ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি থেকে আমার এক সাহিত্যিক-ফিল্ম মেকার বন্ধুর হঠাত্ ফোন। অন্তহীন দেখেছিস!
অন্তহীন? এটা আবার দেখার কী জিনিস। আমি অবাক হয়ে জানতে চাই।
— বারে! অন্তহীন কলকাতার একটা বাংলা ফিল্ম। সাংবাদিকতা করিস। নাম শুনিসনি।
ও। ওটা আবার দেখার কী হলো?
না দেখলে এক্ষুণি দেখে নে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সঙ্গে দারুণ মিল।
স্মৃতি হাতড়ে মনে করতে পারলুম না, ছবিটা দেখেছি কিনা। তাই বসুন্ধরা থেকে সিডি কিনলুম! কী এমন আছে অন্তহীনে।
মার্কিন বন্ধুটি পই পই করে বলছিল, ছবিটা দ্যাখ। তুইও একটা প্যারালাল গল্প দাঁড় করিয়ে ফেল। দেখি একটা ফিল্ম বানানো যায় কিনা!
বললাম, সে তো নকলি-টুকলিবাজি হয়ে যাবে।
হয় হোক। আরে সারা দুনিয়াটাই চলছে—দেবে আর নেবে, মেলাবে-মিলিবে। নকলি-টুকলি ওসব মান্ধাতার শব্দ। এখন তোর মেসেজটা তুই দিতে পারলেই ব্যস।
বন্ধুটির সঙ্গে আলোচনা আর বাড়াইনি।
তবে এক রাতে ল্যাপটপে বসে ছবিটা দেখে চমকে গেলাম বৈকি। সত্যি এমনও হয়!
অন্তহীন ছবিটা জলজ্যান্ত সত্য কাণ্ড নিয়ে বানানো। ভারতের জাতীয় পুরস্কার পাওয়া ছবি। এমন একটা কাহিনীকে ওরা সরকারি জাতীয় পুরস্কারও দিল।
স্বীকার করতেই হবে, ওরা নিজেদের ব্যবচ্ছেদ করতে জানে।
নির্জলা বাস্তবকে নিয়ে অন্তহীনের গল্প। অভীক চৌধুরী সত্-উদ্যমী এক পুলিশ অফিসার। চারপাশের শত অনিয়ম-অন্যায় দেখে তার কোমল-কঠোর মনটা জ্বলছে-পুড়ছে প্রতিদিন। কিছুই করতে পারছে না ছেলেটা। ইন্টারনেটে সময় কাটায়। ফেসবুকে অজানা-অচেনা অনেক বন্ধু। টুকটাক চ্যাটিং হচ্ছে এর-ওর সঙ্গে। এভাবেই সে ভার্চুয়াল সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে বৃন্দার সঙ্গে। বৃন্দা সুন্দরী। ডাইনামিক। টিভি রিপোর্টার। ওরা পরস্পর আস্তে আস্তে একটা বিশ্বাস-আস্থার দিকে এগোচ্ছে।
অন্তহীনের গল্পে প্রবলভাবে উপস্থিত বিজয় কেতন নামের এক বিতর্কিত মেগা ব্যবসায়ী। এলডেরাডো নামে তার মস্ত কনসোর্টিয়াম প্রজেক্ট রয়েছে।
এলডেরাডোকে নিয়ে নানা বিতর্ক। নানা অভিযোগ। লোক ঠকানো। ব্ল্যাক মানি। কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না বিজয় কেতনের। দিল্লি-কলকাতায় নানা কানেকশন। তার হাত অনেক লম্বা। কোনোরকম সত্য সামনে এলেই বিজয় দিব্যি ফলস-ভোগাস বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বৃন্দা দুরন্ত রিপোর্টার। হঠাত্ কী হলো, বিজয় কেতনের মোগল প্রজেক্টকে নিয়ে বৃন্দা দু’জন ক্ষমতাধর মানুষের আলাপচারিতা শুনে ফেলে। বিরাট এক স্কুপ নিউজ পেয়ে যায় সে। তারপর খবরের পেছনে চরকির মতো ঘোরে। স্কুপটাকে ষোলআনা প্রমাণ করা তার চাই-ই চাই।
ওদিকে অভীক-বৃন্দা রিলেশনটি ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তব জগতে আসার পথে কিছু টানাপড়েন রয়েছে ছবিতে। কিছু কনফিউশন। কিছু টক-মিষ্টি-ঝাল। একটি প্রেমের গল্পে যেমনটা হয়েই থাকে।
কিন্তু সে প্রেম ‘হইয়াও হয় না শেষ’।
