ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

নিন্দুকেরা যে যাই বলুক, ’৯৬-২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনার ঐকমত্যের সরকারের কিছু সুকীর্তি ছিল; নারী শিক্ষা, বয়স্ক ভাতা, বিচারপতি সাহাবুদ্দীনকে প্রেসিডেন্ট করার রেওয়াজ বিমুখ সাহস; কিন্তু সেসব কাজ রীতিমত পর্বত চাপা পড়েছিল—গডফাদারতন্ত্র নামের হিমালয়ের নিচে। আবু তাহের, জয়নাল হাজারী, হাসানাত, শামীম ওসমান, গোলন্দাজ, মকবুল—যেন সেই সরকারের দুষ্কীর্তির একেকটি এভারেস্ট শৃঙ্গ। চলতি মহাজোট জমানায় কথামালা আর প্রতিশ্রুতির প্রবল আস্ফাালনের মাঝে কীর্তি খুঁজে পাওয়া ভার—কিন্তু দুষ্কর্মের ভূত যেন পিছুই ছাড়ছে না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের ফাঁসি বাস্তবায়ন; যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আংশিক উদ্যোগ, এছাড়া বলার মতো সরকারের কাজ কই! এই মহাজোট জমানা হতে পারত ইতিহাসের সেতু নির্মাণ জমানা। পদ্মা সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, মেট্রো রেল, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন, কুয়াকাটায় কামাল-জামাল-রাসেল ত্রি-সেতু। কিন্তু সব কাজই যে ঝুলন্ত। দুর্নীতির ভারে ঝুলন্ত। সরকারি সুকীর্তি না থাকলেও রাষ্ট্রীয় দুষ্কীর্তি ঠিকই আছে।

আর সেই দুষ্কীর্তির ব্রান্ড অ্যামবাসাডর হলো লক্ষ্মীপুরের বিশ্বখ্যাত খুনি বিপ্লব। একটি রাষ্ট্র ও সরকারের দুষ্কর্ম কত রকম ও কী কী হতে পারে—তা বিপ্লবকে দিয়েই নির্লজ্জভাবে প্রমাণ করে চলেছে সরকার।
একজন খুনিকে রেহাই দিতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বেপরোয়াভাবে ব্যবহারের ঘৃণ্যতম নজির স্থাপন করা হয়েছে চলতি জমানায়।

দেশ কাঁপানো নূরুল ইসলাম হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি বিপ্লবকে ২০১১ সালের জুলাইতে কলমের এক খোঁচায় রেহাই দেন রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান। ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১২তে সেই খুনি এইচএম বিপ্লবের আরও দুটি খুনের সাজা আংশিক ক্ষমা করলেন তিনি।

রুনি-সাগরের হত্যাকারীকে ধরতে পারে না যে রাষ্ট্র ও সরকার—শত শত খুনের বিচার যে দেশে হয় না—সেই রাষ্ট্রের কর্ণধার কেন খুনিকে রেহাই দেয়ার খেলায় মেতে উঠলেন। দেশ কি তবে খুনিদের অভয়ারণ্য হতে চলেছে। এখানে খুনের বিচার হবে না। খুনের বিচার চাইলে প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে তা নিয়ে টিটকারি দেবেন। হাসবেন। পরিহাস করবেন। আর যদি বিরল ক্ষেত্রে কোনো খুনের বিচার হয়ে যায়—খুনি দণ্ড পায়, তখন রাষ্ট্রপতি তাকে ক্ষমা করে দেবেন। বাহ! খুনিকে না ধরা; তদন্ত-তামাশার নামে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহায়তা—পাশাপাশি চূড়ান্ত বিচারে দণ্ডিত খুনিকে ছেড়ে দেয়ার কার্যক্রম—যুগপত্ একই সঙ্গে চলতে থাকবে। খুনখারাবি নিয়ে রাষ্ট্র ও সরকার কেন এই তামাশায় মেতে উঠল! মহাজোট সরকার কেন ঘাতক সরকারের উপাধি পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছে—ভাবতে ভয় হয়, এসব আলামত আগামীতে খুন হত্যার হোলিখেলার অশনি সঙ্কেত কিনা! তারা ক্ষমতাদর্পী ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে জনগণকে ভয় দেখাতে চায় কিনা—সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।

মহামান্য রাষ্ট্রপতির দরবারে ক্ষুদ্র কয়েকটি কথা নিবেদন করছি। তাহের পুত্র বিপ্লবকে তিনি ক্ষমা করে দিলেও সে খুনি। কেননা নিম্নআদালত, হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট—সর্বত্রই সে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত খুনি। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের যেভাবে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়েছে, এটাই ছিল তার একমাত্র নিয়তি। রাষ্ট্রপতি সেই আইনের স্বাভাবিক চাকাকে উল্টে দিলেন। এই ক্ষমার মাধ্যমে তিনি বিপ্লবের খুনের দায় ও পাপ—সবকিছু রাষ্ট্রের কাঁধে অবলীলায় চাপিয়ে দিয়েছেন। এই পাপ এখন রাষ্ট্রের; সরকারের এই কাজের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রকে কলঙ্কিত করেছেন। ইতিহাসে এই নজির কলঙ্ক হয়ে থাকবে। আর ওই পাপ-কাজের ভার আগামীতে বছরের পর বছর বহন করতে হবে দুর্ভাগা এই দেশকে। প্রিয় রাষ্ট্রপতি, নেতানেত্রীরা মানুষের জানমাল নিয়ে, নিরাপত্তা নিয়ে তামাশা করে করুক; আপনি আওয়ামী লীগের লোক হলেও দেশের অভিভাবক, আপনি রাষ্ট্রের আইন-আদালত, বিচার-ব্যবস্থাকে, তামাশাকে প্রশ্রয় দিতে পারেন না। আপনাকে হতে হবে ন্যায়পালক। ন্যায়-নীতিদণ্ড আপনার হাতে লাঞ্ছিত হলে মানুষের ভরসা হবে ভূলুণ্ঠিত। অপরিণামদর্শী নেতানেত্রীরা রাষ্ট্রপতি পদের সাংবিধানিক দুর্বলতাকে ব্যবহার করে খুনিকে ক্ষমা করতে আপনাকে বাধ্য করে এই রাষ্ট্রের গায়ে দিতে চায় খুনির সিলমোহর; খুনি-হত্যাকারীদের পালাবার পথ করে দিয়ে সরকার যদি হয়ে পড়ে ঘাতক-বন্ধু—এই বালখিল্য তামাশা-বৌচি খেলাকে আপনি কোনোভাবেই স্নেহের দৃষ্টিতে দেখতে পারেন না। রাষ্ট্রকে খুনি হওয়া থেকে, সরকারকে ঘাতক হওয়া থেকে রক্ষা করা আপনার কর্তব্য। স্নেহের আতিশয্যে বার্ধক্যের দুর্বলতায় এই কর্তব্য পালনে অবহেলার কোনো সুযোগ আপনার নেই।