ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

বাংলাদেশের ক্লাব-কমিউনিস্ট কালচারের অন্যতম পুরোধা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলবিভাগের কালো বিড়ালটা খুঁজে বের করবেন, কথা দিয়েছিলেন। মন্ত্রীর মসনদে বসে কয়েকটা মাস তো গেল—সুরঞ্জিতবাবু কি বেড়ালটাকে খুঁজে পেলেন? তার সাম্প্রতিক কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, খুঁজে পাননি। খুঁজে পাবেনও না। বেড়ালটাকে ভালো করে খুঁজে দেখার ইচ্ছাও তার নেই। এত তাড়াতাড়ি ইচ্ছাটা মরে গেল কেন? আসলে তিনি কালো বেড়ালকে আদৌ ধরতেই চাননি। ওটা ছিল কথার কথা, উপমা।

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনটি বছর গলাবাজি করেছেন। আসর মাত করেছেন। শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে ভয়ংকর সব কথা বলেছেন। তারপর মহাজোট নেত্রী যেই না মন্ত্রিত্বের মুলোটি ঝুলালেন, অমনি পদপদবি নিয়ে মুলোমুলি না করে এ্যাবড় এক হাঁ করে গিলে ফেললেন। তখন নীরব দর্শকরা ঠিকই বুঝলাম—তিন বছরের বড়গলা আস্ফাালন, তর্জন গর্জন—সেসবই ছিল মন্ত্রিত্ব বাগাবার জন্য। কথা ও কাজে সেটাই আক্ষরিক অর্থে প্রমাণ করলেন সুরঞ্জিত বাবু। যাই হোক দাদার লাজশরম আছে। সেটা ঢাকতেই চমকপ্রদ কিছু বলতে হয়। ওজনদার কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। দাদা তো আওয়ামী লীগ-বিএনপির ফাঁকা-আওয়াজ রাজনীতি করেন না যে বঙ্গবন্ধু রেলসেতু কিংবা বরিশালে রেললাইন মার্কা বাস্তবায়নযোগ্য ওয়াদা করবেন। আর কমিশনের দরবাজি করে এক লাখ বছর ঝুলিয়ে রাখবেন। তিনি মন্ত্রিত্বের বাসরশয্যার রাতেই বেড়ালটি মারতে চাইলেন উপমা দিয়ে।

তার কথিত কালো বেড়ালের খবর কী! রেল মন্ত্রণালয়কে কি তিনি কালো বেড়ালমুক্ত করতে পেরেছেন!

কই পারলেন? বরং এরই মধ্যে রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। এরই মধ্যে ফিরে গেছেন পুরনো চেহারায়। আবার কথাসরিত্ সাগর খুলে বসেছেন। সুনামগঞ্জের দিরাই শাল্লায় নিজ নির্বাচনী এলাকায় নিয়মিত যান তিনি। ৩ মার্চ নিজ জেলায় এক সংবর্ধনায় বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী হঠাত্ করে আমাকে তার ভাঙা রেলে তুলে দিয়েছেন। সরকারের শেষ সময়ে এসে আমার কাঁধে মন্ত্রিত্ব চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।’

হা হা—এ কী কথা শুনি সুরঞ্জিতের মুখে। দাদা কি নাবালক! হাসিনা তার হাতে মোয়া-মালপোয়া দিতেই বালখিল্য আনন্দে সব চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছেন। এখন পেটে অসুখ করতে হাহুতাশ করছেন—মালপোয়া বাসি ছিল, তাই টক ছিল। না, সুরঞ্জিত বাবুকে একথা বললে চলবে না। মহাজোটের অ্যাকুইরিয়ামে এখন যারা শোভাবর্ধন করছেন, নিঃসন্দেহে দাদা তাদের মধ্যে সবচেয়ে ঝানু, পরিপকস্ফ পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ। হাসিনার মোয়া-মালপোয়া যখন তিনি হাতের তেলোতে নিয়ে চেটেপুটে খেয়ে নিয়েছেন, এখন আর উগরানো চলবে না। এখন এই গান গাইবার কোনো সুযোগ নেই—আগে জানলে হাসিনার ভাঙা নৌকায় চড়তাম না।

বড্ড বক বক করছিলেন। শেখ হাসিনা তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছেন। মিডিয়ার মাইক্রোফোন দেখলে সবারই বড় বড় কথা বলতে ইচ্ছা হয়। এবার দাদা করে দেখাও! হ্যান করব, ত্যান করব—অনেক বলেছেন।

