ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

মহাজোট জমানায় সবচেয়ে বিস্ময়কর নৈপুণ্য দেখিয়েছেন দিলীপ বড়ুয়া। শেখ হাসিনার প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে তিনি এক্সক্লুসিভ আইটেম। সৈয়দ আবুল হোসেন না হয় চীনের কোথায় দৌড় প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হয়ে মন্ত্রিত্ব বাগিয়েছেন। কিন্তু দিলীপ বাবুর উজির হওয়ার গোপন রহস্য আজও জানা হলো না। সে কারণও নিশ্চয়ই চৈনিক। শুধু কি মন্ত্রী হওয়া—তিন বছরের বেশি সময় দিব্যি শিল্পমন্ত্রী হয়ে অটুট রয়েছেন। ক্লাব-কম্যুনিস্ট হিসেবে তার চেয়ে ইউনিক পারফরমেন্স আর কেউ দেখাতে পারবেন না। দিলীপ বড়ুয়া ও তার নামে ব্র্যাকেট-বন্দি সাম্যবাদী দলের অস্তিত্ব যেন একই দেহের খাঁচায়। অনেকেই বলেন, ওয়ান ম্যান পার্টি। হলিউডি-বলিউডি দক্ষিণী ছবিতে ওয়ান ম্যান আর্মি ধুন্ধুমার কাণ্ডকারখানা করে থাকেন। বাস্তবে তা কল্পনাই করা যায় না। দিলীপ বাবু কিন্তু বাস্তব। চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো সত্য। প্রতিভা হিসেবে তিনি বহুমুখী। খালেদা জিয়ার চারদলীয় জোট সরকার জমানায় দেখেছি—বিএনপি ঘনিষ্ঠ সম্পাদকদের দফতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছেন। সম্পাদক অফিসে না থাকুন, তিনি আঠার মতো লেগে থাকতেন। খালেদা জিয়ার চীন সফরে সম্ভবত সফরসঙ্গীও হয়েছিলেন। হাসিনার মহাজোট জমানাতে তার প্রতিভার উত্কর্ষ ও ব্যুত্পত্তি আমরা দেখলাম। মঙ্গোলয়েড চেহারা আর চৈনিক গ্রীন পাসের বদৌলতে।
কারও পক্ষে মন্ত্রী হওয়া সম্ভব, সেটা তিনি বাস্তবায়ন করে দেখালেন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টি, যুব ফেডারেশন, পলিটিক্যাল ব্যুরো হয়ে একান্ত নিজস্ব কমিউনিস্ট ক্লাবের সঙ্গীহীন সভ্য। হাসিনা তাকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো সাযুজ্যপূর্ণ মন্ত্রণালয়টি দিয়েছেন। তার মন্ত্রী হওয়ার চেয়েও বেশি বিস্ময়ের হলো তিনি মন্ত্রী হিসেবে কেমন করে টিকে আছেন?

