ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের ক্লাব-কমিউনিস্ট কালচারের অন্যতম পুরোধা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলবিভাগের কালো বিড়ালটা খুঁজে বের করবেন, কথা দিয়েছিলেন। মন্ত্রীর মসনদে বসে কয়েকটা মাস তো গেল—সুরঞ্জিতবাবু কি বেড়ালটাকে খুঁজে পেলেন? তার সাম্প্রতিক কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, খুঁজে পাননি। খুঁজে পাবেনও না। বেড়ালটাকে ভালো করে খুঁজে দেখার ইচ্ছাও তার নেই। এত তাড়াতাড়ি ইচ্ছাটা মরে গেল কেন? আসলে তিনি কালো বেড়ালকে আদৌ ধরতেই চাননি। ওটা ছিল কথার কথা, উপমা।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনটি বছর গলাবাজি করেছেন। আসর মাত করেছেন। শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে ভয়ংকর সব কথা বলেছেন। তারপর মহাজোট নেত্রী যেই না মন্ত্রিত্বের মুলোটি ঝুলালেন, অমনি পদপদবি নিয়ে মুলোমুলি না করে এ্যাবড় এক হাঁ করে গিলে ফেললেন। তখন নীরব দর্শকরা ঠিকই বুঝলাম—তিন বছরের বড়গলা আস্ফাালন, তর্জন গর্জন—সেসবই ছিল মন্ত্রিত্ব বাগাবার জন্য। কথা ও কাজে সেটাই আক্ষরিক অর্থে প্রমাণ করলেন সুরঞ্জিত বাবু। যাই হোক দাদার লাজশরম আছে। সেটা ঢাকতেই চমকপ্রদ কিছু বলতে হয়। ওজনদার কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। দাদা তো আওয়ামী লীগ-বিএনপির ফাঁকা-আওয়াজ রাজনীতি করেন না যে বঙ্গবন্ধু রেলসেতু কিংবা বরিশালে রেললাইন মার্কা বাস্তবায়নযোগ্য ওয়াদা করবেন। আর কমিশনের দরবাজি করে এক লাখ বছর ঝুলিয়ে রাখবেন। তিনি মন্ত্রিত্বের বাসরশয্যার রাতেই বেড়ালটি মারতে চাইলেন উপমা দিয়ে।

তার কথিত কালো বেড়ালের খবর কী! রেল মন্ত্রণালয়কে কি তিনি কালো বেড়ালমুক্ত করতে পেরেছেন!

কই পারলেন? বরং এরই মধ্যে রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। এরই মধ্যে ফিরে গেছেন পুরনো চেহারায়। আবার কথাসরিত্ সাগর খুলে বসেছেন। সুনামগঞ্জের দিরাই শাল্লায় নিজ নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত যান তিনি। ৩ মার্চ নিজ জেলায় এক সংবর্ধনায় বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হঠাত্ করে আমাকে তার ভাঙা রেলে তুলে দিয়েছেন। সরকারের শেষ সময়ে এসে আমার কাঁধে মন্ত্রিত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।’

হা হা—এ কী কথা শুনি সুরঞ্জিতের মুখে। দাদা কি নাবালক! হাসিনা তার হাতে মোয়া-মালপোয়া দিতেই বালখিল্য আনন্দে সব চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছেন। এখন পেটে অসুখ করতে হাহুতাশ করছেন—মালপোয়া বাসি ছিল, তাই টক ছিল। না, সুরঞ্জিত বাবুকে একথা বললে চলবে না। মহাজোটের অ্যাকুইরিয়ামে এখন যারা শোভাবর্ধন করছেন, নিঃসন্দেহে দাদা তাদের মধ্যে সবচেয়ে ঝানু, পরিপকস্ফ পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। হাসিনার মোয়া-মালপোয়া যখন তিনি হাতের তেলোতে নিয়ে চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছেন, এখন আর উগরানো চলবে না। এখন এই গান গাইবার কোনো সুযোগ নেই—আগে জানলে হাসিনার ভাঙা নৌকায় চড়তাম না।

বড্ড বক বক করছিলেন। শেখ হাসিনা তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছেন। মিডিয়ার মাইক্রোফোন দেখলে সবারই বড় বড় কথা বলতে ইচ্ছা হয়। এবার দাদা করে দেখাও! হ্যান করব, ত্যান করব—অনেক বলেছেন।

উপমাবৃত্তি রাজনীতিবিদের নয়, ওটা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের মানায়। তত্ত্বাবধায়ক বা সামরিক ইমার্জেন্সি সরকারগুলো জবরদস্তি ক্ষমতায় গিয়ে কিছু অর্ধশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী আমলাদের টুকিয়ে এনে উপদেষ্টার পদে বসিয়ে দেয়, তখন আমরা তাদের মুখে বটতলার সাহিত্য শুনতে পাই—সুড়ঙ্গের ওপারে আলোর ইশারা দেখতে পাচ্ছি।

