ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

জিয়াউর রহমান প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। ঘটনাচক্রে মুক্তিযোদ্ধা। তিনি পাকিস্তানের লোক। প্রধানমন্ত্রীর এইসব বক্তব্যও কি তার আত্মানুসন্ধানের মন জ্বালাপোড়ারই অংশ? জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি- এটা প্রমাণের জন্য আদালতের ফরমান পর্যন্ত হয়ে গেল। কিন্তু মানুষের বিশ্বাস যে অন্তরের অন্তস্থলে প্রোথিত। আর দেশবাসীর- ৯৫ শতাংশের বেশি লোক প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের মতো উচ্চশিক্ষিত- ইতিহাসসন্ধিত্সু নয়। এই খাটি হৃদয়ে একবার যে বিশ্বাস ঠাই নেয়- তা উপড়ানো সত্যিই কঠিন। প্রধানমন্ত্রী যাই বলুন, ফরমান যাই বলুক- মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আসা বাঙালিরা বিশ্বাস করে- জিয়া অমর মুক্তিযোদ্ধা- তার স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ জাতির মন ও মননে ৪২ বছর ধরে মুক্তি আকাঙ্ক্ষার অনুরণন তুলে চলছে অমর রণসংগীতের মতো। সেই সুর সঙ্গীতকে কেমন করে হত্যা করা সম্ভব!
জিয়া প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন- বলে কেন পুরানা ইতিহাসের প্রেতাত্মার সঙ্গে অবিরাম লড়াই। জিয়ার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ে কালিমা লেপন করতে গিয়ে নিশ্চয়ই তার বিস্মৃত হওয়ার কথা নয়- বঙ্গবন্ধুর ইমেজেও এমন কালির ছিটা দেয়ার চেষ্টা হয়েছে। অনেক ইতিহাসবিদ তো বিশ্বাসই করেন- বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে ধরা দিয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য। মাতাল ইয়াহিয়া ও টাউট ভুট্টো চক্র শাসনভার বঙ্গবন্ধুর হাতে ছেড়ে দিয়ে সঙ্কটের সুরাহা না করে পাকিস্তানভাগকে অনিবার্য করে তুলেছে। এই মতাবলম্বীরা এমনও বলছেন- বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব পাওয়ার নিভু নিভু আশার প্রদীপটি জ্বালিয়ে সারেন্ডার করেন।

যদিও আরেক দল ইতিহাসবিদ বলছেন- বড় ধরনের ম্যাসাকার ও গণহত্যা থেকে বাঙালি জাতিকে রক্ষার মহতী অবস্থান থেকেই তিনি হানাদারদের হাতে ধরা দেন। ওরা মুজিবকে পেলে হয়তো বাঙালি নিধন করবে না।

কিন্তু কই ম্যাসাকার তো হলই। ৩০ লাখ মানুষ হত্যা করলো ওরা। ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতহানি। এরচেয়ে ভয়ংকর ম্যাসাকার ও গণহত্যা আর কী হতে পারে।
কথার পিঠে কথা আসে। যুক্তি, পাল্টা যুক্তি শেষ হওয়ার নয়। এই বাহাস চাইলে অনন্তকাল চলবে। বাঙালি জাতির বিশ্বাসের এই যে টানাপড়েন- বঙ্গবন্ধুর সারেন্ডার নিয়ে জাতির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে দ্বিধা বিভক্তি- এ নিয়ে তার কন্যার জ্বালাপোড়া খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা নন- ঘটনাচক্রে কথিত মুক্তিযোদ্ধা- এই প্রচার প্রপাগাণ্ডা চালিয়ে মনের জ্বালা কি জুড়ানো সম্ভব! বঙ্গবন্ধুর সারেন্ডার নিয়ে সাধারণ্যের একটি অংশের যে বিশ্বাস- তা জিয়া ও খালেদা জিয়াকে ঘায়েল করে কি ধামাচাপা দেয়া সম্ভব! নাকি এটা পুরানা ঘা চুলকে পুণরায় রক্তক্ষরণের অপরিণামদর্শী উদ্যোগ।

প্রধানমন্ত্রীকে সবিনয়ে বলি- একটি জাতির মহত্ পুরুষদের নিয়ে নানা কিংবদন্তি গালগল্প- বিশ্বাস- পাল্টা বিশ্বাসের টানাপড়েন থাকেই। আত্মপরিচয়ের টানাপড়েনও স্বাভাবিক। সামনে এগুতে চাইলে এসব সত্যাসত্য গল্প উদারভাবে দেখতে হয়। মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী- এদের নিয়ে কত রকম গালগল্প রয়েছে ভারতে। রয়েছে বিব্রতকর নানা বিতর্ক। তাতে কী আসে যায়। সেই সব ব্যক্তিগত ইতিহাস নিয়ে ভারতীয় নেতারা সকাল-সন্ধ্যা কথার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকেন কি!

আমাদের প্রধানমন্ত্রীর অনুসন্ধিত্সা সত্যিই প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু এই ইতিহাস চর্চা নিভৃতে ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে একাগ্রভাবে হওয়া উচিত এবং তার ইতিহাস গবেষণার ফলাফল নিয়ে তিনি ডিসকভারি ইন্ডিয়ার মতো কোন প্রসিদ্ধ গ্রন্থ রচনায় ব্রতী হতে পারেন। কিন্তু মুখে মুখে পেটের সকল বিদ্যা বিতরণ করে ফেললে গ্রন্থ রচনার সময় তিনি কেমন করে বের করবেন।

‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ গ্রন্থে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি- নেহেরুসহচর মৌলানা আবুল কালাম আজাদ চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য জানিয়েছেন। অকপটে বলেছেন প্রিয়-অপ্রিয় নানা প্রসঙ্গে।
মৌলানা আজাদ আরব থেকে আসা ভারতীয় মুসলিম। তার অ্যারাবিয়ান সহবত, খান্দানি ও শরাফত দেখুন- তিনি সমকালে মুখে মুখে পেটের বিদ্যা জনসভায় বিতরণ করে মাঠ ময়দানে ঝঞ্ঝাট ও শোরগোল তোলেননি।

প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেননি। প্রকৃত আরবীয় সৌজন্য-র অতুল দৃষ্টান্ত রেখে তার বইটির বিশেষ কিছু অংশের প্রকাশনা মৃত্যুর পর বেশ কিছু বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে গিয়েছিলেন নিজেই। তার মহত্তম ভাবনা ছিল- ওইসব অকপট সত্য জানার জন্য ভারতীয় মনন প্রস্তুত না হলে তা ভারতবর্ষের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শঙ্কর বাঙালির মন জ্বালা একরকম। আর আরব পণ্ডিতের উদার্য অন্যরকম।
আমরা যারা আরবস্থানের বংশোদ্ভূত বলে দাবি করে নিজেদের শরাফত প্রমাণে সচেষ্ট- তাদের অন্তত আরব সহবত চর্চা একান্ত প্রয়োজন।