একরাতে বৃন্দা অফিসে ফিরছিল। নাইট শিফটে তার কাজ ছিল। পথেই ভয়ঙ্কর এক কার একসিডেন্ট। বৃন্দা ডেড। তার দেহ ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত।
ওদের মধুর মিলন আর হলো না। যে ভালোবাসা-সুখের জন্য ওরা ছিল অধীর অপেক্ষমাণ। তা ঢেকে গেল অন্তহীন রহস্যময়তায়।
ছবিটির পর্দা উঠল ‘বিদেশি তারা’ শিরোনামের অসাধারণ এক গান দিয়ে।
কিন্তু এই অন্তহীনের গল্প দিয়ে আমি কী এমন নকলি-টুকলি করব! এমনটা তো হয়ই। ঢাকায়, বাংলাদেশের নানা জায়গায় হরহামেশাই হচ্ছে। বিজনেস মোগলদের অন্তহীন রহস্যময় কর্মকাণ্ড নিয়ে কৌতূহল দেখানো মোটেই ঠিক নয়। যদি দেখাতে চাও, পথে-ঘাটে, ঘরে-বাইরে-বেডরুমে ছুরি-কাঁচি-বাসের চাকা নিয়ে হাজির হতে পারে আজরাইল। এমন মৃত্যুর কোনো বিচার নেই। কেবলই শোক। কেবলই কান্না। কেবলই মৃত মায়ের সজীব মায়াময় মুখটির দিকে সন্তানের আকুল চেয়ে থাকা। বিচার নেই। মানববন্ধন শোরগোল, কোনো লাভ নেই। একান্ত চেঁচামেচি করলে মিলতে পারে বিচারের নামে প্রহসন। সুপ্রিমো-প্যারা সুপ্রিমো থেকে বিচিত্র সব মহাজন বাণী ও উপদেশ।
আশ্চর্য! ভারতেও এমনটাই হচ্ছে। কলকাতাতেও একই গল্প। সব জায়গাতেই বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদছে। আর বিজয় কেতনরা অবিরাম হেসে চলেছে। ওরা সবাই ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এই গল্প নিয়ে নতুন কী এমন কাহিনী সাজাই। মার্কিন বন্ধুর আবদার কেমন করে রাখি।
কতগুলো প্রশ্ন-প্রসঙ্গ সাজিয়ে নিতে পারি টেবিলে।
কে হত্যা করল বৃন্দাকে। কেন হত্যা করল? বিজয়ের এলডেরাডো সুপ্রিমো প্রজেক্ট নিয়ে কী এমন তথ্য পেয়েছে বৃন্দা। কী সেসব তথ্য! বৃন্দার মৃত্যু নিয়ে কলকাতা পুলিশের কমিশনার ডিআইজি কী বললেন! মমতাময়ী মুখ্যমন্ত্রী দিদিমণি! তিনি তো ভীষণ সোচ্চার। সিঙ্গুর না সিন্দুরের জমি কাণ্ড নিয়ে কী হেস্তনেস্ত না করলেন! তার নাকের ডগার ওপর আস্ত একটা খুন! তাও নারী সাংবাদিক। মিডিয়া কাঁপানো দুর্দান্ত আইটেম। বিরোধী দলে থাকতে দুনিয়া কাঁপানো নেত্রী। এখন ক্ষমতায়। কেমন ট্যাকল দিচ্ছেন কেসটা!
বিজয় কেতনের কী খবর! সেই কি খুনের নেপথ্যে? কেমন করে সে ট্যাকল দিল দিদিমণিকে।
বাহ্। এসব প্রশ্নের জবাব-জট খুলতে পারলেই কেল্লা ফতে। গল্পটা দারুণ জমে যায়। সুতরাং কল্পনা করতে দোষ কী!
আর গল্পটাকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে এ পারে পাচার করার কোনো দরকার দেখছি না। তাতে আমাদের হর্তাকর্তা বিধাতারা দারুণ গোস্বা হতে পারেন। ওপার বাংলার অন্য সবকিছু তাদের ভালো লাগলেও এই আমদানি তাদের ভালো লাগবে না। কলকাতার গল্প কলকাতাতেই থাকুক।
মমতাময়ী দিদিমণির কাছে করজোড়ে ক্ষমা চাইছি। এ গল্প নিতান্তই বানোয়াট। অনুগ্রহ করে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
কল্প প্রশ্ন-(১) কে খুন করল সাংবাদিক বৃন্দাকে? প্রশ্নের জবাবটা পেতে যুঁত্সই জায়গাটা হলো পুলিশ মন্ত্রী। চলুন, তার ক্যামেরা ট্রায়ালটা শুরুতে হয়ে যাক।
দাদা, আপনি এখন কোথায়!
