ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

সুয়োরানী রাজকোষের সম্পদরাশি সামলাতে ব্যস্ত। আর দুয়োরানী নীরবে-নিভৃতে একান্তে কাঁদছেন। সম্পদের জন্য নয়, তিনি কাঁদছেন অনিরুদ্ধ শোকে। তার বুকের মধ্যিখানে অন্তরের অন্তস্থল যে বিশাল মানুষটার ছবি ছিল, সেই লোকটা নেই—এই অনির্বাণ কষ্ট তিনি কেমন করে সামলাবেন! কেউ ডাকিনীর মন্ত্রমায়ায় পড়ে; হাস্য লাস্য চিত্তচাঞ্চল্যের ঘোরে তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে ত্যাগ করলেই কি সব প্রেম মরে যায়? পরিত্যাগ কি ৩০ বছর ধরে সঞ্চিত ভালোবাসাকে এক মুহূর্তে মিথ্যে করে দিতে পারে? প্রেম সে তো হৃদয়ের মধ্যিখানে মমতার খাঁচাবন্দী প্রাণপাখি—এই প্রাণপাখিকে চাইলেই হত্যা করা যায় না। বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। আবার যত দূরে যাই না কেন বড় প্রেম সে হৃদয়ের গভীরে সংগোপনে থেকে যায়। বাংলাদেশ কথাসাহিত্যের অমর-অজর প্রতিভা, নাটক-সিনেমার প্রাণপুরুষ হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে এখন অদ্ভুত এক টানাপড়েন চলছে। আকস্মিক, অনাকাঙ্ক্ষিত, বজ্রাঘাততুল্য রহস্যময় মৃত্যুর করুণ শিকার তিনি। কোটি কোটি টাকা খরচ করে সুচিকিত্সা নিতে আমেরিকায় বিশ্বখ্যাত হাসপাতালে গিয়েছিলেন, কিন্তু দেশে ফিরলেন অবহেলাজনিত কারণে নিষ্প্রাণ লাশ হয়ে। দুর্বহ এই লাশের ভার কিছুতেই সইতে পারছেন না তার লাখো ভক্ত। তাই মুখে মুখে শত প্রশ্ন! কেন বাঁচানো গেল না হুমায়ূনকে। অনিবার্য মৃত্যুর দোহাই দিয়ে অবহেলাজনিত রহস্যময় মৃত্যুর সুরাহা হয় না।
হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশী সাহিত্যের হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। তার জাদুর বাঁশির টানে মাত্র কয়েক বছরে সৃষ্টি হয়েছিল লাখো-কোটি মুগ্ধ পাঠক। বাংলাদেশবন্দিত এই কথাশিল্পীর জনপ্রিয়তা বিশ্বনন্দিত তারকা মাইকেল জ্যাকসনের অনিঃশেষ জনপ্রিয়তার সঙ্গেই তুল্য।

আর এই হুমায়ূনও কিনা মারা গেলেন মাইকেলের মতো বিপর্যয়কর বিস্ময়কর চিকিত্সা-উত্তর অবহেলার শিকার হয়ে। মাইকেল-হত্যার নেপথ্যে ছিলেন তার পরিচর্যাকারী ব্যক্তিগত চিকিত্সক; কিন্তু হুমায়ূনের মৃত্যুর নেপথ্যে কারা? এক্ষেত্রেও কি চিকিত্সকরা দায়ী! নাকি দায়ী ব্যক্তিগত পরিচর্যাকারীরা? তাদের অমার্জনীয় অবহেলা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত, নাকি নিছকই দায়িত্বপালনে অনভিজ্ঞতা-বালখিল্যতা-তাচ্ছিল্যের ফসল?

এক অকাল প্রয়াণের মধ্য দিয়ে চলে গেলেন হুমায়ূন। নশ্বর পৃথিবীতে রেখে গেছেন তার অবিনশ্বর লেখনীরাশি; রেখে গেছেন শোকার্ত ভক্তকুল; দুটি নাবালকসহ সাবালক আরও ৪টি সন্তান। সন্তানের লাশের ভার-বহনকারী মা, আত্মীয়কুল। আর রেখে গেছেন সুয়োরানী দুয়োরানীর গল্প।

