ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মর্যাদাপূর্ণ প্রধানমন্ত্রী পদে থেকেও অবিরাম বিষোদগার করে যাচ্ছেন তারই মতো আরেকটি রক্তাক্ত শহীদ পরিবারের বিরুদ্ধে। তিনি ‘জলে স্থলে অন্তরীক্ষে’—গণভবনে-জনসভায়-সংসদে সর্বত্র গালি ও কটূক্তির তুবড়ি ছোটাচ্ছেন তার শহীদ পিতা বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজিক মৃত্যুর মতো শোকাবহ আরেক হত্যাকাণ্ডের শিকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে। বিষাক্ত কথার সূচাঁলো তীর নিয়ে বিশাল ধনুক হাতে তিনি অহোরাত্র নির্ঘুম আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন—তার এই ছায়াবাজির যুদ্ধের বুঝি শেষ নেই। তিনি যুদ্ধোন্মাদের মতো লড়েই চলেছেন। তিনি এমন এক চক্রব্যূহে ফেঁসে গেছেন—এখন গালির বেসাতির গোয়েবলস না হয়ে তার উপায় নেই। তিনি এমনই নিরুপায়, এমনই অসহায়। লক্ষ্য করুন, তার টার্গেট তারই মতো পিতৃহীন তারেক রহমান। তার টার্গেট খালেদা জিয়া, যিনি একজন মহীয়সী নারী। পিতা ও পরিবারকে হারিয়ে একটা সময় শেখ হাসিনা যেমন সহায়হীন হয়ে পড়েছিলেন, খালেদা জিয়াও এক সময় স্বামীকে হারিয়ে সংসার সমুদ্রে অকূল পাথারে পড়েছিলেন।
তারপর দুজনই অসামান্য দক্ষতায়, অতুলনীয় নেতৃত্বগুণে পাড়ি দিয়েছেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র। জয় করেছেন দুঃসময়কে। পরিণত হয়েছেন সময়ের অসামান্য নায়কে। মহাকালের পাতায় হীরার অক্ষরে লেখা থাকবে তাদের নাম। এ নাম মোছা যাবে না গালি দিয়ে, খিস্তি করে। মোছা যাবে না ফতোয়া দিয়ে। এ নাম অক্ষয়।

একথা আমরা সবাই জানি। এ কথা বলাবাহুল্য—তবুও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যদি সেদিন ভারত থেকে এসে আওয়ামী লীগের হাল না ধরতেন, কাণ্ডারি না হতেন—মুসলিম লীগের চেয়েও করুণ অবস্থা হতো এই বৃহত্তম দলটির। ক্ষতবিক্ষত, খণ্ড খণ্ড-টুকরা টুকরা হয়ে যেত। আজকের যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে মহীরুহ হয়ে বিরাজ করছে, দু-দুবার ক্ষমতায় এসেছে, দেশ শাসন করছে—এসবই শেখ হাসিনার একক কীর্তি। হালুয়া-রুটির জন্য যারা ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের লুটেরা হানাদার সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন, ষড়যন্ত্র করেছিলেন মাইনাস হাসিনার—যাদের আজ স্থান হয়েছে উপদেষ্টামণ্ডলীতে। ওই ১০ ভূতের পাল্লায় পড়লে আওয়ামী লীগ আজ হয়ে পড়ত অস্তিত্ব হারা কিংবা ষোলো খণ্ড। তারা হাসিনাকে মাইনাস করার জন্য পরস্পর নষ্ট রাজনীতির ক্যাম্পফায়ারে উত্সবে মেতেছিল ঠিক, কিন্তু হাসিনা সত্যিই মাইনাস হয়ে গেলে আজকের বাম রাজনৈতিক দলগুলোর মতো জন্ম নিত অসংখ্য ব্রাকেটবন্দি আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ (সু-জ), আওয়ামী লীগ (তো-জা), আওয়ামী লীগ (আ-?) ছিল অনিবার্য।

