—১. স্বামী, স্ত্রী, সন্তানাদি; অথবা ২. সব রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয় (All blood relation); অথবা ৩. সেইসব সদস্য, যারা একই খানা-বসতিতে বাস করেন—চাকর-বাকর, আত্মীয়-স্বজন এবং অর্থনৈতিক সামাজিক সুবিধাভোগীরা।

অভিধানভুক্ত এসব সংজ্ঞার কোনটি প্রধানমন্ত্রী গ্রহণ করলেন! একইসঙ্গে এই প্রশ্নও এসে যায়, এর মধ্যে কোনো সংজ্ঞা প্রধানমন্ত্রী অবজ্ঞা করতে পারেন কিনা।

সংজ্ঞা নম্বর এক : স্বামী, স্ত্রী ও সন্তান। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর মরহুম স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা, জয় এবং পুতুল বাদে কেউই পরিবারভুক্ত নন। ওয়াজেদ মিয়া মৃত। জয় বিয়ে করে আমেরিকায় আলাদা স্বামী-স্ত্রী ইউনিট কায়েম করেছেন। পুতুল কানাডায় পৃথক স্বামী-স্ত্রী-সন্তান ইউনিট কায়েম করেছেন। দুটো আলাদা পরিবার সেখানে স্থায়ীভাবে বসত গেড়েছে। এরা এখন মায়ের পরিবারভুক্ত কিনা অভিধানকর্তারা ভালো বলতে পারবেন।

আরেকটি কথা, এই সংজ্ঞা মেনে নিয়ে তার নিজের ছেলেমেয়েকে কোনোক্রমে পরিবারভুক্ত করা গেলেও প্রধানমন্ত্রী কোনো অবস্থাতেই তার বোন ও ভাগ্নে-ভাগ্নিদের পরিবারভুক্ত দাবি করতে পারেন না। এক্ষেত্রে তাদের পরিবারভুক্ত রাখার কোনো সুযোগই নেই।

সংজ্ঞা নম্বর দুই : অল ব্লাড রিলেশন। হ্যাঁ, এক্ষেত্রে যথেষ্ট উদার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখানে সব রক্ত-সম্পর্কের আত্মীয়কে পরিবারের ছাতার নিচে ঠাঁই দেয়া হয়েছে। তবে এই সংজ্ঞায় সমস্যা হলো পরিবার তখন শেখ হাসিনার দাবিমতো, তিনি ও তার বোন এবং তাদের সন্তানরা—এই সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না। এক্ষেত্রে তার সব রক্ত-সম্পর্ক—চাচাতো, ফুফাতো, মামাতো, খালাতো ভাইবোন-বেরাদর সবাই রয়েছেন। শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার শেখ বংশের অন্যান্য গর্বিত উত্তরাধিকারী সদস্য, যেমন—শেখ সেলিম, শেখ মারুফ, শেখ তাপস, শেখ হেলাল প্রমুখ; নূর ই ইসলাম চৌধুরী, নিক্সন চৌধুরী, বরিশালের আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ সবাই পরিবারভুক্ত। কাউকেই বাদ দেয়ার সুযোগ নেই।

এখানে সমস্যার বিষয় হলো এই সংজ্ঞা মেনে নিয়ে শেখবংশ এবং খালাতো, মামাতো, ফুপাতো—সবাইকে পরিবাভুক্ত করে নিলে প্রধানমন্ত্রী আর বড়গলায় নিজেকে দুর্নীতি ও কলঙ্কমুক্ত দাবি করতে পারেন না। অন্যান্য অভিযোগ বাদই দিলাম, এই পরিবার সদস্যদের একজনের বিরুদ্ধে পরিষ্কার অভিযোগ রয়েছে। পদ্মা সেতু মহা কেলেঙ্কারির দুর্নীতির ইস্যুতে মহাজোট পরিবারের পরম কুটুম্ব আবুল হোসেন গংয়ের উেকাচ দাবির ঘটনায় নিক্সন চৌধুরী ওতপ্রোত জড়িত। বিশ্বব্যাংকের এজাহারে তার নাম রয়েছে। সেটির ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশন এরই মধ্যে নিক্সনকে তাদের দফতরে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে। দুদক যথারীতি নিক্সনকে ‘দুর্নীতিমুক্ত’ সিলমোহর দিয়েছে কিনা এখনও সেই পাকা খবর শুনিনি। নিক্সন নামটি খুব চেনা চেনা লাগছে। ও হ্যাঁ—রিচার্ড নিক্সন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিশ্বব্যাপী বিতর্কিত নিন্দিত নাম। ’৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞকে নতুন মাত্রা দিতে বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিলেন। ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারির হোতা। ওই কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে পদত্যাগে বাধ্য হন।

বাংলাদেশের চলতি শতাব্দীর মহাকলঙ্ক—পদ্মা গেট কেলেঙ্কারি। এখানেও একজন নিক্সনের জড়িত থাকার অভিযোগ টেবিলে। কাকতালীয় ব্যাপার বৈকি। বঙ্গবন্ধুর স্বজন গোষ্ঠীতে রিচার্ড নিক্সনের অনুকরণকৃত নাম। বিধাতার বিচিত্র পরিহাস বৈকি!

