ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

১৮ মার্চ। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অদ্ভূত নিষ্ঠা ও মনোনিবেশসহকারে জিয়া ও খালেদা জিয়ার জন্মতিথি-কুলঠিকুজি নিয়ে পড়েছিলেন। তিনি কি সম্বিত্ হারিয়েছিলেন! নইলে তিনি কেমন করে বিস্মৃত হন ১৭ মার্চ জাতীয় শিশুদিবস জিয়া-খালেদার জন্মদিন নয়; তার পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন।

শেখ হাসিনা এদিন জানালেন, জিয়াউর রহমানের জন্ম ভারতে। পড়াশোনা ভারতে ও পাকিস্তানে। খালেদা জিয়ার জন্মও ভারতের শিলিগুড়িতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে ইচ্ছা হয়, তার জন্ম কোথায় হয়েছিল? তার পিতা-মাতা কোথায় জন্মেছিলেন? তারাও জন্মেছিলেন অবিভক্ত ভারতে। হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্ম নেন সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে। শেখ মুজিব পড়াশোনা করেছেন কলকাতায়। এ নিয়ে এত হই-হট্টগোলের কী আছে! প্রায়ই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করছেন শেখ হাসিনা। তিনি কি এমন কোনো অবিকৃত ইতিহাস হাজির করতে পারবেন—যেখানে বঙ্গবন্ধু, ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, জামাল, রেহেনা—সবাই জন্মেছেন ভারতে কিংবা পাকিস্তানে নয়, তারা জন্মেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে? তিনি এবং তার পূর্বপুরুষ-উত্তরপুরুষ কেউ ভারতে বা পাকিস্তানে লেখাপড়া করেননি?
প্রশ্ন হলো প্রধানমন্ত্রীর এই দৃশ্যত অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক কথার নেপথ্য রহস্য কী! কেন তাকে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও জিয়া-খালেদার জন্ম নিয়ে দীর্ঘ বয়ান করতে হয়।

শিশু দিবসের ওই অনুষ্ঠানে শিশুরাও ছিল। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তারা জানতে এসে আমাদের ইতিহাসবিদ প্রধানমন্ত্রীর মুখে জিয়া-খালেদার জন্মবৃত্তান্ত শুনে ঘরে ফিরল। শিশুদের মাঝে জিয়া ও খালেদাকে পরিচিতকরণের কাজ প্রধানমন্ত্রী ভালোই করে যাচ্ছেন দেখা যাচ্ছে। হাসিও পাচ্ছে। আবার একজন প্রধানমন্ত্রীর দুর্দশা দেখে সহানুভূতিও জাগছে।

এদিন তিনি বললেন, জিয়া ঘটনাচক্রে মুক্তিযোদ্ধা। দেশের প্রতি তার দরদ ছিল না। একথা হরহামেশাই শেখ হাসিনা বলে থাকেন। অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে তিনি আরও যে কথা বলে চলছেন তা হলো—তারেক রহমান ও তার বন্ধু গং হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। জিয়াউর রহমানের লাশ খালেদা ও তারেক-আরাফাত দেখতে পাননি। সংশয় প্রকাশ করেন ওখানে লাশ আছে কি-না! মানুষের মৃত্যু, দাফন ও লাশ নিয়ে কী অশালীন টিটকারি ও ভর্ত্সনা!

কোকো-কে মাদকাসক্ত আখ্যা দিয়ে তিনি আনন্দ পান। এখন আবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার নতুন ব্যঙ্গোক্তি—খালেদার দাদা-দাদি ও নানা-নানির নাম কী!
কেন এসব বাতচিত হাসিনা যত্রতত্র বলে ফিরছেন। এর নেপথ্য কারণ হলো—কিছু পুরানা ভূত তাকে অবিরাম তাড়িয়ে ফিরছে।

সত্যাসত্য যাই হোক—জাতির ষাট-সত্তুর শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে এমন কিছু তথ্যের বিরুদ্ধে তিনি ছায়াবাজির যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। যেসব কথা তিনি বলে নতুন ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করতে চলেছেন, সে সব তারই চারপাশের নানা ঘটনার ভূত ছায়া।

অনেক সহ্য করেছেন তিনি। অনেক শুনেছেন। তার প্রতিপক্ষ সেই ’৭৫ সাল থেকে বলে বেড়াচ্ছে— শেখ কামাল ব্যাংক লুট করেছিলেন। ’৯১-এর পর দু-দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি অসংখ্য অনুষ্ঠানে প্রতিবাদ করেছেন সেই পুরনো তথ্যের। জবাব দিয়েছেন স্বকীয় ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীর ছেলের টাকা দরকার হলে ব্যাংক ডাকাতি করতে যাবে কেন! ঘরে বসে টাকা চাইলেই সে পেত।

