ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা মর্যাদাপূর্ণ প্রধানমন্ত্রী পদে থেকেও অবিরাম বিষোদগার করে যাচ্ছেন তারই মতো আরেকটি রক্তাক্ত শহীদ পরিবারের বিরুদ্ধে। তিনি ‘জলে স্থলে অন্তরীক্ষে’—গণভবনে-জনসভায়-সংসদে সর্বত্র গালি ও কটূক্তির তুবড়ি ছোটাচ্ছেন তার শহীদ পিতা বঙ্গবন্ধুর ট্র্যাজিক মৃত্যুর মতো শোকাবহ আরেক হত্যাকাণ্ডের শিকার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে। বিষাক্ত কথার সূচাঁলো তীর নিয়ে বিশাল ধনুক হাতে তিনি অহোরাত্র নির্ঘুম আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন—তার এই ছায়াবাজির যুদ্ধের বুঝি শেষ নেই। তিনি যুদ্ধোন্মাদের মতো লড়েই চলেছেন। তিনি এমন এক চক্রব্যূহে ফেঁসে গেছেন—এখন গালির বেসাতির গোয়েবলস না হয়ে তার উপায় নেই। তিনি এমনই নিরুপায়, এমনই অসহায়। লক্ষ্য করুন, তার টার্গেট তারই মতো পিতৃহীন তারেক রহমান। তার টার্গেট খালেদা জিয়া, যিনি একজন মহীয়সী নারী। পিতা ও পরিবারকে হারিয়ে একটা সময় শেখ হাসিনা যেমন সহায়হীন হয়ে পড়েছিলেন, খালেদা জিয়াও এক সময় স্বামীকে হারিয়ে সংসার সমুদ্রে অকূল পাথারে পড়েছিলেন।

তারপর দুজনই অসামান্য দক্ষতায়, অতুলনীয় নেতৃত্বগুণে পাড়ি দিয়েছেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সমুদ্র। জয় করেছেন দুঃসময়কে। পরিণত হয়েছেন সময়ের অসামান্য নায়কে। মহাকালের পাতায় হীরার অক্ষরে লেখা থাকবে তাদের নাম। এ নাম মোছা যাবে না গালি দিয়ে, খিস্তি করে। মোছা যাবে না ফতোয়া দিয়ে। এ নাম অক্ষয়।

একথা আমরা সবাই জানি। এ কথা বলাবাহুল্য—তবুও সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা যদি সেদিন ভারত থেকে এসে আওয়ামী লীগের হাল না ধরতেন, কাণ্ডারি না হতেন—মুসলিম লীগের চেয়েও করুণ অবস্থা হতো এই বৃহত্তম দলটির। ক্ষতবিক্ষত, খণ্ড খণ্ড-টুকরা টুকরা হয়ে যেত। আজকের যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে মহীরুহ হয়ে বিরাজ করছে, দু-দুবার ক্ষমতায় এসেছে, দেশ শাসন করছে—এসবই শেখ হাসিনার একক কীর্তি। হালুয়া-রুটির জন্য যারা ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের লুটেরা হানাদার সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন, ষড়যন্ত্র করেছিলেন মাইনাস হাসিনার—যাদের আজ স্থান হয়েছে উপদেষ্টামণ্ডলীতে। ওই ১০ ভূতের পাল্লায় পড়লে আওয়ামী লীগ আজ হয়ে পড়ত অস্তিত্ব হারা কিংবা ষোলো খণ্ড। তারা হাসিনাকে মাইনাস করার জন্য পরস্পর নষ্ট রাজনীতির ক্যাম্পফায়ারে উত্সবে মেতেছিল ঠিক, কিন্তু হাসিনা সত্যিই মাইনাস হয়ে গেলে আজকের বাম রাজনৈতিক দলগুলোর মতো জন্ম নিত অসংখ্য ব্রাকেটবন্দি আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ (সু-জ), আওয়ামী লীগ (তো-জা), আওয়ামী লীগ (আ-?) ছিল অনিবার্য।