সুরঞ্জিত বাবু তেমন ‘বাণী চিরন্তনী’ মুখস্থ করা লোক নন যে মাঝে মাঝে কিছু কোটেশন উদ্ধৃত করে সবজান্তার ভাব নেবেন। তাকে কাজ করে দেখাতে হবে। হাসিনা টিট ফর ট্যাট—যেমন ট্যান্ডল তেমন হ্যান্ডলিং—কর্মসূচির অধীনে তাকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন মানলুম—সেটা জেনে-বুঝেই দাদা টোপটি গিলেছেন। কালো বেড়াল তাকে খুঁজে বের করতে হবে। হাসিনা তাকে যে ঘরটি দিয়েছেন—বুঝলাম সেটা অন্ধকার। অন্ধকারেও কালো বেড়াল খুঁজে পাওয়া যায়। বেড়ালের যে সাদা ফসফরাস চোখ। তাতেও যদি ঠাওর করতে না পারেন, তবে টর্চলাইটটা জ্বালুন। খুঁজে বের করতে চাইলে অবশ্যই বেড়াল পাওয়া যাবে। চীন, ভারত, থাইল্যান্ডে রেল কত শনৈঃ শনৈঃ উন্নত। এখানেও সম্ভব।

মহাজোট নেত্রী যদি ভাঙা রেলে তুলে দিয়ে শঠতা করেই থাকেন, তবে উপযুক্ত শঠে শ্যাঠাং জবাব হবে কাজ দেখানোর মাধ্যমে। শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত শাহি কম্পার্টমেন্টে ঢাকা-সিলেট ট্যুর করেই প্লিজ রণে ভঙ্গ দেবেন না।

অনেক সময় প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমেও উপযুক্ত জবাব দেয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জুতা মেরে গরুদান করার মশকরা করলেন। গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাকে খেদিয়ে বিদেয় করে হঠাত্ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে চমকে দিয়ে ইউনূসকে বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যান করার অদ্ভুত তদবির করলেন। তার মনে যাই থাকুক, ইউরোপীয়রা দৃশ্যত বেশ সিরিয়াসলি নিল। মার্কিন সরকারের একটা ডেপুটি সেক্রেটারি, যার কথাবার্তায় মনে হয় সে বাংলাদেশে মার্কিন গভর্নর, সেও কিনা বলে বসল—ইউনূস রাজি থাকলে তারাও রাজি। ড. ইউনূস এইসব রঙ্গতামাশাকে দক্ষতার সঙ্গেই পাশ কাটিয়েছেন। তাকে ঘিরে মশকরার প্রহসন জমে উঠেছিল। তিনি বিনয়ের অবতার সেজে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা চপেটাঘাত মন্দ করেননি। ইন্টারনেটে তরুণদের ব্লগগুলোতে তার ভূয়সী প্রশংসা—সবাই এটাকে উপযুক্ত চপেটাঘাতই বলছে।

সুরঞ্জিত এই প্রত্যাখ্যানের সুযোগ গোড়াতে হারিয়েছেন। সবিনয়ে তাকে বলব—একজন রাজনীতিবিদ হয়ে রাজনীতিকের মতো আচরণ করুন। বক্তৃতাবাজি, গলাবাজিই আপনার একমাত্র কর্ম নয়। রাজনীতিবিদ যখন পাওয়ারে—মন্ত্রীর চেয়ারে—তখন তার আসল কাজ হলো অ্যাকশন। কিছু করা। কিছু করে দেখানো। রেল মন্ত্রণালয় এখন চলছে আল্লাহর ওয়াস্তে। এটাকে ঢেলে সাজানো দরকার। এটা যে ভাঙা রেল, সে তো নতুন কথা নয়। সেই ভাঙা রেলে কে জোড়া লাগাবে—দেখি সুরঞ্জিত পারেন কিনা!

