ক্যাটেগরিঃ অর্থনীতি-বাণিজ্য

 

পদ্মা সেতুর টাকার সন্ধানে পেরেশান সরকার। টাকা কোথায় পাই! পদ্মা সেতুর জন্য ২২ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা কোথায় পাই! বুদ্ধদেব বসুর সেই পদ্মা ও শোন নদী দেখার আকাঙ্ক্ষা-সংবলিত ‘নদীর স্বপ্ন’ কবিতাটি মনে পড়ছে। বোন ছোকানুকে নিয়ে শোন নদীর সেতু দেখতে যাবে ভাই। মাঝির কাছে দেনদরবার করছে, একপর্যায়ে তার আকুতি—‘ছোকানুর কাছে দুটি আনি আছে—তোমাকে দেবো গো তাও / আমাদের যদি তোমার সঙ্গে নৌকায় নিয়ে যাও।’ বলতে দ্বিধা নেই, নিত্য দরকারি চালডাল-লবণের দোজখি দামে পুড়ে কয়লা এই গরিব জাতিকে পদ্মা নদীর ওপরের স্বপ্নসেতু দেখাবার লোভ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নজর এখন ‘ছোকানু নামের গ্রাম্য দরিদ্র কিশোরীর মহার্ঘ সঞ্চয় ‘দুটি আনি’র দিকে।

ওই পরম দুটি আনিও তারা এখন পদ্মা সেতুর অ্যাকাউন্টে জমা করতে বলছেন। কালো বেড়াল মন্ত্রি চক্রের কথা না হয় বাদ দিলাম, যাকে ন্যূনতম বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন বলে মনে করতাম, সেই স্পিকারের নজরও সর্বহারার পয়সা আনা-পাইয়ের দিকে। জনগণের জাতীয় সংসদের অধ্যক্ষ খোদ সংসদের অধিবেশনে বসেই প্রস্তাব করেছেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে নিজস্ব অর্থায়নের উত্স হিসেবে মোবাইল ফোনের প্রতি কলে ২৫ পয়সা সারচার্জ আরোপের। বোঝাই যাচ্ছে, সারাদেশে কোটি কোটি গরিব মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন দেখে অভিজাতদের চোখ টাটাচ্ছে। এর আগে অর্থমন্ত্রীও তার বাজেট প্রস্তাবে মোবাইলে কথা বলার ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করেছিলেন। অর্থমন্ত্রী এই একটা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলেন, দেখা যাচ্ছে। মোবাইল কোম্পানিগুলো এ পর্যন্ত ৯ কোটির বেশি গ্রাহক জোগাড় করেছে। সারাদেশে খালি কথা আর কথা। রিকশাঅলা, সেও কথা বলে। কৃষক-মজুর, সেও কথা বলে। চলতি-ফিরতি রাস্তাঘাটে কেবলি উচ্চৈঃস্বরের শব্দ। এর মধ্যে নিত্য দরকারি পারিবারিক-সামাজিক আলাপ চলছে। আবার জনদুর্ভোগ—ব্যবসা-বাণিজ্য, হাট-বাট, বাজারে আগুন পণ্যমূল্য—এ নিয়ে হায়-হাহুতাশও একেবারে কম নয়।
৯ কোটি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন। এর বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। হঠাত্ বাংলা বসন্ত মার্কা কোনো জনঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তে তা সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে কতক্ষণ। আমরা তখন নাম দেব মোবাইল বসন্ত। তাছাড়া চাকর-বাকর, পিওন-দারোয়ান, কৃষক, গরিব-মিসকিন, রিকশাঅলা-মজুর—এরা এত কথা বলবে কেন? এদের এত কথা কিসের! তাদের যা কথাবার্তা তা তো প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী নেতা-উপনেতারাই সকাল-সন্ধ্যা অবিরাম বলে যাচ্ছেন। পাবলিক খালি শুনবে। তাদের বলার কিছু থাকতে পারে না।