মহীয়সী নেত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন দলকে। তিনি দলটির ঐক্যের প্রতীক ও একমাত্র শক্তি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর মসনদে বসায় আজ শেখ পরিবারের গর্বিত সদস্যরা গ্যারান্টি কার্ড ব্যবহার করে দেশে-বিদেশে সুখের সাগরে রাজহংসের মতো নিশ্চিন্ত জীবনযাপন করছেন, তারাও নিখিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পুত্রকন্যা-নাতিপুতির মতো এসব ব্রাকেট আওয়ামী লীগের অলঙ্কার হতেন। এর বেশি কিছু নয়। বিদেশের সুখস্বর্গ থেকে মাঝেমধ্যে দেশে এসে ‘গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ ও আওয়ামী লীগের ঐক্যের সম্ভাবনা’র ওপর সেমিনারে বক্তব্য রেখে আবার লন্ডন, আমেরিকা ফিরে যেতেন।
আজ ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগকে সুদৃঢ় ঐক্যের ইস্পাত বন্ধনে যিনি অটুট রেখেছেন, তিনি শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের রেওয়াজি কেতা মেনে রাজনৈতিক দল চালাতে গেলে, সরকার চালাতে গেলে দলীয় লোকজন ও স্বজনদের নানা দীঘি-ডাকাতি টাইপ দুর্নীতি, অনিয়ম-অনাচারকে প্রশ্রয় দিতে হয়, নানা দুর্নাম মাথায় পেতে নিতে হয়। সেটা করে দুর্নীতি-দুর্নামের বিষসাগর গিলে ফেলে আজ শেখ হাসিনা হয়ে উঠেছেন নীলকণ্ঠ; আর আত্মীয়-মন্ত্রী-উপদেষ্টাকুল রাজহংস—সব দায় তার ঘাড়ে চাপিয়ে তারা ‘আমরা রাজনীতি করি না, আমরা রাজনীতিতে নেই’ বলে সাধু সেজে হাঁসের মতো গা-ঝাড়া দিয়ে ধবল নিষ্কলুষ শরীরে লন্ডন-আমেরিকায় নিরাপদে যাওয়ার অপেক্ষায়। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব রক্ষা; দু-দুবার সরকার পরিচালনার কৃতিত্ব— একই সঙ্গে স্বজন-সাঙ্গ-পাঙ্গদের সব বিষ শুষে নিয়েও তিনি মহীয়ান।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই নারী-নক্ষত্র এখন সব সময় ব্যস্ত জিয়া-খালেদার পরিবারকে হেয় করতে। তিনি গালি দিচ্ছেন তারই সমসাময়িক আরেক মহান নারী নেত্রীকে। হাসিনা যেমন দু’বার প্রধানমন্ত্রী, তিনিও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। হাসিনা যেমন জননেত্রী অভিধায় কর্মী ও জনতার মাঝে প্রিয় মুখ, খালেদাও তেমন দেশনেত্রী অভিধায় কর্মী ও জনগণের মাঝে অনিঃশেষ ভালোবাসায় অভিষিক্ত। শেখ হাসিনা যেমন আওয়ামী ঐক্যের কাণ্ডারি। খালেদা জিয়াও তেমনি দেশের বৃহত্তম দল বিএনপির এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের ভিত্তিমূল এবং অবিসংবাদিত চালিকাশক্তি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি বিএনপির কাণ্ডারি হিসেবে হাল না ধরলে আজ এই দলটিও অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ত। ক্ষতবিক্ষত, খণ্ড-বিখণ্ড হতো। বিএনপি যে আজ তিনবার সরকার গঠন করেছে, দেশ পরিচালনা করেছে, তা খালেদা জিয়ার কলঙ্কহীন ইমেজ, নেতৃত্ব গুণ, অনাপস ইস্পাত দৃঢ় সিদ্ধান্ত এবং এসবের যোগফলে জনগণের অঢেল ভালোবাসায়। মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের নাজায়েজ-হারাম সরকারের আমলে খালেদা মাইনাসের ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তারেক রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। খুন তো একরকম করেই ফেলেছিল প্রায়। এই মাইনাস চক্রান্ত সফল হলে বিএনপিও পরিণত হতো একাধিক ব্রাকেটবন্দি দলে। জিয়ার মৃত্যুর পর তিনদশক ধরে বিএনপি আজ জাতীয়তাবাদী শক্তির একচ্ছত্র মুকুট—সেই স্বর্ণতাজের শক্তি কেন্দ্র, ঐক্য কেন্দ্র কোহিনুর হলেন খালেদা।