২.
আমার লেখা এ পর্যন্ত যারা প্রবল ধৈর্য ধরে পড়েছেন, তাদের কেউ কেউ নিশ্চয়ই ঠোঁট উল্টে বলবেন, দাদা পারবেন না। ও কাজ বড় মুশকিলের। কাজ করা সুরঞ্জিতের কাজ নয়। তিনি কথার বাদশা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে তিনি বিচিত্র মুখভঙ্গি করে গোলাপি বেগম বলে রাজনৈতিক মজমা জমিয়ে তুলতেন। দাদ মলম, টোটকা কবিরাজির পথনাটকে নানা রঙ্গ করে যেভাবে সুড়সুড়ি দেয়া হয়, সুরঞ্জিত দীর্ঘকাল সেই রকম ক্যানভাসিং করেছেন। এই ওয়াজ-নসিহতকে পুঁজি করে উঠে এসেছেন মূলধারার বাজারি রাজনীতির লাইমলাইটে। ঝিকাতলায় তার বাড়ির নাম অনসূয়া। মানে ঈর্ষাশূন্য- হিংসাহীন। আর তিনি মুখে চর্চা করেন অসূয়া, ইর্ষা, দ্বেষ। ন্যাপের হয়েই ’৭০ সালেই পাকিস্তান এসেমব্লিতে। ন্যাপ সুরঞ্জিত বলতে গেলে অস্তিত্বহীন একটা দল ছিল। তারপর গণতন্ত্রী পার্টি, একতা পার্টি। একই ক্লাব ঘর। শুধু বার বার নাম বদল। পুরনো ঢাকায় ছোট অফিস ছিল। পাঁচ আঙুলে গোনা যায় এমন ক’জন নেতাকর্মী সেখানে রাজনৈতিক ক্যারমবাজি করতেন। সেই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে দাদা লাইমলাইটে এসেছেন একমাত্র ব্যক্তিগত মুন্সিয়ানায়। তার পুরনো সেই ইয়ারদোস্তদের এখন বাটি চালান দিলেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সুনামগঞ্জের দিরাইশাল্লার দুর্দান্ত জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক জমানায় (৯৬-২০০১) আনুকূল্যভাজন হয়েছেন। সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা হয়েছিলেন। মন্ত্রিত্ব না পেলেও তখন তার কথার দাপট কম ছিল না। সিলেট-সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগের মহারথী আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে তখন তিনি কোমর বেঁধে পলিটিক্যাল রেসলিং করতেন; তাদের পারস্পরিক ল্যাংবাজি বেশ উপভোগ্য ছিল দলটির হাইকমান্ডের কাছে। এছাড়া ‘গোলাপি রে গোলাপি’ জাতীয় নিম্নরুচির গলাবাজি করেও খুশি করেছেন ঐকমত্যের মহানেত্রীকে। কিন্তু সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা—এই মন্ত্রী মর্যাদার পদটি তার মনোমতো হয়নি। কিংবা পুরনো ঢাকার কমিউনিস্ট ক্লাব-ঘর থেকে বেরিয়ে রাতারাতি আওয়ামী রাজনীতির শিখরে পৌঁছে যাওয়ায় নিশ্চয়ই তিনি আরও উচ্চাভিলাষী হয়ে পড়েছিলেন। সামাদ আজাদের সঙ্গে টক্করে তুমুল সাফল্য তাকে উজ্জীবিত করে থাকবে। তাই ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের জমানায় তাকে গভীর জলের মাছ হিসেবে দেখতে পেলাম আমরা। হাসিনার বিরুদ্ধে একরকম শক্ত মুখ করে দাঁড়ালেন। দুই নেত্রী মাইনাস থিওরি বাস্তবায়নে ছিলেন সক্রিয়। সামরিক শাসকরা সব সময়ই তাদের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে এই ক্লাব-কমিউনিস্টদের পেয়েছে—এরা বলে ভালো, রাজনীতিতেও ঝানু, আবার তুষ্টও হয় অল্পতে। সুরঞ্জিতেরও ভুল হয়েছিল। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের স্কন্ধে চড়ে তার রাজনীতির পুলসিরাত পার হওয়ার চেষ্টা সফল হয়নি। তারই মাশুল গুনতে হয়েছে তাকে। মার্শাল মেকারদের সঙ্গে আঁতাতের জন্য নয়, হাসিনা মাইনাস ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার কারণে তাকে ৩টি বছর বসে থাকতে হয়েছে সাইড লাইনে। ছিলেন প্রেসিডিয়াম সদস্য। সেখান থেকে ‘উপদেষ্টা পরিষদ’ নামক আস্তাবলে রেসের বাতিল ঘোড়ার কাতারে তার ঠাঁই হলো। অবহেলা-অপমানের ৩টি বছর তিনি মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকার লোক ছিলেন না। বোম ব্লাস্টিং কিছু না কিছু মাঝেমধ্যেই বলেছেন। ভেবেচিন্তেই আওয়ামী লীগের গলার কাঁটা হিসাবে অবস্থান ধরে রেখেছিলেন। শেখ হাসিনাও সেয়ানা কম নন। তিনি সরকারের গলার কাঁটা মন্ত্রণালয়টি এঁটো হিসেবে ছুড়ে দেন দাদার সামনে। সুরঞ্জিত দাদার গলায় কাঁটাটি বিঁধেছে বেশ বোঝা যাচ্ছে। বলাবাহুল্য, দাদার এই দুরবস্থা বেশ এনজয় করছেন শেখ হাসিনা। এখন দেখার পালা— অধুনা আওয়ামী রাজনীতির যুধিষ্ঠির কেমন করে বেলা শেষের দিনগুলো সামলে ওঠেন।