কে, কী দরকার?
ছোট্ট দুটো প্রশ্ন ছিল। লালবাজারে কি আসব!
নো নো, আমাকে এখন এসে আর পাবে না। একটা এক্সক্লুসিভ মিটিং করছি। ২-৪ মিনিট বাদেই মহাকরণের দিকে ছুটব।
মহাকরণে রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতরে দাদার মুখোমুখি।
দাদা, বৃন্দার মৃত্যুরহস্যের সুরাহা কি কিছু হলো! কোনো ক্লু কি পেলেন?
দাদার এক মুখ হাসি। জানতাম, এই প্রশ্নটাই করবেন। আপনারা সাংবাদিকরা বৃন্দাকে নিয়ে জবর পড়েছেন। পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। সাংবাদিকের মৃত্যু। আপনাদের সহকর্মীর মৃত্যু। মৌচাকের মহারানীর প্রকোষ্ঠে গিয়ে ঢিলটি পড়েছে। সব মৌমাছি হুল ফোটাতে ছড়িয়ে পড়েছে। যাকে পাচ্ছেন তাকেই হুল ফুটিয়ে কাবু করতে চাইছেন। কলকাতায়, হাওড়ায়, মুর্শিদাবাদে কত মানুষ প্রতিদিন অপঘাতে মরছে। কই আপনাদের এমন ঝাঁকে ঝাঁকে ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখি না।
— তার মানে দাদা স্বীকার করছেন, প্রতিদিন বৃন্দার মতো অসংখ্য হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আর আপনি হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন। আমরা ঝাঁপিয়ে না পড়লে কিছু করবেন না, তাই তো! মন্ত্রী দাদা থতমত।
— দেখুন, এরূপ কখন বললুম। আপনারা তিলকে তাল করছেন। আমাদের দিদিমণির সরকার তিলকে তাল করতে দেবে না। দিদিমণি প্রতিটি ঘটনা নিজেই দেখভাল করছেন।
তাছাড়া দেখুন, সাংবাদিক বৃন্দা আমাদের বোন। দিদিমণি তাকে খুব স্নেহ করতেন। আমিও সস্নেহমূলক নজরে তাকে চিনতুম। শি ইজ আওয়ার সিস্টার্স।
দাদা ইংরেজিটা বুঝি ভুল হলো। সিস্টার্স মানে তো অনেক বোন।
ওই হলো। আপনারা হলেন গিয়ে চোখে আঙুল দাদা। কারও কোনো কেশাগ্র, মানে চুলটিও ছিন্ন করতে পারেন না। কেবল যত্রতত্র আঙুল দিয়ে বেড়ান। আরে, আমি বলতে চেয়েছি বৃন্দা আমার অনেক বোনের একজন। আমার ছোট বোনের মৃত্যুরহস্যর সুরাহা আমি চাইলে ২-১ দিনের মধ্যে করতে পারতাম। আমি চাইলে ৪৮ ঘণ্টা ৭২ ঘণ্টা আলটিমেটাম দিয়ে রহস্যটি খোলা আম খুলে দেখাতে পারতাম। আমার সদিচ্ছাও ছিল। ওই লাল দুর্গ ও তাদের রেড ক্যাপ বাহিনীকে হটিয়ে আমরা এক বছর না কাটতেই পুলিশকে ঢেলে সাজিয়েছি। দিদিমণি কলকাতাকে লন্ডনের মতোন করে সাজাচ্ছেন। আর আমি পুলিশকে এরই মধ্যে নীল ইউনিফর্ম দিয়ে নতুন করে ঢেলে সাজিয়েছি। তারা লকআপে কোনো কারাবন্দিকে আর রেপ করে না। তারা এখন লন্ডনের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের চেয়েও গোয়েন্দাবৃত্তিতে অতি দক্ষ। তারা ২-১ দিনেই খুনিকে পাকড়াও করতে পারত। বলতে কী, খুনিকে কব্জা করে ফেলেও ছিল। কিন্তু দিদিমণি রিকোয়েস্ট করলেন। বললেন, পুলিশ বাবু, আস্তে চলুন। তাড়াহুড়ো করবেন না। এটা মিডিয়া আইটেম। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে পড়লে কিন্তু মুশকিল। তখন কলকাতা-দিল্লি সামাল দিতে পারবেন না।
দিদিও জানালেন, বৃন্দা তারও বোন। মামলাটা তিনিও টেককেয়ার করতে চান। আমি তো দিদির কথা ফেলতে পারি না।
— তার মানে দিদির সঙ্গে দাদার একটা টক্কর হয়ে গেল না?