আমি প্রধানমন্ত্রীর যুক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে যদি উদভ্রান্ত ও স্পর্ধায় পাগলপারা না হয়, তবে তার ব্যাংক লুটের কথাই আসে না। সে ড্রইংরুমে বসে টাকা চাইলেই পেতে পারে।
কিন্তু সম্মানিত নেত্রী আমাকে কনভিন্স করতে পারলেও নিশ্চয়ই তার সংশয়—বাঙালি জাতির একটি বৃহত্তর অংশ প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে যেতে রাজি নয়। বহুল উচ্চারিত কিংবদন্তিতেই তাদের বিশ্বাস ও আস্থা।
এমন অবস্থায় কী করা উচিত! একটি প্রচলিত অন্ধ বিশ্বাসকে কবর চাপা দিতে হলে চাই প্যারালাল আরেকটি গল্প। নতুন গল্পটি নিয়ে ডামাডোল-শোরগোল-কথার বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে তুলতে পারলে পুরনোটি ধামাচাপা পড়তে পারে। আজ যদি তারেক রহমানকে লুটেরা বলে নিন্দা-গালমন্দের অনিঃশেষ প্রবাহ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে মানুষ নিশ্চয়ই ভুলে যাবে পুরনো ইতিহাস! শেখ হাসিনা কি এই গোয়েবলসীয় পলিসিই বেছে নিয়েছেন? কিন্তু এতে উল্টো ফলও হতে পারে। এমনিতেই প্রো-বিএনপি প্রিন্ট মিডিয়া হাতেগোনা। যে কারণে আপাত সুবিধা তিনি পাচ্ছেন। কেননা প্রো-আওয়ামী লীগ মিডিয়া খুঁচিয়ে পুরনো ইতিহাসকে সামনে আনছে না। প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরছে না আয়না। তিনি স্বচ্ছ আরশিতে নিজেদের দেখতে পেলে কবর খুঁড়ে খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালো বাসতেন না।

উল্টো ফলাফলের কথা যা বলছিলাম। সেই ঢিল-পাটকেলের কথা। প্রধানমন্ত্রী হাটে-মাঠে-ঘাটে আত্মমর্যাদা-উচ্চ অবস্থানকে ভুলে তারেক-আরাফাতকে নিয়ে পড়েছেন। পাল্টাপাল্টিতে সংসদে তাই লিপিবদ্ধ হচ্ছে তরতাজা নানা তথ্য। হাসিনাপুত্র জয়ের ব্যাপারে এক নারী এমপি বলেছেন, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দেশে ও আমেরিকায় বেশ ক’বার পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। আমেরিকায় বিপুল অর্থসম্পদ করেছেন দেশের টাকা লুটে নিয়ে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

কথাগুলো সত্য না মিথ্যা তার যাচাইয়ে না গিয়ে বলা যায়, সংসদ টিভি ও মিডিয়ার কল্যাণে কোটি কোটি মানুষের কাছে খুব সহজে পৌঁছে গেছে এসব তথ্যও। জনগণ তা বিশ্বাস করবে কিনা, তা তাদের ব্যাপার। কিন্তু আদালতের ফরমান জারি করে মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

আফ্রো-মার্কিন অমর কথাশিল্পী আলেক্স হালীর ‘রুটস’ উপন্যাসের মত আমাদের ইতিহাস গবেষক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী নিজের এবং অন্যের বংশ লতিকার শিকড় সন্ধানে নেমেছেন। তার এই আত্মানুসন্ধান খুবই তাত্পর্যবহ ও কৌতুহল উদ্দীপক। শঙ্কর বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর কুনতা কিনতে’র সন্ধানে তিনি গভীরভাবে সক্রিয়। কুনতা কিনতে হল-রুটস-এর মূল চরিত্র। যে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পায় আফ্রিকা থেকে আসা মার্কিন নিগ্রো দাসদের মাঝে।

’৯৬ সালে ক্ষমতায় আসবার পর শেখ হাসিনা হঠাত্ প্রবল উদ্দীপনায় তার নিজের কুলঠিকুজি দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন। দৈনিক ইনকিলাবে এ নিয়ে বিশাল বর্ণাঢ্য ক্রোড়পত্র প্রকাশ হয়েছিল। নিজেও সভা সমাবেশে কিঞ্চিত্ মুখ খুলেছিলেন। তখন ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি প্রমাণের হিড়িক ও হুজুগ। ক্রোড়পত্রে আমরা জেনেছিলাম- হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’র বংশলতিকা হল- মাত্র সাড়ে তিনশ’ বছর আগে নাকি বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষ ইরাক থেকে এ দেশে ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। ‘শেখ’ উপাধিটি সেই আরব দেশ থেকেই সঙ্গে করে নিয়ে আসা।