৩.
মহাজোট জমানায় সবচেয়ে বিস্ময়কর নৈপুণ্য দেখিয়েছেন দিলীপ বড়ুয়া। শেখ হাসিনার প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে তিনি এক্সক্লুসিভ আইটেম। সৈয়দ আবুল হোসেন না হয় চীনের কোথায় দৌড় প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়ে মন্ত্রিত্ব বাগিয়েছেন। কিন্তু দিলীপ বাবুর উজির হওয়ার গোপন রহস্য আজও জানা হলো না। সে কারণও নিশ্চয়ই চৈনিক। শুধু কি মন্ত্রী হওয়া—তিন বছরের বেশি সময় দিব্যি শিল্পমন্ত্রী হয়ে অটুট রয়েছেন। ক্লাব-কম্যুনিস্ট হিসেবে তার চেয়ে ইউনিক পারফরমেন্স আর কেউ দেখাতে পারবেন না। দিলীপ বড়ুয়া ও তার নামে ব্র্যাকেট-বন্দি সাম্যবাদী দলের অস্তিত্ব যেন একই দেহের খাঁচায়। অনেকেই বলেন, ওয়ান ম্যান পার্টি। হলিউডি-বলিউডি দক্ষিণী ছবিতে ওয়ান ম্যান আর্মি ধুন্ধুমার কাণ্ডকারখানা করে থাকেন। বাস্তবে তা কল্পনাই করা যায় না। দিলীপ বাবু কিন্তু বাস্তব। চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো সত্য। প্রতিভা হিসেবে তিনি বহুমুখী। খালেদা জিয়ার চারদলীয় জোট সরকার জমানায় দেখেছি—বিএনপি ঘনিষ্ঠ সম্পাদকদের দফতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছেন। সম্পাদক অফিসে না থাকুন, তিনি আঠার মতো লেগে থাকতেন। খালেদা জিয়ার চীন সফরে সম্ভবত সফরসঙ্গীও হয়েছিলেন। হাসিনার মহাজোট জমানাতে তার প্রতিভার উত্কর্ষ ও ব্যুত্পত্তি আমরা দেখলাম। মঙ্গোলয়েড চেহারা আর চৈনিক গ্রীন পাসের বদৌলতে।
কারও পক্ষে মন্ত্রী হওয়া সম্ভব, সেটা তিনি বাস্তবায়ন করে দেখালেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টি, যুব ফেডারেশন, পলিটিক্যাল ব্যুরো হয়ে একান্ত নিজস্ব কমিউনিস্ট ক্লাবের সঙ্গীহীন সভ্য। হাসিনা তাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো সাযুজ্যপূর্ণ মন্ত্রণালয়টি দিয়েছেন। তার মন্ত্রী হওয়ার চেয়েও বেশি বিস্ময়ের হলো তিনি মন্ত্রী হিসেবে কেমন করে টিকে আছেন? সুরঞ্জিত বাবু নিজেকে যতই ধুরন্ধর ভাবুন না কেন দিলীপ বড়ুয়ার কাছে তার শেখার রয়েছে। কেননা তার এই উত্থানকে রক্তপাতহীন নীরব লালবিপ্লব বলা যায়। তার টিকে থাকার গোপন সূত্র এটা হতে পারে—তিনি প্রধানমন্ত্রীর তোয়াজ-তোষামোদ করেছেন সবসময়, বেফাঁস কথা কখনো কিছু বলেননি। শুনেছি, নিজের কমিউনিস্ট স্টাইলের সরল-সাধারণ জীবনধারাকে তিনি বদলাননি, তবে মনের সুখ মিটিয়ে বিদেশ সফর করেছেন। অনেকে বলে থাকেন, তাকে ট্যুরিজম দফতরটি দিলে আরও ভালো করতেন। কেননা বিরামহীন বিদেশ সফর করে তিনি বাঙালি বিশ্ব পর্যটকদের ব্র্যান্ড অ্যামবাস্যাডর হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। আর একটা প্রাতঃস্মরণীয় কাজ তিনি করেছেন, সেটা কবুল না করলেই নয়। শিল্প মন্ত্রণালয় পেলে সচরাচর যা হয়—শিল্পপতিদের সঙ্গে দহরম মহরম করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশকে মন্ত্রী লাটে তোলেন। দিলীপ বাবুকে সেই দুর্নাম দেয়া যাবে না। তিনি শিল্পখাতকে ধ্বংস করে দেননি। বরং শিল্প মন্ত্রণালয়ের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছেন। সরকারের মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তবুও ‘শিল্প’ বলে একটা দফতর ছিল। তিনি সেটাকে নিদারুণভাবে মৃত মন্ত্রণালয় বানিয়ে ছেড়েছেন। তার নেতৃত্বে এই মন্ত্রণালয়টির অপমৃত্যু ঘটেছে। মিডিয়ায় বলুন, দুর্নীতির প্রোপাগান্ডায় বলুন, কোথাও এই মন্ত্রণালয়টির নামগন্ধ কিছু নেই। দেশের শিল্পখাত ও মন্ত্রণালয়ের শেষকৃত্য হলো একজন ক্লাব কমিউনিস্টের হাতেই। আগামীতে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি যে-ই সরকার গঠন করুক না কেন তারা শিল্পকে আলাদা মন্ত্রণালয় থেকে ছেঁটে বাণিজ্য কিংবা অর্থ—কোনো একটার সঙ্গে জুড়ে দিয়েই দিব্যি চালাতে পারবেন। গৃহায়ণ পূর্ত দফতরের সঙ্গেও এটাকে ট্যাগ করে দিলে অবাক হওয়া চলবে না। দেশে বাওয়ানি-দেওয়ানি মার্কা বিশাল বিশাল পাট-সুতা-বস্ত্র মিল ছিল—শত শত একর জমির ওপর স্থাপিত শিল্পগুলো গত দেড় দশক ধরে বেচাবিক্রি হয়েছে। বেসরকারি খাতে দত্তক দেয়ার মুচলেকায় শিল্প স্থাপনের একটা বাধ্যবাধকতা ছিল। দিলীপ বাবুর জমানায় সেগুলো সুরম্য আবাসন শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্লট আকারে বিক্রি হয়েছে শিল্পের জমি। ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে। পাঁচ-ছয়তলা লাল-নীল অট্টালিকায় ভরে গেছে। দেশের গৃহায়ন-সমস্যা নিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী দৌড়ঝাঁপ করছেন তিন বছর ধরে। ঢাকার উপকণ্ঠে তো বটেই, সাভার-ধামরাইসহ জেলায়-উপজেলায় স্যাটেলাইট সিটি তৈরির মহাকল্পনায় তিনি বিভোর। আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি করতে গিয়ে ধাওয়া খেয়েছেন। প্রচুর বকর বকর করেছেন। কেবল বসুন্ধরার সঙ্গে আক্রাআক্রি ছাড়া কোনো অশ্বডিম্বও প্রসব হয়নি। সিটি তো দূরের কথা, উত্তরা-মোহম্মদপুরের ফ্ল্যাট প্রকল্পে ইটও গাঁথতে পারেননি। সেখানে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন দিলীপবাবু। দেশের এখানে-সেখানে ঐতিহ্যবাহী মিল-কারখানার অঢেল জমিতে গড়ে উঠেছে সুপরিকল্পিত শহর। দাদাকে ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই। তার হাতে না হয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অপমৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু পুনর্জীবন পেয়েছে গৃহায়ন ও আবাসন।