তার জীবন-রূপকথায় সুয়োরানী হিসেবে পাচ্ছি একজনকে। সুয়োরানীরা যেমন হয়—হাস্যলাস্যময়ী—নোটঙ্কিপনায় সেরা। রাজার রোমাঞ্চবিহারের প্রিয়তমা-অভিসারিকা। বিনোদনদায়িনী। শাওন নিঃসন্দেহে সুঅভিনেত্রী। বহু নাটকে-চলচ্চিত্রে তার অপূর্ব অভিনয়ের অনন্য নৈপুণ্য আমরা দেখেছি। মহারানী কিংবা ঘুটেরানী— যে কোনো চরিত্রে তার অভিনয় দক্ষতা প্রশ্নাতীত। একইসঙ্গে হাস্যলাস্যে আকর্ষণীয়া। তাকে হুমায়ূনের সঙ্গে দেশে-বিদেশে সিবিচে, বিশ্বখ্যাত শপিংমলে, কক্সবাজার-সেন্টমার্টিনে নানা ছবির ফ্রেমে অনবদ্য সাজসজ্জা-পোশাকে আমরা দেখেছি। তিনি জাদুকণ্ঠী। সম্ভবত সুরের জালেই বেঁধেছিলেন মহান এই কথাশিল্পী ও সুরের কারিগরকে। হুমায়ূন দারিদ্র্য ও কষ্ট-দুঃখ কণ্টকিত দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যখন কথাশিল্পের রাজা হলেন—সম্পদেও তার কোষাগার যখন পূর্ণ—শাওন সেই সুখের দিনের রানী।

কিন্তু হুমায়ূন রূপকথার দুয়োরাণী কাকে বলব! না, মহীয়সী রমণী, মমতাময়ী মায়াবতী মা গুলতেকিনকে আমি কোনো অবস্থাতেই দুয়োরানী বলার ন্যায্য অধিকার রাখি না। বলতে পারি না আমি। তিনি যে হুমায়ূনের তালাকপ্রাপ্ত সাবেক স্ত্রী। তিনি এখন হুমায়ূনের কেউ নন। তাই তার প্রতি কেবল পারি শ্রদ্ধা জানাতে। অন্যায় বঞ্চনার শিকার তিনি। শত দুঃখ-কষ্টেও ভেঙে পড়েননি তিনি। রক্তমাংসের সাধারণ নারী হয়েও তিনি যেন হুমায়ূন সাহিত্যের অসংখ্য মায়াবতী চরিত্রের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ নারী চরিত্র। তিনি এক জীবন্ত প্রতিমা। হুমায়ূন নিজেই তাকে জীবনের সেরা নারী বলে নানা লেখায় উল্লেখ করে পাঠকের হৃদয়ের সিংহাসনে অভিষিক্ত করে গেছেন। বহু লেখায় বর্ণনা করে গেছেন গুণবতী গুলের গুণাবলির কথা। তাকে আমি কেমন করে দুয়োরানী বলি! তিনি তো বাস্তবে সাহিত্য-সম্রাট হুমায়ূনের জীবনের বঞ্চিত নিগৃহীত সাবেক মহারানী। হ্যাঁ, এ কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না—চরম অবহেলার শিকার হয়েছেন গুলতেকিন। অঢেল ভালোবাসায় কেবলই ভরিয়ে দিয়েছেন একসময়ের শূন্য কপর্দকহীন হুমায়ূনকে—বিনিময়ে কিছুই পাননি। প্রতিটি সফল পুরুষের নেপথ্যে থাকে এক নারী। যার মায়ার স্পর্শে কপর্দকহীনও হয়ে ওঠেন বৈভবশালী। যার প্রেমের জিয়নকাঠিতে জন্ম হয় মহত্ লেখকের। তিনি সেই নারী। যিনি হুমায়ূনের দুঃখের দিনের চিরসাথী ছিলেন; আর যখন সুখের দিন এলো তখন তালাকপ্রাপ্ত হয়ে দুরের রানী হলেন। ৪টি সন্তান তার সঙ্গে। এক বঞ্চিত জীবনের সব শোক-কষ্ট ভুলে মানুষ করেছেন সন্তানদের। স্ত্রীর কর্তব্যে যেমন ছিলেন অনন্যা, তেমনি মায়ের ভূমিকায়ও তিনি অবিচল।
কন্যা জায়া জননী—উপমহাদেশের চিরন্তন নারীর তিন শাশ্বত রূপ। কন্যার ভূমিকায় তিনি ছিলেন পিতামাতার পরম প্রিয়; জায়ার ভূমিকায় অশেষ অনুপ্রেরণাদায়িনী; জননীর ভূমিকায়ও সম্পূর্ণ সফল। এর বাইরে তিনি আপন নারীসত্তা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশেও অতুলনীয়। রাজধানীর একটি সেরা স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিনি সফল শিক্ষক।