আজ হারাম-অপশক্তি মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন বিদেশের মাটিতে রাজহংস জীবনযাপন করছে—একদল অকর্মণ্য-অদক্ষ-অপরিপকস্ফ-অল্পশিক্ষিত মন্ত্রী এবং দলবাজ আমলা শেখ হাসিনার ঘাড়ে চড়ে তাকে ভুল বুঝিয়ে দেশকে নিয়ে যাচ্ছে রসাতলে—দিল্লির লাড্ডু-রসগোল্লাজীবী কতিপয় উপদেষ্টা বাংলাদেশকে করে তুলছে পরাধীন করদ রাজ্য, যাদের জন্য শেখ হাসিনা আজ নীলকণ্ঠ, সেই দুর্নীতিবাজ চক্রও এখন দায়মুক্তি সনদ নিয়ে পলায়নের অপেক্ষায়, বঙ্গবন্ধু কন্যা হয়েও তাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা টুঁশব্দটি করছেন না। হাসিনার এতটুকু উপলব্ধি হচ্ছে না। তিনি জেগেও ঘুমাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু কিন্তু তার শাসন জমানায় আত্মোপলব্ধি করতে ভুল করেননি। মাত্র ২/৩ বছরে লুট-দুর্নীতির অবিরাম গ্রাসে তার দল-স্বজনগোষ্ঠী যখন বাংলাদেশকে বানিয়েছিল তলাবিহীন ঝুড়ি, তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সত্সাহস দেখিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, অমর উক্তি—চাটার দল সব চেটে চেটে খায়। বলেছিলেন, আমার ভাগের কম্বলটা গেল কোথায়।

এসব ক্ষোভ তাতানো ও সরস উক্তিতে তিনি লুটেরা গোষ্ঠীকে মেসেজ পৌঁছে দিয়েছিলেন। হুশিয়ার করেছিলেন—সাবধান, আমি সব জানি। তখনই ইয়াজুজ-মাজুজ গোষ্ঠীর রক্তপিপাসু জিহবার শিকারে পরিণত হন তিনি ও তার পরিবার। ঘরের বিভীষণরাই ফারুক-রশীদকে মাঠে নামিয়ে শেষ করে দেয় আত্মোপলব্ধির মহত্ মানুষটিকে।

শেখ হাসিনাও কি উপলব্ধি করতে পারছেন সব কিছু! না বোঝার তো তিনি মানুষ নন। তিনি কি ভয় পাচ্ছেন ঘরের ইয়াজুজ-মাজুজদের। তারা সবকিছু চেটেপুটে খেয়ে ফোকলা করেছে তার দীর্ঘ ৩০ বছর সাধনায় গড়া ইমেজকে। এই বিভীষণরা কত ভয়ঙ্কর—’৭৫-এর ট্র্যাজেডি তার প্রমাণ। এই বিভীষণদের ভয়েই কি তিনি প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদাপূর্ণ চেয়ারে বসে হিতাহিত জ্ঞানকে পাত্তা না দিয়ে অবিরাম আক্রমণ করে চলেছেন আরেক মহান নারী শক্তিকে?

২.
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে জিয়া পরিবারকে ঘিরে যে পরিমাণ গালি, কুত্সা, ভর্ত্সনা ও কটূক্তি করেছেন তা সংগ্রহ করে দিব্যি একটি রাজনৈতিক গালি কোষ প্রকাশ করা সম্ভব। দুর্ভাগ্যজনক বিষয় এই যে, তার কথামালা জাতীয় সংসদেই পাল্টা জবাবের শিকার হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কিছু কথা যেমন প্রকাশযোগ্য নয়—সংসদে বিরোধীদলীয় ২/১ মহিলা এমপির পাল্টা জবাবও তেমনি অশোভন ও অপ্রকাশযোগ্য। বাংলাদেশ এখন মুক্ত তথ্যপ্রবাহের দেশ। মুক্তমত এখানে বাধাগ্রস্ত নয়। আমাদের জন্য পরিতাপের ও দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আপত্তিকর এই মন্তব্য করাটা শুরু করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী।
এখানে ২/১টি দৃষ্টান্ত হাজির করা দরকার। বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবিকে ভণ্ডুল করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বারবারই বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে বেগম জিয়াকে কোলে করে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে না।

আমরা নগণ্য কলামিস্টরা শুরু থেকেই এ ধরনের অশালীন মন্তব্য থেকে বিরত থাকার সবিনয় অনুরোধ করেছিলাম প্রধানমন্ত্রীকে। বলেছিলাম, ঢিল ছুঁড়লে পাটকেলটি খেতে হতে পারে। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ চেয়ার থেকে এমন ‘কুিসত’ মন্তব্য কোনোক্রমেই মানানসই নয়।