৪.
এবার ক্লাব-কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে দু-চারটি কথা বলা প্রয়োজন। তোপখানার অলিতে-গলিতে কমিউনিস্ট ক্লাব রয়েছে বেশকিছু। পুরনাপল্টনেও আছে একাধিক। বেশিরভাগই লাইব্রেরি টাইপ রিডিং ক্লাব। পড়াশোনা, দেয়াল পত্রিকা, কমিউন লিভিং আর অজস্র আকাশকুসুম কল্পনা নিয়েই তারা ব্যস্ত। রাষ্ট্র দখল, ক্ষমতা দখলের কিছু কেতাবি কথাবার্তা তারা বলে বেড়ায় বটে, কিন্তু পার্টি অফিসের ভাড়ার টাকা তুলতেই বেশিরভাগ মাসে হতোদ্যম। রাস্তায় গান গেয়ে, সবিনয়ে চাঁদা চেয়ে তারা প্রাণান্ত। অর্থনৈতিক সঙ্কটের বাস্তব টানাপড়েনেই মাঠে মারা যাচ্ছে দিবাস্বপ্ন। সে তুলনায় সিপিবির ক্লাবটি স্বতন্ত্র ও স্বনির্ভর। মণি সিং ট্রাস্ট সুরম্য ভবনটিতে নিজেদের আড্ডা গল্পগুজব ও ভবন বাণিজ্য ভালোই চলছে। বাড়িভাড়ার টাকা সংগ্রহে উদীচীকে হন্যে হয়ে ছুটতে হচ্ছে না। অবশ্য এতে ক্লাব কার্যক্রম হয়ে পড়েছে সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ। আগে সারাদেশে পাড়ায়-মহল্লায় উদীচীর নাম শোনা যেত, কলেজ-ভার্সিটিতে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল প্রবল সক্রিয়—এখন সেসব স্বর্ণালি ইতিহাস। রাজনীতি করে ক্ষমতা দখল করা যায়, এটা সম্ভবত এখন বিশ্বাসই করে না বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টিতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদগুলো আছে বটে। তারা টকশো আর পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লেখার মধ্যেই কুয়োর জলের তলা থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। শীর্ষ নেতারা পরস্পর আত্মীয়তার বন্ধনে আছেন বলে অনেকে পারিবারিক ক্লাব বলে টিটকারিও দিচ্ছে।