অবশ্য মোবাইলে অর্থমন্ত্রীর কর-মিসাইল সাময়িক স্থগিত করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, মোবাইল সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। তাদের ওপর অতিরিক্ত অর্থারোপ ঠিক নয়।
গরিবদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর ওই দরদ তখন লোকদেখানো ভণিতা ছিল বলেই মনে হচ্ছে। স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট মঙ্গল গ্রহ থেকে আসেননি। এই নয়া সারচার্জ নামক কর-টর্পেডো সরকারপ্রধান ও সরকারি দলের মনোবাঞ্ছা না হলে তার এমন প্রস্তাব করার কথা নয়। এবার প্রধানমন্ত্রীও দেখলাম এ নিয়ে কোনো চটজলদি মন্তব্য করলেন না। গরিবের গরিবির ধুয়া তুললেন না। তিনিও নিজস্ব টাকায় পদ্মা সেতু খাড়া করার পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করছেন। মহাজোট পরিবারের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলনেঅলা বিশ্বব্যাংককে একহাত দেখে নিতে হবে যে! সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনীতে তিনি আবারও বিশ্বব্যাংককে তুলাধুনো করেছেন। শেখ হাসিনার রাজনীতি বুঝতে হলে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রবচন অবশ্যই আমলে নিতে হবে। কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, বাঘে ধরলে বাঘে ছাড়ে—শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়ে না।

বিশ্বব্যাংকের এবার রেহাই নেই। সুরঞ্জিতের কথামত তাদের শুধু বাঘে ধরেনি, ধরেছে বাঘের বাঘ। অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন হাসিনা—পদ্মা সেতু বাবদ বিশ্বব্যাংকের কাছে ক্ষতিপূরণ চাইতে। বুঝুন ঠেলা। দুর্নীতির রাঘব বোয়াল ধরতে কোচ নিয়ে পুকুরে নেমেছিল বিশ্বব্যাংক। তারা বোঝেনি, পুকুরে কত জল। এখন বোয়ালেই উল্টো কোচকে ধাওয়াচ্ছে।

শেখ হাসিনা যে নিজস্ব টাকায় সেতু করবেন, সেটা আসলে তার ব্যক্তিগত টাকা নয়। মহাজোট ক্যাপ্টেনের নজর এবার গরিব জনগণের টাকার ওপর। উন্নয়ন বাজেটে ৫৫ হাজার কোটি টাকা রয়েছে। এই টাকার কিছুই তেমন জনগণের দোরগোড়ায় যায় না। এক বছর আগে গত রোজার ঈদে সারাদেশের ক্ষতবিক্ষত এবড়ো-থেবড়ো চড়াই-উত্রাই রাস্তাঘাট নিয়ে আবুল নানা উদ্ভট উত্কট কৈফিয়ত দিচ্ছিলেন। তার বদলে ওবায়দুল কাদের এখন সড়কমন্ত্রী। এক বছরেও রাস্তাঘাটের কোনো উন্নতি হয়নি। ওবায়দুল এখন সড়ক বিভাগের চোর-ছেঁচোড়দের ‘নইলে খবর আছে’ মার্কা ভয়ভীতি দেখিয়ে রাস্তার দুরবস্থা আগাম জনগণকে জানাচ্ছেন। ঈদ আসছে। জনগণ এবার টুঁটি চেপে ধরবে যে! সত্যি বলতে কি, বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে বৈদেশিক তত্ত্বাবধানে কাজ বাদে সড়ক-সেতু—কোনো উন্নয়ন কাজই দেশে সুষ্ঠুভাবে হয় না। যেটা হয় তা হলো উন্নয়নের নামে লুটপাট। সরকারের উন্নয়ন বাজেটের টাকা মানেই হরিলুটের বাতাসা। আশঙ্কা হচ্ছে, এসব টাকা আগামীতে পদ্মাদেবীর ভোগেই লাগবে। বিশ্বব্যাংকের টাকা এনে যথেচ্ছ ভোগ-বিলাস-ব্যসনে লাগানোর পারিবারিক প্রকল্প বৈদেশিক কটু নজরদারিতে ভেস্তে যেতেই এখন কুনজর জনগণের টাকার দিকে।