প্রধানমন্ত্রী গরিবের কথা শোনেননি বরং তাকে গালির পরমানন্দে পেয়ে বসে। ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠন এবং জেলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করেছেন তিনি। প্রতিটি বৈঠকেই তীব্র ব্যঙ্গের সঙ্গে তিনি একই কথা পুনরাবৃত্তি করেছেন। জনসভা ও মহাসমাবেশ করেছেন ঢাকা ও ঢাকার বাইরে। সব জায়গাতেই ওই ‘কোলে করে’ কিংবা ‘কোলে বসিয়ে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া’র ব্যাপারটি মন্ত্রজপের মতো বলেছেন। ওটি না বললে যেন হাসিনা ব্রান্ড বক্তৃতা সম্পূর্ণ হওয়ারই নয়। এখন সেই ‘কুিসত’ বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়াটা দেখুন। বিএনপির এমপিরা যোগ দিয়েছেন সংসদে। বিরোধী দলের দুজন নারী এমপি খোদ সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সমান তালে বলেছেন—‘মইন-ফখরুদ্দীনের কোলে বসে তিনি নাকি ক্ষমতায় এসেছেন।’ ১৮ ও ১৯ মার্চ দুদিনই কোলে বসা প্রসঙ্গটি গরম করে রেখেছে সংসদ। একপর্যায়ে ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছেন স্পিকার আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট। অবশেষে তিনি বলেছেন, কোলে বসা কথাটি ‘কুিসত’। সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে তিনি এক্সপাঞ্জ করে দেন শব্দটি।

স্পিকার মহোদয় আওয়ামী লীগেরই প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ নেতা। দেরিতে হলেও তিনি সাহসী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বহুল উচ্চারিত উক্তিকে ‘কুিসত’ বলার স্পর্ধা দেখিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী যখন হাটে-মাঠে-গণভবনে কথাটা বলছিলেন, তখন তিনি যদি সাহস দেখাতেন তাহলে সংসদে এই বিব্রতকর অবস্থাটা হতো না। প্রধানমন্ত্রী কথাটা বলেছিলেন রাষ্ট্রের উচ্চতম অবস্থানে বসে। বিরোধী নারী এমপিরা বললেন গণতন্ত্রের মিলনগৃহে বসে। আমাদের নারী নেত্রীরা এভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষায় ঝাঁপিয়ে পড়বেন তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আর প্রধানমন্ত্রী হলেন দেশ, সরকার ও রাজনীতির অভিভাবক। তার কাছ থেকে দায়িত্বপূর্ণ, দূরদর্শী আচরণ প্রত্যাশা করলেও তিনি বারবার হতাশ করছেন। আর তার কটূক্তির জেরে সৃষ্টি হচ্ছে নানা কদর্য দৃশ্যপটের।

৩.
১৮ মার্চ। বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রে বঙ্গবন্ধু জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অদ্ভূত নিষ্ঠা ও মনোনিবেশসহকারে জিয়া ও খালেদা জিয়ার জন্মতিথি-কুলঠিকুজি নিয়ে পড়েছিলেন। তিনি কি সম্বিত্ হারিয়েছিলেন! নইলে তিনি কেমন করে বিস্মৃত হন ১৭ মার্চ জাতীয় শিশুদিবস জিয়া-খালেদার জন্মদিন নয়; তার পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন।

শেখ হাসিনা এদিন জানালেন, জিয়াউর রহমানের জন্ম ভারতে। পড়াশোনা ভারতে ও পাকিস্তানে। খালেদা জিয়ার জন্মও ভারতের শিলিগুড়িতে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে ইচ্ছা হয়, তার জন্ম কোথায় হয়েছিল? তার পিতা-মাতা কোথায় জন্মেছিলেন? তারাও জন্মেছিলেন অবিভক্ত ভারতে। হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জন্ম নেন সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে। শেখ মুজিব পড়াশোনা করেছেন কলকাতায়। এ নিয়ে এত হই-হট্টগোলের কী আছে! প্রায়ই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ করছেন শেখ হাসিনা। তিনি কি এমন কোনো অবিকৃত ইতিহাস হাজির করতে পারবেন—যেখানে বঙ্গবন্ধু, ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, জামাল, রেহেনা—সবাই জন্মেছেন ভারতে কিংবা পাকিস্তানে নয়, তারা জন্মেছেন স্বাধীন বাংলাদেশে? তিনি এবং তার পূর্বপুরুষ-উত্তরপুরুষ কেউ ভারতে বা পাকিস্তানে লেখাপড়া করেননি?
প্রশ্ন হলো প্রধানমন্ত্রীর এই দৃশ্যত অবান্তর, অপ্রাসঙ্গিক কথার নেপথ্য রহস্য কী! কেন তাকে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানেও জিয়া-খালেদার জন্ম নিয়ে দীর্ঘ বয়ান করতে হয়।

শিশু দিবসের ওই অনুষ্ঠানে শিশুরাও ছিল। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তারা জানতে এসে আমাদের ইতিহাসবিদ প্রধানমন্ত্রীর মুখে জিয়া-খালেদার জন্মবৃত্তান্ত শুনে ঘরে ফিরল। শিশুদের মাঝে জিয়া ও খালেদাকে পরিচিতকরণের কাজ প্রধানমন্ত্রী ভালোই করে যাচ্ছেন দেখা যাচ্ছে। হাসিও পাচ্ছে। আবার একজন প্রধানমন্ত্রীর দুর্দশা দেখে সহানুভূতিও জাগছে।