— আরে টক্কর কোথায় দেখলেন! আপনাদের সঙ্গে কথা বলাই কষ্টসাধ্য। খুব পেরেশান করছেন। লালবাজার, শোভাবাজার, মহাকরণ যেখানেই থাকি—আপনারা পেছন পেছন ওই তিন হাত লম্বা মাইকটা নিয়ে ছুটছেন। দিদির সঙ্গে টক্কর কেন হবে! তিনি রাস্তা থেকে ধরে এনে আমাকে মন্ত্রী করেছেন। আমি কোন সাহসে তার সঙ্গে টক্কর দিতে যাব।
কথা বলতে বলতে হাঁপানির টান উঠল পুলিশ মন্ত্রীর। তিনি ইনহেলার নিলেন। লম্বা দম নিলেন। পানি খেলেন।
— দেখুন, দিদি ইজ অলওয়েজ রাইট। আমার এই ইংরেজিতে আবার ভুল ধরতে যাবেন না। তাহলে ইংরেজিতে একটি কথাও কইব না। দিদি আমার অভিভাবক। তিনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের পুলিশ খুবই দক্ষ। তারা চাইলে ২-৪ ঘণ্টায় কেসটা সলভ করে ফেলতে পারে।
কিন্তু তাড়াহুড়া করে কী লাভ! বৃন্দাকে চাপা দিয়েছে যে ড্রাইভার, হয়তো আমরা সেই শালাকে ধরলাম। তাকে ফাঁসিতে ঝোলালাম। কিন্তু তাতে মূল কেসটা পণ্ড হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ওই ড্রাইভার খুনিটার নেপথ্যে কারা, তাদের খোঁজটা তখন পাব না! আমরা আসল খুনিকে ধরতে চাইছি। একজন সাংবাদিক খুন বলে কথা? কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
— তার মানে দাঁড়াচ্ছে দাদা, মূল খুনিকে ধরেও আপনারা ছেড়ে দিয়েছেন! খুনিটা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। নতুন কোনো শিকার খুঁজছে, তাই না?
— মা দুগ্গা, দুগ্গা। হায়! একথা কখন বললাম। দেখুন পুলিশি তদন্তে কিছু সিক্রেট আছে। সব সিক্রেট সবসময় খুলে বলাও যায় না। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও সব তথ্য সাংবাদিকদের দেয় না। আমরা বঁড়শিতে মছলি লাগিয়ে টোপ ফেলেছি। নিশ্চয়ই রাঘববোয়াল টোপটা গিলবে।
— ঘটনার নেপথ্যে রাঘববোয়াল নাকি আফ্রিকার মাগুর!
— আফ্রিকার মাগুর মানে!
— শুনেছি এলডেরাডো সুপ্রিমোর বিজনেস টাইকুন বিজয় কেতন এই হত্যার নেপথ্যে!
— বিজয় কেতন, এ আবার কে?