হুমায়ূন-রূপকথায় গুলতেকিন এত অনিবার্য ও প্রাসঙ্গিক কেন! এই প্রশ্নের জবাব মিলবে আরেকটি প্রশ্নের উত্তরে। মহত্ অনেক কীর্তি রেখে গেলেও হুমায়ূনের দুঃখজনক নির্মম ভুল কোনটি!
সেই ভুলটি হলো গুলতেকিনকে পরিত্যাগ। গুলতেকিনের ভালোবাসাকে পায়ে মাড়িয়ে হাতছাড়া যৌবনের মৃতপ্রায় সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে চঞ্চলা ঘাই হরিণীর পেছনে বিভ্রান্ত উপত্যকার জঙ্গলে অভিসার। হুমায়ূন টেরই পাননি। সেই অভিসারিকা পর্বেই তার শরীরে ঢুকে গিয়েছিল মরণের গোপন বিষ। তারপর দীর্ঘদিনের স্লো পয়জনিংয়ে তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত রহস্যময় মৃত্যু। আর এই শোকার্ত মৃত্যুর জন্য কাকে দায়ী করব আমরা। ব্যক্তিজীবনের অবাঞ্ছিত কিছু ভুলের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণাম হলো এই বেদনার্ত জীবনগাথা।

মৃত্যুর আগে হুমায়ূন জেনে গেছেন কিনা জানি না—তার কোটি ভক্ত বিশ্বাস করে আমেরিকায় বিপুল খরচের চিকিত্সা পর্বে যদি স্ত্রীর সমুন্নত মর্যাদায় গুলতেকিন পাশে থাকতেন, কিংবা এই শাশ্বত নারীর মতো মায়াবতী কোনো স্ত্রী থাকতেন পাশে, তবে সেই নারীর ভালোবাসা, সেবা, যত্ন, শুশ্রূষায়; সেই রমণীর মমতার স্পর্শে উপশম হতো হুমায়ূনের সব কষ্ট। সক বেদনা; সব ক্লেশ। মমতাময়ী সেই নারী হয়তো তাকে কোকিল কণ্ঠে গান শোনাতে পারতেন না—বিপন্ন অসুস্থ দিনে রঙ্গ-তামাশা-সঙ্গীতরজনীকে প্রশ্রয় দিতেন না তিনি। কিন্তু তার নিবিড় পর্যবেক্ষণে চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনা ঘটত না। তিনি সর্বাত্মক নিবিড় শুশ্রূষা নিশ্চিত করতেন। মার্কিন মুল্লুকে চিকিত্সার নামে কিছু হুমায়ূন— মধুলোভীর তথাকথিত অর্থ-সহায়তা নামক করুণারও পাত্র হতে দিতেন না তিনি। একজন দৃঢ় অবিচল প্রকৃত স্ত্রী হিসেবে মমতাময়ী সেই নারী এই দুঃসময়ে অসুস্থতার দিনে পালন করতে পারতেন মমতাময়ী দৃঢ়তাময়ী জায়ার ভূমিকা।
হুমায়ূনের কাছে গুলতেকিনের চাওয়া-পাওয়ার কিছু ছিল না। তিনি পথের ভিখারী নন, ঘুঁটেকুড়ানিও নন। হুমায়ূনকে

নুহাশ পল্লীর কয়েক বিঘা বেচতে হতো না। নুহাশ পল্লীর মালিকানা জিম্মি করতে হতো না। বাড়ি-গাড়ি, ব্যাংক-ব্যালেন্স লিখে দিতে হতো না। যখন স্ত্রী ছিলেন—গুলতেকিন তার স্বামীকে অনিঃশেষ অঢেল ভালোবাসা দিয়ে গেছেন বিনাশর্তে; বিনা দাবিতে; বিনিময়ে তাকে একটু ভালোবাসা—জীবনের শ্রেষ্ঠ নারী প্রিয়তমার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখলেই হুমায়ূণ রক্ষা করতে পারতেন সেই অমূল্য গুলমহল। হুমায়ুন-গুলতেকিনের ভালোবাসায় আরও অমূল্য লেখায়-রেখায় গানে-নাটকে সম্পদশালী হতো বাংলাদেশসাহিত্য;রচিত হতে পারতো কথাশিল্পের অনন্য তাজমহল। অনাকাঙ্ক্ষিত তালাক দিয়ে সেই সম্ভাবনাকে খুন করে গেছেন হুমায়ূন নিজেই।