এদিন তিনি বললেন, জিয়া ঘটনাচক্রে মুক্তিযোদ্ধা। দেশের প্রতি তার দরদ ছিল না। একথা হরহামেশাই শেখ হাসিনা বলে থাকেন। অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিকভাবে তিনি আরও যে কথা বলে চলছেন তা হলো—তারেক রহমান ও তার বন্ধু গং হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে। জিয়াউর রহমানের লাশ খালেদা ও তারেক-আরাফাত দেখতে পাননি। সংশয় প্রকাশ করেন ওখানে লাশ আছে কি-না! মানুষের মৃত্যু, দাফন ও লাশ নিয়ে কী অশালীন টিটকারি ও ভর্ত্সনা!

কোকো-কে মাদকাসক্ত আখ্যা দিয়ে তিনি আনন্দ পান। এখন আবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার নতুন ব্যঙ্গোক্তি—খালেদার দাদা-দাদি ও নানা-নানির নাম কী! কেন এসব বাতচিত হাসিনা যত্রতত্র বলে ফিরছেন। এর নেপথ্য কারণ হলো—কিছু পুরানা ভূত তাকে অবিরাম তাড়িয়ে ফিরছে।

সত্যাসত্য যাই হোক—জাতির ষাট-সত্তুর শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে এমন কিছু তথ্যের বিরুদ্ধে তিনি ছায়াবাজির যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। যেসব কথা তিনি বলে নতুন ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করতে চলেছেন, সে সব তারই চারপাশের নানা ঘটনার ভূত ছায়া।

অনেক সহ্য করেছেন তিনি। অনেক শুনেছেন। তার প্রতিপক্ষ সেই ’৭৫ সাল থেকে বলে বেড়াচ্ছে— শেখ কামাল ব্যাংক লুট করেছিলেন। ’৯১-এর পর দু-দুবার প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি অসংখ্য অনুষ্ঠানে প্রতিবাদ করেছেন সেই পুরনো তথ্যের। জবাব দিয়েছেন স্বকীয় ভাষায়, প্রধানমন্ত্রীর ছেলের টাকা দরকার হলে ব্যাংক ডাকাতি করতে যাবে কেন! ঘরে বসে টাকা চাইলেই সে পেত।

আমি প্রধানমন্ত্রীর যুক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণ সহমত। একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর ছেলে যদি উদভ্রান্ত ও স্পর্ধায় পাগলপারা না হয়, তবে তার ব্যাংক লুটের কথাই আসে না। সে ড্রইংরুমে বসে টাকা চাইলেই পেতে পারে।
কিন্তু সম্মানিত নেত্রী আমাকে কনভিন্স করতে পারলেও নিশ্চয়ই তার সংশয়—বাঙালি জাতির একটি বৃহত্তর অংশ প্রচলিত বিশ্বাসের বাইরে যেতে রাজি নয়। বহুল উচ্চারিত কিংবদন্তিতেই তাদের বিশ্বাস ও আস্থা।
এমন অবস্থায় কী করা উচিত! একটি প্রচলিত অন্ধ বিশ্বাসকে কবর চাপা দিতে হলে চাই প্যারালাল আরেকটি গল্প। নতুন গল্পটি নিয়ে ডামাডোল-শোরগোল-কথার বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে তুলতে পারলে পুরনোটি ধামাচাপা পড়তে পারে। আজ যদি তারেক রহমানকে লুটেরা বলে নিন্দা-গালমন্দের অনিঃশেষ প্রবাহ সৃষ্টি করা যায়, তাহলে মানুষ নিশ্চয়ই ভুলে যাবে পুরনো ইতিহাস! শেখ হাসিনা কি এই গোয়েবলসীয় পলিসিই বেছে নিয়েছেন? কিন্তু এতে উল্টো ফলও হতে পারে। এমনিতেই প্রো-বিএনপি প্রিন্ট মিডিয়া হাতেগোনা। যে কারণে আপাত সুবিধা তিনি পাচ্ছেন। কেননা প্রো-আওয়ামী লীগ মিডিয়া খুঁচিয়ে পুরনো ইতিহাসকে সামনে আনছে না। প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরছে না আয়না। তিনি স্বচ্ছ আরশিতে নিজেদের দেখতে পেলে কবর খুঁড়ে খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালো বাসতেন না।