দুই নম্বর সংজ্ঞা প্রধানমন্ত্রীর জন্য বিব্রতকর দেখছি। এটি কবুল করলে তার দাবি পরিষ্কারভাবে ধোপে টেকে না।

এবার যাই তিন নম্বর সংজ্ঞায়। এটি উদার ব্যাপক। আওয়ামী লীগের মতো বিরাট দল, মহাজোট, শেখবংশ; সকল রকম আত্মীয়স্বজন; গোপালগঞ্জবাসীসহ বরিশাল আর ফরিদপুর-খুলনার সব সুবিধাভোগী; মন্ত্রী উপদেষ্টা—তৌফিক-ই-ইলাহী, আবুল, সুরঞ্জিত, গওহর রিজভী ম. খা. আলমগীর, এইচটি ইমাম, লতিফ বিশ্বাস, দিলীপ বড়ুয়া, নুহ উল আলম লেনিন, রাশেদ খান মেনন, ইনু, মশিউর, ছাত্রলীগ-যুবলীগ—সবাইকে আমরা এই বিশাল পরিবারের ছাতার নিচে স্থান দিতে পারি। এমনকি মহাজোট প্রশাসনের বেনেফিশারি আমলা- সারভেন্টস তারাও ঠাঁই পান। চাকর-বাকর, আত্মীয়স্বজন এবং অর্থনৈতিক সামাজিক সুবিধাভোগী ইউনিটের সবাই সদস্য; তদুপরি বাচাল গাড়ল মাহফুজ, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির বিষচক্র, সাগর-রুনিসহ হাজারো হত্যাকাণ্ডের মার্জনাপ্রাপ্ত ও দণ্ড মওকুফ খুনিচক্র সামাজিক-অর্থনৈতিক সুবিধাভোগীর কাতারে পরিবারের শামিয়ানার নিচে দাঁড়াতে পারে।

পরিবার বা ফ্যামিলির এই তিন নম্বর ব্যাখ্যানটি অভিধান ও সমাজবিদ কর্তৃক সুস্বীকৃত। এটি সুগৃহীত হলে মহাজোট জমানার পারিবারিক শাসন (কেউ দুঃশাসন পড়লে দোষের কিছু নয়) পারিবারিক দুর্নীতি-কেলেঙ্কারির সামষ্টিক দিকগুলো চমত্কারভাবে উদ্ভাসিত হয়। এটি একটি এপিক ক্যানভাস। তৌফিক-ই-ইলাহীর রেন্টাল বিদ্যুত্, প্রায় এক লাখ কোটি টাকার গ্রস দুর্নীতি, আবুল গংয়ের পদ্মা সেতু টাইটানিক দুর্নীতি; আমলা-উপদেষ্টাদের ঘুষ-উেকাচ, সুরঞ্জিত গংয়ের ৭০ লাখ টাকার বস্তা; পুত্র সৌমেনের সেনগুপ্ত টেলিকম; মশিউর, গওহর, রিজভীর ভারত তোষণ; লতিফ বিশ্বাসের সস্ত্রীক-সকন্যা তৃণমূল দুর্নীতি; দরবেশ বেশধারী লুটেরাদের এক লাখ কোটি টাকা শেয়ারবাজার মহাডাকাতি; এইচটি ইমামের আমলাশাহী; দিলীপ বড়ুয়ার প্লট-পাজেরো এসি; লাখ টাকার স্যুট-প্যান্ট; লেনিনের বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন; মেননের সুদীপ্ত প্রিন্টার্স, তেজগাঁওয়ে বাণিজ্যিক প্লট—সব মিলিয়ে মহোত্সব কাণ্ড। মহাজোটের মচ্ছব। প্রশ্ন হলো—প্রধানমন্ত্রী কোন সংজ্ঞাটি গ্রহণ করবেন? তিনি ও তার পরিবারকে দুর্নীতিমুক্ত দাবি করতে গেলে কোনো সংজ্ঞাই খাপসই হচ্ছে না। অবশ্য মহাজোট পরিবারের আরেক হিস্যা—বশংবদ তেলবাজ বুদ্ধিজীবীদের হুকুম দিলে তারা যুতসই কোনো নতুন সংজ্ঞা বাতলে দিতে পারেন কিনা দেখা যেতে পারে।