— নাম শোনেননি দাদা। বিজয় কেতন ভুঁইফোঁড় কোটিপতি। দিদিমণির সঙ্গে খুবই দহরম-মহরম। সে তো একটা আস্ত আফ্রিকান মাগুর। যে পুকুরেই নামছে, সব সাবাড় করে দিয়ে লোডশেডিংয়ের অন্ধকার নামিয়ে দিচ্ছে। রামায়নের কিষ্কিন্ধ্যাসন্ধ্যা। ওর গ্রাস নাকি খুব ভয়ঙ্কর।
দাদার অপ্রস্তুত হাসি। আপনারা দেখছি গালগল্প ভালোই ফেঁদেছেন। হলুদ সাংবাদিকতা করছেন। দেখুন, বিজয় কেতনই হোক আর পরাজয় কেতনই হোক, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। কিলারদের জন্য নো মার্সি। একেবারে জিরো টলারেন্স।
— কিন্তু দাদা, বাজারে তো কথা, দিদিমণির সরকার কিলারদের জন্য খুবই মার্সিফুল। বিজয় কেতনের যে সত্ভাইটা কিলিং স্পটে ছিল, কী নাম? ইয়েস অজয় কেতন, সে নিজে সংবাদ ভারতী চ্যানেলের অদূরে ত্রিকোণ শ্মশানতলা মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাক ড্রাইভারকে দেখিয়ে দিয়েছে বৃন্দার মারুতি সুজুকি গাড়িটাকে।
— বেশ বেশ। আপনাদের কল্পনাশক্তি তো সিনেমাকেও হার মানাচ্ছে। আপনারা যখন অজয় কেতনের নামটা জানেনই, ওকে পাকড়াও করে আনুন না। ধরে টাইট দেই। একদম লকআপে ঢুকিয়ে দিই। উমেন হ্যারাসমেন্ট ধারা ঠুকে দেব, বেটা জামিন পাবে না। দাদা হাসছেন। বলুন, চোখে আঙুল দাদারা, আনতে পারবেন কিনা বলুন। নাকি গালগল্প ফেঁদেই খালাস।
— কিন্তু মিস্টার মিনিস্টার, অজয় কেতনকে কোথায় পাব বলুন! শুনেছি, এরই মধ্যে সে দিল্লি হয়ে একেবারে ভার্জিনিয়াতে উড়ে গেছে। সেখানে এলডোরাডোর ড্রিম প্রজেক্টের জন্য মক্কেল ধরার ফাঁদ পেতেছে।
— তাহলে আর কী করা? কলকাতা পুলিশ তো আর আমেরিকা উড়ে যেতে পারবে না। ওটা তো ফরেন দেশ। ওখানে ভারতবর্ষের আইন-কানুন চলে না। দেখুন রিপোর্টার দাদামণি, মুখের সামনে মাইক্রোফোন থাকলে অনেক কিছু বলা যায়, কিন্তু প্রমাণ করা যায় না। আমরা শোনা কথায় কান দিচ্ছি না। হত্যাকারীদের ধরতে চাই। দিদিমণির সরকার কাউকে ছাড় দেবে না। তিরিশ বছরের জঞ্জাল সাফ করতে হচ্ছে আমাদের। একটু সময় লাগবেই।
— তা কেমন সময় লাগতে পারে।
— পুলিশের তদন্তের কোনো টাইম লিমিট দেয়া যায় না। বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে কাজটা করতে গেলে সময় লাগবেই। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডও স্পর্শকাতর মামলায় বেশি সময় নেয়। এটা ঐতিহাসিক মামলা। জলদি কেসটা খতম করে দিয়ে ইতিহাসের কাঠগড়ায় আসামি হতে চাই না।
পুলিশ মন্ত্রীর বক্তব্য তো আমরা শুনলাম, এবার পুলিশের হর্তা-কর্তাদের বয়ান শোনাটা দরকার। চলুন লালবাজারে যাচ্ছি। বঙ্গ পুলিশের যিনি ডিআইজি—তিনি বিহার কা আদমি। বেশ লাজুক। বাংলাটা যেমন আসে না, তেমনি হিন্দি-ইংরেজিটাও যুঁত্সই হয় না। তার চেয়ে সিটি পুলিশের কমিশনার শুদ্ধশেখর বাগচির কাছেই যাওয়া উত্তম। স্মার্ট গাই। অলওয়েজ স্যুটেড-বুটেড। তার সামনে বুম, টেপরেকর্ডার অন করতে হলো না। বুঝে ফেললেন; সহাস্যে বললেন—বড্ড জ্বালিয়ে মারছেন দাদা। বৃন্দাকে নিয়ে খুবই চাপে আছি। প্লিজ, ক্যামেরাটা অন করার দরকার নেই। ওটা বড় অ্যালার্জিক। যা বলতে চাই না, তা বলা হয়ে যায়। ঠোঁট আর জিহ্বাকে কিছুতেই সামলে রাখতে পারি না। যাই হোক, বৃন্দার কেসটাতে খুব এগোচ্ছি। শনৈঃ শনৈঃ এগোচ্ছি। আমরা চলতি স্পেলে এই কেসটা নিয়েই ব্যাটিং লাইনে থাকব। নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন, কে খুন করেছে বৃন্দাকে। এই খুন শব্দটা নিয়ে আমাদের ছোট্ট আপত্তি। যতক্ষণ না প্রমাণ পাচ্ছি কেউ ঠাণ্ডা মাথায় তাকে পিষে মেরেছে, ততক্ষণ কেমন করে বলি ওটা খুন। এটা সিম্পল অ্যাকসিডেন্টও কিন্তু হতে পারে। কেউ তার মারুতির ওপর ঠাণ্ডা মাথায় ট্রাক তুলে দিয়েছে, সেটা কোনোভাবে প্রমাণ করা যাচ্ছে না। সব সোর্স লাগিয়েছি—মোটিভটা মোটেই ক্লিয়ার নয়।
— কিন্তু মিডিয়ার অনেকেই বলছেন, এলডোরাডো সুপ্রিমো এর নেপথ্যে।
— হতে পারে, এলডোরাডো হতে পারে; আবার ডেলডোরাডোও হতে পারে। এই হতে পারের কোনো শেষ নেই। আর যতক্ষণ প্রমাণ না পাচ্ছি ততক্ষণ তথাকথিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে কাউকে আটক করতে পারি না। আমরা প্রপার ওয়েতে এগোচ্ছি। কেসটা আমাদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হতে চলেছে।
— কীরকম পরিষ্কার!