উল্টো ফলাফলের কথা যা বলছিলাম। সেই ঢিল-পাটকেলের কথা। প্রধানমন্ত্রী হাটে-মাঠে-ঘাটে আত্মমর্যাদা-উচ্চ অবস্থানকে ভুলে তারেক-আরাফাতকে নিয়ে পড়েছেন। পাল্টাপাল্টিতে সংসদে তাই লিপিবদ্ধ হচ্ছে তরতাজা নানা তথ্য। হাসিনাপুত্র জয়ের ব্যাপারে এক নারী এমপি বলেছেন, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে দেশে ও আমেরিকায় বেশ ক’বার পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন তিনি। আমেরিকায় বিপুল অর্থসম্পদ করেছেন দেশের টাকা লুটে নিয়ে। ইত্যাদি ইত্যাদি।

কথাগুলো সত্য না মিথ্যা তার যাচাইয়ে না গিয়ে বলা যায়, সংসদ টিভি ও মিডিয়ার কল্যাণে কোটি কোটি মানুষের কাছে খুব সহজে পৌঁছে গেছে এসব তথ্যও। জনগণ তা বিশ্বাস করবে কিনা, তা তাদের ব্যাপার। কিন্তু আদালতের ফরমান জারি করে মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

আফ্রো-মার্কিন অমর কথাশিল্পী আলেক্স হালীর ‘রুটস’ উপন্যাসের মত আমাদের ইতিহাস গবেষক জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী নিজের এবং অন্যের বংশ লতিকার শিকড় সন্ধানে নেমেছেন। তার এই আত্মানুসন্ধান খুবই তাত্পর্যবহ ও কৌতুহল উদ্দীপক। শঙ্কর বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর কুনতা কিনতে’র সন্ধানে তিনি গভীরভাবে সক্রিয়। কুনতা কিনতে হল-রুটস-এর মূল চরিত্র। যে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পায় আফ্রিকা থেকে আসা মার্কিন নিগ্রো দাসদের মাঝে।

’৯৬ সালে ক্ষমতায় আসবার পর শেখ হাসিনা হঠাত্ প্রবল উদ্দীপনায় তার নিজের কুলঠিকুজি দেশবাসীকে জানিয়েছিলেন। দৈনিক ইনকিলাবে এ নিয়ে বিশাল বর্ণাঢ্য ক্রোড়পত্র প্রকাশ হয়েছিল। নিজেও সভা সমাবেশে কিঞ্চিত্ মুখ খুলেছিলেন। তখন ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি প্রমাণের হিড়িক ও হুজুগ। ক্রোড়পত্রে আমরা জেনেছিলাম- হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি’র বংশলতিকা হল- মাত্র সাড়ে তিনশ’ বছর আগে নাকি বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষ ইরাক থেকে এ দেশে ধর্ম প্রচারের জন্য এসেছিলেন। ‘শেখ’ উপাধিটি সেই আরব দেশ থেকেই সঙ্গে করে নিয়ে আসা।

কী অদ্ভূত, কী বিচিত্র আত্মপ্রবঞ্চনা ও আত্মপ্রতারণা। যে জনপ্রিয় মানুষটিকে আমরা জরিপ-ভোট প্রচারণা চালিয়ে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বানালুম- রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের ওপর স্থান দিলুম- তিনি কিনা আদতে বাঙালিই নন। মাত্র সাড়ে তিনশ’ বছর আগে আরব মুলুক থেকে এসেছেন! বাঙালি হিসেবে তার কোন জবরদস্ত পূর্ব ইতিহাসই নেই।

বাঙালি মুসলমানের একটি ক্ষুদ্র অংশের এক বিচিত্র মন জ্বালা হল- ঠুনকো আভিজাত্য, বংশ গৌরব ইত্যাদি প্রমাণে হাপিত্যেস করে তারা নিজেদের হাস্যকরভাবে অবাঙালি, বহিরাগত দাবি করে চলেছেন। কেউ নিজেদের জুড়ে দিতে চাইছেন- আমাদের এই অঞ্চলের তথা ভারতবর্ষের আধ্যাত্মিক পরমপুরুষ পীর-আউলিয়াদের সঙ্গে। কেউ মুর্শিদাবাদের নবাব মুর্শিদ কুলি-সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে। কেউ ইশা খানের সঙ্গে।
এসব জায়গায় কলেক না পেলে অজ্ঞাত-অখ্যাত আরবদের সঙ্গে বংশ লতিকা জুড়ে সম্ভ্রান্ত হতে চান।