কী অদ্ভূত, কী বিচিত্র আত্মপ্রবঞ্চনা ও আত্মপ্রতারণা। যে জনপ্রিয় মানুষটিকে আমরা জরিপ-ভোট প্রচারণা চালিয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বানালুম- রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের ওপর স্থান দিলুম- তিনি কিনা আদতে বাঙালিই নন। মাত্র সাড়ে তিনশ’ বছর আগে আরব মুলুক থেকে এসেছেন! বাঙালি হিসেবে তার কোন জবরদস্ত পূর্ব ইতিহাসই নেই।

বাঙালি মুসলমানের একটি ক্ষুদ্র অংশের এক বিচিত্র মন জ্বালা হল- ঠুনকো আভিজাত্য, বংশ গৌরব ইত্যাদি প্রমাণে হাপিত্যেস করে তারা নিজেদের হাস্যকরভাবে অবাঙালি, বহিরাগত দাবি করে চলেছেন। কেউ নিজেদের জুড়ে দিতে চাইছেন- আমাদের এই অঞ্চলের তথা ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক পরমপুরুষ পীর-আউলিয়াদের সঙ্গে। কেউ মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদ কুলি-সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে। কেউ ইশা খানের সঙ্গে। এসব জায়গায় কলেক না পেলে অজ্ঞাত-অখ্যাত আরবদের সঙ্গে বংশ লতিকা জুড়ে সম্ভ্রান্ত হতে চান।

আত্মপরিচয়-আত্মানুসন্ধান নিয়ে মন জ্বালা পোড়ায় অস্থির এই ক্ষুদ্র অংশটি কখনোই নিজেদের এই বাঙলার আদি বাসিন্দা ভূমিপুত্র হিসেবে দেখতে চায় না। আয়নায় নিজের চেহারা, খাপসুরত- চোখ নাক কান দেখলে আতঙ্কিত হয়- হায় হায় একদিন বাঙালি ছিলাম রে। তারপর আরব-মোগল-পাঞ্জাবী হওয়ার শত চেষ্টা। বাঙালি পরিচয়কে তাদের কেন এতো ভয়? আরব কিংবা মোঘলদের বংশধর হিসেবে দাবি করে এমন কী সুখ! এই অধম কলাম লেখক দ্বিধাহীন চিত্তে কবুল করছি আমি একজন আদি অকৃত্রিম উত্কৃষ্ট বাঙালি। কেননা আমার বাবা মা দাদী নানী দাদা নানার পূর্বপুরুষ বরিশাল-ফরিদপুর অঞ্চলের ধর্মান্তরিত মুসলিম। মাত্র ৭/৮ পুরুষ আগে তারা হিন্দু ছিলেন। শ্রুত ও জ্ঞাত গালগল্প জেনেছি পূর্ব পুরুষদের হিন্দু ও ধর্মান্তরিত মুসলিম দুটি ধারার মধ্যে এই কয়েক পুরুষ আগেও সখ্যতা ও রক্তের সহমর্মিতা ছিল। এই যে কুনতা কিনতে’র মতো আত্মইতিহাস সংক্ষেপে বললাম- তাতে আমার কী এমন জাত গেল!

যদি কেউ উত্কৃষ্ট ও অকৃত্রিম বাঙালি হয়ে থাকেন- তবে তার বংশলতিকা আমার মতনই হওয়া উচিত। অন্যথায় তিনি আদি বাঙালিও নন। এই ভূখণ্ডেরই নন।

ভাবতে ভালোই লাগছে- মাননীয় অনুসন্ধিত্সু প্রধানমন্ত্রী এক সময় যেমন তার পূর্ব পুরুষদের ইরাকি বংশোদ্ভূত বলে প্রমাণে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন- এখন পড়েছেন বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের বংশ লতিকা নিয়ে। কিন্তু নিজেকে আরব মুল্লুকের এবং বিরোধী নেতাকে উপমহাদেশের অকৃত্রিম বাঙালি প্রমাণ করে তার কী এমন মন সুখ- কে জানে! তবে কেউ যদি বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন- এটা তার আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের মন জ্বালা’র লক্ষণ- তবে সেই ব্যাখ্যার বিপক্ষে শক্ত কোন যুক্তি তুলে ধরবো- ভেবে পাচ্ছি না। আর একাডেমিক বিবেচনায় বলাই বাহুল্য- আত্মপরিচয়ের মন জ্বালা আত্মপরিচয় সঙ্কটেরই নামান্তর। এই হীনমন্যতা অন্যকে হীন ও হেয়- গায়ে পড়ে অপদস্থ করার প্রবণতার জন্ম দেয়