মহীয়সী নেত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন দলকে। তিনি দলটির ঐক্যের প্রতীক ও একমাত্র শক্তি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসায় আজ শেখ পরিবারের গর্বিত সদস্যরা গ্যারান্টি কার্ড ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে সুখের সাগরে রাজহংসের মতো নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করছেন, তারাও নিখিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পুত্রকন্যা-নাতিপুতির মতো এসব ব্রাকেট আওয়ামী লীগের অলঙ্কার হতেন। এর বেশি কিছু নয়। বিদেশের সুখস্বর্গ থেকে মাঝেমধ্যে দেশে এসে ‘গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ ও আওয়ামী লীগের ঐক্যের সম্ভাবনা’র ওপর সেমিনারে বক্তব্য রেখে আবার লন্ডন, আমেরিকা ফিরে যেতেন।
আজ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগকে সুদৃঢ় ঐক্যের ইস্পাত বন্ধনে যিনি অটুট রেখেছেন, তিনি শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রেওয়াজি কেতা মেনে রাজনৈতিক দল চালাতে গেলে, সরকার চালাতে গেলে দলীয় লোকজন ও স্বজনদের নানা দীঘি-ডাকাতি টাইপ দুর্নীতি, অনিয়ম-অনাচারকে প্রশ্রয় দিতে হয়, নানা দুর্নাম মাথায় পেতে নিতে হয়। সেটা করে দুর্নীতি-দুর্নামের বিষসাগর গিলে ফেলে আজ শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন নীলকণ্ঠ; আর আত্মীয়-মন্ত্রী-উপদেষ্টাকুল রাজহংস—সব দায় তার ঘাড়ে চাপিয়ে তারা ‘আমরা রাজনীতি করি না, আমরা রাজনীতিতে নেই’ বলে সাধু সেজে হাঁসের মতো গা-ঝাড়া দিয়ে ধবল নিষ্কলুষ শরীরে লন্ডন-আমেরিকায় নিরাপদে যাওয়ার অপেক্ষায়। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষা; দু-দুবার সরকার পরিচালনার কৃতিত্ব— একই সঙ্গে স্বজন-সাঙ্গ-পাঙ্গদের সব বিষ শুষে নিয়েও তিনি মহীয়ান।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই নারী-নক্ষত্র এখন সব সময় ব্যস্ত জিয়া-খালেদার পরিবারকে হেয় করতে। তিনি গালি দিচ্ছেন তারই সমসাময়িক আরেক মহান নারী নেত্রীকে। হাসিনা যেমন দু’বার প্রধানমন্ত্রী, তিনিও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। হাসিনা যেমন জননেত্রী অভিধায় কর্মী ও জনতার মাঝে প্রিয় মুখ, খালেদাও তেমন দেশনেত্রী অভিধায় কর্মী ও জনগণের মাঝে অনিঃশেষ ভালোবাসায় অভিষিক্ত। শেখ হাসিনা যেমন আওয়ামী ঐক্যের কাণ্ডারি। খালেদা জিয়াও তেমনি দেশের বৃহত্তম দল বিএনপির এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের ভিত্তিমূল এবং অবিসংবাদিত চালিকাশক্তি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি বিএনপির কাণ্ডারি হিসেবে হাল না ধরলে আজ এই দলটিও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ত। ক্ষতবিক্ষত, খণ্ড-বিখণ্ড হতো। বিএনপি যে আজ তিনবার সরকার গঠন করেছে, দেশ পরিচালনা করেছে, তা খালেদা জিয়ার কলঙ্কহীন ইমেজ, নেতৃত্ব গুণ, অনাপস ইস্পাত দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং এসবের যোগফলে জনগণের অঢেল ভালোবাসায়। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের নাজায়েজ-হারাম সরকারের আমলে খালেদা মাইনাসের ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তারেক রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। খুন তো একরকম করেই ফেলেছিল প্রায়। এই মাইনাস চক্রান্ত সফল হলে বিএনপিও পরিণত হতো একাধিক ব্রাকেটবন্দি দলে। জিয়ার মৃত্যুর পর তিনদশক ধরে বিএনপি আজ জাতীয়তাবাদী শক্তির একচ্ছত্র মুকুট—সেই স্বর্ণতাজের শক্তি কেন্দ্র, ঐক্য কেন্দ্র কোহিনুর হলেন খালেদা।

আজ হারাম-অপশক্তি মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন বিদেশের মাটিতে রাজহংস জীবনযাপন করছে—একদল অকর্মণ্য-অদক্ষ-অপরিপকস্ফ-অল্পশিক্ষিত মন্ত্রী এবং দলবাজ আমলা শেখ হাসিনার ঘাড়ে চড়ে তাকে ভুল বুঝিয়ে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে রসাতলে—দিল্লির লাড্ডু-রসগোল্লাজীবী কতিপয় উপদেষ্টা বাংলাদেশকে করে তুলছে পরাধীন করদ রাজ্য, যাদের জন্য শেখ হাসিনা আজ নীলকণ্ঠ, সেই দুর্নীতিবাজ চক্রও এখন দায়মুক্তি সনদ নিয়ে পলায়নের অপেক্ষায়, বঙ্গবন্ধু কন্যা হয়েও তাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা টুঁশব্দটি করছেন না। হাসিনার এতটুকু উপলব্ধি হচ্ছে না। তিনি জেগেও ঘুমাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু কিন্তু তার শাসন জমানায় আত্মোপলব্ধি করতে ভুল করেননি। মাত্র ২/৩ বছরে লুট-দুর্নীতির অবিরাম গ্রাসে তার দল-স্বজনগোষ্ঠী যখন বাংলাদেশকে বানিয়েছিল তলাবিহীন ঝুড়ি, তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সত্সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, অমর উক্তি—চাটার দল সব চেটে চেটে খায়। বলেছিলেন, আমার ভাগের কম্বলটা গেল কোথায়।

এসব ক্ষোভ তাতানো ও সরস উক্তিতে তিনি লুটেরা গোষ্ঠীকে মেসেজ পৌঁছে দিয়েছিলেন। হুশিয়ার করেছিলেন—সাবধান, আমি সব জানি।

তখনই ইয়াজুজ-মাজুজ গোষ্ঠীর রক্তপিপাসু জিহবার শিকারে পরিণত হন তিনি ও তার পরিবার। ঘরের বিভীষণরাই ফারুক-রশীদকে মাঠে নামিয়ে শেষ করে দেয় আত্মোপলব্ধির মহত্ মানুষটিকে।
শেখ হাসিনাও কি উপলব্ধি করতে পারছেন সব কিছু! না বোঝার তো তিনি মানুষ নন। তিনি কি ভয় পাচ্ছেন ঘরের ইয়াজুজ-মাজুজদের। তারা সবকিছু চেটেপুটে খেয়ে ফোকলা করেছে তার দীর্ঘ ৩০ বছর সাধনায় গড়া ইমেজকে। এই বিভীষণরা কত ভয়ঙ্কর—’৭৫-এর ট্র্যাজেডি তার প্রমাণ। এই বিভীষণদের ভয়েই কি তিনি প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাপূর্ণ চেয়ারে বসে হিতাহিত জ্ঞানকে পাত্তা না দিয়ে অবিরাম আক্রমণ করে চলেছেন আরেক মহান নারী শক্তিকে?