গণসংগঠন হিসাবে প্রবলভাবে বিকশিত সিপিবি কেন এখন ‘ওয়াকফ এস্টেট’ মার্কা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হল- বুলবুল-সেলিমের কাছে পার্টিজানদের এ এক বিশাল জিজ্ঞাসা। ক্ষমতার লালসা বিমুখ এক নিরামিষ পার্টি হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষা যে তাদের একমাত্র ব্রত- তাই বা জোর দিয়ে বলি কেমন করে! ক্ষমতার রস- আস্বাদনের লালসামুক্ত তারা নয়। ক্ষমতা বলয়ে থাকার বিনম্র একটা প্রয়াস সবসময়েই ছিল। কিংবদন্তি মণি সিং বলতে গেলে বাকশালে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। নেই নেই বলেও তারা ক্ষমতার কক্ষচ্যুত হন না। এখনো অন্যফর্মে ক্ষমতার নিউক্লিয়াসে আছেন। বর্তমান মহাজোট মন্ত্রিসভা তো চলছে চুক্তিভিত্তিক সিপিবি নেতাদের দিয়েই। মতিয়া চৌধুরী- কৃষিমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য যাই হোন না কেন- ছাত্র ইউনিয়নের সোঁদা গন্ধ মুছে ফেলতে পারেন নি। নূরুল ইসলাম নাহিদ সিপিবির চূড়ায় উঠেছিলেন সম্ভবত আওয়ামী লীগে সম্মানজনক পদ বাগাবার জন্যই এবং সেটা তিনি সফলভাবেই পেরেছেন। শফিক আহমেদ আড়ালে ছিলেন। সিপিবিয়ান সিভিলিয়ান হয়েও টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রীত্ব- এটা নিসন্দেহে চমত্কার কারিশমা। তবে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ক্লাব সিপিবির সাবেক অগ্রগণ্য লালকার্ড নুহউল আলম লেলিন। আওয়ামী লীগের প্রচার ও তথ্য সম্পাদক হয়েছেন- এটাকে তেমন বড় করে দেখছি না। এতক্ষণ যাদের কথা বললাম- মতিয়া-নাহিদ-শফিক তারা কমিউনিস্ট ক্লাবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি খোয়াতে পারেননি। মতিয়া আছেন সেই সাততলা-গাছতলার মতিয়া চৌধুরীর মতনই। সরকারের সেরা লুটের খনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মোটামুটি ভালোই সামলাচ্ছেন নাহিদ। তবে বইপত্র ছাপার কাজটা ভারতীয় বেনিয়াদের হাতে না তুলে দিলেই পারতেন। বুঝলাম- দেশীয় মুদ্রণ বেনিয়াদের শিক্ষা দিতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু ব্যাপারটা এখন রেওয়াজ হয়ে ওঠায় দেশীয় মুদ্রণশিল্প কর্মীরা শুনেছি- তাদের ভাষায় ‘ভারতীয় হায়েনাদের’ হাত থেকে মুদ্রণশিল্পকে রক্ষার জন্য আন্দোলনে যাচ্ছেন। ‘টিট ফর ট্যাট’ হয়েছে- এবার ক্ষ্যান্ত দিন। দেশীয়দের কাজ দিন। দেখুন ওরা সত্যিই পারে কিনা। ও হ্যাঁ- আরেকটা কথা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের একাধিক গাড়ি ব্যবহার করছেন নাহিদ পরিবার। এটা ঠিক লাল ক্লাব কালচারের সঙ্গে মানায় না। শফিক আহমেদ রহস্যময়। তার পূর্ণ মন্ত্রীত্ব নিয়ে ধাধাঁয় পড়ি প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের কথা ও কাজের বহর ও বাহারে। শফিক মন্ত্রণালয়ের পুরানা গাড়িতেই চড়ছেন। প্রায় ষাট লাখ টাকার গাড়ি কিনে দেয়ার একটা উদ্যোগ হয়েছিল। তিনি অর্থনৈতিক কৃচ্ছের জন্য তা ফিরিয়ে দিয়ে নস্টালজিক কম্যুনিস্টদের খুশি করেছেন নিঃসন্দেহে। তবে প্রধান বিচারপতির ২টি গাড়ির জন্য ১২/১৩ কোটি টাকার স্যাংশনের ঘটনায় তার ভূমিকা প্রশ্নের বাইরে রাখা যাচ্ছে না।