— চাইলে যে কোনো সময় কেসটা হিল্লে করতে পারি। কিন্তু মিডিয়া কনসার্ন কেস। যা-ই করব, আপনারা সেটি মিথ্যা প্রমাণ করতে কোমর বেঁধে নামবেন। তাই ডান-বাম আমাদের ভাবতে হচ্ছে। ক্লু আমরা পেয়েছিলাম।
— ক্লু? কী ক্লু?
— আরে দাদা, দু-দুজন আই উইটনেস আমরা পেয়েছিলাম। তারা সব দেখেছিল।
— আই উইটনেস! ওই যে ছিঁচকে পকেটমার আবদাল্লা। আরেকটা হেরোইনখোর মানিকচাঁদ। যে কিনা বেহুঁশ হয়ে সেখানে পড়ে ছিল।
— আরে দাদা, আপনাদের নিয়ে আর পারছি না। যে কোনো ক্রাইম সিনের প্রত্যক্ষদর্শী এই নিচুতলার মানুষগুলোই হয়ে থাকে। শ্মশানতলার মোড়টা বড় নির্জন। ওইখানটায় রাত এগারোটায় ভদ্রলোকদের থাকার কথা নয়। আর যদি কেউ দেখেও থাকেন, আপনি নিশ্চিত থাকুন—তিনি লালবাজারমুখো হবেন না। ভুলেও কাউকে বলবেন না, কিছু দেখেছেন। ভদ্রলোক মানেই অন্ধ। কালা। বধির। তারা গান্ধীজীর সেই তিন বাঁদর। যারা চোখে দেখে না, কানে শোনে না এবং কাউকে কিছু বলে না। তাই আমাদের যে কোনো কেসে নিচুতলার মানুষকেই খুঁজতে হয়। ওদের কাছ থেকে আমরা কিছু না কিছু ইনফরমেশন পাবই। ওরা আমাদের হতাশ করে না।
— তা এই আই উইটনেসরা কী বললে? সে রাতে কী দেখতে পেয়েছিল দুই চক্ষুষ্মান।
— পকেটমার আবদাল্লাকে খুবই সাচপিশাচ মনে হচ্ছে।
— কেন?
— ব্যাটা কিছুই বলছে না। স্বীকার করছে, সে রাতে অকুস্থলে ছিল। কিন্তু বলছে, কিছুই দেখেনি। কোনো শব্দ শোনেনি। ওর কথা সত্য ধরলে বেশ সমস্যাতে আমরা পড়ে যাই। তার মানে দাঁড়ায় খুন বা কিলিংটা আদৌ ঘটেনি। তাই রিমান্ডে এনে ব্যাটাকে বড্ড পেদিয়েছি। ডিম থেরাপি, সুই থেরাপি দিয়েছি। তারপরও ওই একই কথা বলছে—কিচ্ছু দেখেনি। তাই ওর স্টেটমেন্ট বাতিলের খাতায় রেখেছি। কেননা বৃন্দা যে মরেছেন শ্মশানতলার মোড়ে। এ সত্যকে অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
— হেরোইনখোর মানিকচাঁদ কী জানাল? ও কী দেখল?