উপমাবৃত্তি রাজনীতিবিদের নয়, ওটা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীদের মানায়। তত্ত্বাবধায়ক বা সামরিক ইমার্জেন্সি সরকারগুলো জবরদস্তি ক্ষমতায় গিয়ে কিছু অর্ধশিক্ষিত বুদ্ধিজীবী আমলাদের টুকিয়ে এনে উপদেষ্টার পদে বসিয়ে দেয়, তখন আমরা তাদের মুখে বটতলার সাহিত্য শুনতে পাই—সুড়ঙ্গের ওপারে আলোর ইশারা দেখতে পাচ্ছি।

সুরঞ্জিত বাবু তেমন ‘বাণী চিরন্তনী’ মুখস্থ করা লোক নন যে মাঝে মাঝে কিছু কোটেশন উদ্ধৃত করে সবজান্তার ভাব নেবেন। তাকে কাজ করে দেখাতে হবে। হাসিনা টিট ফর ট্যাট—যেমন ট্যান্ডল তেমন হ্যান্ডলিং—কর্মসূচির অধীনে তাকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছেন মানলুম—সেটা জেনে-বুঝেই দাদা টোপটি গিলেছেন। কালো বেড়াল তাকে খুঁজে বের করতে হবে। হাসিনা তাকে যে ঘরটি দিয়েছেন—বুঝলাম সেটা অন্ধকার। অন্ধকারেও কালো বেড়াল খুঁজে পাওয়া যায়। বেড়ালের যে সাদা ফসফরাস চোখ। তাতেও যদি ঠাওর করতে না পারেন, তবে টর্চলাইটটা জ্বালুন। খুঁজে বের করতে চাইলে অবশ্যই বেড়াল পাওয়া যাবে। চীন, ভারত, থাইল্যান্ডে রেল কত শনৈঃ শনৈঃ উন্নত। এখানেও সম্ভব।

মহাজোট নেত্রী যদি ভাঙা রেলে তুলে দিয়ে শঠতা করেই থাকেন, তবে উপযুক্ত শঠে শ্যাঠাং জবাব হবে কাজ দেখানোর মাধ্যমে। শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত শাহি কম্পার্টমেন্টে ঢাকা-সিলেট ট্যুর করেই প্লিজ রণে ভঙ্গ দেবেন না।

অনেক সময় প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমেও উপযুক্ত জবাব দেয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জুতা মেরে গরুদান করার মশকরা করলেন। গ্রামীণ ব্যাংক থেকে তাকে খেদিয়ে বিদেয় করে হঠাত্ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নকে চমকে দিয়ে ইউনূসকে বিশ্বব্যাংকের চেয়ারম্যান করার অদ্ভুত তদবির করলেন। তার মনে যাই থাকুক, ইউরোপীয়রা দৃশ্যত বেশ সিরিয়াসলি নিল। মার্কিন সরকারের একটা ডেপুটি সেক্রেটারি, যার কথাবার্তায় মনে হয় সে বাংলাদেশে মার্কিন গভর্নর, সেও কিনা বলে বসল—ইউনূস রাজি থাকলে তারাও রাজি। ড. ইউনূস এইসব রঙ্গতামাশাকে দক্ষতার সঙ্গেই পাশ কাটিয়েছেন। তাকে ঘিরে মশকরার প্রহসন জমে উঠেছিল। তিনি বিনয়ের অবতার সেজে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে পাল্টা চপেটাঘাত মন্দ করেননি। ইন্টারনেটে তরুণদের ব্লগগুলোতে তার ভূয়সী প্রশংসা—সবাই এটাকে উপযুক্ত চপেটাঘাতই বলছে।

সুরঞ্জিত এই প্রত্যাখ্যানের সুযোগ গোড়াতে হারিয়েছেন। সবিনয়ে তাকে বলব—একজন রাজনীতিবিদ হয়ে রাজনীতিকের মতো আচরণ করুন। বক্তৃতাবাজি, গলাবাজিই আপনার একমাত্র কর্ম নয়। রাজনীতিবিদ যখন পাওয়ারে—মন্ত্রীর চেয়ারে—তখন তার আসল কাজ হলো অ্যাকশন। কিছু করা। কিছু করে দেখানো। রেল মন্ত্রণালয় এখন চলছে আল্লাহর ওয়াস্তে। এটাকে ঢেলে সাজানো দরকার। এটা যে ভাঙা রেল, সে তো নতুন কথা নয়। সেই ভাঙা রেলে কে জোড়া লাগাবে—দেখি সুরঞ্জিত পারেন কিনা!