মতিয়া নাহিদ শফিক যেটা পারেননি, লেনিন সেটা পেরেছেন। সিপিবিয়ান বৈশিষ্ট্য খুইয়ে তিনি ষোল আনা আওয়ামী লীগ চরিত্র অর্জন করতে পেরেছেন। দ্রুততম সময়েই সেটা পেরেছেন। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের যদু বাড়িতে কয়েকশ’ বিঘা হিন্দু অর্পিত সম্পত্তি রয়েছে। মন্দির ও দেবোত্তর সম্পত্তিও রয়েছে। লেলিন বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন করে লিজ নিয়েছেন যদু বাড়ির ত্রিশ বিঘা। সেখানে রোমান্টিক নৌ-মিউজিয়াম ও অত্যাধুনিক থিমপার্ক- সরাইখানা হচ্ছে। রাতারাতি লেলিনের এতো বিবর্তন? সিপিবির সংখ্যালঘু সংরক্ষক ভূমিকা সুবিদিত। সাবেক কমরেড পুরানা শিক্ষা ভুলে বেআইনিভাবে অর্পিত-দেবোত্তর সম্পদ দখলের পায়তারা করায় অবাকই হয়েছি বৈকি। থাকিলে ডোবাখানা, হবে কচুরিপানা- স্বভাব তো কখনো যাবে না- গণসঙ্গীতটির মর্মবাণী প্রমাণ করি কেমন করে। লেনিন তো স্বভাব খুইয়ে ফেলতে চলেছেন। ডোবাখানায় ডুব দিয়ে কচুরিপানার সংস্পর্শে তিনি তো দেখছি উত্তর আধুনিক আওয়ামী লীগার হয়ে উঠেছেন।

মণি সিং যা পারেননি- তার উত্তরাধিকারীরা তা করে দেখাচ্ছেন। মণি সিং ভেবেছিলেন- শেখ মুজিবের বাকশালে বিলীন হয়েই ক্ষমতা দখল হয়ে গেছে। মুজিব সৌজন্যমূলক বুদ্ধি পরামর্শ নিচ্ছিলেন সেই ছিল ঢের প্রাপ্তি। তার উত্তরসূরিরা কৌশল বদলেছেন, তারা আওয়ামী লীগের মিত্র শক্তি হয়ে থাকাটাকেই পরম প্রাপ্তি বলে মানেন নি। বরং রং বদলে পোশাক বদলে ভাগ বসিয়েছেন ক্ষমতায়।
এটা কি সত্যিই সিপিবির ক্ষমতা দখলের গোপন কৌশল? কিন্তু এই কৌশলের অন্তিম ফলটা কি হয়েছে! একটা প্রবল সম্ভাবনাময় গণসংগঠন সকল ভবিষ্যত্ জলাঞ্জলি দিয়ে পুরানা পল্টনে একটা ট্রাস্টি পার্টিতে পরিণত হয়েছে। একসময় যারা বিচরণ করেছে সারাদেশে। এখন কেবল পল্টন মোড়ে মাথায় লালপট্টি বেধে হই হট্টগোলই সার।

আর তাতেই লাল বিপ্লবের সাধ মিটে গেল। তবে কি সিপিবি কখনোই পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না কিংবা হয়ে উঠতে পারেনি। তারা সুশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন বা ক্লাবের মতো কিছু এটিকেট ভব্যতা, কালচার চর্চা করেছে। যে কারণে তারা সংস্কৃতিবান সভ্য সৃষ্টি করতে পেরেছে- রাজনৈতিক কর্মী তৈরি করতে পারেনি। রাজনীতির লক্ষ্যে হাজার হাজার উজ্জ্বল মেধাবী তরুণ ছাত্র ইউনিয়ন নামের স্কুলে দাখিল হলেও পাঠশেষে তাদের নীরব স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। মতিয়া-নাহিদ-শফিক-লেনিন; ক্ষমতার রসাস্বাদন করছে কিছু ব্যক্তি- পার্টি কখনো নয়।

৫.
৫ মার্চ ২০১২ সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অতি কথনে কেউ কেউ লাভবান হয়েছেন। অন্যরা এটা দেখে অতিকথন করতে পারেন। অনেকের তো অনেক রকম আকাঙ্ক্ষা থাকে।
অকাট্য কথা। প্রধানমন্ত্রীর এই অকাট্য কথনের টার্গেট কে? অতিকথনে লাভবান হয়েছেন কারা। আর কারা ক্ষুব্ধ হয়ে লাভবান হওয়ার লক্ষ্যে অতিকথনের পথ ধরেছেন? খুব সহজেই ধরে নেয়া যায়- অতিকথন করে লাভবান হয়েছেন সুরঞ্জিত ও ওবায়দুল। আর এই চর্চ্চিত পথটি এখন বেছে নিয়েছেন প্রথিতযশা লাল পতাকাধারী রাশেদ খান মেনন।

তার সাম্প্রতিক কথায় প্রধানমন্ত্রী কষ্ট পেয়েছেন। খুব স্বাভাবিক, যারা প্রধানমন্ত্রীর এতো পেয়ারের। আমাদের কথাপ্রিয় প্রধানমন্ত্রীকেও যাতে কথা বলে কষ্ট করতে না হয়- সেজন্য যারা হাসিনার মনের কথা হিল্লি দিল্লী সব জায়গায় বলে বেড়ান। মেনন তাদেরকে নিয়ে অমন কটূক্তি করলেন; বললেন- ওরা প্রধানমন্ত্রী হাসিনার উপদেষ্টা নন, ওরা মনমোহনের। ওরা বাংলাদেশের নয়, ওরা ভারতের উপদেষ্টা। এই কথা মেনন রাজপথে বলেননি; বলেছেন খোদ সংসদে। সংসদের ইতিহাসে যে কথা রেকর্ড হয়ে গেল।

