ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

রাজা হওয়ার তার কথাই ছিল না। খালেবিলে দৌড়ে ছুটে মারপিট করে কেটেছে তার শৈশব। ডাণ্ডা-ডাংগুলি খেলেই দিন পার। পড়ালেখায় তেমন মন দিতেই পারেনি। যৌবনে পাণ্ডার দুরন্তপনায় খুব নামডাক। তারপর…। তারপর কী আর হবে। কেউ তার কাছে বড় কিছু আশাও করেনি। কিন্তু পাবলিকের পাগলামি বলে কথা। তারা চাইলে পাড়ার পাগলার মাথায়ও পরিয়ে দিতে পারে রাজার পাগড়ি। পাবলিক ঠিক তাই করল। তাদের খামখেয়ালি বলে কথা। রাজা হওয়ার কথা ছিল না যে ডানপিটে ছেলেটির। সে রাজা হয়ে গেল। আর বকলম রাজা হলে যা হয়। সে নিজেকে ভাবে মহারাজা। ভাবে তার চেয়ে মহাজ্ঞানী আর কে আছে। ঘটে মানে মস্তকে কিছু নেই; তাতে কী! অহঙ্কারে মাটিতে তার পা পড়ে না। ভাবে তার মতো আহাম্মককে যারা রাজা বানিয়েছে তারা নিশ্চয়ই তার চেয়েও বড় আহাম্মক। নইলে তাকে তো রাজা বানানোর কথা নয়।

এই হঠাত্ রাজাদের পেয়ে বসে খামখেয়ালিতে। তাদের খামখেয়ালির শেষ নেই। দেশটাকে মনে করে বাপ-দাদার তাল্লুক। মন যা চায় তাই করে। মনে যা বলতে ইচ্ছা করে তাই বলে তারা। কোনো রকম সেন্সর নেই। কোনো রকম হায়া-শরম নেই। তাদের মহামূর্খ কথাবার্তা শুনে পাবলিক হাসে কিনা; দুয়ো দেয় কিনা—কোনো পরোয়া করে না। করার দরকার মনেও করে না। পাবলিক তাদের রাজা বানিয়েই তো মহা ঠেকেছে। রাজা যখন বানিয়েছিস এবার বোঝ ঠেলা; ভেবেছিলি নাকে তেল দিয়ে ঘুমাবি। ঘুমা…কত ঘুমাতে চাস ঘুমা। শাপলার বিল থেকে কাউকে তুলে এনে লাখো বছরের সেরা রাজা বানাবি; তার খেসারত না দিয়ে কোনো উপায় আছে! পাবলিকের ভুলের খেসারত পাবলিককেই দিতে হবে।
এখন চারিদিকে সেই খেসারতপর্ব চলছে। হঠাত্ কেউ রাজা হলে সে তো খামখেয়ালি করবেই। খামখেয়ালি রাজার অধিকার। সে যদি পাগলামি না করে তবে সে রাজা কিসের। খামখেয়ালির রাজার আদব-কায়দা কেমন! তা আর বলতে হয়? প্রতিদিনই আমরা তার নমুনা দেখছি। তার যা মনে আসে বলছে। যা করতে ইচ্ছা হয়—তাই-ই করছে। তাকে কে ঠেকাবে। সে যে পাবলিকের বানানো রাজা। তার কথাই আইন। সে যদি মনে করে কারও গলা কাটবে। সেটাই আইন। সে যদি মনে করে কারও হাত কাটবে—তবে সেটাই আইন। সে কাজীকে যা বলবে কাজীর জন্য তাই শিরোধার্য। খামখেয়ালির রাজার তো আর আইন জানার দরকার নেই। তার আইনের তত্ত্ব-তালাশের খোঁজ রাখারও কোনো দরকার দেখি না। কাউকে মারা-কাটা—এ সবই তার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে। তার স্তাবক-মোল্লা দোপেয়াজারা যা বলবে; যা বুঝাবে সেটা শুনে যা কিছু করতে পারে। রাজ্য শাসন মানেই হচ্ছে রাজা আর রাজার নির্বোধ ভাড়দের শাসন। ভাড়দের সান্নিধ্য ছাড়া রাজা যে অচল।