— হ্যাঁ, ওর উইটনেস আমরা খুব সিরিয়াসলি নিয়েছি। ও জানাচ্ছে, ও দেখেছে।
— কী দেখেছে?
— ও দেখেছে বৃন্দাকে কোনো গাড়ি চাপা দেয়নি। কোনো ট্রাক বা লরি ও দেখেনি।
— তবে কি বৃন্দা আপনা-আপনি রক্তারক্তি করে মরল?
— সেই তো রহস্য! ট্রাক বা লরি চাপা না দিলে লেডি রিপোর্টার কেমন করে মরলেন?
— আপনাদের গোয়েন্দা জ্ঞানগম্যি কী বলছে।
— অভিজ্ঞতা যা বলছে তা কেমন করে মিডিয়াকে বলি। মিডিয়া সত্যটা শুনতে চায় না। মানিকচাঁদের চক্ষু-সাক্ষ্য আমরা আমলে না নিয়ে পারি না। প্লিজ, বুমটা সরিয়ে রাখুন। অন দ্য রেকর্ড কিছু বলতে পারব না। প্রশ্ন হলো, বৃন্দা কেমন করে মরল। এক হতে পারে, শি ড্রাইভস নট প্রপারলি। এমনকি এটা সুইসাইডালও হতে পারে।
— কী সব উদ্ভট বলছেন। দাদা, কেসটা নিয়ে সারা ওয়েস্টবেঙ্গল কাঁপছে। মানববন্ধন হচ্ছে। সবাই সোচ্চার। এমনটা বললে তো আপনারা ফেঁসে যাবেন।
কমিশনার হাসলেন।
— দাদা, তাই তো চলতে গিয়েও সব বলতে পারছি না। কিন্তু আমাদের কাছে অন্য খবর আছে।
— কী খবর! ওই হেরোইনখোরকে পটিয়ে-পিটিয়ে যা বলাবেন, তাই তো!
— আরে না, তা কেন হবে। বৃন্দার ড্রাইভিং লাইসেন্সের পাকা খবর পেয়েছি। বছর তিনেক আগে লালবাবুদের বিশেষ তদবিরে কিছু লাইসেন্স স্পেশালি দেয়া হয়েছিল। কোনো পরীক্ষা নেয়া হয়নি। বৃন্দা তখন তার লাইসেন্স বাগিয়ে নিয়েছিল।
— তার মানে কী বলতে চাইছেন। বৃন্দাকে কেউ মারেনি। সে নিজেই অ্যাকসিডেন্ট করে মরেছে। আর এটা প্রমাণ করবার জন্য যা যা দরকার, তার সবই করবেন। বৃন্দা ড্রাইভস ওভার ফাইভ ইয়ারস। নো অ্যাকসিডেন্ট। আর এখন কিনা লালবাবুদের ঘাড়ে চড়ে হেরোইনখোরদের গপ্প সাজাচ্ছেন।
কমিশনার হাসেন। —খেপছেন কেন দাদা। আমাদের ইনভেস্টিগেশন যা বলছে, ইনফরমেশন যা বলবে, আমরা তার বাইরে যেতে পারব না। আমাদের সিস্টেমের মধ্য দিয়ে চলতে হয়।
— এই ইনফরমেশন আগুন জ্বালাবে রাজ্যে। সাংবাদিকরা এই গাঁজাখুরি গপ্প মানবে না।
— দেখুন খবরি দাদা, এজন্যই আমি অন রেকর্ড কিছু বলিনি। আমার মুখে কুলুপ। আমরা এখনই কিছু বলব না। কেননা আমরা অ্যানার্কি চাই না। আপনারা মানববন্ধন না কী সব করছেন। ওপার বাংলার কর্মসূচি। করে যান। শরীর ভালো থাকবে। আমরা বছরের পর বছর পিটি-প্যারেড করতে অভ্যস্ত। আপনাদের ওটা কাজ নয়। আপনারা ক্লান্ত হলে থলের বেড়াল বের করব। হা হা।
— কিন্তু বিজয় কেতনের ভাই অজয় কেতন যে ভার্জিনিয়া গিয়ে উঠল, সে খবর কিছু রাখছেন। তাকে যে বড় জামাই আদরে বিদেশ যেতে দিলেন।
— দেখুন, আপনাদের মিডিয়ার একটা মস্ত সমস্যা হলো, কোনো কিছু ঘটলেই বিশাল কোনো বিজনেস হাউসকে জড়িয়ে ফেলেন। ওরা কী বলে জানেন, এটা নাকি সাংবাদিকদের পয়সা খাওয়ার ধান্ধা। অজয় কেতনের কথা বলছিলেন। খোঁজ নিয়েছি। সে বিজনেস ট্রিপে অনেক আগেই ভার্জিনিয়ার পারমিশন করে রেখেছিল। তাকে আমরা কেমন করে আটকাব। হি ইজ অ্যা জেন্টলম্যান। তার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। ও বলেছে, বৃন্দা নামে কাউকে সে চেনে না। তাছাড়া আমাদের হাতের পাঁচ যে দু’জন আই উইটনেস তারা কেউই অজয় বাবুকে ঘটনাস্থলে দেখেনি। এখন মিডিয়াতে কি গসিপ চলছে, তার ভিত্তিতে আমরা কেমন করে একজন জেন্টলম্যানকে মার্কিন মুল্লুক থেকে ডেকে পাঠিয়ে হ্যারাস করি দাদা।
— বৃন্দা এলডোরাডো সুপ্রিমোর বড় ধরনের ব্লান্ডার নিয়ে স্কুপ রিপোর্ট করতে যাচ্ছিল। সেই ব্লান্ডারটা কী?