এজন্য কথা বলার ওপর সারচার্জ, স্কুল ছাত্রছাত্রীদের টিফিনে জমানো টাকা, প্রবাসীদের কষ্টার্জিত রেমিট্যান্স, উন্নয়ন বাজেট—রাজার লম্বা হাত এখন সব দিকেই বাড়ানো হচ্ছে। ওদিকে মহাজোটের নিজস্ব তদারকিতে ব্রিজ হচ্ছে শুনে কিছু লোকের উত্সাহ দেখে কে! ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মালিকদের জোটপ্রধান শেখ কবীর হোসেন বলেছেন, তারাই ১১ হাজার কোটি টাকা দিতে পারবেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবার-ঘনিষ্ঠ আরেক শিল্পগোষ্ঠী সিকদার গ্রুপ বলেছে, তারা অন্তত ২০০ কোটি টাকা দিতে পারবে। বৃহত্তর শেখ পরিবারের লোকজনকে শেখ হাসিনা যতই দূরে ঠেলতে চান, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এরাই প্রথম তার পাশে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে উপস্থিত। এদের অবশ্যই মূল্যায়ন করা উচিত। শেখ পরিবারের শত সদস্য এখন নানা নামে নানা পরিচয়ে বিশাল শিল্পগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে—এরকম দু-একটা পদ্মা সেতু তাদের বংশীয় অর্থায়নেই তৈরি করা সম্ভব। বিশ্বব্যাংককে ঠ্যাঙাতে গিয়ে কেন অযথা জাতিকে জড়াচ্ছেন।
এই বাঙালি জাতিকে কোনো বিশ্বাস নেই। ক্ষমতার নামে লুটপাটকারীদের জন্য এই জাতটা মস্ত বেইমান। ষাটের দশকে, সত্তরের নির্বাচনে এরা শেখ মুজিবকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছিল।
আবার এরাই ’৭২-’৭৫-এর দুঃশাসনে চরম বৈরী হয়ে পড়ে মুজিব সরকারের জন্য। সে ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না। শেখ হাসিনা বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে যে বিপ্লবীপনা দেখাচ্ছেন, তা সাধারণের চোখে তামাশা ছাড়া কিছু নয়। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগকে বিশ্বাস করে না, এমন লোক আওয়ামী লীগ সমর্থকদের মাঝেই খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সাধারণ মানুষ এখন ব্যালটে সরকারের বালখিল্যতা- অপরিণামদর্শিতার জবাব দেয়ার জন্য মুখিয়ে। দেশে এখন মুজিব কোটধারীদের সংখ্যা আশ্চর্যরকম কমে গেছে। নৌকা প্রতীক হ্যান্ডেল ও হুডের ওপর বসিয়ে দিনভর মুজিব স্তুতিকারী রিকশাঅলাদের আর কোথাও দেখা যাচ্ছে না। কোথায় হারালো তারা! কেন হারিয়ে গেল? বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিয়ে ধারণা করেছিলাম, মার-মার কাট-কাট হবে বইটি। ৫০-৬০ হাজার কপি তো বিকোবেই। সাধারণ আওয়ামী লীগাররা কিনলেই লাখখানেক কপি বিক্রি হওয়ার কথা। সেখানে ৫-১০ হাজার কপিই নাকি বিক্রি হচ্ছে না। এখন ‘রকমারি’ নামের একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিশেষ মূল্যছাড়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে বিক্রির উদ্যোগেও সাড়া মিলছে না। এমনটি হওয়ার কথা নয়, তবুও হচ্ছে; তার কারণ পায়ের নিচের মাটি সরে গেছে। এখন নাট্য প্রহসন রঙ-ঢঙ করেও শেষ রক্ষা হবে না। এখন খোদ আওয়ামী লীগাররাই বঙ্গবন্ধুর লেখা বই কিনছেন না।