যে উপদেষ্টারা সারাক্ষণ ব্যস্ত হাসিনার সুখে দুঃখে। ভারতের আচরণে দেশবাসী যাতে কষ্ট না পান- সেজন্য বিগলিত ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। বিদ্যুত্ সঙ্কট, শেয়ারবাজার লুট, অর্থনৈতিক মহামন্দা- হাসিনা সরকারের ইমেজ যাতে কালিমালিপ্ত না হয় উপদেষ্টাদের প্রাণান্ত চেষ্টা সারাক্ষণ। তাদেরকে ভারতের মনমোহনের উপদেষ্টা বললে হাসিনা কষ্ট পাবেন- সেটা খুবই স্বাভাবিক। আর মেনন বলে সারতে পারেননি- মহাজোট সরকারের তিন নম্বর ছাগলছানা এরশাদও ধেই ধেই নেচে নালিশ জুড়েছে- ঠিক ঠিক; ওরা ভারতের লোক।

একবার ভাবুন- কেমন বহুমুখী কষ্ট পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। এমনিতে চির বৈরী বিরোধী দল ইন্ডিয়ান কার্ড খেলে পর্যুদস্ত করে ফেলেছে মহাজোটকে। আর এখন কিনা- ঘরের লোকজনই তুলেছে একই আওয়াজ।

কিন্তু রাশেদ খান মেননের কষ্টও তো বুঝতে হবে হাসিনাকে। তিনিও একটা ছোটমোটো ক্লাব কমিউনিস্ট পার্টি চালাচ্ছেন অনেকদিন ধরে। আকারে ছোট হতে পারে তবে ঝাল ও তেজ আছে। তেজ আছে বলেই তো বার বার তার পার্টি ভেঙে টুকরো হচ্ছে। তারপরও বিনাশ হচ্ছে না। কী অবিনাশী! হাসিনা কোনভাবেই তাকে তুচ্ছজ্ঞান করতে পারেন না। মেননকে নিসঙ্গ করে সাইফুল হকরা চলে গেল; আরেক পার্টি করলো- দীর্ঘদিনের বন্ধু-সহযোগী হায়দার আকবর খান রনো ট্রাস্টি ক্লাবে গিয়ে উঠলো- মৃত্যুঞ্জয়ী মেনন ঠিকই টিকে রইলেন। তারপরও তার যথা মূল্যায়ণ হলো না।

এক নেতা- এক পার্টি- এক কর্মী দিলীপ বড়ুয়া পর্যন্ত লম্বা লম্বা পা ফেলে মন্ত্রীর শপথ নিলো; তিনটি বছর মসনদে কাটিয়ে দিলো, মহাজোটের বেলা শেষের দিনে অনেক রদবদলই হচ্ছে। আবুলের মতো বিশ্বস্ততম মন্ত্রীকে সবচেয়ে লাভজনক খাত থেকে সরিয়ে দেয়া হল- অতিকথক সুরঞ্জিত-ওবায়দুলকে মন্ত্রী করা হল। বাম কোটাতেও চাইলে পরিবর্তন আনতে পারেন হাসিনা। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি।
একজন প্রধানমন্ত্রীকে এতটা অলস, ধীরগতির হলে চলে না। দিলীপের না হয় চীন কার্ড রয়েছে। চীনা কার্ড সংগ্রহ মেননের জন্য কোন ব্যাপারই নয়। তদুপরি তার রয়েছে কোরিয়ান কানেকশন। প্রধানমন্ত্রীকে এসব খবর রাখতে হবে।

অনেক ধৈর্য্য ধরেছেন মেনন। আর নয়। অপরিণামদর্শী প্রধানমন্ত্রীকে কথার হুল দিয়েই ঘায়েল করতে হবে। হাসিনা ইশারা ভাষা বোঝেন না। তবে অতিকথন যারা করেন- তাদের মূল্যায়ণে দেরি করেননি।
আর যে তর সইছে না। বেলা শেষের দিনগুলো হুড়মুড় করে ফুরিয়ে যাচ্ছে। মেনন সম্ভবত খুব দেরি করে ফেললেন। সবে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। দু’চারটা টক ঝাল কথায় ঘায়েল হওয়ার মানুষ নন হাসিনা। তিনিও পাল্টা তীর ছুঁড়বেন। এমনটা বছর খানেক চলবে। কোন আশা নেই। তারপরও যদি ভাগ্যের শিকা ছেঁড়েও বা- তখন দেখা যাবে সূর্য পশ্চিম দিগন্তে শুধু হেলে নাই- অস্তাচলের শয্যায় শয়ানে গেছেন সূর্যদেব।

হায়! ক্ষমতার লিপ্সা ও লালসা এবং অপ্রাপ্তির যন্ত্রণা একদিন মেনন ও এরশাদকে এক কাতারে- দাঁড় করাবে- কে ভেবেছিল!