আত্মপরিচয়-আত্মানুসন্ধান নিয়ে মন জ্বালা পোড়ায় অস্থির এই ক্ষুদ্র অংশটি কখনোই নিজেদের এই বাঙলার আদি বাসিন্দা ভূমিপুত্র হিসেবে দেখতে চায় না। আয়নায় নিজের চেহারা, খাপসুরত- চোখ নাক কান দেখলে আতঙ্কিত হয়- হায় হায় একদিন বাঙালি ছিলাম রে। তারপর আরব-মোগল-পাঞ্জাবী হওয়ার শত চেষ্টা। বাঙালি পরিচয়কে তাদের কেন এতো ভয়? আরব কিংবা মোঘলদের বংশধর হিসেবে দাবি করে এমন কী সুখ! এই অধম কলাম লেখক দ্বিধাহীন চিত্তে কবুল করছি আমি একজন আদি অকৃত্রিম উত্কৃষ্ট বাঙালি। কেননা আমার বাবা মা দাদী নানী দাদা নানার পূর্বপুরুষ বরিশাল-ফরিদপুর অঞ্চলের ধর্মান্তরিত মুসলিম। মাত্র ৭/৮ পুরুষ আগে তারা হিন্দু ছিলেন। শ্রুত ও জ্ঞাত গালগল্প জেনেছি পূর্ব পুরুষদের হিন্দু ও ধর্মান্তরিত মুসলিম দুটি ধারার মধ্যে এই কয়েক পুরুষ আগেও সখ্যতা ও রক্তের সহমর্মিতা ছিল। এই যে কুনতা কিনতে’র মতো আত্মইতিহাস সংক্ষেপে বললাম- তাতে আমার কী এমন জাত গেল!

যদি কেউ উত্কৃষ্ট ও অকৃত্রিম বাঙালি হয়ে থাকেন- তবে তার বংশলতিকা আমার মতনই হওয়া উচিত। অন্যথায় তিনি আদি বাঙালিও নন। এই ভূখণ্ডেরই নন। ভাবতে ভালোই লাগছে- মাননীয় অনুসন্ধিত্সু প্রধানমন্ত্রী এক সময় যেমন তার পূর্ব পুরুষদের ইরাকি বংশোদ্ভূত বলে প্রমাণে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন- এখন পড়েছেন বিরোধী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের বংশ লতিকা নিয়ে। কিন্তু নিজেকে আরব মুল্লুকের এবং বিরোধী নেতাকে উপমহাদেশের অকৃত্রিম বাঙালি প্রমাণ করে তার কী এমন মন সুখ- কে জানে! তবে কেউ যদি বিষয়টি এভাবে ব্যাখ্যা করেন- এটা তার আত্মপরিচয় অনুসন্ধানের মন জ্বালা’র লক্ষণ- তবে সেই ব্যাখ্যার বিপক্ষে শক্ত কোন যুক্তি তুলে ধরবো- ভেবে পাচ্ছি না। আর একাডেমিক বিবেচনায় বলাই বাহুল্য- আত্মপরিচয়ের মন জ্বালা আত্মপরিচয় সঙ্কটেরই নামান্তর। এই হীনমন্যতা অন্যকে হীন ও হেয়- গায়ে পড়ে অপদস্থ করার প্রবণতার জন্ম দেয়।

৪.
জিয়াউর রহমান প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। ঘটনাচক্রে মুক্তিযোদ্ধা। তিনি পাকিস্তানের লোক। প্রধানমন্ত্রীর এইসব বক্তব্যও কি তার আত্মানুসন্ধানের মন জ্বালাপোড়ারই অংশ? জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি- এটা প্রমাণের জন্য আদালতের ফরমান পর্যন্ত হয়ে গেল। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস যে অন্তরের অন্তস্থলে প্রোথিত। আর দেশবাসীর- ৯৫ শতাংশের বেশি লোক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের মতো উচ্চশিক্ষিত- ইতিহাসসন্ধিত্সু নয়। এই খাটি হৃদয়ে একবার যে বিশ্বাস ঠাই নেয়- তা উপড়ানো সত্যিই কঠিন। প্রধানমন্ত্রী যাই বলুন, ফরমান যাই বলুক- মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আসা বাঙালিরা বিশ্বাস করে- জিয়া অমর মুক্তিযোদ্ধা- তার স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ জাতির মন ও মননে ৪২ বছর ধরে মুক্তি আকাঙ্ক্ষার অনুরণন তুলে চলছে অমর রণসংগীতের মতো। সেই সুর সঙ্গীতকে কেমন করে হত্যা করা সম্ভব!
জিয়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন- বলে কেন পুরানা ইতিহাসের প্রেতাত্মার সঙ্গে অবিরাম লড়াই। জিয়ার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে কালিমা লেপন করতে গিয়ে নিশ্চয়ই তার বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়- বঙ্গবন্ধুর ইমেজেও এমন কালির ছিটা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ তো বিশ্বাসই করেন- বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধরা দিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য। মাতাল ইয়াহিয়া ও টাউট ভুট্টো চক্র শাসনভার বঙ্গবন্ধুর হাতে ছেড়ে দিয়ে সঙ্কটের সুরাহা না করে পাকিস্তানভাগকে অনিবার্য করে তুলেছে। এই মতাবলম্বীরা এমনও বলছেন- বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব পাওয়ার নিভু নিভু আশার প্রদীপটি জ্বালিয়ে সারেন্ডার করেন।

