ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

ক্লাব-কমিউনিস্ট পার্টি নিয়ে দু-চারটি কথা বলা প্রয়োজন। তোপখানার অলিতে-গলিতে কমিউনিস্ট ক্লাব রয়েছে বেশকিছু। পুরনাপল্টনেও আছে একাধিক। বেশিরভাগই লাইব্রেরি টাইপ রিডিং ক্লাব। পড়াশোনা, দেয়াল পত্রিকা, কমিউন লিভিং আর অজস্র আকাশকুসুম কল্পনা নিয়েই তারা ব্যস্ত। রাষ্ট্র দখল, ক্ষমতা দখলের কিছু কেতাবি কথাবার্তা তারা বলে বেড়ায় বটে, কিন্তু পার্টি অফিসের ভাড়ার টাকা তুলতেই বেশিরভাগ মাসে হতোদ্যম। রাস্তায় গান গেয়ে, সবিনয়ে চাঁদা চেয়ে তারা প্রাণান্ত। অর্থনৈতিক সঙ্কটের বাস্তব টানাপড়েনেই মাঠে মারা যাচ্ছে দিবাস্বপ্ন। সে তুলনায় সিপিবির ক্লাবটি স্বতন্ত্র ও স্বনির্ভর। মণি সিং ট্রাস্ট সুরম্য ভবনটিতে নিজেদের আড্ডা গল্পগুজব ও ভবন বাণিজ্য ভালোই চলছে। বাড়িভাড়ার টাকা সংগ্রহে উদীচীকে হন্যে হয়ে ছুটতে হচ্ছে না। অবশ্য এতে ক্লাব কার্যক্রম হয়ে পড়েছে সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে আবদ্ধ। আগে সারাদেশে পাড়ায়-মহল্লায় উদীচীর নাম শোনা যেত, কলেজ-ভার্সিটিতে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল প্রবল সক্রিয়—এখন সেসব স্বর্ণালি ইতিহাস। রাজনীতি করে ক্ষমতা দখল করা যায়, এটা সম্ভবত এখন বিশ্বাসই করে না বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টিতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক পদগুলো আছে বটে। তারা টকশো আর পত্রিকায় উপসম্পাদকীয় লেখার মধ্যেই কুয়োর জলের তলা থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে অস্তিত্ব জানান দিচ্ছেন। শীর্ষ নেতারা পরস্পর আত্মীয়তার বন্ধনে আছেন বলে অনেকে পারিবারিক ক্লাব বলে টিটকারিও দিচ্ছে।

গণসংগঠন হিসাবে প্রবলভাবে বিকশিত সিপিবি কেন এখন ‘ওয়াকফ এস্টেট’ মার্কা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হল- বুলবুল-সেলিমের কাছে পার্টিজানদের এ এক বিশাল জিজ্ঞাসা। ক্ষমতার লালসা বিমুখ এক নিরামিষ পার্টি হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষা যে তাদের একমাত্র ব্রত- তাই বা জোর দিয়ে বলি কেমন করে! ক্ষমতার রস- আস্বাদনের লালসামুক্ত তারা নয়। ক্ষমতা বলয়ে থাকার বিনম্র একটা প্রয়াস সবসময়েই ছিল। কিংবদন্তি মণি সিং বলতে গেলে বাকশালে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। নেই নেই বলেও তারা ক্ষমতার কক্ষচ্যুত হন না। এখনো অন্যফর্মে ক্ষমতার নিউক্লিয়াসে আছেন। বর্তমান মহাজোট মন্ত্রিসভা তো চলছে চুক্তিভিত্তিক সিপিবি নেতাদের দিয়েই। মতিয়া চৌধুরী- কৃষিমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য যাই হোন না কেন- ছাত্র ইউনিয়নের সোঁদা গন্ধ মুছে ফেলতে পারেন নি। নূরুল ইসলাম নাহিদ সিপিবির চূড়ায় উঠেছিলেন সম্ভবত আওয়ামী লীগে সম্মানজনক পদ বাগাবার জন্যই এবং সেটা তিনি সফলভাবেই পেরেছেন। শফিক আহমেদ আড়ালে ছিলেন। সিপিবিয়ান সিভিলিয়ান হয়েও টেকনোক্রেট কোটায় মন্ত্রীত্ব- এটা নিসন্দেহে চমত্কার কারিশমা। তবে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব দেখিয়েছেন ক্লাব সিপিবির সাবেক অগ্রগণ্য লালকার্ড নুহউল আলম লেলিন। আওয়ামী লীগের প্রচার ও তথ্য সম্পাদক হয়েছেন- এটাকে তেমন বড় করে দেখছি না। এতক্ষণ যাদের কথা বললাম- মতিয়া-নাহিদ-শফিক তারা কমিউনিস্ট ক্লাবের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি খোয়াতে পারেননি। মতিয়া আছেন সেই সাততলা-গাছতলার মতিয়া চৌধুরীর মতনই। সরকারের সেরা লুটের খনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে মোটামুটি ভালোই সামলাচ্ছেন নাহিদ। তবে বইপত্র ছাপার কাজটা ভারতীয় বেনিয়াদের হাতে না তুলে দিলেই পারতেন। বুঝলাম- দেশীয় মুদ্রণ বেনিয়াদের শিক্ষা দিতে চেয়েছেন তিনি। কিন্তু ব্যাপারটা এখন রেওয়াজ হয়ে ওঠায় দেশীয় মুদ্রণশিল্প কর্মীরা শুনেছি- তাদের ভাষায় ‘ভারতীয় হায়েনাদের’ হাত থেকে মুদ্রণশিল্পকে রক্ষার জন্য আন্দোলনে যাচ্ছেন। ‘টিট ফর ট্যাট’ হয়েছে- এবার ক্ষ্যান্ত দিন। দেশীয়দের কাজ দিন। দেখুন ওরা সত্যিই পারে কিনা। ও হ্যাঁ- আরেকটা কথা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের একাধিক গাড়ি ব্যবহার করছেন নাহিদ পরিবার। এটা ঠিক লাল ক্লাব কালচারের সঙ্গে মানায় না। শফিক আহমেদ রহস্যময়। তার পূর্ণ মন্ত্রীত্ব নিয়ে ধাধাঁয় পড়ি প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের কথা ও কাজের বহর ও বাহারে। শফিক মন্ত্রণালয়ের পুরানা গাড়িতেই চড়ছেন। প্রায় ষাট লাখ টাকার গাড়ি কিনে দেয়ার একটা উদ্যোগ হয়েছিল। তিনি অর্থনৈতিক কৃচ্ছের জন্য তা ফিরিয়ে দিয়ে নস্টালজিক কম্যুনিস্টদের খুশি করেছেন নিঃসন্দেহে। তবে প্রধান বিচারপতির ২টি গাড়ির জন্য ১২/১৩ কোটি টাকার স্যাংশনের ঘটনায় তার ভূমিকা প্রশ্নের বাইরে রাখা যাচ্ছে না।