সুরঞ্জিত বাবু নিজেকে যতই ধুরন্ধর ভাবুন না কেন দিলীপ বড়ুয়ার কাছে তার শেখার রয়েছে। কেননা তার এই উত্থানকে রক্তপাতহীন নীরব লালবিপ্লব বলা যায়। তার টিকে থাকার গোপন সূত্র এটা হতে পারে—তিনি প্রধানমন্ত্রীর তোয়াজ-তোষামোদ করেছেন সবসময়, বেফাঁস কথা কখনো কিছু বলেননি। শুনেছি, নিজের কমিউনিস্ট স্টাইলের সরল-সাধারণ জীবনধারাকে তিনি বদলাননি, তবে মনের সুখ মিটিয়ে বিদেশ সফর করেছেন। অনেকে বলে থাকেন, তাকে ট্যুরিজম দফতরটি দিলে আরও ভালো করতেন। কেননা বিরামহীন বিদেশ সফর করে তিনি বাঙালি বিশ্ব পর্যটকদের ব্র্যান্ড অ্যামবাস্যাডর হিসেবে গণ্য হচ্ছেন। আর একটা প্রাতঃস্মরণীয় কাজ তিনি করেছেন, সেটা কবুল না করলেই নয়। শিল্প মন্ত্রণালয় পেলে সচরাচর যা হয়—শিল্পপতিদের সঙ্গে দহরম মহরম করে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশকে মন্ত্রী লাটে তোলেন। দিলীপ বাবুকে সেই দুর্নাম দেয়া যাবে না। তিনি শিল্পখাতকে ধ্বংস করে দেননি। বরং শিল্প মন্ত্রণালয়ের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছেন। সরকারের মন্ত্রণালয়ের তালিকায় তবুও ‘শিল্প’ বলে একটা দফতর ছিল। তিনি সেটাকে নিদারুণভাবে মৃত মন্ত্রণালয় বানিয়ে ছেড়েছেন। তার নেতৃত্বে এই মন্ত্রণালয়টির অপমৃত্যু ঘটেছে। মিডিয়ায় বলুন, দুর্নীতির প্রোপাগান্ডায় বলুন, কোথাও এই মন্ত্রণালয়টির নামগন্ধ কিছু নেই। দেশের শিল্পখাত ও মন্ত্রণালয়ের শেষকৃত্য হলো একজন ক্লাব কমিউনিস্টের হাতেই। আগামীতে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি যে-ই সরকার গঠন করুক না কেন তারা শিল্পকে আলাদা মন্ত্রণালয় থেকে ছেঁটে বাণিজ্য কিংবা অর্থ—কোনো একটার সঙ্গে জুড়ে দিয়েই দিব্যি চালাতে পারবেন। গৃহায়ণ পূর্ত দফতরের সঙ্গেও এটাকে ট্যাগ করে দিলে অবাক হওয়া চলবে না।

দেশে বাওয়ানি-দেওয়ানি মার্কা বিশাল বিশাল পাট-সুতা-বস্ত্র মিল ছিল—শত শত একর জমির ওপর স্থাপিত শিল্পগুলো গত দেড় দশক ধরে বেচাবিক্রি হয়েছে। বেসরকারি খাতে দত্তক দেয়ার মুচলেকায় শিল্প স্থাপনের একটা বাধ্যবাধকতা ছিল। দিলীপ বাবুর জমানায় সেগুলো সুরম্য আবাসন শিল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্লট আকারে বিক্রি হয়েছে শিল্পের জমি। ফ্ল্যাট বাড়ি উঠছে। পাঁচ-ছয়তলা লাল-নীল অট্টালিকায় ভরে গেছে। দেশের গৃহায়ন-সমস্যা নিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী দৌড়ঝাঁপ করছেন তিন বছর ধরে। ঢাকার উপকণ্ঠে তো বটেই, সাভার-ধামরাইসহ জেলায়-উপজেলায় স্যাটেলাইট সিটি তৈরির মহাকল্পনায় তিনি বিভোর। আড়িয়ল বিলে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সিটি করতে গিয়ে ধাওয়া খেয়েছেন। প্রচুর বকর বকর করেছেন। কেবল বসুন্ধরার সঙ্গে আক্রাআক্রি ছাড়া কোনো অশ্বডিম্বও প্রসব হয়নি। সিটি তো দূরের কথা, উত্তরা-মোহম্মদপুরের ফ্ল্যাট প্রকল্পে ইটও গাঁথতে পারেননি। সেখানে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন দিলীপবাবু। দেশের এখানে-সেখানে ঐতিহ্যবাহী মিল-কারখানার অঢেল জমিতে গড়ে উঠেছে সুপরিকল্পিত শহর। দাদাকে ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই। তার হাতে না হয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অপমৃত্যু ঘটেছে, কিন্তু পুনর্জীবন পেয়েছে গৃহায়ন ও আবাসন।