কিন্তু এই ভাড়ামোর শাসনেরও পরিণাম ভালো হয় না। অতীতে ভালো হয়নি। আগামীতে ভালো হবে না। বর্তমানেও যদি কোথাও এরকম ভাড়ামোর শাসন চলে তার পরিণাম ভালো হবে না।
সেই খামখেয়ালির রাজার কথা ও তার পরিণামের কথা আমরা অনেকেই জানি। তারও রাজা হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু পাবলিকের কী মহা তামাশা। তারা তাকে বানিয়েছিল মহারাজা। আবার তারাই রাজাকে ঘৃণার আগুনে পুড়িয়ে ছিল। সে কী দাউ দাউ আগুন। জাহান্নামের লেলিহান শিখার চেয়েও জিহ্বা লকলকে সেই আগুনের। মহারাজা ভুল করে সেই আগুন থেকে রেহাই পাননি। তিনি নিষ্ঠুরভাবে সবংশে বিনাশ হয়েছেন। সে এক রূপকথার গল্প।

রূপকথা থেকে এ যুগে কেইবা শিক্ষা নেয়। শিক্ষা নেয়ার শিক্ষা যে এরা পায়নি। তবুও পুরান সেই গল্পে শুনেছি মহারাজা বিনাশ হয়েছেন তার পুত্র, ভাগ্নে কুলের জন্য। পুত্র ও ভাগ্নেরা দেশে যে অত্যাচার-নির্যাতন কায়েম করেছিল-জনগণেশ্বর তা সহ্য করেনি। রাজার এক ভাগ্নে ছিল বাকলা নামক রাজ্যে। ভাগ্নে ছিল বাকলার অধীশ্বর। একবার এক সনাতন ধর্মের যাজকের কন্যা ধর্ষণের মুখে পড়েছিল ভাগ্নে বাহিনীর হাতে। কন্যাটিকে ধাওয়া করে লুটতে গিয়েছিল ধর্ষককুল। কন্যাটি কী করে। সে গিয়ে আশ্রয় চাইল ভাগ্নেশ্বরের কাছে। ভাগ্নে পলায়নপর হরিণীকে বাগে পেয়ে বললে—এসো ললনা এসো। এসো আমার প্রাসাদে এসো। আমি তোমাকে অবশ্যই আশ্রয় দেব। আপেল, আঙুর, বেদানা খেতে দেব। নাশপাতি খাওয়াব। শুনেছি সনাতন ধর্মের ললনাটি বিশ্বাস করে ভাগ্নের প্রাসাদে গিয়ে পড়েছিল আসল বাঘের মুখে।

রক্ষকের মুখোশ খুলে ফেলে ভাগ্নে ঠিকই লুটেছিল ললনার ইজ্জত। এখনও বাকলার জনপদে সেই ললনার দীর্ঘশ্বাস। তার কান্না। বাকলার অনেক সনাতন ধর্মানুসারী তারপর আপন ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিল অন্য জনপদে। আজও নাকি তারা সেই বিশ্বাসঘাতক ভাগ্নের বেইমানীর কথা ভোলেনি।

এরকম কত গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এই সোনার বাংলায়। সেসব লোককথা পাবলিক ভুলতে বসেছিল বলেই আজকের এই গজব। পাবলিক ভেবেছিল সম্ভবত এই রাক্ষস-খোক্কসরা নিজেদের বদলাবে। ওরা আদিম লুটপাট নারী ধর্ষণের অভ্যাসগুলো বদলে একালের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলবে। ভারতবর্ষের আদি রাক্ষসপুরীতে এখন কত পরিবর্তন এসেছে। আর্যদের কাছে আদব-কায়দা সভ্যতা শিখে অনার্যরা কত বদলে নিয়েছে নিজেদের। এখন তারা আর্যদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিজেদের সেরা প্রমাণ করছে। আর আমাদের সোনার বাংলায় যেন হামলা করেছে রাক্ষস-খোক্কসকুল। তারা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ভয়ঙ্কর রুদ্রমূর্তি ধারণ করে পেটাল শতাধিক শিক্ষককে। কেউ গালে থাপ্পড় খেয়েছেন। কারও কানকাটা যাওয়ার দশা হয়েছে। কেউ পাড়া খেয়েছেন। কেউ চোখ হারানোর ভয়ে হাউমাউ করে কেঁদেছেন। রাক্ষসদের আক্রমণ হয় ঠিক এই রকম। ওরা মা-বোন, শিক্ষক, ওস্তাদ কিছুই মানে না। ওরা হাত কাটতে জানে। ওরা রগ কাটতে জানে। ওরা গলার শিরা কাটতে জানে। ওরা সামনে যা পায় তাই কাটতে জানে। ওদের কোনো বাছবিচার নেই।