জনগণকে চরমভাবে ঠকানো হয়েছে। কিন্তু প্রতারণা-প্রবঞ্চনা আর কতদিন! মানুষকে রামগাধা ভেবে পরম আত্মতুষ্টি লাভ করছেন, যা ইচ্ছে তা-ই কাজ করা হচ্ছে। ভাবছেন, গাধার বাচ্চা জনগণ কেন কিছু বলছে না! নিশ্চয়ই এদের ঘাড়ে উঠে পাড়ালেও কিছু বলবে না। লুটপাটের অফুরন্ত খনি প্রকল্প গড়ার লক্ষ্যে আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর ও বঙ্গবন্ধু সিটি তৈরির অপচেষ্টা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। জনগণ বোকা সাজার ভান করে। আসলে তারা বোকা নয়। রক্তক্ষয়ী প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু নামের লুটপাটের মহা আয়োজনকে ভণ্ডুল করে দিয়েছে জনতা।

বিশ্বব্যাংকের কাছে তীব্র চপেটাঘাত খেয়েও সরকারের মধ্যে লজ্জা-শরমের লক্ষণ দেখছি না। এবার তারা দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির নাম ভাঙিয়ে তথাকথিত নিজস্ব অর্থায়নের ব্যাপারে জনগণের টাকা নিয়ে মহা দুর্নীতির নতুন নকশা এঁটেছে।

সততা শেখানো হচ্ছে জাতিকে। শিশু-কিশোর, কৃষক-মজুরদেরও এই ভণ্ডামির মধ্যে টানা হচ্ছে। বেহায়াপনার একটা সীমা আছে।

এতই যখন নিজস্ব টাকায় সেতু বানানোর ইচ্ছা—মহাজোট আমলে আত্মসাৎকৃত লুটের টাকায়ই একাধিক ব্রিজ তৈরি সম্ভব। শেয়ারবাজার থেকে যে এক লাখ কোটি টাকা লুট হয়েছে, কুইক রেন্টালের টাকা—এসব অর্থ দিয়ে তারা ব্রিজ বানিয়ে জাতিকে অবশ্যই সারপ্রাইজ দিতে পারেন। মহাজোটের একাধিক মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সাবেক আমলা কাম এমপি চলতি জমানায় যত টাকা কামিয়েছেন, তাদের টাকাতেও একাধিক সেতু সম্ভব। আর বিদেশে বসে এসব লুটেরাদের কাছ থেকে যারা উচ্চ হারে কমিশন নিয়েছেন, দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে তাদেরও। আশঙ্কা হয়—টিফিনের টাকা, প্রবাসীর টাকা ইত্যাদি বালখিল্য আবেগের আড়ালে সত্যি সত্যিই আবার লুটেরা বখরাজীবী সিন্ডিকেটের গোপন অর্থায়নে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে সেতুর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কিনা!

বলা বাহুল্য, মালয়েশিয়ান কোম্পানির আড়ালে পিপিপির নামে এমন প্ল্যান-প্রোগ্রাম মহাজোট দুর্নীতিধরদের মগজে রয়েছে। এখন দেশপ্রেম-মুক্তিযুদ্ধ, মোবাইল ফোনের ওপর সারচার্জ ইত্যাদির নামে ব্যাপক ডামাডোল তৈরি করে তলে তলে ভাড়ার বিদ্যুত্ প্রকল্পের মতো ‘ভাড়ার পদ্মা সেতু’ করা যায় কিনা তার সময়-সুযোগ ও মোক্ষম মওকা খোঁজা হচ্ছে। সুতরাং সাধু সাবধান! ‘যে গান তুমি শুনিতেছ, সেটি আসল গান নয়। যে গল্প তুমি জানিতেছ সেটি আসল গল্প নয়।’ তোমরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নাম শুনেছ, সাহারা ইন্ডিয়ার নামও ইদানীং শুনছ, কিন্তু সাহারা ইন্ডিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত কিছুই জান না। পিকচার এখনও বাকি, প্রিয় বন্ধু!