— হা হা। সে প্রশ্ন তো আমারও। পুলিশও তা জানতে চায়। আরে দাদা, আমরা তো সিবিআই নই। সিআইএ-ও নই। আমরা পুিলশ। আমাদের দৌড় রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর আর পুলিশমন্ত্রী পর্যন্ত। তার বেশি আমরা কেমন করে দৌড়াব।
— বৃন্দা তার রিপোর্টের জন্য সেনসেটিভ কিছু ফুটেজ যোগাড় করেছিল। সেই ফুটেজ মহাকরণকেও টলিয়ে দিতে পারত।
— হা হা। এসব গাল-গপ্পও শুনেছি। কানে এসেছে। কিন্তু সেসব ফুটেজ কোথায়? তার হদিসটা দিন না। শোনা কথায় কেমন করে কান দিই। তাছাড়া যে বিজয়কেতন-অজয় কেতনের কথা বলছেন, ওরা তো বৃন্দার জন্য মস্ত কনডোলেনস করেছে। এলডোরাডো বড় একটা অ্যামাউন্ট ডোনেট করছে। এসব কাজকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। দেখুন দাদা, আমরা দৃশ্যমান সত্যকে নিয়ে কাজ করি। হাইপোথেটিক্যাল ব্যাপার নিয়ে পুলিশকে মাথা ঘামালে চলে না। ওসব উঁচুতলার গল্প নিয়ে সিবিআইকে ঘাঁটিয়ে দেখতে পারেন। হা হা।
— আর একটা প্রশ্ন।
— বলে ফেলুন। মাথায় যত প্রশ্ন আছে, সব ঝেড়ে কাশুন।
— এলডোরাডোর সঙ্গে মহাকরণের রাঘববোয়ালরা রয়েছে।
কমিশনার হাসলেন। আমিও তেমনটা শুনেছি। তবে আমি শুনেছি—মহাকরণ নয়, দিল্লির সাউথ ব্লক রয়েছে।
— সে সবের কোনো ডেভেলপমেন্ট।
— কী ডেভেলপমেন্ট। আপনারা যেমন শুনছেন, আমরাও তেমন শুনছি। নো ডেভেলপমেন্ট। সব ঝামেলায় পুলিশকে জড়ানো ঠিক নয়।
— তা হলে আলটিমেটলি কেসটা কী দাঁড়াচ্ছে। তদন্ত কোনদিকে এগোচ্ছে।
— হা, হা। কি আর বলব দাদা। তদন্ত শনৈঃ শনৈঃ এগোচ্ছে। আমরা প্রপার ওয়েতে কাজ করে যাচ্ছি।
— তদন্তের ফল নিয়ে কোনো স্কুপ নিউজ কি পেতে পারি? অফ দ্য রেকর্ড বলুন। বুম, মাইক্রোফোন অফ করলুম।
— ওকে, ওকে। শেষ কথা হলো, আমরা দৃশ্যমান যেসব আই উইটনেস পাচ্ছি—তাদের নিয়েই এগোবো। যদি আর নতুন কোনো আই উইটনেস না পাই, তবে সরি টু সে—আবদাল্লা আর মানিকচাঁদকে ভরসা করেই কেসটার ফয়সালা করতে আমরা বাধ্য।