যদিও আরেক দল ইতিহাসবিদ বলছেন- বড় ধরনের ম্যাসাকার ও গণহত্যা থেকে বাঙালি জাতিকে রক্ষার মহতী অবস্থান থেকেই তিনি হানাদারদের হাতে ধরা দেন। ওরা মুজিবকে পেলে হয়তো বাঙালি নিধন করবে না।

কিন্তু কই ম্যাসাকার তো হলই। ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করলো ওরা। ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতহানি। এরচেয়ে ভয়ংকর ম্যাসাকার ও গণহত্যা আর কী হতে পারে। কথার পিঠে কথা আসে। যুক্তি, পাল্টা যুক্তি শেষ হওয়ার নয়। এই বাহাস চাইলে অনন্তকাল চলবে। বাঙালি জাতির বিশ্বাসের এই যে টানাপড়েন- বঙ্গবন্ধুর সারেন্ডার নিয়ে জাতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে দ্বিধা বিভক্তি- এ নিয়ে তার কন্যার জ্বালাপোড়া খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা নন- ঘটনাচক্রে কথিত মুক্তিযোদ্ধা- এই প্রচার প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে মনের জ্বালা কি জুড়ানো সম্ভব! বঙ্গবন্ধুর সারেন্ডার নিয়ে সাধারণ্যের একটি অংশের যে বিশ্বাস- তা জিয়া ও খালেদা জিয়াকে ঘায়েল করে কি ধামাচাপা দেয়া সম্ভব! নাকি এটা পুরানা ঘা চুলকে পুণরায় রক্তক্ষরণের অপরিণামদর্শী উদ্যোগ।

প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে বলি- একটি জাতির মহত্ পুরুষদের নিয়ে নানা কিংবদন্তি গালগল্প- বিশ্বাস- পাল্টা বিশ্বাসের টানাপড়েন থাকেই। আত্মপরিচয়ের টানাপড়েনও স্বাভাবিক। সামনে এগুতে চাইলে এসব সত্যাসত্য গল্প উদারভাবে দেখতে হয়। মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী- এদের নিয়ে কত রকম গালগল্প রয়েছে ভারতে। রয়েছে বিব্রতকর নানা বিতর্ক। তাতে কী আসে যায়। সেই সব ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে ভারতীয় নেতারা সকাল-সন্ধ্যা কথার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকেন কি!

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অনুসন্ধিত্সা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু এই ইতিহাস চর্চা নিভৃতে ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে একাগ্রভাবে হওয়া উচিত এবং তার ইতিহাস গবেষণার ফলাফল নিয়ে তিনি ডিসকভারি ইন্ডিয়ার
মতো কোন প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনায় ব্রতী হতে পারেন। কিন্তু মুখে মুখে পেটের সকল বিদ্যা বিতরণ করে ফেললে গ্রন্থ রচনার সময় তিনি কেমন করে বের করবেন।

‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি- নেহেরুসহচর মৌলানা আবুল কালাম আজাদ চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য জানিয়েছেন। অকপটে বলেছেন প্রিয়-অপ্রিয় নানা প্রসঙ্গে।
মৌলানা আজাদ আরব থেকে আসা ভারতীয় মুসলিম। তার অ্যারাবিয়ান সহবত, খান্দানি ও শরাফত দেখুন- তিনি সমকালে মুখে মুখে পেটের বিদ্যা জনসভায় বিতরণ করে মাঠ ময়দানে ঝঞ্ঝাট ও শোরগোল তোলেননি।

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেননি। প্রকৃত আরবীয় সৌজন্য-র অতুল দৃষ্টান্ত রেখে তার বইটির বিশেষ কিছু অংশের প্রকাশনা মৃত্যুর পর বেশ কিছু বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে গিয়েছিলেন নিজেই। তার মহত্তম ভাবনা ছিল- ওইসব অকপট সত্য জানার জন্য ভারতীয় মনন প্রস্তুত না হলে তা ভারতবর্ষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শঙ্কর বাঙালির মন জ্বালা একরকম। আর আরব পণ্ডিতের উদার্য অন্যরকম।
আমরা যারা আরবস্থানের বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে নিজেদের শরাফত প্রমাণে সচেষ্ট- তাদের অন্তত আরব সহবত চর্চা একান্ত প্রয়োজন।