মতিয়া নাহিদ শফিক যেটা পারেননি, লেনিন সেটা পেরেছেন। সিপিবিয়ান বৈশিষ্ট্য খুইয়ে তিনি ষোল আনা আওয়ামী লীগ চরিত্র অর্জন করতে পেরেছেন। দ্রুততম সময়েই সেটা পেরেছেন। মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের যদু বাড়িতে কয়েকশ’ বিঘা হিন্দু অর্পিত সম্পত্তি রয়েছে। মন্দির ও দেবোত্তর সম্পত্তিও রয়েছে। লেলিন বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন করে লিজ নিয়েছেন যদু বাড়ির ত্রিশ বিঘা। সেখানে রোমান্টিক নৌ-মিউজিয়াম ও অত্যাধুনিক থিমপার্ক- সরাইখানা হচ্ছে। রাতারাতি লেলিনের এতো বিবর্তন? সিপিবির সংখ্যালঘু সংরক্ষক ভূমিকা সুবিদিত। সাবেক কমরেড পুরানা শিক্ষা ভুলে বেআইনিভাবে অর্পিত-দেবোত্তর সম্পদ দখলের পায়তারা করায় অবাকই হয়েছি বৈকি। থাকিলে ডোবাখানা, হবে কচুরিপানা- স্বভাব তো কখনো যাবে না- গণসঙ্গীতটির মর্মবাণী প্রমাণ করি কেমন করে। লেনিন তো স্বভাব খুইয়ে ফেলতে চলেছেন। ডোবাখানায় ডুব দিয়ে কচুরিপানার সংস্পর্শে তিনি তো দেখছি উত্তর আধুনিক আওয়ামী লীগার হয়ে উঠেছেন।

মণি সিং যা পারেননি- তার উত্তরাধিকারীরা তা করে দেখাচ্ছেন। মণি সিং ভেবেছিলেন- শেখ মুজিবের বাকশালে বিলীন হয়েই ক্ষমতা দখল হয়ে গেছে। মুজিব সৌজন্যমূলক বুদ্ধি পরামর্শ নিচ্ছিলেন সেই ছিল ঢের প্রাপ্তি। তার উত্তরসূরিরা কৌশল বদলেছেন, তারা আওয়ামী লীগের মিত্র শক্তি হয়ে থাকাটাকেই পরম প্রাপ্তি বলে মানেন নি। বরং রং বদলে পোশাক বদলে ভাগ বসিয়েছেন ক্ষমতায়।
এটা কি সত্যিই সিপিবির ক্ষমতা দখলের গোপন কৌশল? কিন্তু এই কৌশলের অন্তিম ফলটা কি হয়েছে! একটা প্রবল সম্ভাবনাময় গণসংগঠন সকল ভবিষ্যত্ জলাঞ্জলি দিয়ে পুরানা পল্টনে একটা ট্রাস্টি পার্টিতে পরিণত হয়েছে। একসময় যারা বিচরণ করেছে সারাদেশে। এখন কেবল পল্টন মোড়ে মাথায় লালপট্টি বেধে হই হট্টগোলই সার।

আর তাতেই লাল বিপ্লবের সাধ মিটে গেল। তবে কি সিপিবি কখনোই পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক সংগঠন ছিল না কিংবা হয়ে উঠতে পারেনি। তারা সুশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন বা ক্লাবের মতো কিছু এটিকেট ভব্যতা, কালচার চর্চা করেছে। যে কারণে তারা সংস্কৃতিবান সভ্য সৃষ্টি করতে পেরেছে- রাজনৈতিক কর্মী তৈরি করতে পারেনি। রাজনীতির লক্ষ্যে হাজার হাজার উজ্জ্বল মেধাবী তরুণ ছাত্র ইউনিয়ন নামের স্কুলে দাখিল হলেও পাঠশেষে তাদের নীরব স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে। মতিয়া-নাহিদ-শফিক-লেনিন; ক্ষমতার রসাস্বাদন করছে কিছু ব্যক্তি- পার্টি কখনো নয়।